Islamic Life

আকিকার গোস্ত মাতা-পিতা খেতে পারবে কিনা

আকিকা আকিকা

আকিকার গোস্ত মাতা-পিতা খেতে পারবে কিনা — কুরআন, হাদিস ও আলেমদের মতামতসহ বিশ্লেষণ

🔹 আকিকার পরিচয় ও শরয়ি গুরুত্ব

“আকিকা” (العقيقة) শব্দের অর্থ হলো নবজাতকের পক্ষ থেকে কৃত কোরবানি। নবী করিম ﷺ নিজে আকিকার নির্দেশ দিয়েছেন। হাদিসে এসেছে —

> عَنِ الغُلَامِ شَاتَانِ مُكَافِئَتَانِ، وَعَنِ الْجَارِيَةِ شَاةٌ
(সুনান ইবন মাজাহ, হাদিস: 3162)

 

অর্থ: “ছেলের পক্ষ থেকে দুইটি সমবয়সী ভেড়া/ ছাগল এবং মেয়ের পক্ষ থেকে একটি ভেড়া/ ছাগল কোরবানি করা হোক।”

আরেকটি হাদিসে এসেছে —

> كُلُّ غُلَامٍ مُرْتَهَنٌ بِعَقِيقَتِهِ، تُذْبَحُ عَنْهُ يَوْمَ السَّابِعِ، وَيُحْلَقُ رَأْسُهُ وَيُسَمَّى
(সুনান আবু দাউদ, হাদিস: 2838)

 

অর্থ: “প্রত্যেক শিশু তার আকিকার সাথে বন্ধকিত থাকে। সপ্তম দিনে তার জন্য পশু জবাই করা হবে, মাথা মুণ্ডন করা হবে এবং নাম রাখা হবে।”

এই হাদিসদ্বয় থেকে জানা যায় যে আকিকা একটি সুন্নতে মুয়াক্কাদা আমল — নবজাতকের জন্য কৃত কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি শরঈ রীতি।

আকিকা
আকিকা

🔹 আকিকার গোস্ত খাওয়া সম্পর্কিত মৌলিক বিধান

ইসলামের শরীয়তে আকিকার মাংস কোরবানির মতোই বৈধ ও হালাল। এটি দান করা, আত্মীয়-স্বজনকে খাওয়ানো, নিজেরা খাওয়া — সবই জায়েয। হাদিসে বা সাহাবায়ে কেরামের আমলে এমন কোনো নির্দেশ পাওয়া যায়নি যে, “মাতা-পিতা আকিকার মাংস খেতে পারবে না।”

হানাফি মাজহাবের প্রসিদ্ধ ফতোয়া বইগুলোতে (যেমন “ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি”, “আল-বাহরুর রায়েক”, “রদুল মুহতার”) এবং আধুনিক আলেমদের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে:

> “يُسْتَحَبُّ أَنْ يُؤْكَلَ مِنْهَا وَيُتَصَدَّقَ وَيُهْدَى”
অর্থ: আকিকার মাংস থেকে খাওয়া, দান করা ও উপহার দেওয়া – সবই মুস্তাহাব।

 

অতএব, শরীয়তের দৃষ্টিতে আকিকার গোস্ত নিজে খাওয়া জায়েয এবং মুস্তাহাব।

🔹 দারুল উলূম দেওবন্দ ও হক্কানী আলেমদের ফতোয়া

দারুল ইফতা, দারুল উলূম দেওবন্দ-এর অফিসিয়াল ফতোয়ায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে:

> “আকিকার মাংস শিশুর মাতা-পিতা, দাদা-দাদি, ভাই-বোন – সকলের জন্যই খাওয়া জায়েয। আকিকা কোনো নযর বা মান্নতের কোরবানি নয়; এটি কৃতজ্ঞতার সুন্নতি কোরবানি, তাই অন্য কোরবানির মতোই সবাই খেতে পারে।”
(ফতোয়া: দারুল ইফতা, দেওবন্দ – রেফারেন্স নং: 109514)

 

এছাড়া মুফতি ইব্রাহিম দেশাই , মুফতি তাকি উসমানী (Pakistan), মুফতি মুহাম্মদ শফী (Fatāwā Ma‘ariful-Qur’an) প্রমুখ আলেমও একমত —
আকিকার মাংস থেকে মাতা-পিতা খেতে পারবেন, কারণ এতে কোনো শরঈ নিষেধাজ্ঞা নেই।

ইসলামিক ওয়েবসাইট “IslamWeb”, “IslamQA”, ও “Darulifta Deoband”-এর একাধিক ফতোয়ায় বলা হয়েছে:

> “It is permissible for the parents to eat from the meat of ‘Aqeeqah, and also to give some to relatives and the poor.”
(রেফ: IslamWeb Fatwa No. 92079)

 

🔹 হাদিস ও ফতোয়ার আলোকে ব্যাখ্যা

আকিকার উদ্দেশ্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং নবজাতকের জন্য দোয়া করা। কোরবানি-জাতীয় এই ইবাদতের মাধ্যমে মুসলিম সমাজে আনন্দ ভাগাভাগি হয়। নবী ﷺ-এর আমলে ও সাহাবাদের যুগে আকিকার মাংস পরিবার-সহ ভাগাভাগি করা হতো।

যেহেতু কোরবানি ও আকিকার মধ্যে মূল পার্থক্য শুধুমাত্র উদ্দেশ্যে, বিধানে নয়, তাই আকিকার মাংস খাওয়ায় কোনো হারাম বা মাকরূহ দিক নেই।

আর কেউ যদি বলে “মাতা-পিতা খেতে পারবে না”—তাহলে তার কাছে শরঈ প্রমাণ চাইতে হবে। কোরআন-সুন্নাহ বা সাহাবিদের আমল কোথাও এমন নিষেধ পাওয়া যায় না। বরং সকল প্রমাণই বলে, খাওয়া জায়েয ও উত্তম।

🔹 যারা বলে আকিকার গোশত মাতা পিতা খেতে পারবে না — তাদের দাবির জবাব

কিছু লোক বলে থাকেন যে, “আকিকার মাংস দান করতে হয়, তাই মা-বাবা খেতে পারবে না।” — এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা।
কারণ আকিকা কোনো “নযর” নয়; নযরের মাংস দাতা নিজে খেতে পারেন না, কিন্তু আকিকা হলো “সুন্নতি কোরবানি”, যা কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য। তাই এর বিধান কোরবানির মতোই।

দারুল উলূম দেওবন্দ-এর ফতোয়ায় এ বিষয়ে বলা হয়েছে —

> “এই ধারণা ভিত্তিহীন; বরং শরীয়ত মাতা-পিতার খাওয়া অনুমোদন করেছে। তাদের না খাওয়ায় কোনো সওয়াব বৃদ্ধি হয় না, বরং এটি কুসংস্কার।”

 

🔹 উপসংহার

১️⃣ আকিকা হলো নবজাতকের পক্ষ থেকে কৃত কোরবানিসদৃশ সুন্নতি আমল।
২️⃣ আকিকার মাংস দান করা, আত্মীয়দের খাওয়ানো ও নিজেরা খাওয়া — তিনটিই শরীয়তসম্মত।
৩️⃣ কোনো হাদিস, কোরআন আয়াত বা ফতোয়া নেই যা মা-বাবার খাওয়াকে নিষিদ্ধ করে।
৪️⃣ দারুল উলূম দেওবন্দসহ সমস্ত হক্কানী আলেমের ফতোয়া — মাতা-পিতা ও পরিবারের জন্য আকিকার গোস্ত খাওয়া সম্পূর্ণ বৈধ ও উত্তম।

🔸 সংক্ষেপে (এক বাক্যে):

“আকিকার গোস্ত থেকে মাতা-পিতা খেতে পারবে; এতে কোনো শরঈ নিষেধ নেই বরং এটি মুস্তাহাব ও বরকতপূর্ণ কাজ।”

2 thoughts on “আকিকার গোস্ত মাতা-পিতা খেতে পারবে কিনা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *