দশ কেরাত(القراءات العشر) – সংক্ষিপ্ত পরিচয়, ইতিহাস ও দলিলসহ বিস্তারিত আলোচনা
কোরআন মাজিদ আল্লাহর পক্ষ হতে নাযিলকৃত একমাত্র সংরক্ষিত গ্রন্থ। আল্লাহ তাআলা স্বয়ং প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছেন কোরআান সংরক্ষণের ব্যাপারে:
আল-কোরআনের প্রমাণ
﴿ إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ ﴾
“নিশ্চয়ই আমরাই এই স্মরণ (কোরআন) নাযিল করেছি এবং আমরাই তার সংরক্ষণকারী।”
— সূরা আল-হিজর, ১৫:৯
কোরআন সংরক্ষণের অন্যতম মাধ্যম হলো কিরাআত—অর্থাৎ বিভিন্ন সাহাবী ও তাবেঈদের মাধ্যমে তাওকীফী (নবী ﷺ শিক্ষা দিয়েছেন) উচ্চারণ-পদ্ধতিতে কোরআন পাঠ।
এই কিরাআতসমূহ পরবর্তীতে সাত কিরাআত, দশ কিরাআত আশারা এবং চৌদ্দ রাওয়ায়াত হিসেবে ইলমে কিরাআতের বইগুলোতে সংরক্ষিত হয়।
দশ কেরাতের দলিলসমূহ কোরআন ও হাদিসে
১) কোরআন বহু-পাঠরূপে নাযিল হওয়ার দলিল
(আহরুফে নাযিল হওয়ার প্রমাণ)
রাসুল ﷺ বলেন—
« إِنَّ هذَا الْقُرْآنَ أُنزِلَ عَلَى سَبْعَةِ أَحْرُفٍ »
“এই কোরআন সাত ‘অহরুফে’ নাযিল হয়েছে।”
— সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮১৮
এখানে ‘অহরুফ’ বলে বিভিন্ন আরবি জাতিগোষ্ঠীর ভাষাগত বৈচিত্র্য অনুযায়ী পাঠরূপ বোঝানো হয়েছে। পরবর্তীতে সাহাবীগণ যেসব নির্ভুল পাঠরূপ সংরক্ষণ করেছেন—তাই আজকের ‘কিরাআত’।
দশ কেরাত (القراءات العشر)
দশ কেরাত বলতে ১০ জন প্রধান কিরাআত ইমামের নির্ভুল পাঠ বোঝানো হয়। প্রত্যেক ইমামের ২ জন করে রাওয়ি (বর্ণনাকারী) রয়েছে। এরা তাওকীফী, মুতাওয়াতির এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সংরক্ষিত।
দশ কিরাআত ইমাম
(১) ইমাম নافع আল-মাদানী
(২) ইমাম ইবনে কাসির আল-মাক্কী
(৩) ইমাম আবু আমর আল-বাসরী
(৪) ইমাম ইবনে আমির আশ-শামী
(৫) ইমাম আসিম আল-কুফী
(৬) ইমাম হামযা আল-কুফী
(৭) ইমাম কিসাঈ (الكسائي)
— এই সাতজনকে বলা হয় “সাবআ কিরাআত”
অতিরিক্ত তিনজন যাদের যুক্ত করে আশারা কুবরা (দশ কিরাত) সম্পূর্ণ হয়:
(৮) ইমাম আবু জা’ফর আল-মাদানী
(৯) ইমাম ইয়াকুব আল-বাসরী
(১০) ইমাম খলফ আল-আশির (خلف العاشر)
দশ কেরাত প্রত্যেক ইমাম ও তাঁদের রাওয়ি (বর্ণনাকারী)
১. কিরাআত নافع (القراءة لِنافع المدني)
রাওয়ি:
- ওয়ারশ (ورش)
- কালূন (قالون)
২. কিরাআত ইবনে কাসির (ابن كثير المكي)
রাওয়ি:
- বাজ্জি (البزي)
- কুন্নাবি/কুন্নি (قنبل)
৩. কিরাআত আবু আমর (أبو عمرو البصري)
রাওয়ি:
- দুরি (الدوري)
- সুসি (السوسي)
৪. কিরাআত ইবনে আমির (ابن عامر الشامي)
রাওয়ি:
- হিশাম (هشام)
- ইবন জুবাইর (ابن ذكوان)
৫. কিরাআত আসিম (عاصم الكوفي)
(বিশ্বে সবচেয়ে প্রচলিত – হাফস আন আসিম)
রাওয়ি:
- হাফস (حفص)
- শুবা (شعبة)
৬. কিরাআত হামযা (حمزة الكوفي)
রাওয়ি:
- খালাফ (خلف)
- খালাদ (خلاد)
৭. কিরাআত কিসাঈ (الكسائي)
রাওয়ি:
- দুরি (الدوري)
- আবুল হারেস (أبو الحارث)
অতিরিক্ত তিন কিরাত (মুতাওয়াতির আশারা সম্পূর্ণকারী)
৮. কিরাআত আবু জা’ফর (أبو جعفر المدني)
রাওয়ি:
- ইবনে ওয়ারদান (ابن وردان)
- ইবনে জামজুম (ابن جماز)
৯. কিরাআত ইয়াকুব (يعقوب الحضرمي)
রাওয়ি:
- রুয়াইস (رويس)
- রূহ (روح)
১০. কিরাআত খলফ আল-আশির (خلف العاشر)
রাওয়ি:
- ইসমাঈল (إسحاق)
- ইদ্রিস (إدريس)
দশ কেরাত — সহিহ দলিলের ভিত্তিতে গ্রহণযোগ্যতা
ইমাম ইবনে জাযরি (ইলমে কিরাতের সর্বোচ্চ অথরিটি) বলেন—
« كل قراءة وافقت العربية وصح سندها ووافقت رسم المصحف فهي من القراءات الصحيحة »
“যে কিরাআত আরবির ব্যাকরণসম্মত, যার sanad (শৃঙ্খল) সহিহ, এবং যা উসমানি মুসহাফের রসমের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ—সেটিই সহিহ কিরাআত।”
— ইবনে জাযরি, النشر في القراءات العشر, 1/9
এই নীতিমালা অনুযায়ী দশ কেরাত (আশারা) পুরোপুরি মুতাওয়াতির ও সহিহ।
দশ কেরাত
কেন ভিন্ন?
ভিন্নতার কারণগুলো—
- হামজা, মাদ্দ, আদগাম, ইমালা, ইশমাম, তাখফিফ ইত্যাদি উচ্চারণগত পার্থক্য
- কিছু স্থানে হামজা পড়া বা না পড়া
- حذف، زيادة، تقديم، تأخير—কিছু শব্দ রসূল ﷺ দুটি বৈধ উচ্চারণ শিখিয়েছেন
- আরব উপভাষাগত পার্থক্য সংরক্ষিত থাকা
এই ভিন্নতা কোনো বিরোধ সৃষ্টি করে না, বরং কোরআনের ফাসাহাত, গভীরতা ও মু’জিজাহ প্রকাশ করে।
হাদিস ও সাহাবীদের প্রমাণ (দশ কেরাত
ভিন্নতার দলিল)
১) উমর ও হিশাম বিন হাকিমের ঘটনা
সহিহ বুখারি ও মুসলিমে এসেছে—
« فَقَرَأَ كُلٌّ مِنهُمَا عَلَى وَجْهٍ مُخْتَلِفٍ، فَأَقَرَّ النَّبِيُّ ﷺ كِلَيْهِمَا »
উভয়েই ভিন্নভাবে কোরআন পড়লেন, এবং নবী ﷺ উভয় রূপই অনুমোদন করলেন।
— সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৯৯২
এটি প্রমাণ করে বহু-পাঠরূপ রাসুল ﷺ এরই অনুমোদিত।

উপসংহার
- দশ কেরাত হলো কোরআনের দশটি মুতাওয়াতির, সহিহ, তাওকীফী পাঠরূপ।
- প্রত্যেক কিরাতের পাঠরীতি রাসুল ﷺ → সাহাবী → তাবেঈ → তাবে-তাবেঈ → কিরাত ইমামদের মাধ্যমে সংরক্ষিত।
- এগুলোর ভিন্নতা ‘বিরোধ’ নয়, বরং কোরআনের গভীরতা, ফাসাহাত ও মু’জিজার অংশ।
দশ কেরাতের ইলম মুসলিম উম্মাহর ইলমী ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

