Islamic Life

আশুরার গুরুত্ব, ফজিলত, ইতিহাস ও আমল |

আশুরার গুরুত্ব, ফজিলত আশুরার গুরুত্ব, ফজিলত

Table of Contents

আশুরার গুরুত্ব, ফজিলত, ইতিহাস ও আমল | কুরআন-হাদিসের আলোকে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা

ভূমিকা

ইসলামী বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস হলো মুহাররম। এটি ইসলামের চারটি সম্মানিত মাসের অন্যতম। এই মাসের ১০ তারিখকে “ইয়াওমুল আশুরা” বা আশুরার দিন বলা হয়। ইসলামের ইতিহাসে এ দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ। নবী-রাসূলদের জীবনে সংঘটিত বহু ঐতিহাসিক ঘটনার স্মৃতি বহন করে এই দিন। একই সঙ্গে রাসূলুল্লাহ ﷺ এ দিনের রোজাকে বিশেষ ফজিলতপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করেছেন।

আশুরা শুধু একটি দিন নয়; বরং এটি ঈমান, ত্যাগ, ধৈর্য, আল্লাহর সাহায্যের প্রতি বিশ্বাস এবং সত্যের জন্য আত্মত্যাগের এক উজ্জ্বল প্রতীক।

 

আশুরার গুরুত্ব, ফজিলত
আশুরার গুরুত্ব, ফজিলত

মুহাররম মাসের মর্যাদা

إِنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِندَ اللَّهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِي كِتَابِ اللَّهِ يَوْمَ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ ۚ ذَٰلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ ۚ فَلَا تَظْلِمُوا فِيهِنَّ أَنْفُسَكُمْ ۚ وَقَاتِلُوا الْمُشْرِكِينَ كَافَّةً كَمَا يُقَاتِلُونَكُمْ كَافَّةً ۚ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ مَعَ الْمُتَّقِينَ

বাংলা অনুবাদ

“নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা বারোটি, যা আল্লাহর বিধানে সেদিন থেকেই নির্ধারিত যেদিন তিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। এর মধ্যে চারটি হলো সম্মানিত (পবিত্র) মাস। এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীন। সুতরাং তোমরা এ মাসগুলোতে নিজেদের ওপর জুলুম করো না। আর তোমরা সকল মুশরিকের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে যুদ্ধ কর, যেমন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে যুদ্ধ করে। আর জেনে রাখ, আল্লাহ মুত্তাকীদের সঙ্গে আছেন।”

— সূরা আত-তাওবা, আয়াত: ৩৬

আয়াতের ব্যাখ্যা

এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, বছরের মাস সংখ্যা বারোটি—এটি কোনো মানবসৃষ্ট ব্যবস্থা নয়; বরং আসমান-জমিন সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহ নির্ধারণ করে রেখেছেন।

চারটি সম্মানিত মাস

রাসূল ﷺ বলেছেন: السَّنَةُ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا، مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ: ثَلَاثٌ مُتَوَالِيَاتٌ: ذُو الْقَعْدَةِ وَذُو الْحِجَّةِ وَالْمُحَرَّمُ، وَرَجَبُ مُضَرَ

“বছর বারো মাসের। এর মধ্যে চারটি সম্মানিত মাস। তিনটি ধারাবাহিক—যিলকদ, যিলহজ ও মুহাররম; আর একটি হলো রজব।”

Sahih al-Bukhari, হাদিস নং ৪৬৬২; Sahih Muslim, হাদিস নং ১৬৭৯

অতএব সম্মানিত চার মাস হলো:

  1. যিলকদ (ذو القعدة)
  2. যিলহজ (ذو الحجة)
  3. মুহাররম (المحرم)
  4. রজব (رجب)

তোমরা এ মাসগুলোতে নিজেদের ওপর জুলুম করো না” — এর অর্থ

তাফসিরবিদগণ বলেন, সব সময়ই পাপ করা নিষিদ্ধ; তবে সম্মানিত মাসগুলোতে পাপের ভয়াবহতা ও গুনাহের গুরুত্ব আরও বেশি। একইভাবে নেক আমলের সওয়াবও অধিক মর্যাদাপূর্ণ।

Ibn Kathir বলেন, এ মাসগুলোতে জুলুম ও গুনাহ থেকে বিশেষভাবে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কারণ এসব মাসের মর্যাদা আল্লাহ তাআলা বিশেষভাবে বৃদ্ধি করেছেন।

মুহাররম মাসের বিশেষ মর্যাদা

মুহাররম হলো হিজরি বছরের প্রথম মাস এবং চারটি সম্মানিত মাসের অন্যতম। এ মাস সম্পর্কে রাসূল ﷺ বলেছেন— أَفْضَلُ الصِّيَامِ بَعْدَ رَمَضَانَ شَهْرُ اللَّهِ الْمُحَرَّمُ “রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মুহাররমের রোজা।”— Sahih Muslim, হাদিস নং ১১৬৩

হাদিসে মুহাররমকে “শাহরুল্লাহ” (আল্লাহর মাস) বলা হয়েছে, যা এ মাসের বিশেষ মর্যাদা ও সম্মানের প্রমাণ।—

 

আশুরা কী?

“আশুরা” শব্দটি আরবি “عاشر” (আশির) থেকে এসেছে, যার অর্থ দশম। মুহাররম মাসের ১০ তারিখকে আশুরা বলা হয়।

আশুরার রোজার গুরুত্ব

হাদিসের মূল বর্ণনা

عن أبي قتادة رضي الله عنه قال: سُئِلَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ عَنْ صِيَامِ يَوْمِ عَاشُورَاءَ، فَقَالَ: يُكَفِّرُ السَّنَةَ الْمَاضِيَةَ

“রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে আশুরার দিনের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, ‘এটি বিগত এক বছরের (সগীরা) গুনাহের কাফফারা হয়ে যায়।’”

অন্য বর্ণনায় এসেছে— صِيَامُ يَوْمِ عَاشُورَاءَ، أَحْتَسِبُ عَلَى اللَّهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُ“আশুরার দিনের রোজা সম্পর্কে আমি আল্লাহর কাছে আশা রাখি যে, তিনি এর মাধ্যমে পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবেন।”

Sahih Muslim, হাদিস নং ১১৬২

বাংলা অনুবাদ

আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:

“রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে আশুরার দিনের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে আশা করি যে আশুরার রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।’”


হাদিসের ব্যাখ্যা

১. আশুরার রোজা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ

আশুরা অর্থ মুহাররম মাসের ১০ তারিখ। এই দিনের রোজার এমন মর্যাদা রয়েছে যে আল্লাহ তাআলা এর মাধ্যমে বান্দার পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ ক্ষমা করে দেন।

২. এখানে কোন গুনাহ ক্ষমা করা হয়?

মুহাদ্দিস ও ফকিহগণ ব্যাখ্যা করেছেন যে, এ হাদিসে সগীরা (ছোট) গুনাহ বোঝানো হয়েছে। আর কবীরা (বড়) গুনাহ থেকে মুক্তি পেতে হলে তওবা করা আবশ্যক।

Imam al-Nawawi বলেন: “আরাফার রোজা দুই বছরের এবং আশুরার রোজা এক বছরের গুনাহের কাফফারা হয়। এর দ্বারা সগীরা গুনাহ ক্ষমা হওয়া উদ্দেশ্য।”

৩. “আমি আশা করি” কথার অর্থ

রাসূল ﷺ-এর “أَحْتَسِبُ عَلَى اللَّهِ” (আমি আল্লাহর কাছে আশা করি) বাক্যটি বিনয়, আদব ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ নির্ভরতার শিক্ষা দেয়। অর্থাৎ গুনাহ মাফ করা সম্পূর্ণ আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়ার বিষয়।

৪. আশুরার সাথে ৯ বা ১১ মুহাররম মিলিয়ে রোজা রাখা উত্তম

রাসূলুল্লাহ ﷺ ইহুদিদের থেকে স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার জন্য পরবর্তী বছরে ৯ মুহাররমও রোজা রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।

তিনি বলেন— لَئِنْ بَقِيتُ إِلَى قَابِلٍ لَأَصُومَنَّ التَّاسِعَ “আমি যদি আগামী বছর পর্যন্ত জীবিত থাকি, তবে অবশ্যই ৯ তারিখও রোজা রাখব।”

Sahih Muslim, হাদিস নং ১১৩৪

 

আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—

مَا رَأَيْتُ النَّبِيَّ ﷺ يَتَحَرَّى صِيَامَ يَوْمٍ فَضَّلَهُ عَلَى غَيْرِهِ إِلَّا هَذَا الْيَوْمَ، يَوْمَ عَاشُورَاءَ، وَهَذَا الشَّهْرَ، يَعْنِي شَهْرَ رَمَضَانَ

বাংলা অনুবাদ

“আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে এমন কোনো দিনের রোজা পালনে বিশেষভাবে আগ্রহী হতে দেখিনি, যাকে তিনি অন্যান্য দিনের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিতেন; তবে এই দিনটি—আশুরার দিন, এবং এই মাসটি—অর্থাৎ রমজান মাস ব্যতীত।”

Sahih al-Bukhari, হাদিস নং ২০০৬

হাদিসের ব্যাখ্যা

১. আশুরার রোজার প্রতি রাসূল ﷺ-এর বিশেষ যত্ন

হাদিসে “يَتَحَرَّى” শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ হলো—বিশেষভাবে খোঁজ নেওয়া, গুরুত্ব দেওয়া এবং যত্নসহকারে কোনো আমল পালন করা।

অর্থাৎ রাসূল ﷺ আশুরার রোজাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালন করতেন এবং সাহাবিদেরও এ ব্যাপারে উৎসাহিত করতেন।

২. আশুরার দিনের বিশেষ মর্যাদা

আশুরা (১০ মুহাররম) এমন একটি দিন, যেদিন আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী Musa (আলাইহিস সালাম) ও বনী ইসরাঈলকে ফিরআউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। এজন্য নবী ﷺ এ দিনের রোজা রাখতেন এবং মুসলমানদেরও রোজা রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন।

৩. রমজানের পর সর্বাধিক গুরুত্বপ্রাপ্ত রোজাগুলোর একটি

এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, ফরজ রমজানের রোজার পরে আশুরার রোজা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ নফল রোজাগুলোর অন্তর্ভুক্ত।

অন্য হাদিসে রাসূল ﷺ বলেছেন: صِيَامُ يَوْمِ عَاشُورَاءَ، أَحْتَسِبُ عَلَى اللَّهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُ “আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আশুরার রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।”

Sahih Muslim, হাদিস নং ১১৬২

৪. আশুরার রোজার সুন্নত পদ্ধতি

মুহাদ্দিসগণ উল্লেখ করেছেন যে, আশুরার রোজার পূর্ণাঙ্গ সুন্নত হলো—

  • ৯ ও ১০ মুহাররম রোজা রাখা; অথবা
  • ১০ ও ১১ মুহাররম রোজা রাখা; অথবা
  • ৯, ১০ ও ১১—তিন দিনই রোজা রাখা।

এতে ইহুদিদের থেকে স্বাতন্ত্র্য বজায় থাকে এবং সুন্নতের অনুসরণ আরও পরিপূর্ণ হয়।

কেন আশুরার রোজা রাখা হয়?

ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন—

রাসূল ﷺ মদিনায় এসে দেখলেন ইহুদিরা আশুরার দিনে রোজা রাখে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন— “তোমরা কেন রোজা রাখো?” তারা বলল— > هَذَا يَوْمٌ صَالِحٌ، هَذَا يَوْمٌ نَجَّى اللَّهُ بَنِي إِسْرَائِيلَ مِنْ عَدُوِّهِمْ

অর্থঃ “এটি একটি মহান দিন। এ দিনে আল্লাহ বনী ইসরাইলকে তাদের শত্রুর হাত থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন।” তখন রাসূল ﷺ বললেন— > فَأَنَا أَحَقُّ بِمُوسَى مِنْكُمْ

 

আশুরার রোজা ও মূসা (আ.)-এর অনুসরণের প্রকৃত অধিকার

আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—

قَدِمَ النَّبِيُّ ﷺ الْمَدِينَةَ، فَرَأَى الْيَهُودَ تَصُومُ يَوْمَ عَاشُورَاءَ، فَقَالَ: مَا هَذَا؟ قَالُوا: هَذَا يَوْمٌ صَالِحٌ، هَذَا يَوْمٌ نَجَّى اللَّهُ بَنِي إِسْرَائِيلَ مِنْ عَدُوِّهِمْ، فَصَامَهُ مُوسَى، فَقَالَ: فَأَنَا أَحَقُّ بِمُوسَى مِنْكُمْ، فَصَامَهُ وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ

অর্থ:
“নবী ﷺ মদিনায় আগমন করে দেখলেন, ইহুদিরা আশুরার দিন রোজা রাখছে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এটা কী?’ তারা বলল, ‘এটি একটি মহৎ দিন। এ দিনে আল্লাহ বনী ইসরাঈলকে তাদের শত্রুর হাত থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। তাই মূসা (আ.) এ দিনে রোজা রেখেছিলেন।’ তখন রাসূল ﷺ বললেন, ‘মূসা (আ.)-এর অনুসরণ করার অধিক হকদার আমি তোমাদের চেয়ে বেশি।’ অতঃপর তিনি নিজে রোজা রাখলেন এবং এ দিনের রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন।” — Sahih al-Bukhari, হাদিস নং ২০০৪


হাদিসের রাবি (বর্ণনাকারী)

এই হাদিসের বর্ণনাকারী হলেন Abdullah ibn Abbas (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা)। তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর চাচাতো ভাই এবং উম্মতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম ও মুফাসসির। রাসূল ﷺ তাঁর জন্য এ দোয়া করেছিলেন: اللَّهُمَّ فَقِّهْهُ فِي الدِّينِ وَعَلِّمْهُ التَّأْوِيلَ “হে আল্লাহ! তাকে দ্বীনের গভীর জ্ঞান দান করুন এবং কুরআনের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিন।”


হাদিসের ব্যাখ্যা

১. আশুরার দিনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব

আশুরার দিনে আল্লাহ তাআলা নবী Musa (আলাইহিস সালাম) এবং তাঁর অনুসারীদেরকে ফিরআউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। কুরআনে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ সমুদ্র দ্বিখণ্ডিত করে মূসা (আ.) ও তাঁর জাতিকে নিরাপদে পার করে দেন এবং ফিরআউন ও তার বাহিনীকে ডুবিয়ে দেন। এ মহান নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশে মূসা (আ.) রোজা রেখেছিলেন।

২. “আমি মূসার অধিক হকদার” — এর অর্থ কী?

রাসূল ﷺ-এর এ বক্তব্যের অর্থ হলো—

  • ইসলামের নবী ও মুসলমানরাই প্রকৃত অর্থে সকল নবীর উত্তরসূরি।
  • মূসা (আ.) যে তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছিলেন, রাসূল ﷺ-ও সেই একই তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছেন।
  • ইহুদিরা মূসা (আ.)-এর মূল শিক্ষা ও শরিয়তের অনেক বিষয় পরিবর্তন ও বিকৃত করেছিল; পক্ষান্তরে ইসলাম তাঁর প্রকৃত শিক্ষার ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছে।

অতএব, নবী ﷺ বোঝাতে চেয়েছেন যে, তাওহীদ ও আনুগত্যের দিক থেকে মুসলমানরাই মূসা (আ.)-এর প্রকৃত অনুসারী।

৩. আশুরার রোজা সুন্নত হওয়ার দলিল

এই হাদিসে স্পষ্টভাবে এসেছে— فَصَامَهُ وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ “তিনি নিজে রোজা রাখলেন এবং রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন।” এ থেকে প্রমাণিত হয় যে আশুরার রোজা একটি প্রতিষ্ঠিত সুন্নত।

৪. কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি মাধ্যম

আশুরার রোজা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও নিয়ামতের জন্য শোক নয়; বরং ইবাদত, শুকরিয়া ও আনুগত্যের মাধ্যমে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হয়।

৯ ও ১০ মুহাররম রোজা রাখার নির্দেশ

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন— > لَئِنْ بَقِيتُ إِلَى قَابِلٍ لَأَصُومَنَّ التَّاسِعَ অর্থঃ “আমি যদি আগামী বছর বেঁচে থাকি, তাহলে নবম তারিখও রোজা রাখব।” — সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৩৪

 

আশুরার দিনে সংঘটিত ঐতিহাসিক ঘটনাবলি

বিভিন্ন ইতিহাসগ্রন্থে উল্লেখ আছে যে—

  1. আদম (আ.)-এর তওবা কবুল হয়।
  2. নূহ (আ.)-এর নৌকা জুদি পর্বতে ভিড়ে।
  3. ইবরাহিম (আ.) নমরুদের আগুন থেকে রক্ষা পান।
  4. ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে মুক্তি পান।
  5. আইয়ুব (আ.) রোগমুক্ত হন।
  6. ইউসুফ (আ.) কূপ থেকে উদ্ধার হন।
  7. মূসা (আ.) ও বনী ইসরাইল ফেরাউনের হাত থেকে মুক্তি পান।

তবে এসব ঘটনার অনেকগুলোর সনদ দুর্বল। সহিহ সূত্রে সবচেয়ে শক্তিশালীভাবে প্রমাণিত ঘটনা হলো মূসা (আ.) ও বনী ইসরাইলের মুক্তি।

 

ইমাম হুসাইন (রা.)-এর মর্যাদা ও কারবালার ঘটনা

৬১ হিজরির ১০ মুহাররম (আশুরা দিবস) ইরাকের Karbala প্রান্তরে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রিয় দৌহিত্র Al-Husayn ibn Ali (রাদিয়াল্লাহু আনহু) শাহাদাতবরণ করেন। ইসলামের ইতিহাসে এটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ও বেদনাদায়ক একটি ঘটনা। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদা হলো—আমরা ইমাম হুসাইন (রা.)-কে গভীরভাবে ভালোবাসি, তাঁর শাহাদাতের জন্য দুঃখ প্রকাশ করি এবং তাঁর মর্যাদা ও ত্যাগকে সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করি।

হাদিসের মূল বর্ণনা

ইয়ালা ইবনু মুররাহ আস-সাকাফী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন— حُسَيْنٌ مِنِّي وَأَنَا مِنْ حُسَيْنٍ، أَحَبَّ اللَّهُ مَنْ أَحَبَّ حُسَيْنًا، حُسَيْنٌ سِبْطٌ مِنَ الْأَسْبَاطِ

অর্থ:
“হুসাইন আমার অংশ এবং আমি হুসাইনের অংশ। আল্লাহ তাকে ভালোবাসুন, যে হুসাইনকে ভালোবাসে। হুসাইন হলো নাতিদের অন্যতম (সম্মানিত বংশধর)।”

Jami at-Tirmidhi, হাদিস নং ৩৭৭৫


হাদিসের ব্যাখ্যা

“হুসাইন আমার অংশ” — এর অর্থ

রাসূল ﷺ-এর এ বক্তব্য ইমাম হুসাইন (রা.)-এর প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা, স্নেহ ও নৈকট্য প্রকাশ করে। অর্থাৎ হুসাইন (রা.) ছিলেন রাসূল ﷺ-এর পরিবার (আহলে বাইত)-এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সদস্য।

“আমি হুসাইনের অংশ” — এর অর্থ

মুহাদ্দিসগণ ব্যাখ্যা করেছেন, এর অর্থ হলো—

  • হুসাইন (রা.) রাসূল ﷺ-এর দ্বীন, আদর্শ ও সুন্নাহর ধারক ও অনুসারী।
  • তাঁর মর্যাদা, সংগ্রাম ও ত্যাগ ইসলামের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
  • রাসূল ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসার একটি নিদর্শন হলো তাঁর আহলে বাইতকে ভালোবাসা।

“আল্লাহ তাকে ভালোবাসুন, যে হুসাইনকে ভালোবাসে”

এ বাক্য ইমাম হুসাইন (রা.)-এর ফজিলত ও মর্যাদার সুস্পষ্ট প্রমাণ। একজন মুমিনের কর্তব্য হলো রাসূল ﷺ-এর পরিবারকে সম্মান ও ভালোবাসা।


কারবালার ঘটনা সম্পর্কে ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি

কারবালার ঘটনা অত্যন্ত মর্মান্তিক ও দুঃখজনক। ইমাম হুসাইন (রা.) এবং তাঁর পরিবারের বহু সদস্য অন্যায়ভাবে শহীদ হন। মুসলমানদের হৃদয়ে এ ঘটনা গভীর বেদনার সৃষ্টি করে।

তবে মনে রাখতে হবে—

  • আশুরার দিনের ফজিলত কারবালার ঘটনার বহু পূর্ব থেকেই প্রতিষ্ঠিত ছিল।
  • আশুরার রোজার বিধান রাসূল ﷺ-এর যুগেই প্রমাণিত।
  • কারবালার শোক স্মরণ করতে গিয়ে শরিয়তবিরোধী কাজ, মাতম, আত্মপ্রহার বা অতিরঞ্জন করা বৈধ নয়।
  • সুন্নাহ হলো ধৈর্য ধারণ করা, শহীদদের জন্য দোয়া করা এবং তাদের আদর্শ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা।

আশুরার দিনে করণীয় আমল

১. রোজা রাখা

সর্বোত্তম পদ্ধতি: ৯ ও ১০ মুহাররম অথবা ১০ ও ১১ মুহাররম অথবা ৯, ১০ ও ১১ মুহাররম

২. তওবা ও ইস্তিগফার করা

আল্লাহ বলেন— > وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ অর্থঃ “হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর দিকে তওবা কর।”— সূরা আন-নূর: ৩১

৩. নফল ইবাদত বৃদ্ধি করা কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, দোয়া, সদকা

আশুরাকে কেন্দ্র করে প্রচলিত ভুল ধারণা

অনেক সমাজে আশুরাকে কেন্দ্র করে কিছু ভিত্তিহীন প্রথা চালু আছে:

  1. বিশেষ খাবার রান্না করাকে সুন্নত মনে করা।
  2. নির্দিষ্ট নামাজকে ফরজ বা সুন্নত মনে করা।
  3. শরীর আঘাত করা।
  4. মাতম করা।
  5. শোককে ধর্মীয় ইবাদত বানিয়ে ফেলা।

রাসূল ﷺ বলেছেন— > لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَطَمَ الْخُدُودَ وَشَقَّ الْجُيُوبَ অর্থঃ “যে ব্যক্তি গাল চাপড়ায় ও কাপড় ছিঁড়ে শোক প্রকাশ করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।”

— সহিহ বুখারি, হাদিস: ১২৯৪

 

আশুরার শিক্ষাসমূহ

  1. ঈমানের শিক্ষা
  2. মূসা (আ.)-এর ঘটনা আল্লাহর সাহায্যের উপর অটল বিশ্বাস শেখায়।
  3. ত্যাগের শিক্ষা
  4. ইমাম হুসাইন (রা.) সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন।
  5. ধৈর্যের শিক্ষা
  6. বিপদে ধৈর্য ধারণ মুমিনের অন্যতম গুণ।
  7. তওবার শিক্ষা
  8. আল্লাহ সর্বদা বান্দার তওবা কবুল করেন।
  9. জুলুমের বিরুদ্ধে অবস্থান
  10. অত্যাচারের কাছে মাথা নত না করার শিক্ষা দেয় কারবালা।

উপসংহার

আশুরা ইসলামের ইতিহাসে এক মহিমান্বিত, গৌরবময় এবং শিক্ষামূলক দিন। এ দিনটি একদিকে যেমন আল্লাহর সাহায্য, রহমত ও নাজাতের স্মৃতি বহন করে, অন্যদিকে কারবালার আত্মত্যাগ ও সত্য প্রতিষ্ঠার উজ্জ্বল দৃষ্টান্তও তুলে ধরে। তাই একজন মুসলিমের কর্তব্য হলো আশুরার রোজা পালন করা, তওবা-ইস্তিগফার করা, নফল ইবাদত বৃদ্ধি করা এবং এ দিনের প্রকৃত শিক্ষা নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করা।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে আশুরার সঠিক শিক্ষা গ্রহণ এবং সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *