Table of Contents
Toggleইসলামে চোরের শাস্তি: হাত কাটার বিধান, শর্তাবলি ও প্রয়োগ — কুরআন ও হাদিসের আলোকে একটি গবেষণামূলক আলোচনা
ভূমিকা
ইসলামে মানুষের জীবন, সম্পদ, সম্মান ও নিরাপত্তার সুরক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এজন্য অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করা বা চুরি করাকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। তবে ইসলামে চুরির শাস্তি হিসেবে হাত কেটে ফেলা একটি নির্দিষ্ট ও কঠোর বিধান হলেও, তা নির্বিচারে বা সামান্য চুরির জন্য কার্যকর করা হয় না। বরং কুরআন, হাদিস এবং ফিকহবিদদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী এর জন্য বহু শর্ত ও বিধিনিষেধ রয়েছে। এমনকি সামান্য সন্দেহ থাকলেও এ শাস্তি কার্যকর করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ পাওয়া যায়।
১. চুরির শাস্তি সম্পর্কে কুরআনের নির্দেশ
আল্লাহ তাআলা বলেন— وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالًا مِّنَ اللَّهِ ۗ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ
অর্থ:
“চোর পুরুষ ও চোর নারী, তারা যা উপার্জন করেছে তার প্রতিফলস্বরূপ এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হিসেবে তাদের হাত কেটে দাও। আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।”
— (সূরা আল-মায়িদাহ ৫:৩৮)
এই আয়াত ইসলামে চুরির শাস্তির মূল ভিত্তি।
২. হাত কাটার পূর্বে তওবার সুযোগ
পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ বলেন—
فَمَنْ تَابَ مِنْ بَعْدِ ظُلْمِهِ وَأَصْلَحَ فَإِنَّ اللَّهَ يَتُوبُ عَلَيْهِ
“যে ব্যক্তি অন্যায়ের পর তওবা করে এবং নিজেকে সংশোধন করে, আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন।”
— (সূরা আল-মায়িদাহ ৫:৩৯)
৩. কত পরিমাণ চুরি করলে হাত কাটা হবে?
রাসূল ﷺ বলেছেন—
لَا تُقْطَعُ يَدُ السَّارِقِ إِلَّا فِي رُبُعِ دِينَارٍ فَصَاعِدًا
অর্থ:
“এক-চতুর্থাংশ দিনার বা তার বেশি মূল্যের জিনিস চুরি না করলে চোরের হাত কাটা হবে না।”
— সহীহ বুখারী (৬৭৮৯), সহীহ মুসলিম (১৬৮৪)
অর্থাৎ, অতি সামান্য জিনিস চুরি করলে হাত কাটার শাস্তি প্রযোজ্য হবে না।

৪. হাত কাটার জন্য প্রধান শর্তসমূহ
(১) চুরি প্রমাণিত হতে হবে
দুইজন নির্ভরযোগ্য সাক্ষীর সাক্ষ্য অথবা অভিযুক্ত ব্যক্তির স্বীকারোক্তির মাধ্যমে অপরাধ প্রমাণিত হতে হবে।
(২) চুরি করা সম্পদ মূল্যবান হতে হবে
হাদিসে নির্ধারিত ন্যূনতম পরিমাণ (নিসাব) পূরণ করতে হবে।
(৩) সম্পদ নিরাপদ স্থানে সংরক্ষিত থাকতে হবে
যদি খোলা জায়গায় রাখা জিনিস কেউ নিয়ে যায়, অধিকাংশ ফকিহের মতে হাত কাটার শাস্তি প্রযোজ্য হবে না।
(৪) গোপনে চুরি হতে হবে
ডাকাতি, ছিনতাই বা প্রকাশ্য লুটপাটের বিধান ভিন্ন।
(৫) মালিকানা নিয়ে সন্দেহ থাকলে হাত কাটা হবে না
যেমন পিতা সন্তানের সম্পদ থেকে বা অংশীদার যৌথ সম্পদ থেকে নিলে হদ্দ শাস্তি কার্যকর হবে না।
(৬) ক্ষুধা বা দুর্ভিক্ষের কারণে চুরি হলে
খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) দুর্ভিক্ষের সময় হাত কাটার শাস্তি স্থগিত করেছিলেন।
لَا قَطْعَ فِي عَامِ الْمَجَاعَةِ
“দুর্ভিক্ষের বছরে হাত কাটার শাস্তি কার্যকর করা হয়নি।”— মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা (২৮৫১৭)
এ থেকে বোঝা যায় যে, মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ না হওয়ার কারণে সংঘটিত চুরির ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্বও বিবেচ্য।
ক্ষুধার তাড়নায় চুরি করলে কি হাত কাটা হবে?
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) দুর্ভিক্ষের বছরে হাত কাটার শাস্তি স্থগিত করেছিলেন।
لا قطع في عام المجاعة
“দুর্ভিক্ষের বছরে হাত কাটার শাস্তি কার্যকর করা হয়নি।”— মুসান্নাফ ইবন আবি শাইবা (২৮৫১৭)
কেন?
কারণ ক্ষুধা, অভাব ও জীবন রক্ষার প্রয়োজন (ضرورة) ইসলামী শরীয়তে বিশেষ বিবেচ্য বিষয়।
আল্লাহ বলেন—
فَمَنِ اضْطُرَّ غَيْرَ بَاغٍ وَلَا عَادٍ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ
“যে ব্যক্তি নিরুপায় অবস্থায় পড়ে, সীমালঙ্ঘনকারী না হয়ে (নিষিদ্ধ বস্তু গ্রহণ করে), তার কোনো গুনাহ নেই।”
— সূরা বাকারা, ২:১৭৩
ইবন তাইমিয়্যা (রহ.) বলেন—
“যদি মানুষ অভাবের কারণে চুরি করতে বাধ্য হয় এবং সমাজ তার প্রয়োজন পূরণে ব্যর্থ হয়, তবে হদ্দ রহিত হবে।”
(মাজমু’ ফাতাওয়া, ২৮/৫৩৯)
চার মাযহাবের মতামত
হানাফি মাযহাব
ইমাম সারাখসী (রহ.) বলেন—সন্দেহ বা অভাব থাকলে হদ্দ রহিত হবে।
(আল-মাবসুত, ৯/১৩৩)
মালিকি মাযহাব
ইমাম ইবন আব্দুল বার (রহ.) বলেন— দুর্ভিক্ষের সময় হাত কাটার বিধান কার্যকর করা হয় না।
(আল-ইস্তিযকার, ৭/৪৪৬)
শাফেয়ী মাযহাব
ইমাম নববী (রহ.) বলেন— চুরির সব শর্ত পূরণ না হলে হাত কাটা বৈধ নয়।
(আল মাজমু’, ২০/৮৪)
হাম্বলি মাযহাব
ইবন কুদামাহ (রহ.) বলেন— সন্দেহের উপস্থিতিতে হদ্দ রহিত হয়ে যায়।
(আল মুগনী, ১০/২৯৩)
(৭) চোর প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কের হতে হবে
শিশু বা মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির উপর এ শাস্তি কার্যকর হবে না।
(৮) জবরদস্তির কারণে হলে শাস্তি হবে না
যদি কাউকে বাধ্য করা হয়, তবে হদ্দ শাস্তি প্রযোজ্য নয়।
৫. সন্দেহ থাকলে হদ্দ শাস্তি বন্ধ করার নির্দেশ
রাসূল ﷺ বলেছেন—
ادْرَءُوا الْحُدُودَ بِالشُّبُهَاتِ
“সন্দেহ থাকলে হদ্দ শাস্তি বন্ধ রাখো।”— সুনান তিরমিযী (১৪২৪)
অর্থাৎ, অপরাধের বিষয়ে সামান্য সন্দেহ থাকলেও হাত কাটার মতো শাস্তি কার্যকর করা যাবে না।
৬. কেন ইসলামে এত কঠোর শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে?
ইসলামের উদ্দেশ্য কেবল শাস্তি দেওয়া নয়; বরং—
- মানুষের সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
- সমাজে চুরি-ডাকাতি প্রতিরোধ করা।
- মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা ও আস্থা প্রতিষ্ঠা করা।
- অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধ করা।
৭. চুরির কারণসমূহ
১. দারিদ্র্য ও অভাব
অনেক সময় অভাবের কারণে মানুষ অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।
২. ঈমান ও নৈতিকতার দুর্বলতা
রাসূল ﷺ বলেছেন—
لَا يَسْرِقُ السَّارِقُ حِينَ يَسْرِقُ وَهُوَ مُؤْمِنٌ
“চোর যখন চুরি করে, তখন সে পূর্ণ ঈমানের অবস্থায় থাকে না।” — সহীহ বুখারী (২৪৭৫), সহীহ মুসলিম (৫৭)
অর্থাৎ, চুরি ঈমানের দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ।
৩. সামাজিক বৈষম্য
৪. লোভ ও ভোগবাদ
৫. পারিবারিক ও নৈতিক শিক্ষার অভাব
৮. হাত কাটার শাস্তি কার্যকর করার ক্ষমতা কার?
এ ধরনের হদ্দ শাস্তি কোনো ব্যক্তি, দল বা জনতা নিজেরা কার্যকর করতে পারে না। এটি একটি বৈধ ও সক্ষম ইসলামী বিচারব্যবস্থা, যথাযথ তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং বিচারকের রায়ের মাধ্যমে কার্যকর হয়। ব্যক্তিগত প্রতিশোধ বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া ইসলামে বৈধ নয়।
ফকিহদের মন্তব্য
ইমাম ইবনু কুদামাহ বলেন—
“হদ্দ শাস্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সন্দেহমুক্ত প্রমাণ ও সকল শর্ত পূরণ হওয়া অপরিহার্য।”
(আল-মুগনী, ১০/২৫৪)
ইমাম আন-নাওয়াবী বলেন— “যেখানে সন্দেহ থাকবে সেখানে হদ্দ শাস্তি কার্যকর করা হবে না।”
(শারহু সহীহ মুসলিম, ১১/১৮৫)
উপসংহার
কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী চুরির শাস্তি হিসেবে হাত কাটা একটি নির্ধারিত হদ্দ শাস্তি হলেও এটি অত্যন্ত কঠোর শর্তসাপেক্ষ। সামান্য চুরি, অভাব-অনটন, সন্দেহপূর্ণ পরিস্থিতি, মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব কিংবা অপর্যাপ্ত প্রমাণের ক্ষেত্রে এ শাস্তি কার্যকর হয় না। ইসলামী আইন শুধু শাস্তির উপর জোর দেয় না; বরং ন্যায়বিচার, সামাজিক নিরাপত্তা, দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার উপরও সমান গুরুত্ব দেয়। তাই হাত কাটার বিধানকে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, বরং সামগ্রিক ইসলামী বিচারব্যবস্থা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রেক্ষাপটে বুঝতে হবে।
তথ্যসূত্র
- আল-কুরআন, সূরা আল-মায়িদাহ ৫:৩৮-৩৯।
- সহীহ বুখারী, হাদিস ২৪৭৫, ৬৭৮৯।
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ৫৭, ১৬৮৪।
- সুনান তিরমিযী, হাদিস ১৪২৪।
- ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী।
- ইমাম আন-নাওয়াবী, শারহু সহীহ মুসলিম।
- ইবন আবি শাইবা, আল-মুসান্নাফ।

