দ্বিতীয় অধ্যায় তাওহীদ ও সিফাতুল্লাহ
তাওহীদ ও সিফাতুল্লাহ
তাওহীদ (توحيد) অর্থ একত্ববাদ, যা ইসলামের মৌলিক ও সর্বপ্রধান বিশ্বাস। এটি আল্লাহ তাআলার একত্ব, একক সত্তা ও অদ্বিতীয়তা প্রতিষ্ঠা করে। কুরআনে বলা হয়েছে:
قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ ٭ اللَّهُ الصَّمَدُ
“বল, তিনি আল্লাহ, এক। আল্লাহ সমর্থনদাতা (নির্ভরযোগ্য)।” (সূরা আল-ইখলাস: ১-২)
সিফাতুল্লাহ (صفات الله) বলতে বোঝানো হয় আল্লাহর গুণাবলি, যা তাঁকে অন্য সব সৃষ্টির থেকে আলাদা ও অনন্য করে। আল্লাহর সিফাত দুই প্রকার: সিফাতে যাবিয়া (ধনাত্মক গুণ, যেমন: ইলম, কুদরত, হায়াত) এবং সিফাতে সালবিয়া (নেতিবাচক গুণ, যেমন: আল্লাহর শরিক নেই, সীমাবদ্ধ নন, পরিবর্তনশীল নন)।
এলমে কালামের আলোকে, তাওহীদ ও সিফাতুল্লাহ নিয়ে আলোচনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসকে সংরক্ষণ করে এবং বিভ্রান্তি দূর করে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ
“কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়, এবং তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” (সূরা আশ-শুরা: ১১)
এই অধ্যায়ে আমরা তাওহীদের সংজ্ঞা, গুরুত্ব, প্রকারভেদ এবং আল্লাহর সিফাত সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব, যা আমাদের ঈমানকে মজবুত ও সুদৃঢ় করবে।
তাওহীদের পরিচয়:
কুরআন ও হাদিসের আলোকে
তাওহীদের সংজ্ঞা ও গুরুত্ব
তাওহীদ (توحيد) অর্থ একত্ববাদ, যা ইসলামের মূল ভিত্তি। এটি বিশ্বাস করা যে, আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়, তাঁর কোনো শরিক নেই এবং তিনিই সমস্ত সৃষ্টির একমাত্র রব। তাওহীদ ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আকিদা, যা মানুষের ঈমানের মূল ভিত্তি।
কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ اللَّهُ الصَّمَدُ لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ
“বল, তিনি আল্লাহ, এক। আল্লাহ সমর্থনদাতা (নির্ভরযোগ্য)। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি। এবং তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই।” (সূরা আল-ইখলাস: ১-৪)
এই আয়াতগুলো তাওহীদের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করে যে, আল্লাহ তাআলা এক, তিনি কারো উপর নির্ভরশীল নন, এবং তাঁর কোনো সমকক্ষ নেই।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
مَنْ قَالَ: لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ، وَكَفَرَ بِمَا يُعْبَدُ مِنْ دُونِ اللَّهِ، حَرُمَ مَالُهُ وَدَمُهُ، وَحِسَابُهُ عَلَى اللَّهِ
“যে ব্যক্তি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলবে এবং আল্লাহ ব্যতীত যেসব মিথ্যা উপাস্য পূজিত হয়, সেগুলোর প্রতি কুফরী করবে, তার সম্পদ ও জীবন নিরাপদ থাকবে এবং তার হিসাব আল্লাহর উপর ন্যস্ত থাকবে।” (সহিহ মুসলিম: ২৩)
তাওহীদের প্রকারভেদ
তাওহীদকে তিন ভাগে বিভক্ত করা হয়:
১. তাওহীদ আর-রুবুবিয়্যাহ (توحيد الربوبية)
এটি বিশ্বাস করা যে, আল্লাহই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা ও পরিচালনাকারী। তিনিই বিশ্বজগতের একমাত্র শাসক।
কুরআনে বলা হয়েছে:
اللَّهُ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ وَكِيلٌ
“আল্লাহই সকল কিছুর সৃষ্টিকর্তা এবং তিনিই সবকিছুর পরিচালক।” (সূরা আজ-যুমার: ৬২)
২. তাওহীদ আল-উলুহিয়্যাহ (توحيد الألوهية)
এটি বিশ্বাস করা যে, একমাত্র আল্লাহই ইবাদতের যোগ্য, এবং তাঁর সাথে কাউকে শরিক করা যাবে না।
আল্লাহ বলেন:
وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ
“তাদেরকে কেবল এই আদেশই দেওয়া হয়েছিল যে, তারা যেন খাঁটি মনে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করে।” (সূরা আল-বাইয়্যিনাহ: ৫)
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন:
حَقُّ اللَّهِ عَلَى الْعِبَادِ أَنْ يَعْبُدُوهُ وَلَا يُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا
“আল্লাহর অধিকার বান্দার ওপর এটাই যে, তারা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কোনো কিছু শরিক করবে না।” (সহিহ বুখারি: ২৮৫৬, সহিহ মুসলিম: ৩০)
৩. তাওহীদ আল-আসমা ওয়াস-সিফাত (توحيد الأسماء والصفات)
এটি বিশ্বাস করা যে, আল্লাহর নাম ও গুণাবলি অনন্য এবং তাঁর গুণাবলির কোনো তুলনা নেই।
কুরআনে বলা হয়েছে:
لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ البَصِيرُ
“কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়, এবং তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” (সূরা আশ-শুরা: ১১)
শিরক: তাওহীদের বিপরীত
শিরক (شرك) অর্থ হলো, আল্লাহর সাথে কাউকে অংশীদার করা, যা তাওহীদের সম্পূর্ণ বিপরীত। এটি ইসলামের সবচেয়ে বড় গুনাহ।
আল্লাহ বলেন:
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরিক করাকে ক্ষমা করেন না, কিন্তু এর বাইরে যা কিছু আছে, তিনি যার জন্য ইচ্ছা ক্ষমা করেন।” (সূরা আন-নিসা: ৪৮)
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
أَكْبَرُ الْكَبَائِرِ: الإِشْرَاكُ بِاللَّهِ
“সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহ হলো আল্লাহর সাথে শরিক করা।” (সহিহ বুখারি: ২৬৫৪)
উপসংহার
তাওহীদ ইসলামের মূল ভিত্তি এবং নবী-রাসূলগণের প্রধান দাওয়াত। এটি আল্লাহর একত্ব, রবুবিয়্যাহ, উলুহিয়্যাহ এবং আসমা ওয়াস-সিফাতের স্বীকৃতিতে সুপ্রতিষ্ঠিত। কুরআন ও হাদিসে তাওহীদের গুরুত্ব অসংখ্যবার বর্ণিত হয়েছে এবং শিরকের ভয়াবহতা সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে। সঠিক তাওহীদ বুঝা ও অনুসরণ করা প্রত্যেক মুসলমানের প্রধান দায়িত্ব, কারণ এটি ঈমানের মূল ভিত্তি এবং জান্নাত লাভের প্রধান শর্ত।
আল্লাহ তাআলার একত্ববাদের প্রমাণ:
কুরআন ও হাদিসের আলোকে
ভূমিকা
আল্লাহ তাআলার একত্ব (توحيد) হল ইসলামের মূল ভিত্তি। ইসলামের প্রথম ও প্রধান আকীদা হলো “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” (لا إله إلا الله) অর্থাৎ “আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই।” এই বিশ্বাসের উপরই মানুষের ঈমান নির্ভরশীল। কুরআন ও হাদিসে বারবার আল্লাহর একত্বের বিষয়টি স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে এবং এই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আল্লাহ তাআলার একত্ব কেবল তাত্ত্বিক বিশ্বাস নয়, বরং এর উপরই সমস্ত ইবাদত, আনুগত্য ও জীবন পরিচালিত হওয়া আবশ্যক।
১. কুরআনে আল্লাহর একত্বের প্রমাণ
(ক) আল্লাহই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা
আল্লাহ তাআলা বিশ্বজগতের একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, তিনিই সমস্ত কিছু নিয়ন্ত্রণ করেন। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে—
اللَّهُ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ وَكِيلٌ
“আল্লাহই সকল কিছুর সৃষ্টিকর্তা এবং তিনিই সবকিছুর পরিচালক।” (সূরা আজ-যুমার: ৬২)
এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, এই মহাবিশ্বের একমাত্র স্রষ্টা এবং পরিচালনাকারী আল্লাহ, আর কোনো শক্তি এই কাজে অংশীদার নয়।
(খ) আল্লাহর কোনো শরিক নেই
আল্লাহ তাআলা তাঁর একত্ব ও অদ্বিতীয়তা সম্পর্কে ঘোষণা করেছেন—
وَقَالَ ٱللَّهُ لَا تَتَّخِذُوا۟ إِلَهَيْنِ ٱثْنَيْنِ إِنَّمَا هُوَ إِلَٰهٌۭ وَٰحِدٌۭ فَإِيَّٰىَ فَٱرْهَبُونِ
“আল্লাহ বলেছেন, ‘দুই উপাস্য গ্রহণ করো না। তিনি একমাত্র ইলাহ, সুতরাং আমারই ভয় করো।’” (সূরা আন-নাহল: ৫১)
এখানে আল্লাহ স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, তাঁর কোনো অংশীদার নেই এবং একমাত্র তিনিই ইবাদতের উপযুক্ত।
(গ) সূরা ইখলাসে তাওহীদের স্পষ্ট দলিল
তাওহীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ সূরা ইখলাসে এসেছে—
قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ اللَّهُ الصَّمَدُ لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ
“বল, তিনি আল্লাহ, এক। আল্লাহ সমর্থনদাতা (নির্ভরযোগ্য)। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি। এবং তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই।” (সূরা আল-ইখলাস: ১-৪)
এই সূরা প্রমাণ করে যে, আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়, তাঁর কোনো শরিক নেই, এবং তাঁর তুল্য কেউ নেই।
২. হাদিসে আল্লাহর একত্বের প্রমাণ
(ক) তাওহীদ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর শিক্ষা
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
حَقُّ اللَّهِ عَلَى الْعِبَادِ أَنْ يَعْبُدُوهُ وَلَا يُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا
“আল্লাহর অধিকার বান্দার ওপর এটাই যে, তারা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কোনো কিছু শরিক করবে না।” (সহিহ বুখারি: ২৮৫৬, সহিহ মুসলিম: ৩০)
এই হাদিস দ্বারা বোঝা যায় যে, আল্লাহর একত্ব স্বীকার করা ও তাঁর সাথে কাউকে শরিক না করা মানুষের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
(খ) তাওহীদের ভিত্তি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন:
مَنْ قَالَ: لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ، وَكَفَرَ بِمَا يُعْبَدُ مِنْ دُونِ اللَّهِ، حَرُمَ مَالُهُ وَدَمُهُ، وَحِسَابُهُ عَلَى اللَّهِ
“যে ব্যক্তি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলবে এবং আল্লাহ ব্যতীত যেসব মিথ্যা উপাস্য পূজিত হয়, সেগুলোর প্রতি কুফরী করবে, তার সম্পদ ও জীবন নিরাপদ থাকবে এবং তার হিসাব আল্লাহর উপর ন্যস্ত থাকবে।” (সহিহ মুসলিম: ২৩)
এখানে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করাই তাওহীদের মূল শিক্ষা।
৩. আল্লাহর একত্বের যৌক্তিক প্রমাণ
(ক) যদি একাধিক ইলাহ থাকত তাহলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতো
আল্লাহ বলেন:
لَوْ كَانَ فِيهِمَا آلِهَةٌ إِلَّا اللَّهُ لَفَسَدَتَا
“যদি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ থাকত, তবে নিশ্চয়ই উভয়টি ধ্বংস হয়ে যেত।” (সূরা আল-আম্বিয়া: ২২)
এ আয়াতের মাধ্যমে বোঝা যায় যে, যদি একাধিক ইলাহ থাকত, তাহলে বিশ্বজগতের শৃঙ্খলা নষ্ট হয়ে যেত।
(খ) মানুষের স্বভাবগতভাবেই তাওহীদের প্রতি আকর্ষণ
মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি হলো, সে একক সৃষ্টিকর্তার দিকে ফিরে যেতে চায়। কঠিন মুহূর্তে মানুষ আল্লাহকেই ডাকে। কুরআনে বলা হয়েছে—
فَإِذَا رَكِبُوا۟ فِى ٱلْفُلْكِ دَعَوُا۟ ٱللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ
“যখন তারা নৌকায় আরোহন করে, তখন তারা খাঁটি মনে আল্লাহকে ডাকতে থাকে।” (সূরা আল-আঙ্কাবুত: ৬৫)
এটি প্রমাণ করে যে, মানুষ স্বাভাবিকভাবেই এক আল্লাহর প্রতি নির্ভরশীল এবং তাঁর একত্বকে স্বীকার করে।
উপসংহার
আল্লাহ তাআলার একত্ব সম্পর্কে কুরআন ও হাদিসে অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে। তিনি এক, অদ্বিতীয়, তাঁর কোনো শরিক নেই, এবং তিনি সকল কিছুর সৃষ্টিকর্তা ও পরিচালনাকারী। ইসলামের মূল ভিত্তি হলো তাওহীদ, যা ছাড়া ঈমান পূর্ণতা লাভ করে না। শিরক করা সবচেয়ে বড় গুনাহ, যা কখনো ক্ষমার যোগ্য নয়। তাই প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব হলো বিশুদ্ধ তাওহীদের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা এবং আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক না করা।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে প্রকৃত তাওহীদের উপর অবিচল রাখুন এবং শিরক থেকে হেফাজত করুন। আমিন!

