Islamic Life

সপ্তম অধ্যায় মুজিজা,কারামত ও ইসতিদরাজ

কালাম শাস্ত্র কালাম শাস্ত্র

সপ্তম অধ্যায় মুজিজা, কারামত ও ইসতিদরাজ নিয়ে আলোচনা করব

 

ভূমিকা: 

ইসলামে মুজিজা, কারামত ও ইসতিদরাজ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত, যা আল্লাহর কুদরতের বহিঃপ্রকাশ। মুজিজা হলো নবীদের দ্বারা সংঘটিত অলৌকিক ঘটনা, যা সাধারণ নিয়মের বাইরে গিয়ে আল্লাহ তাআলার নির্দেশে ঘটে এবং নবুয়তের সত্যতার প্রমাণ বহন করে। কারামত হলো আল্লাহর নেককার ওলী-বন্দাদের মাধ্যমে প্রদত্ত বিশেষ অলৌকিক ক্ষমতা, যা তাদের মর্যাদার নিদর্শন। অন্যদিকে, ইসতিদরাজ হলো পাপী ও অবিশ্বাসীদের ক্ষেত্রে সংঘটিত চমকপ্রদ ঘটনা, যা প্রকৃতপক্ষে তাদের জন্য পরীক্ষা ও ধ্বংসের পূর্বাভাস।

এই অধ্যায়ে মুজিজা, কারামত ও ইসতিদরাজের প্রকৃতি, পার্থক্য এবং কুরআন ও হাদিসের আলোকে তাদের বাস্তব নিদর্শন আলোচনা করা হবে, যাতে এসব বিষয় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় এবং সত্য-মিথ্যার বিভ্রান্তি দূর হয়।

 

মুজিজা বলতে কী বোঝায়?

“মুজিজা” শব্দটি আরবি (معجزة) থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো এমন একটি অলৌকিক ঘটনা, যা সাধারণ মানবীয় ক্ষমতার বাইরে এবং যা নবী-রাসূলগণের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা প্রকাশ করেন। এটি এমন এক ঘটনা, যা স্বাভাবিক নিয়মের ব্যতিক্রম হয় এবং আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন হিসেবে মানুষের সামনে উপস্থাপিত হয়।

কুরআনে আল্লাহ বলেন—

وَمَا مَنَعَنَا أَنْ نُرْسِلَ بِالْآيَاتِ إِلَّا أَنْ كَذَّبَ بِهَا الْأَوَّلُونَ
(সূরা আল-ইসরা: ৫৯)

অর্থ: “আমরা নিদর্শন (মুজিজা) পাঠানো থেকে কেবল এই কারণে বিরত থাকি যে, আগের সম্প্রদায়গুলো এগুলোকে অস্বীকার করেছিল।”

এ থেকে বোঝা যায় যে, মুজিজা আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে এবং এটি নবীদের সত্যতা প্রমাণ করার জন্য দেয়া হয়।

 

মুজিজার পরিচয়

মুজিজা হলো এক ধরনের ঐশী নিদর্শন, যা মানুষের সাধারণ ক্ষমতার বাইরে এবং এটি শুধুমাত্র নবী ও রাসূলগণের মাধ্যমে সংঘটিত হয়। মুজিজা কখনো স্বাভাবিক নিয়মের বিপরীত হয়, কিন্তু এটি প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর কুদরতের ফলাফল।

উদাহরণস্বরূপ:

  1. মুসা (আ.)-এর লাঠির সাপ হয়ে যাওয়া:
    فَأَلْقَىٰ عَصَاهُ فَإِذَا هِىَ ثُعْبَانٌ مُّبِينٌ
    (সূরা আশ-শু’আরা: ৩২)

    অর্থ: “অতঃপর তিনি তাঁর লাঠি নিক্ষেপ করলেন, যা সাথে সাথে প্রকাশ্য সাপে পরিণত হলো।” 
  2. ঈসা (আ.)-এর মাটি দিয়ে পাখি তৈরি করা ও মৃতকে জীবিত করা:
    وَإِذْ تَخْلُقُ مِنَ ٱلطِّينِ كَهَيْـَٔةِ ٱلطَّيْرِ بِإِذْنِى فَتَنفُخُ فِيهَا فَتَكُونُ طَيْرًۭا بِإِذْنِى
    (সূরা আল-মায়িদা: ১১০)

    অর্থ: “তুমি যখন আমার অনুমতিক্রমে মাটি দ্বারা পাখির আকৃতি গঠন করতে এবং তাতে ফুঁ দিলে, তখন তা আমার হুকুমে জীবিত পাখি হয়ে যেত।” 
  3. রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর চন্দ্রবিদারণ:
    ٱقْتَرَبَتِ ٱلسَّاعَةُ وَٱنشَقَّ ٱلْقَمَرُ
    (সূরা আল-কামার: ১)

    অর্থ: “কিয়ামত সন্নিকটে এসে গেছে এবং চন্দ্র বিদারিত হয়েছে।” 

এগুলো নবীদের সত্যতা প্রমাণের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত অলৌকিক নিদর্শন।

মুজিজার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

১. নবী ও রাসূলগণের সত্যতার প্রমাণ
মুজিজার প্রধান উদ্দেশ্য হলো নবীদের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত করা এবং মানুষকে বোঝানো যে, তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত।

২. অবিশ্বাসীদের চ্যালেঞ্জ ও জবাব
যখন অবিশ্বাসীরা নবীদের সত্যতা অস্বীকার করত, তখন আল্লাহ তাঁদের মাধ্যমে মুজিজা প্রদর্শন করতেন, যা মানুষকে ঈমানের দিকে আহ্বান করত।

৩. আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন
মুজিজা আল্লাহর অসীম শক্তি ও ক্ষমতার প্রতিফলন। এটি প্রমাণ করে যে, আল্লাহ তাআলা সর্বশক্তিমান এবং তিনি যা ইচ্ছা তাই করতে সক্ষম।

মুজিজার গুরুত্ব ও তাৎপর্য

১. ঈমানের শক্তিশালী ভিত্তি
মুজিজা নবী ও রাসূলগণের সত্যতাকে প্রমাণ করে, যা ঈমানদারদের জন্য একটি শক্তিশালী বিশ্বাসের ভিত্তি স্থাপন করে।

২. মানুষের চিন্তাধারা ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন
যখন মানুষ মুজিজা প্রত্যক্ষ করে, তখন তারা বুঝতে পারে যে, আল্লাহর কুদরতের সীমা নেই এবং তিনি যেকোনো কিছু ঘটাতে পারেন।

৩. মানুষকে সঠিক পথে আনার মাধ্যম
বহু মানুষ মুজিজা দেখে ঈমান এনেছে। উদাহরণস্বরূপ, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর চন্দ্রবিদারণের ঘটনা দেখে অনেক মানুষ ইসলামে প্রবেশ করেছিল।

৪. পূর্ববর্তী জাতিগুলোর শিক্ষা
কুরআনে বহু নবীর মুজিজার কথা উল্লেখ আছে, যা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শিক্ষা এবং উপদেশ।

উপসংহার

মুজিজা নবী ও রাসূলগণের সত্যতা প্রমাণের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত বিশেষ নিদর্শন। এটি সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে এবং কেবলমাত্র আল্লাহর ইচ্ছায় সংঘটিত হয়। কুরআন ও হাদিসে অসংখ্য মুজিজার বর্ণনা রয়েছে, যা মানুষের জন্য ঈমানকে দৃঢ় করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

আল্লাহ বলেন—

وَلِلَّهِ جُنُودُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ
(সূরা আল-ফাতহ: ৪)

অর্থ: “আকাশসমূহ ও পৃথিবীর সকল সৈন্য আল্লাহরই।”

অতএব, মুজিজা একমাত্র আল্লাহর কুদরতের প্রকাশ, যা নবীগণের মাধ্যমে মানুষকে সত্যের দিকে আহ্বান করার জন্য প্রদর্শন করা হয়।

 

নবী-রাসূলদের মুজিজা প্রদান করা হয় কেন?

আল্লাহ তাআলা নবী-রাসূলদের মুজিজা দান করেছেন মূলত তাদের নবুয়তের সত্যতা প্রমাণের জন্য, যাতে মানুষ বুঝতে পারে যে তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত। মুজিজা এমন এক অলৌকিক ঘটনা, যা সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে এবং যা শুধুমাত্র আল্লাহর হুকুমে সংঘটিত হয়। কুরআন ও হাদিসে অসংখ্য মুজিজার উল্লেখ রয়েছে, যা নবী-রাসূলদের সত্যতার দলিল হিসেবে কাজ করেছে।

১. নবুয়তের সত্যতা প্রমাণ

প্রত্যেক জাতির কাছে নবী-রাসূল পাঠানো হয়েছে, কিন্তু মানুষ তাদের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ করেছে। তাই আল্লাহ নবীদের মাধ্যমে এমন অলৌকিক নিদর্শন পাঠিয়েছেন, যা কেবল আল্লাহর কুদরতে সম্ভব।

কুরআনে আল্লাহ বলেন:

لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَأَنْزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتَابَ وَالْمِيزَانَ لِيَقُومَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ
(সূরা আল-হাদীদ: ২৫)

অর্থ: “নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলগণকে স্পষ্ট নিদর্শনসহ প্রেরণ করেছি এবং তাদের সাথে কিতাব ও ন্যায়বিচারের মানদণ্ড নাজিল করেছি, যাতে মানুষ ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে।”

এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, নবীদের সত্যতার প্রমাণস্বরূপ আল্লাহ তাদের কাছে নিদর্শন দিয়েছেন, যা মুজিজার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

২. অবিশ্বাসীদের চ্যালেঞ্জ ও জবাব

প্রতিটি যুগে অবিশ্বাসীরা নবীদের সত্যতা অস্বীকার করেছে এবং প্রমাণ চেয়েছে। তখন আল্লাহ তাদের চ্যালেঞ্জের জবাব দিতে নবীদের মাধ্যমে মুজিজা প্রকাশ করেছেন।

উদাহরণস্বরূপ, মক্কার মুশরিকরা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে চাঁদ দ্বিখণ্ডিত করার প্রমাণ চাইলে তিনি তা আল্লাহর ইচ্ছায় ঘটান।

কুরআনে এসেছে:

اقْتَرَبَتِ السَّاعَةُ وَانْشَقَّ الْقَمَرُ
(সূরা আল-কামার: ১)

অর্থ: “কিয়ামত ঘনিয়ে এসেছে এবং চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হয়েছে।”

এই মুজিজা দেখে বহু লোক ঈমান এনেছিল, আবার অনেক অবিশ্বাসী তা স্বীকার করেনি।

৩. আল্লাহর কুদরতের প্রকাশ

মুজিজা শুধুমাত্র নবী-রাসূলদেরই দেওয়া হয়েছে, যাতে মানুষেরা বুঝতে পারে যে, আল্লাহই সর্বশক্তিমান এবং তিনিই প্রকৃত মালিক। মুজিজাগুলো স্বাভাবিক নিয়মের বিপরীত হলেও এগুলো আসলে আল্লাহর নিরঙ্কুশ ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ।

ঈসা (আ.)-কে দেওয়া মুজিজা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:

وَتُبْرِئُ ٱلْأَكْمَهَ وَٱلْأَبْرَصَ بِإِذْنِى ۖ وَإِذْ تُخْرِجُ ٱلْمَوْتَىٰ بِإِذْنِى
(সূরা আল-মায়িদা: ১১০)

অর্থ: “তুমি আমার অনুমতিক্রমে জন্মান্ধ ও কুষ্ঠরোগীদের সুস্থ করতে এবং মৃতকে জীবিত করতে।”

এটি প্রমাণ করে যে, নবীগণ নিজের শক্তিতে নয়, বরং আল্লাহর অনুমতিতে মুজিজা দেখিয়েছেন।

৪. নবীদের অনুসারীদের ঈমান দৃঢ় করা

যারা নবীদের অনুসরণ করত, তাদের বিশ্বাস আরও দৃঢ় করার জন্য আল্লাহ মুজিজা দান করেছেন। তারা যখন অলৌকিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করত, তখন তাদের ঈমান আরও গভীর হতো।

উদাহরণস্বরূপ, মুসা (আ.)-এর লাঠি সাপ হয়ে যাওয়া দেখে বনি ইসরাইলের লোকেরা তার উপর ঈমান এনেছিল।

কুরআনে বলা হয়েছে:

فَأَلْقَىٰ عَصَاهُ فَإِذَا هِىَ ثُعْبَانٌ مُّبِينٌ
(সূরা আশ-শু’আরা: ৩২)

অর্থ: “অতঃপর তিনি তার লাঠি ফেলে দিলেন, যা সাথে সাথে প্রকাশ্য সাপে পরিণত হলো।”

এটি দেখে ফেরাউনের যাদুকররা পর্যন্ত বুঝে গিয়েছিল যে, এটি জাদু নয়, বরং আল্লাহর কুদরতের বহিঃপ্রকাশ।

৫. পূর্ববর্তী নবীদের সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া

মুজিজাগুলো শুধুমাত্র সেই যুগের মানুষের জন্য নয়, বরং পরবর্তী প্রজন্মের জন্যও শিক্ষা ও উপদেশ। কুরআনে উল্লেখিত মুজিজাগুলো মানুষকে বুঝতে সাহায্য করে যে, আল্লাহ তার নবীদের কীভাবে সাহায্য করেছেন এবং কীভাবে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য স্পষ্ট করেছেন।

আল্লাহ বলেন:

وَكُلًّا نَّقُصُّ عَلَيْكَ مِنْ أَنْبَاءِ الرُّسُلِ مَا نُثَبِّتُ بِهِ فُؤَادَكَ
(সূরা হুদ: ১২০)

অর্থ: “আমি নবীদের কাহিনীগুলো তোমার কাছে বর্ণনা করছি, যার মাধ্যমে তোমার হৃদয়কে দৃঢ় করি।”

এটি নবীজির জন্য সান্ত্বনা এবং আমাদের জন্য শিক্ষা যে, নবীরা সবসময় কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছেন, কিন্তু আল্লাহ তাদের মুজিজার মাধ্যমে সাহায্য করেছেন।

উপসংহার

মুজিজা নবীদের সত্যতা প্রমাণের জন্য, অবিশ্বাসীদের চ্যালেঞ্জের জবাব দিতে, আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন প্রকাশ করতে, অনুসারীদের ঈমান দৃঢ় করতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শিক্ষা হিসেবে প্রদান করা হয়েছে। কুরআন ও হাদিসে অসংখ্য মুজিজার বিবরণ রয়েছে, যা প্রমাণ করে যে, এগুলো শুধুমাত্র আল্লাহর কুদরতেরই নিদর্শন।

 

ইলমুল কালাম সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আমাদের বই পড়ুন।