Islamic Life

দশম অধ্যায় কবিরাগুনা ও তাকদির

কালাম শাস্ত্র কালাম শাস্ত্র

Table of Contents

দশম অধ্যায় কবিরা গুনাহ ও তাকদীর

ভূমিকা:

ইসলামে বিশ্বাস ও কর্মের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো কবিরা গুনাহ (মহাপাপ) এবং তাকদীর (অদৃষ্ট/প্রাকৃতিক নির্ধারণ)। একজন মুসলিমের জীবনে এই দুটি বিষয়ের গভীর প্রভাব রয়েছে।

কবিরা গুনাহ হলো সেই বড় বড় পাপ, যেগুলোর জন্য কুরআন ও হাদিসে কঠোর শাস্তির হুমকি দেওয়া হয়েছে বা যেগুলোর জন্য ইসলামে নির্দিষ্ট দুনিয়াবি শাস্তি নির্ধারিত আছে। শিরক, হত্যা, সুদ, মিথ্যা সাক্ষ্য, জিনা, যাদু, নামাজ পরিত্যাগ করা ইত্যাদি কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। এই পাপগুলো ব্যক্তি ও সমাজকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যেতে পারে এবং আখেরাতে কঠিন শাস্তির কারণ হতে পারে।

অন্যদিকে, তাকদীর হলো আল্লাহর পূর্বনির্ধারিত বিধান, যা তাঁর অসীম জ্ঞান ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে নির্ধারিত। ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ ঈমান বিল কদর বা তাকদীরের প্রতি বিশ্বাস রাখা। তাকদীর সম্পর্কে সঠিক আকিদা থাকা জরুরি, যাতে একজন মুসলিম আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা রাখতে পারে এবং জীবনকে সঠিকভাবে পরিচালিত করতে পারে।

এই অধ্যায়ে আমরা কবিরা গুনাহ ও তাকদীরের ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি, কুরআন ও হাদিসের আলোকে এর গুরুত্ব ও প্রভাব নিয়ে বিশদ আলোচনা করব।

 

কবিরা গুনাহ: শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ, প্রকারভেদ ও উদাহরণ

কবিরা গুনাহের শাব্দিক অর্থ

“কবিরা” (الكبيرة) শব্দটি আরবি ভাষার “كبر” (কাবারা) ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ হলো “বড়”, “গুরুতর” বা “মহান”। আর “গুনাহ” (الذنب) শব্দটি পাপ বা অপরাধ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। সুতরাং, “কবিরা গুনাহ” শব্দটির শাব্দিক অর্থ হলো “বড় বা গুরুতর পাপ”।

কবিরা গুনাহের পারিভাষিক অর্থ

ইসলামি শরিয়তে, কবিরা গুনাহ হলো এমন গুরুতর পাপ, যা কুরআন ও হাদিসে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং যার জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেছেন:

الكبيرة هي كل ذنب توعد الله عليه بلعنة أو غضب أو عذاب في الدنيا أو الآخرة
(الكبائر، لابن تيمية، ص: 5)

অর্থাৎ, “প্রত্যেক সে গুনাহই কবিরা, যার জন্য আল্লাহ কোনো শাস্তির ঘোষণা দিয়েছেন, যেমন অভিশাপ, ক্রোধ বা দুনিয়া ও আখিরাতে শাস্তি।”

কবিরা গুনাহের প্রকারভেদ

ইসলামী স্কলারগণ বিভিন্নভাবে কবিরা গুনাহকে শ্রেণিবদ্ধ করেছেন। সাধারণভাবে, কবিরা গুনাহ দুই প্রকার:

১. আল্লাহর হকের বিপরীতে কবিরা গুনাহ – যেমন, শিরক, নামাজ না পড়া, রোযা ভঙ্গ করা ইত্যাদি।
২. বান্দার হকের বিপরীতে কবিরা গুনাহ – যেমন, হত্যা, চুরি, মিথ্যা সাক্ষ্য, সুদ খাওয়া ইত্যাদি।

কুরআন ও হাদিসের আলোকে কিছু কবিরা গুনাহ

১. শিরক (আল্লাহর সঙ্গে কাউকে অংশীদার করা)

শিরক হল সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহ। আল্লাহ বলেন:

إِنَّ اللَّهَ لا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ
(সূরা النساء: ৪৮)

অর্থ: “নিশ্চয়ই, আল্লাহ তাঁকে অংশীদার করা ক্ষমা করেন না, তবে এর চেয়ে নিচের যেকোনো গুনাহ তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।”

২. মানুষ হত্যা করা

কুরআনে বলা হয়েছে:

وَمَنْ يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا
(সূরা আন-নিসা: ৯৩)

অর্থ: “যে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করে, তার প্রতিদান জাহান্নাম, সেখানে সে চিরস্থায়ী হবে।”

৩. সুদ খাওয়া

আল্লাহ বলেছেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ
(সূরা আল-বাকারা: ২৭৮)

অর্থ: “হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা কিছু বাকি আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হও।”

৪. মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

أَلَا أُنَبِّئُكُمْ بِأَكْبَرِ الْكَبَائِرِ؟ قَالُوا: بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ. قَالَ: الإِشْرَاكُ بِاللَّهِ، وَعُقُوقُ الْوَالِدَيْنِ، وَشَهَادَةُ الزُّورِ
(সহিহ বুখারি: ২৬৫৪, সহিহ মুসলিম: ৮৭)

অর্থ: “আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহ সম্পর্কে জানাব? তাঁরা বললেন, হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসুল। তিনি বললেন, ‘আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা, পিতা-মাতার অবাধ্যতা করা, এবং মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া।'”

৫. যাদু বা জাদুবিদ্যা চর্চা করা

আল্লাহ বলেন:

وَمَا يُعَلِّمَانِ مِنْ أَحَدٍ حَتَّى يَقُولَا إِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلَا تَكْفُرْ
(সূরা আল-বাকারা: ১০২)

অর্থ: “তারা কাউকে জাদু শিক্ষা দিত না যতক্ষণ না বলত, ‘আমরা তো কেবল পরীক্ষা, তুমি কুফর করো না।'”

৬. মিথ্যা শপথ করা

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

الْيَمِينُ الْغَمُوسُ مِنْ الْكَبَائِرِ
(সহিহ বুখারি: ৬৬৩৪)

অর্থ: “মিথ্যা শপথ করা কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।”

৭. আত্মহত্যা করা

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

مَنْ تَرَدَّى مِنْ جَبَلٍ فَقَتَلَ نَفْسَهُ، فَهُوَ فِي نَارِ جَهَنَّمَ يَتَرَدَّى فِيهَا خَالِدًا مُخَلَّدًا فِيهَا أَبَدًا
(সহিহ বুখারি: ৫৭৭৮, সহিহ মুসলিম: ১০৯)

অর্থ: “যে ব্যক্তি পাহাড় থেকে লাফিয়ে পড়ে নিজেকে হত্যা করবে, সে জাহান্নামে চিরকাল এর মধ্যেই পতিত হতে থাকবে।”

উপসংহার

ইসলামে কবিরা গুনাহ অত্যন্ত ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক। এটি আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও কঠোর শাস্তির কারণ। মুসলমানদের উচিত, কুরআন ও হাদিসের আলোকে এসব গুনাহ থেকে বিরত থাকা এবং আন্তরিক তওবার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। আল্লাহ বলেন:

وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَا الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
(সূরা আন-নূর: ৩১)

অর্থ: “হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।”

 

কবিরা গুনাহকারীর পরিণতি, শাস্তি ও আল্লাহর ক্ষমা

কবিরা গুনাহকারী চিরকাল জাহান্নামে থাকবে কি না?

ইসলামী আকিদা অনুযায়ী, কবিরা গুনাহকারী যদি ঈমানের উপর মৃত্যুবরণ করে, তবে সে চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে থাকবে না। কারণ, ঈমানদার ব্যক্তি একসময় আল্লাহর রহমতে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে। তবে যে ব্যক্তি শিরক বা কুফর অবস্থায় মারা যায়, আল্লাহ তাকে কখনো ক্ষমা করবেন না। কুরআনে এসেছে:

إِنَّ اللَّهَ لا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ
(সূরা আন-নিসা: ৪৮)

অর্থ: “নিশ্চয়ই, আল্লাহ তাঁকে অংশীদার করা ক্ষমা করেন না, তবে এর চেয়ে নিচের যেকোনো গুনাহ তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।”

তবে যদি কোনো মুসলমান বড় গুনাহ করে এবং আল্লাহ তার প্রতি দয়া না করেন, তবে সে শাস্তি ভোগ করার পর জান্নাতে প্রবেশ করবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন:

يَخْرُجُ مِنَ النَّارِ مَنْ قَالَ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَفِي قَلْبِهِ وَزْنُ شَعِيرَةٍ مِنْ خَيْرٍ
(সহিহ বুখারি: ৪৪)*

অর্থ: “যে ব্যক্তি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলে এবং তার অন্তরে অণু পরিমাণও ঈমান থাকে, সে জাহান্নাম থেকে বের হয়ে আসবে।”

কবিরা গুনাহের শাস্তি

কবিরা গুনাহের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে কঠিন শাস্তির বিধান রয়েছে। নিচে কিছু প্রধান শাস্তি উল্লেখ করা হলো:

১. দুনিয়ার শাস্তি

কিছু কবিরা গুনাহের শাস্তি দুনিয়াতেই হয়, যেমন:

  • যিনা (ব্যভিচার) করলে বিবাহিত হলে পাথর নিক্ষেপে হত্যা, অবিবাহিত হলে ৮০ বেত্রাঘাত(সহিহ মুসলিম: ১৬৯০)
  • চুরি করলে হাত কাটা হবে। (সূরা আল-মায়েদা: ৩৮)
  • সুদ খেলে ধ্বংস অনিবার্য। (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫-২৭৯)
২. কবরের শাস্তি

হাদিসে এসেছে, কিছু কবিরা গুনাহের কারণে কবরের শাস্তি হবে, যেমন:

  • মিথ্যাবাদী হলে তার চোয়াল চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হবে। (সহিহ বুখারি: ৭০৪৭)
  • যিনাকারী হলে আগুনের চুল্লিতে পোড়ানো হবে। (সহিহ বুখারি: ১৩৮৬)
৩. আখিরাতের শাস্তি
  • শিরক করলে চিরকাল জাহান্নামে থাকবে। (সূরা আল-মায়েদা: ৭২)
  • নামাজ না পড়লে সে কাফেরের শাস্তি পাবে। (সহিহ মুসলিম: ৮২)
  • সুদখোরদের জাহান্নামে ভয়ানক শাস্তি দেওয়া হবে। (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)

আল্লাহ কি কবিরা গুনাহ ক্ষমা করেন?

আল্লাহর রহমত অসীম। তিনি যে কোনো পাপ ক্ষমা করতে পারেন, যদি বান্দা খাঁটি তওবা করে। কুরআনে এসেছে:

قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
(সূরা আজ-জুমার: ৫৩)

অর্থ: “হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের ওপর সীমালঙ্ঘন করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত পাপ ক্ষমা করেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”

ইমামদের মতামত

১. ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.)

তিনি বলেন:

الكبائر تغفر بالتوبة والاستغفار، وقد يغفرها الله لمن يشاء من عباده الصالحين
(মাজমু’ আল-ফাতাওয়া, ১১/৬৭)

অর্থ: “কবিরা গুনাহ তওবা ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে ক্ষমা হয়ে যায়। আর আল্লাহ যাকে চান, তার জন্যও তা ক্ষমা করতে পারেন।”

২. ইমাম নববী (রহ.)

তিনি বলেন:

من مات على التوحيد دخل الجنة، وإن كان من أهل الكبائر
(শরহ মুসলিম, ১/২৭০)

অর্থ: “যে ব্যক্তি তাওহীদের উপর মারা যায়, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে, যদিও সে কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত থাকে।”

৩. ইমাম ইবনে কাসির (রহ.)

তিনি বলেন:

إذا تاب العبد توبة نصوحا، فإن الله يغفر له جميع ذنوبه
(তাফসির ইবনে কাসির, ৩/৬৭১)

অর্থ: “যদি বান্দা খাঁটি তওবা করে, তবে আল্লাহ তার সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেন।”

কবিরা গুনাহ থেকে মুক্তির উপায়

১. খাঁটি তওবা করা:

وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَا الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
(সূরা আন-নূর: ৩১)
“হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা করো, যাতে তোমরা সফল হও।”

২. সৎকাজ বেশি করা

إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ
(সূরা হুদ: ১১৪)
“নিশ্চয়ই, সৎকাজ মন্দ কাজকে দূর করে।”

৩. আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন:

اتَّقِ اللَّهَ حَيْثُمَا كُنْتَ، وَأَتْبِعِ السَّيِّئَةَ الْحَسَنَةَ تَمْحُهَا
(তিরমিজি: ১৯৮৭)
“তুমি যেখানে থাকো, আল্লাহকে ভয় করো, আর মন্দ কাজের পর ভালো কাজ করো, তাহলে তা মন্দ কাজকে মুছে দেবে।”

উপসংহার

কবিরা গুনাহ করা মারাত্মক অপরাধ। তবে আল্লাহর রহমত সীমাহীন। যে ব্যক্তি খাঁটি অন্তরে তওবা করে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন। তবে যারা তওবা না করে কবিরা গুনাহের উপর মৃত্যুবরণ করে, তারা কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হবে। তাই, সকল মুসলমানের উচিত কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা এবং আল্লাহর কাছে তওবা করা।

 

ইলমুল কালাম সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আমাদের বই পড়ুন।