তাফসীর কাকে বলে? তাফসীরের পরিচয়
তাফসীর শব্দটি আরবি মূল “تفسير” থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ হলো ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা প্রদান বা স্পষ্টীকরণ। ইসলামী পরিভাষায় তাফসীর বলতে কুরআনের অর্থ ও মর্ম ব্যাখ্যা করাকে বোঝায়। মহান আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারীমকে মানবজাতির জন্য পথনির্দেশনা হিসেবে নাজিল করেছেন। তবে এর গভীর অর্থ ও হিকমত বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়, যা তাফসীর নামে পরিচিত।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَاَنْزَلْنَاۤ اِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ اِلَيْهِمْ وَلَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُوْنَ
“আর আমি আপনার প্রতি স্মরণিকা (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি, যাতে আপনি মানুষের কাছে সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেন যা তাদের প্রতি নাযিল করা হয়েছে এবং যাতে তারা চিন্তা-গবেষণা করে।”
📖 (সূরা আন-নাহল: ৪৪)
তাফসীরের প্রকারভেদ
তাফসীর প্রধানত দুই প্রকারে বিভক্ত:
(১) তাফসীর বিল মাসুর (التفسير بالمأثور)
এটি এমন তাফসীর যা কুরআন, হাদিস এবং সাহাবাদের ব্যাখ্যার ভিত্তিতে করা হয়। এ ধরনের তাফসীর সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য এবং নির্ভরযোগ্য। যেমন:
- কুরআনের একটি আয়াতের ব্যাখ্যা অন্য আয়াত দ্বারা করা।
- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বর্ণনা অনুযায়ী কুরআনের ব্যাখ্যা করা।
- সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীদের ব্যাখ্যার আলোকে কুরআনের ব্যাখ্যা করা।
📖 আল্লাহ বলেন:
وَمَا يَعْلَمُ تَأْوِيلَهُ إِلَّا اللَّهُ وَالرَّاسِخُونَ فِي الْعِلْمِ
“এর ব্যাখ্যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না, এবং যারা সুগভীর জ্ঞানসম্পন্ন তারা জানে।”
📖 (সূরা আলে ইমরান: ৭)
উদাহরণ:
তাফসীর ইবনে কাসির, তাফসীর আত-তাবারি, তাফসীর আল-কুরতুবী ইত্যাদি প্রসিদ্ধ তাফসীর গ্রন্থসমূহ তাফসীর বিল মাসুরের অন্তর্ভুক্ত।
(২) তাফসীর বিল রায় (التفسير بالرأي)
এটি এমন তাফসীর যা ইজতিহাদ ও চিন্তাশক্তির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়। তবে তা ইসলামী শরিয়তের নীতিমালার পরিপন্থী হলে তা গ্রহণযোগ্য নয়। ইজতিহাদের ভিত্তিতে করা তাফসীর দুই প্রকার:
ক. গ্রহণযোগ্য তাফসীর বিল রায় (مقبول التفسير بالرأي):
যে সকল তাফসীর কুরআন ও হাদিসের মাপকাঠির মধ্যে থেকে করা হয় এবং যাদের ব্যাখ্যা পূর্ববর্তী উলামাদের মতামতের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয়, সেগুলো গ্রহণযোগ্য।
খ. প্রত্যাখ্যাত তাফসীর বিল রায় (مردود التفسير بالرأي):
যে সকল ব্যাখ্যা ব্যক্তিগত মতামতের ভিত্তিতে করা হয় এবং যা ইসলামী নীতিমালার পরিপন্থী, সেগুলো নাজায়েজ বা হারাম।
উদাহরণ:
কিছু মানুষ কুরআনের আয়াতকে নিজেদের মত করে ব্যাখ্যা করে ভ্রান্ত অর্থ প্রকাশ করে, যা সম্পূর্ণভাবে হারাম ও প্রত্যাখ্যাত।
কোন তাফসীর জায়েজ ও কোনটি নাজায়েজ?
✅ যে তাফসীর জায়েজ (গ্রহণযোগ্য)
১. কুরআনের আয়াতের ব্যাখ্যা কুরআনের অন্য আয়াতের মাধ্যমে করা।
২. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যাখ্যার আলোকে তাফসীর করা।
3. সাহাবাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী তাফসীর করা।
4. বিশুদ্ধ উলামাদের মতামতের ভিত্তিতে কুরআনের ব্যাখ্যা প্রদান।
❌ যে তাফসীর নাজায়েজ (প্রত্যাখ্যাত/হারাম)
১. ইচ্ছাকৃতভাবে কুরআনের বিকৃত ব্যাখ্যা করা।
২. ইসলাম বিরোধী দর্শন ও মতবাদ দ্বারা তাফসীর করা।
৩. অজ্ঞতা ও কল্পনার ভিত্তিতে কুরআনের ব্যাখ্যা করা।
৪. স্বার্থান্বেষী উদ্দেশ্যে কুরআনের বিকৃত অর্থ প্রকাশ করা।
📖 রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
مَنْ قَالَ فِي الْقُرْآنِ بِرَأْيِهِ فَأَصَابَ فَقَدْ أَخْطَأَ
“যে ব্যক্তি নিজ মতামতের ভিত্তিতে কুরআনের ব্যাখ্যা করে, সে যদি ঠিকও বলে, তবুও সে ভুল করল।”
📖 (সুনানে আবু দাউদ: ৩৬৫২)
তাফসীর সংক্রান্ত প্রসিদ্ধ ইমামদের মতামত
✅ ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) বলেন:
“তাফসীর এমন হতে হবে, যা কুরআন, হাদিস এবং সাহাবাদের বক্তব্যের ভিত্তিতে করা হয়।”
✅ ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেন:
“যে ব্যক্তি কুরআনের ব্যাখ্যা করতে চায়, তার উচিত প্রথমে কুরআনের গভীর জ্ঞান অর্জন করা এবং হাদিস ও সাহাবাদের বক্তব্যের উপর ভিত্তি করে ব্যাখ্যা প্রদান করা।”
✅ ইমাম মালিক (রহ.) বলেন:
“কুরআনের তাফসীর করতে হলে ইলম, তাকওয়া ও সুন্নাহর গভীর জ্ঞান থাকা আবশ্যক।”
✅ ইমাম ইবনু তাইমিয়া (রহ.) বলেন:
“নিজের মনগড়া ব্যাখ্যা করা হারাম এবং এটি ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের শামিল।”
উপসংহার
তাফসীর হলো কুরআনের সঠিক মর্ম বোঝার জন্য এক অপরিহার্য মাধ্যম। এটি কুরআনের গভীর হিকমত এবং বিধানগুলো অনুধাবন করতে সাহায্য করে। তবে তাফসীর করার ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য সূত্র অনুসরণ করতে হবে এবং ইসলামবিরোধী মনগড়া ব্যাখ্যা থেকে বিরত থাকতে হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে বিশুদ্ধ জ্ঞান অর্জন করে কুরআনের সঠিক ব্যাখ্যা বোঝার এবং তা অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন।
📖 আল্লাহ বলেন:
اِنَّ هٰذَا الۡقُرۡاٰنَ یَہۡدِیۡ لِلَّتِیۡ ہِیَ اَقۡوَمُ
“নিশ্চয়ই এই কুরআন সর্বোত্তম পথের দিকে পরিচালিত করে।”
📖 (সূরা আল-ইসরা: ৯)
বিস্তারিত তাফসীর জানতে এখানে ক্লিক করুন

