Islamic Life

স্বামীর হক আদায় না করলে কী শাস্তি?

স্বামীর হক স্বামীর হক

Table of Contents

স্বামীর হক আদায় না করলে কী শাস্তি? কোরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা

ভূমিকা

ইসলাম মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। বিবাহের মাধ্যমে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে একটি পবিত্র সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সম্পর্কের ভিত্তি হলো ভালোবাসা, দয়া, বিশ্বস্ততা, পারস্পরিক অধিকার এবং আল্লাহর বিধান মেনে চলা।

ইসলামে স্বামীর প্রতি স্ত্রীর কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। একইভাবে স্ত্রীর প্রতিও স্বামীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। কোনো পক্ষই অন্য পক্ষের বৈধ অধিকার অন্যায়ভাবে নষ্ট করতে পারে না।

বিশেষ করে স্বামীর বৈধ দাম্পত্য অধিকার, স্বামীর আহ্বানে সাড়া দেওয়া এবং বিনা কারণে দাম্পত্য সম্পর্ক প্রত্যাখ্যান করার বিষয়ে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর একাধিক হাদিস রয়েছে। এসব হাদিসে কিছু ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর সতর্কবাণী এসেছে।

তবে হাদিসের সঠিক বিধান বুঝতে হলে তার আরবি মূল বক্তব্য, অনুবাদ, প্রেক্ষাপট এবং ইসলামী ফিকহের ব্যাখ্যা জানা জরুরি।

নিম্নে বিষয়টি দলিলসহ আলোচনা করা হলো।

—

প্রথম অধ্যায়: স্বামীর প্রতি স্ত্রীর কর্তব্য সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের আয়াত

১. স্বামীর দায়িত্বশীলতা ও স্ত্রীর আনুগত্য

আয়াত:

وَالرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ وَبِمَا أَنْفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ ۚ فَالصَّالِحَاتُ قَانِتَاتٌ حَافِظَاتٌ لِلْغَيْبِ بِمَا حَفِظَ اللَّهُ

বাংলা অনুবাদ:

পুরুষরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক ও দায়িত্বশীল, এ কারণে যে আল্লাহ তাদের এককে অন্যের ওপর কিছু বিষয়ে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন এবং এ কারণে যে তারা নিজেদের সম্পদ ব্যয় করে। সুতরাং নেককার নারীরা অনুগত এবং আল্লাহ যা সংরক্ষণ করতে বলেছেন, স্বামীর অনুপস্থিতিতেও তা সংরক্ষণ করেন।

রেফারেন্স: সূরা আন-নিসা, আয়াত ৩৪।

ব্যাখ্যা

এই আয়াতে স্বামীর পারিবারিক দায়িত্ব এবং নেককার স্ত্রীর বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে।

এখানে কাওয়ামুন শব্দটি পরিবারের দায়িত্বশীলতা, তত্ত্বাবধান এবং ভরণপোষণের দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত।

আয়াতটি থেকে কয়েকটি শিক্ষা পাওয়া যায়:

১. স্বামী পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল থাকবেন।

২. স্ত্রী বৈধ বিষয়ে স্বামীর সঙ্গে সহযোগিতা করবেন।

৩. স্বামীর অনুপস্থিতিতে দাম্পত্য বিশ্বস্ততা ও আমানত রক্ষা করবেন।

৪. স্বামী-স্ত্রী উভয়েই আল্লাহর বিধান মেনে চলবেন।

তবে এই আয়াত স্বামীকে স্ত্রীর ওপর জুলুম করার বা তার অধিকার নষ্ট করার অনুমতি দেয় না। বরং স্বামীর ওপরও ন্যায়সংগত আচরণ ও ভরণপোষণের দায়িত্ব রয়েছে।

—

২. স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকারের দলিল

আরবি আয়াত:

وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ ۗ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ

বাংলা অনুবাদ:

নারীদের জন্যও ন্যায়সংগত অধিকার রয়েছে, যেমন তাদের ওপর দায়িত্ব রয়েছে। আর পুরুষদের তাদের ওপর একটি বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

রেফারেন্স: সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২২৮।

ব্যাখ্যা

এই আয়াত স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার ও দায়িত্বের একটি মৌলিক নীতি প্রতিষ্ঠা করেছে।

স্বামীর যেমন স্ত্রীর ওপর অধিকার রয়েছে, তেমনি স্ত্রীরও স্বামীর ওপর অধিকার রয়েছে। তাই ইসলামের বিধানকে একপেশেভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে না।

স্ত্রীর কর্তব্য হলো স্বামীর হক আদায় করা। স্বামীর কর্তব্য হলো স্ত্রীর অধিকার রক্ষা করা এবং তার প্রয়োজনের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া।

—

৩. স্ত্রীর সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ

আরবি আয়াত:

وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ

বাংলা অনুবাদ:

তোমরা তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।

রেফারেন্স: সূরা আন-নিসা, আয়াত ১৯।

ব্যাখ্যা

এই আয়াতে স্বামীদের স্ত্রীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

স্বামীর অধিকার আদায় করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি স্ত্রীর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করাও গুরুত্বপূর্ণ। স্বামী তার অধিকার আদায়ের দাবি করতে পারেন, কিন্তু স্ত্রীর প্রতি অন্যায়, জুলুম বা ক্ষতিকর আচরণ করতে পারেন না।

—

৪. স্বামী-স্ত্রী একে অপরের পোশাকস্বরূপ

আরবি আয়াত:

هُنَّ لِبَاسٌ لَّكُمْ وَأَنْتُمْ لِبَاسٌ لَّهُنَّ

বাংলা অনুবাদ:

তারা তোমাদের জন্য পোশাকস্বরূপ এবং তোমরাও তাদের জন্য পোশাকস্বরূপ।

রেফারেন্স: সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১৮৭।

ব্যাখ্যা

এই আয়াত স্বামী-স্ত্রীর ঘনিষ্ঠতা, পারস্পরিক সুরক্ষা এবং দাম্পত্য সম্পর্কের তাৎপর্য প্রকাশ করে।

পোশাক যেমন মানুষের শরীরকে আবৃত করে এবং সুরক্ষা দেয়, তেমনি স্বামী-স্ত্রী একে অপরের মানসিক প্রশান্তি, নিরাপত্তা ও ভালোবাসার মাধ্যম।

তাই দাম্পত্য অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে শুধু নিজের চাহিদা নয়, অপর পক্ষের অবস্থা ও প্রয়োজনও বিবেচনা করতে হবে।

—

স্বামীর হক
স্বামীর হক

দ্বিতীয় অধ্যায়: স্বামীর হক সম্পর্কে সহিহ হাদিস

হাদিস ১: স্বামীর শয্যার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করলে ফেরেশতাদের অভিশাপ

আরবি ইবারত

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَالَ: إِذَا دَعَا الرَّجُلُ امْرَأَتَهُ إِلَى فِرَاشِهِ فَأَبَتْ، فَبَاتَ غَضْبَانَ عَلَيْهَا، لَعَنَتْهَا الْمَلَائِكَةُ حَتَّى تُصْبِحَ

বাংলা অনুবাদ

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “কোনো ব্যক্তি যখন তার স্ত্রীকে নিজের শয্যায় আহ্বান করে, আর সে স্ত্রী তা প্রত্যাখ্যান করে এবং স্বামী তার প্রতি অসন্তুষ্ট অবস্থায় রাত কাটায়, তখন ফেরেশতারা সকাল পর্যন্ত ওই স্ত্রীর প্রতি অভিশাপ দিতে থাকেন।”

রেফারেন্স

সহিহ আল-বুখারি: হাদিস ৩২৩৭।

সহিহ মুসলিম: হাদিস ১৪৩৬।

দ্রষ্টব্য: বিভিন্ন সংস্করণ ও ডেটাবেসে হাদিস নম্বরের বিন্যাসে সামান্য পার্থক্য থাকতে পারে।

বিস্তারিত ব্যাখ্যা

স্বামীর বৈধ দাম্পত্য আহ্বান অকারণে প্রত্যাখ্যান করার বিষয়ে এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাদিস।

হাদিসটিতে তিনটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে:

প্রথমত: স্বামীর বৈধ আহ্বান।

বিবাহের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের জন্য বৈধ হন। তাই বৈধ দাম্পত্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে উভয়েরই অধিকার ও দায়িত্ব রয়েছে।

দ্বিতীয়ত: প্রত্যাখ্যানের কারণ।

হাদিসটি সব ধরনের প্রত্যাখ্যানকে নির্বিশেষে একই বিধানের আওতায় আনার জন্য নয়। অসুস্থতা, ঋতুস্রাব, শারীরিক ক্ষতির আশঙ্কা বা গ্রহণযোগ্য ওজর থাকলে পরিস্থিতি ভিন্ন হবে।

তৃতীয়ত: কঠোর সতর্কবাণী।

যে স্ত্রী কোনো গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়াই স্বামীর বৈধ দাম্পত্য আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন এবং তাকে অসন্তুষ্ট অবস্থায় রাত কাটাতে বাধ্য করেন, তার ব্যাপারে হাদিসে ফেরেশতাদের অভিশাপের সতর্কবাণী এসেছে।

এ কারণে মুসলিম নারীর উচিত স্বামীর বৈধ দাম্পত্য অধিকারকে অবহেলা না করা।

—

হাদিস ২: স্বামীর হক সম্পর্কে সহিহ মুসলিমের বর্ণনা

আরবি ইবারত

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ: إِذَا بَاتَتِ الْمَرْأَةُ هَاجِرَةً فِرَاشَ زَوْجِهَا لَعَنَتْهَا الْمَلَائِكَةُ حَتَّى تُصْبِحَ

বাংলা অনুবাদ

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ বলেছেন: “কোনো নারী তার স্বামীর শয্যা পরিত্যাগ করে রাত কাটালে সকাল পর্যন্ত ফেরেশতারা তার প্রতি অভিশাপ দিতে থাকেন।”

রেফারেন্স

সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৪৩৬-এর সংশ্লিষ্ট বর্ণনা।

বিস্তারিত ব্যাখ্যা

এই বর্ণনায় স্বামীর শয্যা পরিত্যাগ করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এটি দাম্পত্য জীবনে স্বামীর হক আদায় করতে অবহেলা করার ব্যাপারে সতর্ক করে।

তবে এই হাদিসকে ব্যাখ্যা করার সময় কয়েকটি বিষয় মনে রাখতে হবে:

১. স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধের প্রকৃত কারণ বিবেচনা করতে হবে।

২. স্ত্রী অসুস্থ  হওয়ার আশঙ্কায় থাকলে তাকে দোষারোপ করা যাবে না।

৩. স্বামী নিজেই অন্যায় আচরণ করলে শুধু তার অসন্তুষ্টির ভিত্তিতে স্ত্রীর ওপর গুনাহের হুকুম দেওয়া যাবে না।

৪. হাদিসের সতর্কবাণী মূলত বৈধ অধিকার অকারণে প্রত্যাখ্যানের গুরুতরতা বোঝায়।

—

হাদিস ৩:

হাদিসের আরবি ইবারত

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، عَنِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ: «لَوْ كُنْتُ آمِرًا أَحَدًا أَنْ يَسْجُدَ لِأَحَدٍ، لَأَمَرْتُ الْمَرْأَةَ أَنْ تَسْجُدَ لِزَوْجِهَا»

বাংলা অনুবাদ

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “আমি যদি কোনো ব্যক্তিকে অন্য কোনো ব্যক্তির জন্য সিজদা করার নির্দেশ দিতাম, তাহলে স্ত্রীকে তার স্বামীকে সিজদা করার নির্দেশ দিতাম।”

হাদিসের রেফারেন্স

গ্রন্থ: জামে আত-তিরমিজি (جامع الترمذي)

অধ্যায়: স্ত্রীর ওপর স্বামীর অধিকার

হাদিস নম্বর: ১১৫৯ (প্রচলিত একটি সংস্করণ অনুযায়ী)

সাহাবি রাবি: হজরত আবু হুরায়রা (রা.)

হাদিসের মান: ইমাম তিরমিজি (রহ.) হাদিসটিকে হাসান গরিব বলেছেন। শায়খ আলবানি (রহ.) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন।

হাদিসটি পড়ুন: [হাদিসের আরবি পাঠ ও ব্যাখ্যা](https://sunnah.global/hadeeth/ar/show/5826?utm_source=chatgpt.com)

—

২. হাদিসটির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

প্রথম ব্যাখ্যা: স্বামীর হক সম্পর্কে গুরুত্ব

এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ স্বামীর ওপর স্ত্রীর কর্তব্যের গুরুত্ব বোঝাতে একটি শক্তিশালী উদাহরণ দিয়েছেন।

স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিবাহের মাধ্যমে উভয়ের ওপরই কিছু অধিকার ও দায়িত্ব অর্পিত হয়। স্ত্রী যেমন স্বামীর কিছু অধিকার আদায় করবেন, তেমনি স্বামীরও স্ত্রীর অধিকার আদায় করা ফরজ দায়িত্ব।

এই হাদিসের মাধ্যমে বোঝা যায়, বৈধ ও ন্যায়সংগত বিষয়ে স্বামীর অধিকারকে অবহেলা করা উচিত নয়।

দ্বিতীয় ব্যাখ্যা: সিজদা কেবল আল্লাহর জন্য

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে।

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেননি যে স্ত্রী বাস্তবে স্বামীকে সিজদা করবে। বরং তিনি বলেছেন, যদি কাউকে অন্য কারও জন্য সিজদা করার নির্দেশ দিতাম।

অর্থাৎ, এটি একটি শর্তসাপেক্ষ বক্তব্য। এর মাধ্যমে স্বামীর অধিকারের গুরুত্ব বোঝানো হয়েছে।

ইসলামে ইবাদত হিসেবে সিজদা একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য নির্ধারিত। সুতরাং স্বামীকে সম্মান জানানোর উদ্দেশ্যেও সিজদা করা জায়েজ নয়।

তৃতীয় ব্যাখ্যা: স্ত্রীর কর্তব্য কী কী?

এই হাদিসের আলোকে স্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্যগুলোর মধ্যে রয়েছে:

১. বৈধ ও ন্যায়সংগত বিষয়ে স্বামীর কথা মেনে চলা।

২. স্বামীর সম্পদ, সম্মান ও পারিবারিক গোপনীয়তা রক্ষা করা।

৩. দাম্পত্য জীবনে বিশ্বস্ততা বজায় রাখা।

৪. স্বামীর সঙ্গে উত্তম আচরণ করা এবং পারিবারিক শান্তি বজায় রাখতে সহযোগিতা করা।

৫. শরিয়তসম্মত দাম্পত্য অধিকার ও দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা।

তবে মনে রাখতে হবে, আল্লাহর অবাধ্যতা, অন্যায়, জুলুম কিংবা শরিয়তবিরোধী কোনো কাজে স্বামীর আনুগত্য করা যাবে না। স্বামীর যেমন স্ত্রীর ওপর অধিকার রয়েছে, তেমনি স্ত্রীরও স্বামীর ওপর ন্যায্য অধিকার রয়েছে।

—

৩. এই হাদিস থেকে কী শিক্ষা পাওয়া যায়?

এই হাদিস থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়:

প্রথমত: স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক শুধু সামাজিক সম্পর্ক নয়; এটি ধর্মীয় দায়িত্বেরও অংশ।

দ্বিতীয়ত: স্ত্রীর উচিত স্বামীর বৈধ অধিকার যথাযথভাবে আদায় করা।

তৃতীয়ত: স্বামীর অধিকার আদায়ের গুরুত্ব বোঝাতে রাসুলুল্লাহ ﷺ সিজদার উদাহরণ দিয়েছেন।

চতুর্থত: কোনো মানুষের জন্য সিজদা করা বৈধ নয়। হাদিসটি বাস্তবে স্বামীকে সিজদা করার অনুমতি দেয় না।

হাদিস ৪: নফল রোজার ক্ষেত্রে স্বামীর অনুমতির বিধান

আরবি ইবারত

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَالَ: لَا يَحِلُّ لِلْمَرْأَةِ أَنْ تَصُومَ وَزَوْجُهَا شَاهِدٌ إِلَّا بِإِذْنِهِ

বাংলা অনুবাদ

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “স্বামী উপস্থিত থাকলে তার অনুমতি ছাড়া কোনো নারীর জন্য নফল রোজা রাখা বৈধ নয়।”

রেফারেন্স

সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৫১৯৫।

বিস্তারিত ব্যাখ্যা

এই হাদিসে নফল রোজার ক্ষেত্রে স্বামীর অনুমতির বিষয়টি এসেছে। কারণ নফল রোজা স্বামীর বৈধ দাম্পত্য অধিকার পালনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

ইসলামে নফল ইবাদত গুরুত্বপূর্ণ হলেও স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এখানে ফরজ রোজা এবং নফল রোজার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। রমজানের ফরজ রোজা পালন করতে স্বামীর অনুমতি প্রয়োজন হয় না।

শিক্ষা: নফল ইবাদত করতে গিয়ে স্বামী-স্ত্রীর বৈধ অধিকার নষ্ট করা উচিত নয়।

—

হাদিস ৫: স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার

আরবি ইবারত

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، قَالَ النَّبِيُّ ﷺ: إِنَّ لِجَسَدِكَ عَلَيْكَ حَقًّا، وَإِنَّ لِعَيْنِكَ عَلَيْكَ حَقًّا، وَإِنَّ لِزَوْجِكَ عَلَيْكَ حَقًّا

বাংলা অনুবাদ

আবদুল্লাহ ইবন আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ বলেছেন: “নিশ্চয়ই তোমার শরীরের তোমার ওপর অধিকার রয়েছে, তোমার চোখের তোমার ওপর অধিকার রয়েছে এবং তোমার স্ত্রীরও তোমার ওপর অধিকার রয়েছে।”

রেফারেন্স

সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ১৯৭৫ ও ৫১৯৯-এ সংশ্লিষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায়।

বিস্তারিত ব্যাখ্যা

এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ অতিরিক্ত ইবাদতের কারণে নিজের শরীর, বিশ্রাম ও পরিবারের অধিকার অবহেলা করতে নিষেধ করেছেন।

হাদিসটি থেকে বোঝা যায়, ইসলাম শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের ওপর গুরুত্ব দেয় না; বরং পরিবারের অধিকার রক্ষাকেও গুরুত্ব দেয়।

স্বামী যদি স্ত্রীর বৈধ অধিকার অবহেলা করেন, তাহলে তিনিও দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হতে পারেন।

একইভাবে স্ত্রীও স্বামীর বৈধ অধিকার অকারণে অবহেলা করবেন না।

মূল শিক্ষা: দাম্পত্য জীবনে স্বামীর ও  অধিকার রয়েছে এবং স্ত্রীর ও অধিকার  রয়েছে।

—

হাদিস ৬: প্রত্যেকেই নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে

আরবি ইবারত

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَالَ: كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ

বাংলা অনুবাদ

আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।”

রেফারেন্স

সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৮৯৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৮২৯।

বিস্তারিত ব্যাখ্যা

এই হাদিসে পরিবারসহ প্রত্যেক ব্যক্তির দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে।

স্বামী পরিবারের দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন। স্ত্রীও নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন।

তাই স্ত্রীকে শুধু স্বামীর অধিকার সম্পর্কে সচেতন করাই যথেষ্ট নয়; স্বামীকেও নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।

পরিবারে শান্তি বজায় রাখতে উভয়েরই আল্লাহর কাছে জবাবদিহির কথা স্মরণ রাখা উচিত।

—

তৃতীয় অধ্যায়: স্বামীর বৈধ যৌন চাহিদা পূরণের বিধান

১. স্বামীর যৌন অধিকার কি ইসলামে স্বীকৃত?

হ্যাঁ। ইসলামে বৈধ বিবাহের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যৌন সম্পর্ক বৈধ হয়েছে। এই সম্পর্ক দাম্পত্য জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

স্বামীর বৈধ দাম্পত্য আহ্বান অকারণে প্রত্যাখ্যান করার বিষয়ে সহিহ হাদিসে কঠোর সতর্কবাণী রয়েছে। ইসলামে স্বামীর অধিকার এবং স্ত্রীর অধিকার—উভয়ই বিবেচ্য।

২. স্ত্রী অকারণে স্বামীর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করলে কী হতে পারে?

সহিহ বুখারি ও মুসলিমের হাদিস অনুযায়ী, কোনো স্ত্রী বৈধ কারণ ছাড়া স্বামীর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে তাকে অসন্তুষ্ট অবস্থায় রাত কাটাতে বাধ্য করলে তার ব্যাপারে ফেরেশতাদের অভিশাপের সতর্কবাণী এসেছে।

এটি একটি গুরুতর ধর্মীয় সতর্কবাণী।

তাই স্ত্রী যদি কেবল জেদ, প্রতিশোধ বা অবহেলার কারণে স্বামীর হক নষ্ট করেন, তাহলে তার উচিত নিজের আচরণ সংশোধন করা এবং আল্লাহর কাছে তওবা করা।

৩. স্ত্রী কি স্বামীর সব দাবি মানতে বাধ্য?

না। স্বামীর বৈধ অধিকার রক্ষা করা এবং স্বামীর প্রতিটি দাবি নিঃশর্তভাবে মেনে নেওয়া এক বিষয় নয়।

স্বামী যদি হারাম কাজে বাধ্য করেন, অথবা শরিয়তবিরোধী কোনো আচরণ দাবি করেন, তাহলে স্ত্রী তা মানতে বাধ্য নন।

স্বামীর অধিকারকে আল্লাহর বিধানের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া যাবে না।

—

চতুর্থ অধ্যায়: কোন পরিস্থিতিতে স্ত্রী ওজরগ্রস্ত হতে পারেন?

১. ঋতুস্রাবের সময়

আরবি আয়াত

وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْمَحِيضِ ۖ قُلْ هُوَ أَذًى فَاعْتَزِلُوا النِّسَاءَ فِي الْمَحِيضِ

বাংলা অনুবাদ

তারা আপনাকে ঋতুস্রাব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলুন, তা কষ্টদায়ক অবস্থা। সুতরাং ঋতুস্রাবকালে তোমরা নারীদের থেকে বিরত থাকো।

রেফারেন্স: সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২২২।

ব্যাখ্যা

ঋতুস্রাব চলাকালে যৌনসঙ্গম নিষিদ্ধ। তাই এই সময় স্ত্রীকে সহবাসে বাধ্য করা যাবে না।

২. অসুস্থতা ও শারীরিক ক্ষতি

কোনো স্ত্রী গুরুতর অসুস্থ হলে অথবা সহবাসে বাস্তব শারীরিক ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে তার অবস্থা বিবেচনা করতে হবে।

ইসলামের একটি প্রসিদ্ধ ফিকহি নীতি হলো:

لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ

বাংলা অনুবাদ: ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতির প্রতিদানেও ক্ষতি করা যাবে না।

রেফারেন্স: সুনান ইবন মাজাহ, হাদিস ২৩৪০।

এই নীতি স্বামী-স্ত্রী উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

৩. মানসিক অসুস্থতা ও গুরুতর মানসিক কষ্ট

স্ত্রী যদি গুরুতর মানসিক সমস্যায় ভোগেন, আতঙ্কে থাকেন বা দাম্পত্য সম্পর্কের কারণে বাস্তব ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তাহলে তার পরিস্থিতি সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।

এক্ষেত্রে জোরজবরদস্তির পরিবর্তে চিকিৎসা, আলোচনা এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

৪. ফরজ রোজার সময়

রমজানের দিনের বেলায় রোজা অবস্থায় সহবাস করা নিষিদ্ধ। তাই এ সময় সহবাস না করা আল্লাহর বিধান মেনে চলার অংশ।

—

পঞ্চম অধ্যায়: স্বামীর হক আদায় না করলে কী শাস্তি হতে পারে?

১. ফেরেশতাদের অভিশাপের সতর্কবাণী

সহিহ বুখারি ও মুসলিমের হাদিসে স্বামীর বৈধ আহ্বান অকারণে প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে ফেরেশতাদের অভিশাপের কথা এসেছে।

এটি স্বামীর বৈধ দাম্পত্য অধিকার অবহেলা করার বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর সতর্কবাণী।

২. আল্লাহর কাছে জবাবদিহি

আরবি আয়াত

فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ ۝ وَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ

বাংলা অনুবাদ

কেউ অণু পরিমাণ ভালো কাজ করলে তা দেখতে পাবে, আর কেউ অণু পরিমাণ মন্দ কাজ করলে তাও দেখতে পাবে।

রেফারেন্স: সূরা আয-যিলযাল, আয়াত ৭–৮।

ব্যাখ্যা

এই আয়াতের সাধারণ শিক্ষা হলো, মানুষ তার কাজের জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করবে।

কোনো স্ত্রী যদি ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যায় করেন, তাহলে তারও জবাবদিহি রয়েছে। একইভাবে স্বামীও স্ত্রীর অধিকার নষ্ট করলে জবাবদিহির মুখোমুখি হবেন।

৩. তওবার সুযোগ

আরবি আয়াত

قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ

বাংলা অনুবাদ

বলুন, হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ! তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।

রেফারেন্স: সূরা আয-যুমার, আয়াত ৫৩।

ব্যাখ্যা

কোনো স্ত্রী বা স্বামী নিজের ভুল বুঝতে পারলে তার উচিত আল্লাহর কাছে তওবা করা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া।

ইসলামে ভুল সংশোধনের সুযোগ রয়েছে। তাই কাউকে চিরস্থায়ী অভিশপ্ত বা নিশ্চিত জাহান্নামি বলে ঘোষণা করা উচিত নয়।

—

ষষ্ঠ অধ্যায়: স্বামী-স্ত্রীর অধিকার সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

স্বামীর হক সম্পর্কে আলোচনা করার সময় কয়েকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি।

প্রথমত: স্বামীর বৈধ দাম্পত্য অধিকার রক্ষা করা স্ত্রীর দায়িত্ব।

দ্বিতীয়ত: বিনা কারণে স্বামীর বৈধ আহ্বান প্রত্যাখ্যান করার ব্যাপারে সহিহ হাদিসে কঠোর সতর্কবাণী রয়েছে।

তৃতীয়ত: অসুস্থতা, ঋতুস্রাব, শারীরিক ক্ষতির আশঙ্কা ও অন্যান্য গ্রহণযোগ্য ওজর বিবেচনা করতে হবে।

চতুর্থত: স্ত্রী যেমন স্বামীর হক আদায় করবেন, তেমনি স্বামীও স্ত্রীর অধিকার রক্ষায় দায়বদ্ধ।

—

উপসংহার

কোরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে স্বামীর প্রতি স্ত্রীর কর্তব্য ইসলামের পারিবারিক বিধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে স্বামীর বৈধ দাম্পত্য আহ্বান অকারণে প্রত্যাখ্যান করার বিষয়ে সহিহ বুখারি ও মুসলিমের হাদিসে কঠোর সতর্কবাণী এসেছে।

এই হাদিসগুলো থেকে শিক্ষা পাওয়া যায় যে, স্বামী-স্ত্রী কেউই অপর পক্ষের বৈধ অধিকার অবহেলা করবেন না। স্ত্রী স্বামীর হক আদায় করবেন এবং স্বামীও স্ত্রীর প্রতি সদাচরণ, ন্যায়বিচার ও দায়িত্বশীল আচরণ করবেন।

ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা হলো, পারিবারিক জীবনে আল্লাহর বিধান মেনে চলা, পরস্পরের অধিকার রক্ষা করা এবং ভালোবাসা ও দয়ার মাধ্যমে দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রাখা।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কোরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করার এবং স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার যথাযথভাবে আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

—

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *