Islamic Life

জিলহজ মাসের গুরুত্ব ও ফজিলত

জিলহজ মাসের গুরুত্ব ও ফজিলত জিলহজ মাসের গুরুত্ব ও ফজিলত

Table of Contents

জিলহজ মাসের গুরুত্ব ও ফজিলত কোরআন ও হাদিসের আলোকে বিশেষ করে প্রথম ১০ দিনের বিস্তারিত আলোচনা

ভূমিকা

আল্লাহ তাআলা মানবজাতির হিদায়াত, ইবাদত এবং আত্মশুদ্ধির জন্য কিছু বিশেষ সময় নির্ধারণ করেছেন। যেমন—রমজান মাস, জুমার দিন, লাইলাতুল কদর, আশুরার দিন—তেমনি ইসলামী বছরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সময় হলো জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিন। এই সময় শুধু একটি মাসের সূচনা নয়; বরং এটি ঈমান নবায়ন, আত্মশুদ্ধি, গুনাহ মাফ, তাকওয়া অর্জন এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক অসাধারণ সুযোগ।

ইসলামী ক্যালেন্ডারের দ্বাদশ মাস হলো জিলহজ (ذُو الْحِجَّةِ)। এই মাসে মুসলিম উম্মাহর জন্য রয়েছে হজের মহান ইবাদত, আরাফার দিনের রহমত, ঈদুল আযহার আনন্দ, কুরবানীর আত্মত্যাগ এবং তাকবীরে তাশরীকের পরিবেশ। এ মাসে মানুষ শুধু আনন্দ উদযাপন করে না; বরং ইবরাহীম (আ.)-এর ত্যাগ, ইসমাঈল (আ.)-এর আনুগত্য এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণের শিক্ষা গ্রহণ করে।

বিশেষ করে জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিন সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—এই দিনগুলোর আমল বছরের অন্য সব দিনের আমলের চেয়ে উত্তম। এমনকি আল্লাহর পথে জিহাদের মতো মহান ইবাদতের সাথেও তুলনা করে তিনি এই দিনগুলোর মর্যাদা তুলে ধরেছেন।

আজ অনেক মুসলিম শুধু কুরবানীর ঈদকে গুরুত্ব দেন, কিন্তু জিলহজ মাসের গুরুত্ব ও ফজিলত সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা রাখেন না। ফলে প্রথম ১০ দিনের অমূল্য সময় অবহেলায় চলে যায়। অথচ এই সময়ে অল্প আমলও বহু গুণ সওয়াবের কারণ হতে পারে।

এই প্রবন্ধে আমরা কোরআন ও হাদিসের আলোকে জিলহজ মাসের গুরুত্ব, প্রথম ১০ দিনের ফজিলত, আরাফার দিনের মাহাত্ম্য, কুরবানীর শিক্ষা, সাহাবায়ে কেরামের আমল এবং আমাদের করণীয়—সবকিছু বিস্তারিতভাবে আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ।

কোরআনের আলোকে জিলহজ মাসের গুরুত্ব

১. আল্লাহ তাআলার কসম — প্রথম ১০ দিনের মর্যাদা

আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَالْفَجْرِ ۝ وَلَيَالٍ عَشْرٍ

উচ্চারণ:
ওয়াল ফাজর, ওয়া লাইয়ালিন আশর

অনুবাদ:
শপথ ফজরের, এবং শপথ দশ রাতের।

— সূরা আল-ফাজর: ১-২

ব্যাখ্যা

কোরআনে আল্লাহ তাআলা যখন কোনো কিছুর শপথ করেন, তখন তা সাধারণত সেই বিষয়ের গুরুত্ব, মর্যাদা এবং বিশেষত্ব বোঝানোর জন্য করেন। যেমন—সূর্য, চাঁদ, রাত, দিন, কলম—এসবের শপথ এসেছে। ঠিক তেমনি এখানে আল্লাহ “দশ রাতের” শপথ করেছেন।

মুফাসসিরদের বিশাল অংশ যেমন ইবনে আব্বাস, মুজাহিদ, ইমাম তাবারী, ইমাম ইবনে কাসীর বলেন—এই “দশ রাত” বলতে জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন বোঝানো হয়েছে।

কেন এই দিনগুলো এত গুরুত্বপূর্ণ?

কারণ—

এই দিনগুলোতে হজের প্রধান আমলগুলো সংঘটিত হয়

আরাফার দিন এই সময়ে আসে

কুরবানীর দিন এই সময়ে আসে

তাকবীরের বিশেষ সময় শুরু হয়

আল্লাহর কাছে নেক আমল সবচেয়ে প্রিয় হয়

অর্থাৎ আল্লাহ নিজেই এই সময়কে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন।

এখানে একটি গভীর শিক্ষা হলো—যে সময়কে আল্লাহ সম্মানিত করেছেন, সেই সময়কে সম্মান করা ঈমানের অংশ। তাই একজন মুমিনের উচিত জিলহজের প্রথম ১০ দিনকে অন্য সাধারণ দিনের মতো না দেখা।

২. হজ ফরজ হওয়ার ঘোষণা

আল্লাহ বলেন—

وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا

অনুবাদ:
মানুষের উপর আল্লাহর জন্য এই ঘরের (কাবা শরীফের) হজ করা ফরজ, যে সেখানে পৌঁছার সামর্থ্য রাখে।

— সূরা আলে ইমরান: ৯৭

 ব্যাখ্যা

এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা হজকে ফরজ ঘোষণা করেছেন। হজ ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি। নামাজ, রোজা, যাকাতের মতো হজও ইসলামের মৌলিক ভিত্তির অন্তর্ভুক্ত।

হজ শুধু ভ্রমণ নয়, এটি আত্মার পরিশুদ্ধি।

হজের মধ্যে রয়েছে—

দুনিয়াবি অহংকার ত্যাগ

সাদা কাপড় পরে মৃত্যুর স্মরণ

আরাফার ময়দানে দাঁড়িয়ে কিয়ামতের অনুভূতি

সাফা-মারওয়ায় দৌড়ে হাজেরা (আ.)-এর ত্যাগ স্মরণ

কুরবানীর মাধ্যমে ইবরাহীম (আ.)-এর আনুগত্য শিক্ষা

এই সবই জিলহজ মাসের সাথে সম্পর্কিত।

যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হজ বিলম্ব করে, সে একটি বড় ফরজকে পিছিয়ে দেয়। তাই এই মাস মানুষকে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার ডাক দেয়।

৩. কুরবানীর নির্দেশ

আল্লাহ বলেন—

فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ

অনুবাদ:
অতএব তোমার রবের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় কর এবং কুরবানী কর।

— সূরা আল-কাওসার: ২

ব্যাখ্যা

এখানে “ওয়ানহার” অর্থ—কুরবানী করো।

আল্লাহ নামাজের সাথে কুরবানীর কথা একসাথে উল্লেখ করেছেন। এটি প্রমাণ করে কুরবানী শুধু সামাজিক অনুষ্ঠান নয়; বরং এটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত।

বর্তমানে অনেকেই কুরবানীকে শুধুই মাংস বণ্টনের উৎসব মনে করেন। কিন্তু ইসলামে কুরবানীর মূল শিক্ষা হলো—

আল্লাহর জন্য ত্যাগ

নিজের প্রিয় জিনিস উৎসর্গ করা

আল্লাহর হুকুমের সামনে আত্মসমর্পণ

দরিদ্রদের প্রতি সহমর্মিতা

ইবরাহীম (আ.) তাঁর প্রিয় সন্তান ইসমাঈল (আ.)-কে আল্লাহর আদেশে কুরবানী করতে প্রস্তুত হয়েছিলেন। এই আনুগত্যের স্মৃতিই আজকের কুরবানী।

অতএব কুরবানী মানে শুধু পশু জবাই নয়; বরং নিজের নফস, অহংকার, লোভ ও গুনাহকে আল্লাহর জন্য কুরবানী করা।

৪. কুরবানীর মূল উদ্দেশ্য তাকওয়া

আল্লাহ বলেন—

لَنْ يَنَالَ اللهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَكِنْ يَنَالُهُ التَّقْوَى مِنْكُمْ

অনুবাদ:
আল্লাহর কাছে পৌঁছে না তাদের গোশত, না তাদের রক্ত; বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।

— সূরা আল-হাজ্জ: ৩৭

ব্যাখ্যা

এই আয়াত অত্যন্ত গভীর শিক্ষা বহন করে।

অনেক সময় মানুষ বাহ্যিক ইবাদতকে বড় মনে করে কিন্তু অন্তরের ইখলাস ভুলে যায়। আল্লাহ এখানে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন—তিনি মাংস চান না, রক্তও চান না; তিনি চান তোমার অন্তরের তাকওয়া।

তাকওয়া মানে—

আল্লাহকে ভয় করা

গোপনে ও প্রকাশ্যে তাঁকে মানা

হারাম থেকে বেঁচে থাকা

আন্তরিকভাবে ইবাদত করা

অর্থাৎ কেউ যদি বড় পশু কুরবানী করে কিন্তু অহংকার, রিয়া, লোক দেখানো থাকে—তবে সেই কুরবানীর আসল উদ্দেশ্য নষ্ট হয়ে যায়।

আবার কেউ সামান্য সামর্থ্য নিয়ে আন্তরিকভাবে কুরবানী করলে আল্লাহ তার তাকওয়া কবুল করেন।

এই আয়াত আমাদের শেখায়—ইসলামে কাজের চেয়ে নিয়তের মূল্য বেশি।

জিলহজ মাসের গুরুত্ব ও ফজিলত
জিলহজ মাসের গুরুত্ব ও ফজিলত

হাদিসের আলোকে জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের ফজিলত

১. বছরের শ্রেষ্ঠ আমল

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—

مَا مِنْ أَيَّامٍ الْعَمَلُ الصَّالِحُ فِيهِنَّ أَحَبُّ إِلَى اللهِ مِنْ هَذِهِ الْأَيَّامِ

সাহাবীগণ বললেন—

وَلَا الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللهِ؟

তিনি বললেন—

وَلَا الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللهِ، إِلَّا رَجُلٌ خَرَجَ بِنَفْسِهِ وَمَالِهِ فَلَمْ يَرْجِعْ مِنْ ذَلِكَ بِشَيْءٍ

অনুবাদ:
এই দশ দিনের আমলের চেয়ে আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় আর কোনো দিনের আমল নেই।

সাহাবীরা বললেন—আল্লাহর পথে জিহাদও নয়?

তিনি বললেন—জিহাদও নয়; তবে সেই ব্যক্তি ব্যতীত, যে নিজের জান ও মাল নিয়ে বের হলো এবং কিছুই নিয়ে ফিরে এলো না।

— সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৬৯

 ব্যাখ্যা

এই হাদিস শুনে সাহাবাগণ বিস্মিত হয়েছিলেন। কারণ জিহাদ ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদত। তবুও রাসূল ﷺ বললেন—জিলহজের প্রথম ১০ দিনের নেক আমল এর চেয়েও প্রিয়।

এতে বুঝা যায়—

এই সময়ের মূল্য অসাধারণ

সামান্য নফল আমলও বড় সওয়াবের কারণ

আল্লাহর স্মরণ বহুগুণে প্রতিদান লাভ করে

অনেক মানুষ রমজান শেষ হলে ইবাদতে দুর্বল হয়ে যায়। কিন্তু রাসূল ﷺ আমাদের আরেকটি সুবর্ণ সুযোগ দেখিয়ে দিয়েছেন—জিলহজের প্রথম ১০ দিন।

এগুলো হলো ঈমান পুনর্গঠনের দিন।

২. আরাফার দিনের রোজার ফজিলত

রাসূল ﷺ বলেন—

صِيَامُ يَوْمِ عَرَفَةَ أَحْتَسِبُ عَلَى اللهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُ وَالسَّنَةَ الَّتِي بَعْدَهُ

অনুবাদ:
আরাফার দিনের রোজা সম্পর্কে আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, তিনি এর মাধ্যমে আগের এক বছর এবং পরের এক বছরের গুনাহ ক্ষমা করবেন।

— সহিহ মুসলিম

ব্যাখ্যা

জিলহজের ৯ তারিখ হলো ইয়াওমে আরাফা।

যারা হজে নেই, তাদের জন্য এই দিনের রোজা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ।

একটি রোজা—দুই বছরের গুনাহ মাফ!

এখানে উদ্দেশ্য ছোট গুনাহ। বড় গুনাহের জন্য আলাদা তওবা জরুরি।

এই দিনের রোজা শুধু ক্ষুধা সহ্য করা নয়; বরং এটি—

আত্মশুদ্ধি

গুনাহ থেকে ফিরে আসা

আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া

আখিরাতের প্রস্তুতি

আরাফার দিনকে হালকাভাবে নেওয়া একজন মুমিনের জন্য বড় ক্ষতি।

৩. আরাফার দিন জাহান্নাম থেকে মুক্তির দিন

রাসূল ﷺ বলেন—

مَا مِنْ يَوْمٍ أَكْثَرَ مِنْ أَنْ يُعْتِقَ اللهُ فِيهِ عَبْدًا مِنَ النَّارِ مِنْ يَوْمِ عَرَفَةَ

অনুবাদ:
আরাফার দিনের চেয়ে এমন কোনো দিন নেই, যেদিন আল্লাহ এত বেশি মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন।

— সহিহ মুসলিম

 ব্যাখ্যা

এই হাদিস আরাফার দিনের আসমানী রহমতের ঘোষণা।

যেদিন আল্লাহ সবচেয়ে বেশি মানুষকে মুক্তি দেন—সেদিন একজন মুমিন কীভাবে গাফেল থাকতে পারে?

এই দিনে—

দোয়া বেশি করতে হবে

কান্না করে তওবা করতে হবে

পুরনো গুনাহ স্মরণ করে ক্ষমা চাইতে হবে

ভবিষ্যতের জন্য হিদায়াত চাইতে হবে

এই দিন হলো “নাজাতের দিন”।

 

কুরবানীর হাদিস, তাকবীর, সাহাবাদের আমল ও আমাদের করণীয়

৪. কুরবানীর দিনের আমল আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—

مَا عَمِلَ ابْنُ آدَمَ يَوْمَ النَّحْرِ مِنْ عَمَلٍ أَحَبَّ إِلَى اللهِ مِنْ إِهْرَاقِ الدَّمِ وَإِنَّهَا لَتَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِقُرُونِهَا وَأَشْعَارِهَا وَأَظْلَافِهَا وَإِنَّ الدَّمَ لَيَقَعُ مِنَ اللهِ بِمَكَانٍ قَبْلَ أَنْ يَقَعَ عَلَى الْأَرْضِ فَطِيبُوا بِهَا نَفْسًا

অনুবাদ:
কুরবানীর দিন (১০ জিলহজে) আদম সন্তানের কোনো আমল আল্লাহর কাছে রক্ত প্রবাহিত করার (কুরবানী করার) চেয়ে বেশি প্রিয় নয়। কিয়ামতের দিন তা তার শিং, পশম ও খুরসহ উপস্থিত হবে। কুরবানীর রক্ত জমিনে পড়ার আগেই আল্লাহর কাছে কবুল হয়ে যায়। অতএব, তোমরা আনন্দের সাথে কুরবানী করো।

— সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩১২৬

 ব্যাখ্যা

এই হাদিস কুরবানীর গুরুত্বকে অত্যন্ত শক্তভাবে তুলে ধরে। কুরবানী শুধু একটি সামাজিক উৎসব নয়; বরং এটি আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় ইবাদত।

আজ অনেকেই কুরবানীকে “মাংসের অনুষ্ঠান” মনে করেন। কিন্তু রাসূল ﷺ আমাদের শিখিয়েছেন—এটি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য।

এই হাদিস থেকে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়—

১. কুরবানী একটি ইবাদত

এটি শুধুমাত্র প্রথা নয়। নামাজ, রোজার মতোই এটি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হয়।

২. কুরবানীর প্রতিটি অংশের মূল্য আছে

শিং, পশম, খুর—সবকিছু হিসাবের মধ্যে আসবে। অর্থাৎ আল্লাহ এই আমলকে অত্যন্ত মর্যাদার সাথে গ্রহণ করেন।

৩. আন্তরিকতা জরুরি

“আনন্দের সাথে কুরবানী করো”—এর অর্থ হলো কষ্ট মনে না করে, বরং খুশির সাথে আল্লাহর জন্য ব্যয় করা।

আজ অনেকেই দাম নিয়ে অভিযোগ করে। অথচ একজন মুমিন ভাবে—এটি আমার রবের জন্য।

৫. তাকবীর, তাহলীল ও তাহমীদের গুরুত্ব

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—

فَأَكْثِرُوا فِيهِنَّ مِنَ التَّهْلِيلِ وَالتَّكْبِيرِ وَالتَّحْمِيدِ

অনুবাদ:
এই দিনগুলোতে বেশি বেশি তাহলীল, তাকবীর এবং তাহমীদ পাঠ করো।

— মুসনাদ আহমাদ

বিস্তারিত ব্যাখ্যা

জিলহজের প্রথম ১০ দিন শুধু রোজা বা কুরবানীর জন্য নয়; বরং আল্লাহর জিকিরের জন্যও বিশেষ সময়।

তাহলীল কী?

لا إله إلا الله

অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই

এটি তাওহীদের ঘোষণা।

তাকবীর কী?

الله أكبر

অর্থ: আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ

এটি আমাদের শেখায়—দুনিয়ার সবকিছুর চেয়ে আল্লাহ বড়।

তাহমীদ কী?

الحمد لله

অর্থ: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য

এটি কৃতজ্ঞতার শিক্ষা দেয়।

প্রসিদ্ধ তাকবীর

الله أكبر، الله أكبر، لا إله إلا الله، والله أكبر، الله أكبر، ولله الحمد

অনুবাদ:
আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ, আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ, আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ, এবং সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য।

কেন এত জিকির গুরুত্বপূর্ণ?

কারণ জিকির—

অন্তরকে জীবিত করে

গুনাহ দূর করে

শয়তানকে দুর্বল করে

ঈমানকে শক্তিশালী করে

আল্লাহর রহমত নাযিল করে

জিলহজের এই সময়ে ঘরে, মসজিদে, বাজারে, কাজে—সর্বত্র আল্লাহর জিকির বৃদ্ধি করা উচিত।

৬. সাহাবায়ে কেরামের আমল

আবদুল্লাহ ইবনে উমর এবং আবু হুরাইরা জিলহজের প্রথম ১০ দিনে বাজারে বের হয়ে উচ্চস্বরে তাকবীর পাঠ করতেন।

মানুষ তাদের তাকবীর শুনে নিজেরাও তাকবীর শুরু করত।

— সহিহ বুখারি (মুআল্লাক বর্ণনা)

বিস্তারিত ব্যাখ্যা

এটি শুধু ব্যক্তিগত ইবাদত ছিল না; বরং সামাজিকভাবে আল্লাহর স্মরণ ছড়িয়ে দেওয়ার একটি পদ্ধতি ছিল।

আজ আমরা বাজারে গেলে দুনিয়ার কথা বলি, কিন্তু সাহাবাগণ বাজারেও আল্লাহকে স্মরণ করতেন।

এখান থেকে শিক্ষা—

সমাজে ইসলামের পরিবেশ তৈরি করতে হবে

নিজের আমল অন্যদের উৎসাহিত করতে পারে

আল্লাহর নাম প্রকাশ্যে উচ্চারণে লজ্জা করা উচিত নয়

আজ যদি পরিবারে, বাজারে, অফিসে তাকবীরের পরিবেশ তৈরি হয়—তবে সমাজে ঈমানি পরিবেশ ফিরে আসবে।

৭. কুরবানীকারীর জন্য চুল ও নখ না কাটার বিধান

রাসূল ﷺ বলেন—

إِذَا دَخَلَتِ الْعَشْرُ وَأَرَادَ أَحَدُكُمْ أَنْ يُضَحِّيَ فَلَا يَمَسَّ مِنْ شَعَرِهِ وَبَشَرِهِ شَيْئًا

অনুবাদ:
যখন জিলহজের প্রথম দশ দিন শুরু হয় এবং তোমাদের কেউ কুরবানী করার ইচ্ছা করে, তখন সে যেন তার চুল ও শরীরের কিছু না কাটে।

— সহিহ মুসলিম

বিস্তারিত ব্যাখ্যা

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়—যে ব্যক্তি কুরবানী করবে, সে ১ জিলহজ থেকে কুরবানী সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত চুল, নখ ইত্যাদি না কাটবে।

এটি একটি সুন্নাহ আমল।

এর মধ্যে রয়েছে—

ইবাদতের বিশেষ প্রস্তুতি

হজযাত্রীদের সাথে আধ্যাত্মিক সাদৃশ্য

কুরবানীর গুরুত্ব অনুভব করা

এটি ফরজ নয়, তবে গুরুত্বের সাথে পালন করা উচিত।

আমাদের করণীয়

জিলহজ মাসের গুরুত্ব ও ফজিলত জানার পর এখন প্রশ্ন—আমরা কী করবো?

১. আমলের পরিকল্পনা করা

অনেকেই সময় নষ্ট করে পরে আফসোস করে। আগে থেকেই পরিকল্পনা করতে হবে—

কোন দিন রোজা রাখবো

কখন কুরআন পড়বো

কত দান করবো

কাকে সাহায্য করবো

 

২. তওবা করা

পুরনো গুনাহ নিয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে আসতে হবে।

أستغفر الله وأتوب إليه

এই ইস্তিগফার বেশি বেশি পড়া উচিত।

৩. পরিবারকে ইসলামী পরিবেশ দেওয়া

শিশুদের শেখাতে হবে—

কুরবানীর ইতিহাস

ইবরাহীম (আ.)-এর ত্যাগ

তাকবীরের গুরুত্ব

আরাফার দিনের ফজিলত

 

৪. কুরবানীকে ইবাদত হিসেবে দেখা

শুধু সামাজিক মর্যাদা নয়; বরং এটি আল্লাহর সন্তুষ্টির কাজ—এই নিয়ত রাখতে হবে।

৫. দরিদ্রদের কথা স্মরণ রাখা

কুরবানীর গোশত শুধু নিজের জন্য নয়; বরং গরিব, প্রতিবেশী, আত্মীয়দের মাঝে বণ্টন করতে হবে।

উপসংহার

জিলহজ মাস শুধু একটি মাস নয়; এটি তাকওয়ার প্রশিক্ষণ, আত্মশুদ্ধির সময়, গুনাহ মাফের সুযোগ এবং জান্নাতের পথে অগ্রসর হওয়ার সুবর্ণ সময়।

বিশেষ করে প্রথম ১০ দিন—এগুলো বছরের শ্রেষ্ঠ দিন। এই সময়ে করা সামান্য আমলও আল্লাহর কাছে অত্যন্ত মূল্যবান।

আরাফার দিন ক্ষমার দিন, কুরবানীর দিন ত্যাগের দিন, তাকবীরের দিন আল্লাহর মহত্ব ঘোষণা করার দিন।

সুতরাং একজন মুমিনের উচিত—

এই দিনগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া

অলসতা ত্যাগ করা

গুনাহ থেকে ফিরে আসা

আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া

যে ব্যক্তি এই দিনগুলোকে কাজে লাগাবে, সে দুনিয়া ও আখিরাতে সফল হবে ইনশাআল্লাহ।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে জিলহজ মাসের গুরুত্ব ও ফজিলত যথাযথভাবে বুঝে আমল করার তাওফীক দান করুন।

আমীন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *