Islamic Life

সেহরির সময় আযান হলে মুখের খাবার খাওয়া যাবে কি

সেহরির সময় সেহরির সময়

সেহরির সময় আযান হলে মুখের খাবার খাওয়া যাবে কি

ভূমিকা

রমজান মাসে রোজা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। রোজার একটি মৌলিক শর্ত হলো সুবহে সাদিক (ফজরের সময়) শুরু হওয়ার সাথে সাথে পানাহার থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা। বাস্তবে অনেক সময় দেখা যায়, কেউ সেহরি খাচ্ছে—এমন সময় ফজরের আযান শুরু হয়ে যায়। তখন তার মুখের ভিতরে খাবার থাকে। এ অবস্থায় প্রশ্ন দেখা দেয়—মুখের ভেতরে থাকা খাবারটি কি গিলে ফেলা যাবে, নাকি ফেলে দিতে হবে?

কিছু লোক এ ক্ষেত্রে একটি হাদিস দ্বারা প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে মুখের ভেতরের খাবার শেষ করা যাবে। কিন্তু মুহাদ্দিস, মুফাসসির এবং ফকিহগণ কুরআনের স্পষ্ট নির্দেশনা ও অন্যান্য সহীহ হাদিসের আলোকে দেখিয়েছেন যে আযান শুরু হওয়ার সাথে সাথে খাওয়া বন্ধ করতে হবে এবং মুখে থাকা খাবারও ফেলে দিতে হবে। নিচে বিষয়টি কুরআন, হাদিস ও ইমামদের মতামতের আলোকে আলোচনা করা হলো।

১. যারা মুখের খাবার শেষ করার অনুমতি দেয় তাদের দলিল

যারা বলেন যে আযান শুরু হলে মুখে থাকা খাবার শেষ করা যাবে, তারা সাধারণত আবু দাউদ শরীফের একটি হাদিস দ্বারা দলিল দেন।

হাদিস

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ

إِذَا سَمِعَ أَحَدُكُمُ النِّدَاءَ وَالإِنَاءُ عَلَى يَدِهِ فَلَا يَضَعْهُ حَتَّى يَقْضِيَ حَاجَتَهُ مِنْهُ

অনুবাদ:
যখন তোমাদের কেউ আযান শুনবে এবং তার হাতে পানির পাত্র থাকবে, তবে সে যেন তার প্রয়োজন পূরণ না করা পর্যন্ত সেটি না রাখে।

সূত্র:
আবু দাউদ, হাদিস নং ২৩৫০

এই হাদিসের ভিত্তিতে কেউ কেউ বলেন—আযান শুরু হলে হাতে বা মুখে থাকা খাবার শেষ করা যাবে।

কিন্তু অধিকাংশ মুহাদ্দিস বলেন এই হাদিসটি ফজরের পূর্বের আযান অথবা প্রাথমিক সময়ের বিধান, যা পরে রহিত হয়েছে। ওই হাদিসের উপরে এখন আমল করা যাবে না কারণ কোরআনের আয়াত এবং অন্য সহিহ হাদিস দিয়ে ওই হাদিসের হুকুমকে মানসুখ তথা বাতিল করা হয়েছে।

২. কুরআনের স্পষ্ট নির্দেশনা

কুরআনে রোজার সময়সীমা অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

কুরআনের আয়াত

وَكُلُوا وَاشْرَبُوا حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَكُمُ الْخَيْطُ الْأَبْيَضُ مِنَ الْخَيْطِ الْأَسْوَدِ مِنَ الْفَجْرِ

অনুবাদ:
তোমরা খাও ও পান কর যতক্ষণ না ফজরের সাদা রেখা কালো রেখা থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়।

— (সূরা আল-বাকারা ২:১৮৭)

ব্যাখ্যা

এই আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে ফজর শুরু হওয়ার সাথে সাথে খাওয়া বন্ধ করতে হবে।
ফজরের সময় শুরু হয়ে গেলে খাওয়া বা পান করা আর বৈধ থাকে না। পানাহার করলে রোজা ভেঙ্গে যায়।

অতএব আযান শুরু হলে খাওয়া চালিয়ে যাওয়া কুরআনের নির্দেশনার বিরুদ্ধে যায়।

৩. অন্য সহীহ হাদিস

রাসূল ﷺ বলেন:

إِنَّ بِلاَلًا يُؤَذِّنُ بِلَيْلٍ فَكُلُوا وَاشْرَبُوا حَتَّى يُؤَذِّنَ ابْنُ أُمِّ مَكْتُومٍ

অনুবাদ:
বিলাল রাতে আযান দেয়, তাই তোমরা খাও ও পান কর যতক্ষণ না ইবনে উম্মে মাকতূম আযান দেয়।

সূত্র:
সহীহ বুখারী, হাদিস ৬১৭
সহীহ মুসলিম, হাদিস ১০৯২

ব্যাখ্যা

হযরত বিলাল (রাঃ) আজান দিতেন সেহেরির সময় শেষ হওয়ার আগেই, সতর্কতামূলক আজান দিতেন, তাই বেলাল (রাঃ) যখন আজান দিতেন সেই সময় যদি তোমাদের হাতে কোন খাবার বা পানি থাকে তাহলে তোমরা শেষ করবে। আর উম্মে মাকতুম (রাঃ) আজান দিতেন সেহরির সময় শেষ হওয়ার সাথে সাথে, ফজর শুরু হওয়ার সময়। তাই ইবনে উম্মে মাকতূমের ফজরের আযান শুরু হওয়ার সাথে সাথেই খাওয়া বন্ধ করতে হবে। যদি কেউ খায় বা পান করে তাহলে তার রোজা ভেঙ্গে যাবে

 

৪. আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস

রাসূল ﷺ বলেন:

لا يَمْنَعَنَّكُمْ أَذَانُ بِلَالٍ مِنْ سُحُورِكُمْ فَإِنَّهُ يُؤَذِّنُ بِلَيْلٍ

অনুবাদ:
বিলালের আযান তোমাদের সেহরি থেকে বিরত না রাখুক, কারণ সে রাতে আযান দেয়।

📚 সহীহ মুসলিম – ১০৯৩

ব্যাখ্যা

এই হাদিস স্পষ্টভাবে বোঝায়—

সেহরি করার অনুমতি শুধু ফজরের আযান পর্যন্তই। কারণ বেলাল (রাঃ) আযান দিতেন সেহরীর সময় থাকা অবস্থায় নামাজের প্রস্তুতির জন্য। বেলালের আযানের সময় যদি তোমাদের মুখে বা হাতে পানি থাকে তাহলে তোমরা ওটা শেষ করে জামাতের জন্য প্রস্তুতি নিবে আর যখন উম্মে মাকতুম আজান দেবে তখন তোমরা পানাহার একেবারে বন্ধ করে দেবে। তখন কারো মুখের মধ্যে অথবা যদি হাতে পানি থাকে, আর তখন যদি কেউ পানাহার করে তাহলে তার রোজা ভেঙে যাবে।

৪. আবু দাউদের হাদিসটি কেন মানসুখ বা অগ্রহণযোগ্য

অনেক মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও ফকিহ বলেছেন—আবু দাউদের হাদিসটি কুরআনের স্পষ্ট আয়াত ও সহীহ হাদিসের সাথে সাংঘর্ষিক। তাই  ইহার উপর আমল করা যাবে না। তারা এটিকে নিম্নোক্তভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।

ব্যাখ্যা

১️⃣ হাদিসটি ফজর হওয়ার আগের আযানের প্রসঙ্গে বলা হয়েছে।
২️⃣ কিছু মুহাদ্দিস এটিকে দুর্বল বা শায (ব্যতিক্রমী) বলেছেন।
৩️⃣ কুরআনের স্পষ্ট নির্দেশনার বিরুদ্ধে কোনো হাদিস গ্রহণযোগ্য নয়।

ইমাম নববী (রহ.) বলেন:

> কুরআনের স্পষ্ট নির্দেশনার পরে ফজর শুরু হলে পানাহার বৈধ নয়।

 

৫. চার মাযহাবের ইমামদের মতামত

সেহরির সময়
সেহরির সময়

১. ইমাম আবু হানিফা (রহ.)

ফজর শুরু হলে মুখে থাকা খাবারও গিলে ফেলা যাবে না।

২. ইমাম মালিক (রহ.)

আযানের পরে খেলে রোজা ভেঙে যাবে।

৩. ইমাম শাফেয়ী (রহ.)

ফজরের সময় শুরু হলে খাওয়া হারাম এবং রোজা নষ্ট হবে।

৪. ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)

আযান শোনার পরে খাওয়া রোজা ভঙ্গের কারণ।

ফিকহ গ্রন্থের বক্তব্য

الدر المختار
المجموع للنووي
المغني لابن قدامة

এসব গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে ফজর শুরু হলে পানাহার বন্ধ করা ফরজ।

৬. চূড়ান্ত মাসআলা (Final Ruling) { সঠিক বিধান }

উপরের আলোচনা থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়—

✔ ফজরের সময় শুরু হলে খাওয়া বন্ধ করতে হবে
✔ মুখের ভিতরে খাবার থাকলেও গিলে ফেলা যাবে না
✔ সাথে সাথে মুখ থেকে ফেলে দিতে হবে
✔ যদি গিলে ফেলে তবে রোজা ভেঙে যাবে

উপসংহার

ইসলামের বিধান অনুযায়ী রোজা শুরু হয় সুবহে সাদিক থেকে। কুরআন ও সহীহ হাদিসের আলোকে স্পষ্ট যে ফজরের আযান শুরু হলে আর খাওয়া বা পান করা বৈধ নয়। তাই যদি কেউ সেহরি খাওয়ার সময় আযান শুনে এবং তার মুখে খাবার থাকে, তবে সেটি গিলে ফেলা নয় বরং ফেলে দেওয়াই সঠিক আমল। অন্যথায় রোজা ভেঙে যাবে এবং তা কাজা করতে হবে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *