Islamic Life

ষষ্ঠ অধ্যায় মিরাজ

কালাম শাস্ত্র কালাম শাস্ত্র

ষষ্ঠ অধ্যায় মিরাজ

ভূমিকা: মিরাজ অধ্যায়

মিরাজ ইসলামের এক গুরুত্বপূর্ণ ও অলৌকিক ঘটনা, যা মহানবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের অন্যতম বিস্ময়কর ঘটনা হিসেবে পরিগণিত হয়। এটি তাঁর নবুওয়াতের মধ্যবর্তী পর্যায়ে সংঘটিত হয় এবং এতে তিনি আল্লাহ তাআলার বিশেষ অনুগ্রহে স্বর্গলোকে ভ্রমণ করেন। কুরআন ও হাদিসে এ ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়।

মিরাজের ঘটনা মূলত দুটি অংশে বিভক্ত—ইসরা ও মিরাজ। ইসরা হলো মক্কা থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস (মসজিদুল আকসা) পর্যন্ত রাতের সফর, যা আল্লাহ তাআলা কুরআনে উল্লেখ করেছেন:

سُبْحَانَ ٱلَّذِىٓ أَسْرَىٰ بِعَبْدِهِۦ لَيْلًۭا مِّنَ ٱلْمَسْجِدِ ٱلْحَرَامِ إِلَى ٱلْمَسْجِدِ ٱلْأَقْصَا
“পবিত্র ও মহিমান্বিত তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে এক রাতের মধ্যে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায় ভ্রমণ করিয়েছেন।” (সূরা আল-ইসরা: ১)

মিরাজের দ্বিতীয় অংশ হলো মহান আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ, যেখানে রাসূল (সা.) সপ্তম আকাশ পেরিয়ে সিদরাতুল মুনতাহায় পৌঁছান এবং সেখানে বিশেষ প্রতিদান লাভ করেন। এই সফরেই পাঁচওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয়, যা মুসলিমদের জন্য অন্যতম প্রধান ইবাদত হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে।

মিরাজের ঘটনা মুসলিম উম্মাহর জন্য এক বিশেষ শিক্ষা বহন করে। এটি নবীজির মর্যাদা, আল্লাহর অসীম কুদরত ও ইসলামের গুরুত্বকে তুলে ধরে। এই অধ্যায়ে মিরাজ সংক্রান্ত কুরআন ও হাদিসের আলোকে এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

 

মিরাজ কাকে বলে?

“মিরাজ” (المعراج) শব্দটি আরবি “উরুজ” (عروج) ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ হলো ‘উর্ধ্বগমন’ বা ‘উচ্চে আরোহণ’। ইসলামের পরিভাষায়, মিরাজ বলতে নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর আকাশে ভ্রমণ বা মহান আল্লাহর বিশেষ সান্নিধ্যে পৌঁছানোর ঐশী ঘটনা বোঝানো হয়। এটি ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যা নবুয়তের ১১তম বছরে সংঘটিত হয়।

মিরাজের সংজ্ঞা

ইসলামী পরিভাষায়, মিরাজ বলতে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর শারীরিক ও আত্মিকভাবে বিশেষ বাহন “বোরাক” (البُراق) যোগে আল্লাহর নির্দেশে মক্কা থেকে বাইতুল মাকদিস (বায়তুল মোকাদ্দাস/মসজিদুল আকসা) হয়ে সপ্তম আকাশ পেরিয়ে সিদরাতুল মুনতাহায় পৌঁছানোর অলৌকিক ভ্রমণকে বোঝায়। এটি ছিল আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও মহান নিদর্শনসমূহের মধ্যে অন্যতম।

মিরাজ ও ইসরা মধ্যে পার্থক্য

“ইসরা” (الإسراء) ও “মিরাজ” (المعراج) দুটি ভিন্ন অংশ নিয়ে গঠিত হলেও তারা একে অপরের সাথে সম্পর্কিত।

  • ইসরা: এটি রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর রাতের ভ্রমণকে বোঝায়, যেখানে তিনি মসজিদুল হারাম (মক্কা) থেকে মসজিদুল আকসা (ফিলিস্তিন) পর্যন্ত যান।
  • মিরাজ: ইসরা শেষে আল্লাহর হুকুমে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আসমানের দিকে উর্ধ্বগমন করেন এবং সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত পৌঁছান।

কুরআনের আলোকে:
الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ (الإسراء: 1)
অর্থ: “যিনি (আল্লাহ) তাঁকে এক রাতের মধ্যে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায় ভ্রমণ করিয়েছেন, যাতে আমরা তাঁকে আমাদের কিছু নিদর্শন দেখাই।” (সূরা আল-ইসরা: ১)

মিরাজের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

মিরাজের অন্যতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে আল্লাহ তাআলার নিদর্শনসমূহ দেখানো, উম্মতের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা এবং নবীজিকে বিশেষভাবে সান্ত্বনা দেওয়া।

হাদিসের আলোকে:
রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন,
فُرِضَتْ عَلَى أُمَّتِي خَمْسُونَ صَلاَةً فَرَجَعْتُ بِذَلِكَ، فَقَالَ لِي مُوسَى، صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ارْجِعْ إِلَى رَبِّكَ فَاسْأَلْهُ التَّخْفِيفَ
অর্থ: “আমার উম্মতের জন্য প্রথমে ৫০ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয়েছিল, পরে হযরত মুসা (আ.)-এর পরামর্শে আমি আল্লাহর দরবারে বারবার আবেদন জানাই, তখন আল্লাহ তাআলা তা ৫ ওয়াক্তে কমিয়ে দেন।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৪৯)

উপসংহার

মিরাজ ইসলামের এক গৌরবময় ও অলৌকিক ঘটনা। এটি নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর জন্য আল্লাহর এক বিশেষ দান। এই ঘটনায় উম্মতের জন্য নামাজের বিধান নির্ধারিত হয়েছে, যা ইসলামের অন্যতম মূল স্তম্ভ। এ ঘটনা আমাদের আল্লাহর ওপর বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করে এবং ইসলামের মূল আদর্শের প্রতি অবিচল থাকতে উদ্বুদ্ধ করে।

 

মেরাজের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

মেরাজ ইসলামের এক গৌরবময় ঘটনা, যা সরাসরি নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জীবনে সংঘটিত হয়েছিল। এটি কেবলমাত্র একটি অলৌকিক ঘটনা নয়; বরং এটি ইসলামের মৌলিক শিক্ষা, আল্লাহর মহত্ত্বের নিদর্শন এবং নবুয়তের সত্যতার অন্যতম প্রমাণ। কোরআন ও হাদিসে এ সম্পর্কে সুস্পষ্ট দলিল রয়েছে।

১. মেরাজের মাধ্যমে আল্লাহর নিদর্শন প্রদর্শন

মেরাজের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল মহান আল্লাহর কিছু বিশেষ নিদর্শন নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে দেখানো। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে—

﴿لَقَدْ رَأَى مِنْ آيَاتِ رَبِّهِ الْكُبْرَىٰ﴾
(সূরা আন-নাজম: ১৮)

অর্থ: “নিশ্চয়ই তিনি তাঁর প্রতিপালকের মহান নিদর্শনসমূহের কিছু দেখেছেন।”

এই আয়াত দ্বারা বোঝা যায় যে, মেরাজ একটি বিশেষ ভ্রমণ ছিল, যেখানে রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এমন কিছু দেখেছিলেন যা সাধারণ মানুষ বা অন্য কোনো নবী দেখেননি।

২. নামাজ ফরজ হওয়ার পটভূমি

মেরাজের মাধ্যমে মুসলমানদের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয়েছে, যা ইসলামের অন্যতম প্রধান ইবাদত। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন—

فُرِضَتْ عَلَى أُمَّتِي خَمْسُونَ صَلاَةً، فَرَجَعْتُ بِذَلِكَ، فَقَالَ لِي مُوسَى: ارْجِعْ إِلَى رَبِّكَ فَاسْأَلْهُ التَّخْفِيفَ
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৪৯)

অর্থ: “আমার উম্মতের জন্য প্রথমে ৫০ ওয়াক্ত নামাজ নির্ধারিত হয়েছিল, পরে আমি আল্লাহর কাছে বারবার অনুরোধ করি এবং তিনি তা কমিয়ে ৫ ওয়াক্ত করে দেন।”

এ ঘটনা প্রমাণ করে যে, নামাজ মুসলমানদের জন্য একটি মহান নেয়ামত, যা মেরাজের মাধ্যমে উপহার দেওয়া হয়েছে।

৩. নবী (সা.)-এর মর্যাদার উচ্চতা

মেরাজের মাধ্যমে নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মর্যাদা ও অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি আল্লাহর বিশেষ সান্নিধ্যে পৌঁছানোর সুযোগ পেয়েছেন, যা অন্য কোনো নবী পাননি।

﴿ثُمَّ دَنَا فَتَدَلَّىٰ ۝ فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَىٰ﴾
(সূরা আন-নাজম: ৮-৯)

অর্থ: “অতঃপর তিনি (জিবরাইল) নিকটবর্তী হলেন এবং আরও ঘনিষ্ঠ হলেন, ফলে তিনি দুই ধনুক পরিমাণ দূরত্বে বা আরও কাছাকাছি ছিলেন।”

এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, রাসুল (সা.) আল্লাহর বিশেষ নৈকট্য লাভ করেছেন, যা তাঁর নবুয়তের উচ্চ মর্যাদার প্রমাণ বহন করে।

৪. ঈমানের পরীক্ষা ও বিশ্বাসের পরিপূর্ণতা

মেরাজের ঘটনা যখন রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবাদের মাঝে বর্ণনা করলেন, তখন অনেক অবিশ্বাসী ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করেছিল। কিন্তু হযরত আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) দ্বিধাহীনভাবে এই ঘটনাকে সত্য বলে গ্রহণ করেন এবং তাঁকে “সিদ্দীক” উপাধি দেওয়া হয়।

হাদিসে এসেছে—

قَالَ أَبُو بَكْرٍ: إِنْ كَانَ قَالَهُ فَقَدْ صَدَقَ
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৬৩৯)

অর্থ: “আবু বকর বললেন, যদি তিনি (নবী সা.) এটা বলে থাকেন, তবে নিশ্চয়ই তা সত্য।”

এ থেকে বোঝা যায় যে, মেরাজ মুসলমানদের ঈমান ও বিশ্বাসের পরীক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল।

৫. উম্মতের জন্য শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা

মেরাজের ঘটনা আমাদের জন্য অনেক শিক্ষা রেখে গেছে। এটি আমাদের শেখায় যে, কঠিন বিপদের মুহূর্তেও আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তখন অত্যন্ত কঠিন সময় পার করছিলেন (তাইফের দাওয়াত ব্যর্থ হওয়া, আমুল হুযন ইত্যাদি), তখনই আল্লাহ তাঁকে এই মহান উপহার দেন।

উপসংহার

মেরাজ ইসলামের অন্যতম অলৌকিক ঘটনা এবং রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; বরং মুসলমানদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। এটি নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মর্যাদা, নামাজের গুরুত্ব, আল্লাহর নিদর্শন ও উম্মতের ঈমানের পরীক্ষার একটি বড় নিদর্শন। এজন্য আমাদের উচিত মেরাজের শিক্ষা থেকে অনুপ্রেরণা গ্রহণ করা এবং তা অনুযায়ী জীবন পরিচালিত করা।

 

ইলমুল কালাম সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আমাদের বই পড়ুন।