সালাতের আরকান ও আহকাম: কুরআন ও হাদিসের আলোকে
সালাতের আরকান (ركن الصلاة) বা মূল ভিত্তি
সালাতের কিছু আবশ্যকীয় স্তম্ভ বা রুকন রয়েছে, যা পালন না করলে সালাত বাতিল হয়ে যায়। কুরআন ও হাদিসের আলোকে সালাতের প্রধান রুকনগুলো নিম্নে বর্ণনা করা হলো:
- নিয়ত (النية)
সালাত শুরু করার পূর্বে মনে মনে দৃঢ় সংকল্প করা আবশ্যক। নবী (সা.) বলেন:
«إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ»
অর্থ: “নিশ্চয়ই সকল কর্ম নিয়তের উপর নির্ভরশীল।” (বুখারি: ১, মুসলিম: ১৯০৭) - তাকবীর (تكبيرة الإحرام)
সালাত শুরু করার সময় ‘আল্লাহু আকবার’ বলা আবশ্যক। নবী (সা.) বলেন:
«تَفْتَحُ الصَّلَاةُ بِالتَّكْبِيرِ»
অর্থ: “সালাত শুরু হয় তাকবীর দ্বারা।” (আবু দাউদ: ৬১৮) - কিয়াম (القيام) (সক্ষমদের জন্য)
ফরজ সালাতে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়া ফরজ। কুরআনে বলা হয়েছে:
﴿وَقُومُوا لِلَّهِ قَانِتِينَ﴾
অর্থ: “তোমরা আল্লাহর সামনে একাগ্রচিত্তে দাঁড়িয়ে থাক।” (সূরা আল-বাকারা: ২৩৮) - সূরা ফাতিহা পাঠ (قراءة الفاتحة)
সালাতের প্রতিটি রাকাতে সূরা ফাতিহা পড়া ফরজ। নবী (সা.) বলেন:
«لَا صَلَاةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ»
অর্থ: “যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা পড়ে না, তার সালাত হয় না।” (বুখারি: ৭৫৬, মুসলিম: ৩৯৪) - রুকু (الركوع)
সালাতের প্রতিটি রাকাতে যথাযথভাবে রুকু করা ফরজ। কুরআনে এসেছে:
﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ارْكَعُوا وَاسْجُدُوا﴾
অর্থ: “হে ঈমানদারগণ! রুকু করো এবং সিজদা করো।” (সূরা আল-হাজ্জ: ৭৭) - সিজদা (السجود)
সিজদা করা সালাতের অন্যতম প্রধান রুকন। হাদিসে এসেছে:
«أُمِرْتُ أَنْ أَسْجُدَ عَلَى سَبْعَةِ أَعْظُمٍ»
অর্থ: “আমাকে আদেশ করা হয়েছে সাতটি অঙ্গে সিজদা করতে।” (বুখারি: ৮১২, মুসলিম: ৪৯০) - তাশাহহুদে বসা (الجلوس للتشهد)
শেষ বৈঠকে বসা আবশ্যক। নবী (সা.) বলেন:
«إِذَا جَلَسَ أَحَدُكُمْ فِي الصَّلَاةِ فَلْيَقُلْ: التَّحِيَّاتُ للهِ»
অর্থ: “যখন তোমরা সালাতে বসবে, তখন ‘আত্তাহিয়াতু লিল্লাহ…’ পড়বে।” (বুখারি: ৮৩১) - সালাম (التسليم)
সালাত শেষ করার জন্য ডান ও বামে সালাম ফিরানো ফরজ। নবী (সা.) বলেন:
«إِنَّمَا تَمَامُ الصَّلَاةِ التَّسْلِيمُ»
অর্থ: “সালাত পূর্ণ হয় সালামের মাধ্যমে।” (আবু দাউদ: ৬১৭)
সালাতের আহকাম (أحكام الصلاة) বা বিধি-বিধান
সালাতের কিছু বিধান রয়েছে, যা অবশ্যই মেনে চলতে হয়:
- সালাতের সময় নির্দিষ্ট (أوقات الصلاة المحددة)
সালাত নির্দিষ্ট সময়ে আদায় করতে হয়। কুরআনে এসেছে:
﴿إِنَّ الصَّلَاةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتَابًا مَوْقُوتًا﴾
অর্থ: “নিশ্চয়ই সালাত নির্ধারিত সময়ে মুসলিমদের জন্য ফরজ।” (সূরা আন-নিসা: ১০৩) - তাহারাত বা পবিত্রতা (الطهارة للصلاة)
সালাতের পূর্বে ওজু করা আবশ্যক। কুরআনে এসেছে:
﴿إِذَا قُمْتُمْ إِلَى الصَّلَاةِ فَاغْسِلُوا وُجُوهَكُمْ﴾
অর্থ: “যখন তোমরা সালাতে দাঁড়াবে, তখন তোমাদের মুখমণ্ডল ধুয়ে নাও।” (সূরা আল-মায়িদা: ৬) - কিবলার দিকে মুখ করা (استقبال القبلة)
সালাতে কিবলার দিকে মুখ করা ফরজ। কুরআনে এসেছে:
﴿فَوَلِّ وَجْهَكَ شَطْرَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ﴾
অর্থ: “তোমার মুখ মসজিদুল হারামের দিকে ফিরিয়ে নাও।” (সূরা আল-বাকারা: ১৪৪) - সালাত যথাযথ আদায় করা (إقامة الصلاة بخشوع وخضوع)
সালাত খুশু-খুযুর সাথে আদায় করতে হয়। কুরআনে এসেছে:
﴿قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ، الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ﴾
অর্থ: “নিশ্চয়ই সফল তারা, যারা তাদের সালাতে বিনীত থাকে।” (সূরা আল-মুমিনূন: ১-২)
উপসংহার
সালাত ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ভ এবং এটি বিশুদ্ধভাবে আদায় করা প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য। সালাতের আরকান ও আহকাম মেনে চললে একজন ব্যক্তি পরিপূর্ণভাবে সালাত আদায় করতে সক্ষম হবে। কুরআন ও হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী সালাত আদায় করলে তা আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম হয়ে ওঠে এবং পরকালের মুক্তির জন্য সহায়ক হয়।
اللهم اجعلنا من المحافظين على الصلاة بخشوع وخضوع. آمين
(হে আল্লাহ! আমাদেরকে বিনম্রতা ও খুশু-খুযুর সাথে সালাত আদায়কারী বানাও, আমীন!)

