Islamic Life

চতুর্থ অধ্যায় আসমানি কিতাব

কালাম শাস্ত্র

চতুর্থ অধ্যায়: আসমানী কিতাব নিয়ে আলোচনা

আসমানী কিতাবসমূহ হলেন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য প্রেরিত দিকনির্দেশনা ও আইন। এগুলো আল্লাহর বাণী, যা ফেরেশতাদের মাধ্যমে নবীদের ওপর অবতীর্ণ হয়েছে। ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, চারটি প্রধান আসমানী কিতাব রয়েছে: তাওরাত, যা হজরত মূসা (আ.)-এর প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে; যাবুর, যা হজরত দাউদ (আ.)-এর প্রতি; ইনজিল, যা হজরত ঈসা (আ.)-এর প্রতি; এবং সর্বশেষ কুরআন, যা হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে।

আসমানী কিতাবগুলোর প্রতি ঈমান আনয়ন করা ইসলামের একটি মৌলিক বিশ্বাস, যা কুরআন ও হাদিস দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। এগুলো আল্লাহর বিধান ও জীবনব্যবস্থার মূল উৎস, যা মানবজাতিকে সঠিক পথ দেখানোর জন্য নাজিল করা হয়েছে।

 

আসমানী কিতাব কাকে বলে?

আসমানী কিতাব হলো সেসব ধর্মীয় গ্রন্থ, যা আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন নবীদের মাধ্যমে মানবজাতির জন্য নাজিল করেছেন। এই কিতাবগুলোতে হেদায়েত, জীবন বিধান, আখিরাতের বার্তা ও ইবাদতের নিয়মাবলি বর্ণিত রয়েছে। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَأَنْزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتَابَ وَالْمِيزَانَ لِيَقُومَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ
‘‘আর আমি আমার রাসূলদেরকে সুস্পষ্ট প্রমাণসহ প্রেরণ করেছি এবং তাদের সঙ্গে কিতাব ও ন্যায়পরায়ণতার মাপকাঠি অবতীর্ণ করেছি, যাতে মানুষ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে।’’ (সুরা হাদীদ: ২৫)

আসমানী কিতাবের আলোচ্য বিষয়

আসমানী কিতাবগুলোর মূল আলোচ্য বিষয় হলো:

১. তাওহীদ – একমাত্র আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং শিরক থেকে বিরত থাকার আদেশ।
২. রিসালাত – নবীদের প্রতি বিশ্বাস রাখা এবং তাদের আনিত শরীয়তের অনুসরণ করা।
3. আখিরাত – কিয়ামত, জান্নাত, জাহান্নাম, হাশর-নশর এবং জবাবদিহিতার বিষয়।
4. ইবাদত ও শরীয়ত – নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাতসহ বিভিন্ন ইবাদতের নিয়মাবলি।
5. নৈতিকতা ও আচরণ বিধান – সত্যবাদিতা, ইনসাফ, দানশীলতা, ভালো কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ।

আল্লাহ বলেন:

إِنَّ هَٰذَا ٱلۡقُرۡءَانَ يَهۡدِي لِلَّتِي هِيَ أَقۡوَمُ وَيُبَشِّرُ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ ٱلَّذِينَ يَعۡمَلُونَ ٱلصَّٰلِحَٰتِ أَنَّ لَهُمۡ أَجۡرٗا كَبِيرٗا
‘‘নিশ্চয় এই কুরআন সে পথ দেখায়, যা সর্বাধিক সরল ও সঠিক এবং এটি সেই মুমিনদের সুসংবাদ দেয়, যারা সৎকর্ম সম্পাদন করে যে, তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার।’’ (সুরা বনি ইসরাইল: ৯)

আসমানী কিতাব নাজিলের উদ্দেশ্য

আসমানী কিতাব নাজিলের প্রধান উদ্দেশ্য হলো:

১. মানবজাতিকে পথনির্দেশনা দেওয়া: মানুষ যেন সঠিক পথ গ্রহণ করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে।
২. সত্য-মিথ্যার পার্থক্য স্পষ্ট করা: শয়তানের ধোঁকা ও মিথ্যাচার থেকে মানুষকে রক্ষা করা।
3. ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা: সমাজে শান্তি ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার জন্য আল্লাহ তাঁর বিধান পাঠিয়েছেন।
4. আখিরাতের প্রতি মানুষকে সতর্ক করা: আল্লাহ বলেন,

وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ ٱلْكِتَٰبَ تِبْيَٰنٗا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَهُدٗى وَرَحْمَةٗ وَبُشْرَىٰ لِلْمُسْلِمِينَ
‘‘আমি তোমার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি, যাতে সবকিছু স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যা হেদায়েত, রহমত ও মুসলমানদের জন্য সুসংবাদ।’’ (সুরা নাহল: ৮৯)

আসমানী কিতাব সম্পর্কে অন্যান্য গ্রন্থের ব্যাখ্যা

তাফসীর গ্রন্থসমূহে আসমানী কিতাবের গুরুত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা পাওয়া যায়। যেমন:

  1. তাফসীর ইবনে কাসীর: এখানে বলা হয়েছে যে, আসমানী কিতাবের মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের সত্যপথে পরিচালিত করেছেন।
  2. তাফসীর আত-তাবারী: এই গ্রন্থে বলা হয়েছে, আসমানী কিতাব মানুষকে ন্যায়বিচার ও কল্যাণের দিকে আহ্বান জানায়।
  3. তাফসীর আল-জালালাইন: এখানে বলা হয়েছে, কিতাব পাঠানোর উদ্দেশ্য হলো মানবতার কল্যাণ ও আত্মশুদ্ধি।

শিক্ষণীয় ও করণীয় বিষয়সমূহ

১. আসমানী কিতাবগুলোর প্রতি বিশ্বাস রাখা ফরজ।
২. কুরআনের বিধান মেনে চলা ও তার ব্যাখ্যা নবী (সা.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী গ্রহণ করা।
৩. আল্লাহর বিধান ও হুকুম আহকাম মেনে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।
৪. আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস রেখে এই দুনিয়ায় নেক আমল করা।

 

আসমানী কিতাব ও তা প্রাপ্ত চারজন রাসূল (আ.)

আসমানী কিতাবের সংজ্ঞা

আসমানী কিতাব হলো সেসব ঐশী গ্রন্থ, যা আল্লাহ তাআলা তাঁর মনোনীত রাসূলগণের মাধ্যমে মানবজাতির হেদায়েত ও কল্যাণের জন্য নাজিল করেছেন। এই কিতাবগুলোতে তাওহীদ, রিসালাত, আখিরাত, ইবাদত-বন্দেগি, সামাজিক ও নৈতিক বিধি-বিধান এবং মানবজীবনের যাবতীয় দিকনির্দেশনা রয়েছে।

আল্লাহ বলেন:

وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَأَنْزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتَابَ وَالْمِيزَانَ لِيَقُومَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ
‘‘আর আমি আমার রাসূলদেরকে সুস্পষ্ট প্রমাণসহ প্রেরণ করেছি এবং তাদের সঙ্গে কিতাব ও ন্যায়পরায়ণতার মাপকাঠি অবতীর্ণ করেছি, যাতে মানুষ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে।’’ (সুরা হাদীদ: ২৫)

আসমানী কিতাব প্রাপ্ত চারজন রাসূল ও তাদের কিতাব

আসমানী কিতাব মোট চারটি, যা চারজন রাসূলের উপর নাজিল করা হয়েছে। এরা হলেন:

  1. তাওরাত – হযরত মূসা (আ.)
  2. জবূর – হযরত দাউদ (আ.)
  3. ইঞ্জিল – হযরত ঈসা (আ.)
  4. কুরআনুল কারীম – হযরত মুহাম্মদ (সা.)

আল্লাহ তাআলা বলেন:

إِنَّا أَنْزَلْنَا التَّوْرَاةَ فِيهَا هُدًى وَنُورٌ
‘‘নিশ্চয় আমি তাওরাত নাযিল করেছি, যাতে রয়েছে হেদায়েত ও নূর।’’ (সুরা মায়েদা: ৪৪)

وَآتَيْنَا دَاوُودَ زَبُورًا
‘‘আর আমি দাউদকে দিয়েছিলাম জবূর।’’ (সুরা নিসা: ১৬৩)

وَقَفَّيْنَا عَلَىٰ آثَارِهِم بِعِيسَى ٱبْنِ مَرْيَمَ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ ٱلتَّوْرَىٰةِ وَآتَيْنَٰهُ ٱلْإِنجِيلَ فِيهِ هُدًۭى وَنُورٌۭ
‘‘আর আমি তাদের পর মারিয়ামের পুত্র ঈসাকে পাঠিয়েছি, যিনি তাওরাতের সত্যায়নকারী ছিলেন এবং আমি তাকে ইঞ্জিল দিয়েছি, যাতে রয়েছে হেদায়েত ও নূর।’’ (সুরা মায়েদা: ৪৬)

شَهْرُ رَمَضَانَ ٱلَّذِىٓ أُنزِلَ فِيهِ ٱلْقُرْءَانُ هُدًۭى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَٰتٍۢ مِّنَ ٱلْهُدَىٰ وَٱلْفُرْقَانِ
‘‘রমজান মাস, যে মাসে কুরআন নাজিল করা হয়েছে, যা মানুষের জন্য হিদায়াত এবং সত্যপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও ফয়সালার বিধান।’’ (সুরা বাকারা: ১৮৫)

প্রত্যেক কিতাবের বৈশিষ্ট্য ও আলোচ্য বিষয়

(১) তাওরাত

  • প্রাপ্ত রাসূল: হযরত মূসা (আ.)
  • ভাষা: হিব্রু ভাষায় নাজিল হয়েছিল।
  • বৈশিষ্ট্য: এতে শিরক বিরোধী নির্দেশনা, হালাল-হারাম, ইবাদতের নিয়ম, সামাজিক ও ফৌজদারি আইন ছিল।
  • আলোচ্য বিষয়:
    • ইবাদতের বিধান
    • ন্যায়বিচার
    • হারাম ও হালালের বর্ণনা
    • ইহুদি জাতির জন্য বিশেষ বিধান

(২) জবূর

  • প্রাপ্ত রাসূল: হযরত দাউদ (আ.)
  • ভাষা: হিব্রু ভাষা
  • বৈশিষ্ট্য: এটি ছিল মূলত দোয়া ও যিকির সংকলন, যাতে বিধি-বিধান কম ছিল।
  • আলোচ্য বিষয়:
    • আল্লাহর প্রশংসা
    • নবীদের গুণাবলী
    • আত্মশুদ্ধির দোয়া
    • গজল ও হামদ

আল্লাহ বলেন:

وَلَقَدْ كَتَبْنَا فِى ٱلزَّبُورِ مِنۢ بَعْدِ ٱلذِّكْرِ أَنَّ ٱلْأَرْضَ يَرِثُهَا عِبَادِىَ ٱلصَّٰلِحُونَ
‘‘আমি জবূরে লিখেছি যে, আমার নেক বান্দারাই পৃথিবীর উত্তরাধিকারী হবে।’’ (সুরা আম্বিয়া: ১০৫)

(৩) ইঞ্জিল

  • প্রাপ্ত রাসূল: হযরত ঈসা (আ.)
  • ভাষা: আরামাইক
  • বৈশিষ্ট্য: এটি ছিল নৈতিক শিক্ষা ও আত্মশুদ্ধির কিতাব।
  • আলোচ্য বিষয়:
    • প্রেম, দয়া ও ক্ষমার শিক্ষা
    • আত্মশুদ্ধি ও অন্তরের ইবাদত
    • পরকালীন জবাবদিহিতা
    • পূর্ববর্তী কিতাবের সমর্থন

(৪) কুরআনুল কারীম

  • প্রাপ্ত রাসূল: হযরত মুহাম্মদ (সা.)
  • ভাষা: আরবি
  • বৈশিষ্ট্য: এটি সর্বশেষ ও সর্বজনীন কিতাব, যা কিয়ামত পর্যন্ত প্রযোজ্য।
  • আলোচ্য বিষয়:
    • তাওহীদ, রিসালাত, আখিরাত
    • নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাত
    • পারিবারিক ও সামাজিক বিধান
    • অপরাধ ও দণ্ডবিধান
    • ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনীতি, অর্থনীতি
    • পরকাল ও জান্নাত-জাহান্নামের বর্ণনা

আল্লাহ বলেন:

إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا ٱلذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُۥ لَحَٰفِظُونَ
‘‘নিশ্চয় আমি কুরআন নাজিল করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক।’’ (সুরা হিজর: ৯)

কুরআনুল কারীম: সর্বশেষ ও সর্বজনীন কিতাব

কুরআন পূর্ববর্তী সব কিতাবের সমাপ্তি ঘোষণা করেছে। এটি সকল জাতি, সকল যুগ ও সকল মানুষের জন্য প্রযোজ্য।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
خَيْرُكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ الْقُرْآنَ وَعَلَّمَهُ
‘‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে কুরআন শেখে এবং অন্যকে শেখায়।’’ (বুখারী: ৫০২৭)

শিক্ষণীয় ও করণীয় বিষয়সমূহ

১. সকল আসমানী কিতাবের প্রতি ঈমান রাখা ঈমানের অংশ।
২. কুরআন সর্বশেষ ও সর্বজনীন বিধান, যা কিয়ামত পর্যন্ত অপরিবর্তনীয়।
৩. কুরআন অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা এবং নবী (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করা।
৪. সমাজে ন্যায়বিচার, মানবতা ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠার জন্য কুরআনের বিধান বাস্তবায়ন করা।

 

ইলমুল কালাম সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আমাদের বই পড়ুন।