Islamic Life

হিজড়া ব্যক্তির জানাজার নামাজ ইসলামে বৈধ কি?

হিজড়া হিজড়া
হিজড়া
হিজড়া

Table of Contents

 হিজড়া (خُنثى / مُخَنَّث) ব্যক্তির জানাজার নামাজ ইসলামে বৈধ কি?

🔹 ১. ইসলামে মানুষের মর্যাদা

ইসলাম লিঙ্গ-নিরপেক্ষভাবে সকল মানুষকে সম্মান দিয়েছে — ঈমান ও আমলই মূল পার্থক্য।

قَالَ اللَّهُ تَعَالَى:
يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَىٰ وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا ۚ إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ ۚ
إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ
سورة الحجرات (49:13)

বাংলা অনুবাদ:
“হে মানবজাতি! আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি, এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি যেন তোমরা একে অপরকে চেন। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে সম্মানিত সে, যে সবচেয়ে বেশি পরহেজগার।”

🔸 এই আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে — মর্যাদা বা সম্মান লিঙ্গ বা শারীরিক গঠনের ওপর নয়, বরং তাকওয়া ও ঈমানের ওপর নির্ভরশীল


🔹 ২. হিজড়া বা خُنثى ব্যক্তি সম্পর্কে ইসলামী ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি

📚 ফিকহী সংজ্ঞা:

ইসলামী পরিভাষায় خُنثى (খুনসা) হল এমন ব্যক্তি যার মধ্যে উভয় লিঙ্গের বৈশিষ্ট্য থাকে।
এবং مُخَنَّث (মুখান্নাছ) বলতে বোঝানো হয় এমন ব্যক্তি, যিনি পুরুষ হলেও নারীর স্বভাব বা রুচি প্রদর্শন করেন।


📜 কুরআনে সরাসরি “খুনসা” বা “মুখান্নাছ” শব্দ নেই, তবে নীতিগত ব্যাখ্যা আছে:

وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ
سورة الإسراء (17:70)

বাংলা অনুবাদ:
“আর নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানদের সম্মানিত করেছি।”

➡ অর্থাৎ, লিঙ্গ নির্বিশেষে যে মুসলিম হিসেবে মৃত্যুবরণ করবে, তার জানাজার নামাজ ফরয-কিফায়াহ হিসেবে বৈধ ও প্রয়োজনীয়।


🔹 ৩. নবী ﷺ–এর যুগে মুখান্নাছ (নারী-স্বভাববিশিষ্ট পুরুষ) ছিলেন

সহিহ বুখারিতে একটি হাদীস আছে যেখানে রাসূল ﷺ মুখান্নাছদের আচরণ সংশোধন করেছিলেন, কিন্তু তাদেরকে ইসলাম থেকে বহিষ্কার করেননি, বরং তাদের ইসলামী মর্যাদা বজায় রেখেছিলেন।

عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ:
دَخَلَ عَلَيَّ النَّبِيُّ ﷺ وَعِندِي مُخَنَّثٌ، فَسَمِعَهُ النَّبِيُّ ﷺ يَقُولُ لِأَخِي أُمِّ سَلَمَةَ، إِنْ فَتَحَ اللَّهُ عَلَيْكُمُ الطَّائِفَ غَدًا أَدُلُّكَ عَلَى ابْنَةِ غَيْلَانَ، فَإِنَّهَا تُقْبِلُ بِأَرْبَعٍ وَتُدْبِرُ بِثَمَانٍ، فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ: لَا يَدْخُلَنَّ هَؤُلَاءِ عَلَيْكُنَّ.
صحيح البخاري، كتاب النكاح، حديث رقم 5235

বাংলা অনুবাদ:
উম্মে সালামা (রা.) বলেন, একবার নবী ﷺ আমার ঘরে প্রবেশ করলেন, সেখানে এক মুখান্নাছ ছিল। সে আমার ভাইকে বলল, “যদি আল্লাহ তোমাদের তায়েফ জয় দান করেন, আমি তোমাকে গাইলানের কন্যাকে দেখাবো, সে সামনে থেকে এমন এবং পিছন থেকে এমন।” তখন নবী ﷺ বললেন: “এরা যেন তোমাদের (নারীদের) কাছে প্রবেশ না করে।”

➡ এখানে দেখা যাচ্ছে, রাসূল ﷺ শুধু শালীনতা রক্ষা করেছেন; তাদের মুসলমান হিসেবে অধিকার, জানাজা বা ইমানের মর্যাদা অস্বীকার করেননি।


🔹 ৪. ফিকহী ফতোয়া (ইসলামী আইনবিদদের ব্যাখ্যা)

ইমাম নববী (রহ.) বলেন:

“الْخُنْثَىٰ يُصَلَّى عَلَيْهِ كَسَائِرِ الْمُسْلِمِينَ.”
شرح النووي على صحيح مسلم (كتاب الجنائز)

বাংলা অনুবাদ:
“খুনসা (হিজড়া) ব্যক্তির উপরও অন্যান্য মুসলিমদের মতোই জানাজার নামাজ পড়া হবে।”

⚖️ অর্থাৎ, যদি সে মুসলমান হয়, তবে তার জন্য জানাজা নামাজ পড়া ফরয-কিফায়াহ।


🔹 ৫. হিজড়া ব্যক্তির জানাজার নামাজের পদ্ধতি

 ইসলামী নীতি: জানাজার নামাজ প্রত্যেক মুসলিমের অধিকার

قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ :
حَقُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ خَمْسٌ: رَدُّ السَّلَامِ، وَعِيَادَةُ الْمَرِيضِ، وَاتِّبَاعُ الْجَنَائِزِ…
صحيح البخاري (1240), صحيح مسلم (2162)

বাংলা অনুবাদ:
“এক মুসলিমের উপর অপর মুসলিমের পাঁচটি অধিকার রয়েছে: সালামের জবাব দেয়া, অসুস্থের খোঁজ নেওয়া, জানাজায় অংশগ্রহণ করা…”

🔸 অর্থাৎ, যে ব্যক্তি মুসলমান, সে পুরুষ, নারী বা হিজড়া—সবার জানাজার নামাজ পড়া ফরয-কিফায়াহ (সামষ্টিক দায়িত্ব)।


🔶  কুরআনে মানবসম্মান ও লিঙ্গ-নিরপেক্ষ মর্যাদা

يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَىٰ … إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ
سورة الحجرات (49:13)

বাংলা অনুবাদ:
“হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি… এবং আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যে সবচেয়ে পরহেজগার।”

🔹 তাই আল্লাহর দৃষ্টিতে মানুষের মর্যাদা লিঙ্গে নয়, তাকওয়ায় (ভক্তিতে) নির্ভর করে।


🔶  ফিকহ অনুযায়ী হিজড়া (خُنثى) ব্যক্তির মর্যাদা

ইমাম নববী (রহ.) বলেন:

“الْخُنْثَىٰ يُصَلَّى عَلَيْهِ كَسَائِرِ الْمُسْلِمِينَ.”
شرح النووي على صحيح مسلم (كتاب الجنائز)

বাংলা অনুবাদ:
“খুনসা (হিজড়া) ব্যক্তির উপরও অন্যান্য মুসলমানদের মতোই জানাজার নামাজ পড়া হবে।”

অর্থাৎ, সে মুসলিম হলে তার জানাজা পড়া ফরয-কিফায়াহ;
তবে পদ্ধতিগত কিছু পার্থক্য শারীরিক সাদৃশ্য অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।


⚖️  হিজড়া ব্যক্তির জানাজার নামাজের নিয়ম

(ইসলামী ফিকহের ব্যাখ্যা অনুযায়ী)

➤ (১) যদি হিজড়া ব্যক্তির পুরুষের সাদৃশ্য বেশি থাকে

অর্থাৎ শরীরের গঠন, কণ্ঠ, আচার-আচরণ, পোশাক ও জন্মগত লিঙ্গ পুরুষসুলভ হয়:

  • তবে তাকে পুরুষ হিসেবে গণ্য করা হবে।

  • জানাজার নামাজ হবে পুরুষের নিয়মে

  • গুসল ও কাফনের নিয়মও পুরুষের মতোই।

  • জানাজায় পুরুষদের সারিতে রাখা হবে, মহিলাদের নয়।

📖 দলীল:

إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ
صحيح البخاري (حديث 1)

🔹 উদ্দেশ্য ও অবস্থা অনুযায়ীই আমল গৃহীত হয়।
অতএব, যার স্বরূপ ও দেহগত বৈশিষ্ট্য পুরুষসুলভ, সে পুরুষের বিধানে গণ্য হবে।


➤ (২) যদি হিজড়া ব্যক্তির মহিলার সাদৃশ্য বেশি থাকে

  • তাহলে তাকে নারীর বিধান অনুযায়ী বিবেচনা করা হবে।

  • জানাজার নামাজে তাকে মহিলাদের সারিতে বা পৃথক স্থানে রাখা হবে।

  • গুসল ও কাফনের নিয়মও মহিলাদের মতোই হবে।

📖 দলীল:

وَلَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا
سورة البقرة (2:286)

🔹 আল্লাহ মানুষকে তার সামর্থ্য ও অবস্থা অনুযায়ী দায়িত্ব দেন।
অতএব, যিনি নারীসদৃশ, তার জন্য নারীর বিধানই প্রযোজ্য।


➤ (৩) যদি তার লিঙ্গ নির্ধারণ করা কঠিন হয় (দ্ব্যর্থক অবস্থা)

  • তাহলে ফকীহগণ বলেন, জানাজায় নিয়ত সাধারণভাবে করা হবে:

    “اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِهَذَا الْمُسْلِمِ” (অথবা “لِهَذِهِ الْمُسْلِمَةِ”) না বলে
    “اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِهَذَا الْمَيِّتِ” বলা উত্তম।

  • জানাজার নামাজের ফরমে কোন পার্থক্য নেই;
    শুধু নিয়তটি নিরপেক্ষভাবে “এই মৃত মুসলিমের জন্য” রূপে করা হবে।

📖 দলীল:

الأعمال بالنيات وإنما لكل امرئ ما نوى
সহিহ বুখারি (1)


🔹 ৬. উপসংহার

বিষয় ইসলামী নির্দেশনা
হিজড়া মুসলিম মুসলমান হিসেবে মর্যাদা সমান
জানাজার নামাজ বৈধ, সাধারণ মুসলিমের মতোই
নিয়ত ও দোয়া লিঙ্গ উল্লেখ না করলেও বৈধ
কোরআন-হাদীস রেফারেন্স الحجرات 49:13, الإسراء 17:70, সহিহ বুখারি 5235, মুসলিম 963
ফিকহী মতামত ইমাম নববী, ইবন হাজর, ফতোয়া দারুল ইফতা (মালয়েশিয়া) — অনুমোদন প্রদান করেন

🕋 সারসংক্ষেপ:

🟩 যে হিজড়া ব্যক্তি ঈমানদার মুসলিম, তার জানাজার নামাজ পড়া ও মাগফিরাত কামনা করা ইসলামে বৈধ ও পুণ্যকর্ম।
🟩 কোরআন বা হাদীসে কোথাও নিষেধ নেই; বরং মানবসম্মান, তাকওয়া ও মুসলিম ভ্রাতৃত্বের ভিত্তিতে অনুমোদনই বিদ্যমান।


 

3 thoughts on “হিজড়া ব্যক্তির জানাজার নামাজ ইসলামে বৈধ কি?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *