Islamic Life

    পুরুষ ও নারীর নামাজের পদ্ধতি

    কুরআনের দৃষ্টিতে পুরুষ ও নারীর নামাজের পদ্ধতি

     পুরুষ ও নারীর নামাজের পদ্ধতি

    নারী ও পুরুষের নামাজের পদ্ধতিতে ভিন্নতা রয়েছে কি না—এটি বহু আলোচিত একটি ফিকহি ইস্যু। এই বিষয়ে ইসলামী শরীয়তের মূল উৎস কুরআন, সহীহ হাদীস, সাহাবা-তাবেয়ীনগণের আছার, চার মাজহাবের ইমামদের মতামত, ইসলামি স্কলারদের ব্যাখ্যা ও দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়ার আলোকে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।


    কুরআনের দৃষ্টিকোণ

    কুরআনে পুরুষ ও নারীর নামাজের পদ্ধতির পার্থক্যের নির্দিষ্ট উল্লেখ নেই। বরং নামাজের ফরজ এবং রুকনসমূহ উভয়ের জন্য একই। তবে নারী-পুরুষের শারীরিক গঠন, শরয়ী পর্দা ও সামাজিক অবস্থা ভিন্ন হওয়ায় কুরআনের সাধারণ নির্দেশনা অনুযায়ী নারীদের কিছু ভিন্নতা প্রয়োগ করা হয়েছে ফিকহে।

    قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ، الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ
    অর্থ: “নিশ্চয়ই মুমিনরা সফল, যারা নিজেদের নামাজে বিনয় ও একাগ্রতা অবলম্বন করে।”
    সূত্র: সূরা আল-মুমিনূন: ১–২

    এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, নামাজে খুশু-খুজু রক্ষা করা জরুরি, এবং নারীদের ক্ষেত্রে তা লজ্জাশীলতা ও পর্দা রক্ষার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়, যা তাদের অঙ্গভঙ্গিতে ভিন্নতা আনে।


    হাদীস দ্বারা প্রমাণ

    ১. নারীদের সিজদা ও রুকুতে শরীর গুটিয়ে রাখার হাদীস

    عن يزيد بن أبي حبيب أن النبي ﷺ مر على امرأة تصلي، فقال: إذا سجدت المرأة فلتضم فخذيها.
    অর্থ: “নবী ﷺ এক মহিলাকে নামাজ পড়তে দেখলেন এবং বললেন: যখন নারী সিজদা করে, সে যেন তার উরু (থাই) একত্র করে রাখে।”
    সূত্র: আল-মু’জামুল কবীর للطبراني, হাদীস: ٧١٣٦

    এখানে স্পষ্টভাবে রাসূল ﷺ নারীদের সিজদার ভিন্নতাকে অনুমোদন করেছেন। যদিও এই হাদীস দুর্বল, তবে এটি বহু ফকীহ গ্রহণ করেছেন সতর ও পর্দার নীতির কারণে।


    ২. হযরত আলী (রাঃ) এর বর্ণনা

    عن علي رضي الله عنه قال: إذا صلت المرأة فلتلزم بعضها بعضًا، ولا ترفع يديها في الركوع والسجود، ولا ترفع صوتها بالتكبير.
    অর্থ: “যখন নারী নামাজ পড়বে, তখন সে যেন শরীর গুটিয়ে রাখে, রুকু-সিজদায় হাত না তোলে, এবং তাকবীরে আওয়াজ না তোলে।”
    সূত্র: মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা, হাদীস: ٣٧٨٣

    এটি সাহাবির আছার, যা হানাফী মাযহাবে বিশুদ্ধ দলিল হিসেবে গণ্য হয়।


    ৩. তাবেয়ী ইব্রাহিম নাখাঈ (রহ.) এর বক্তব্য

    قال إبراهيم النخعي: المرأة تصلي كما يصلي الرجل، فإذا سجدت فَتَجْمَعْ يديها إلى صدرها وتضم بطنها إلى فخذيها.
    অর্থ: ইব্রাহিম নাখাঈ (রহ.) বলেন: “নারী পুরুষের মতো নামাজ পড়বে, কিন্তু সিজদা করলে সে হাত বুকের দিকে রাখবে এবং পেট উরুর সঙ্গে লাগিয়ে রাখবে।”

    কুরআনের দৃষ্টিতে পুরুষ ও নারীর নামাজের পদ্ধতি
    কুরআনের দৃষ্টিতে পুরুষ ও নারীর নামাজের পদ্ধতি

    সূত্র: মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা, হাদীস: ٣٧٩٠

    এখানে শরীর সঙ্কুচিত করে রাখার ইঙ্গিত স্পষ্ট।


    চার মাজহাবের ইমামদের মতামত

    ১. হানাফী মাযহাব

    নারীদের নামাজে ভিন্নতা ফিকহের বহু কিতাবে উল্লেখ আছে। যেমন:

    المرأة تضم نفسها في الركوع والسجود، ولا ترفع يديها إلا في تكبيرة الإحرام، وتخفض صوتها في القراءة والتكبير.
    অর্থ: “নারী রুকু-সিজদা ও বসায় শরীর গুটিয়ে রাখবে, কেবল তাকবীরে তাহরীমায় হাত তুলবে, কিরাআতে আওয়াজ নিচু রাখবে।”
    সূত্র: আল-হিদায়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৭৩

    ২. মালিকী মাযহাব

    মালিকী মাজহাবে নারীদের নামাজে সাধারণত ভিন্নতা নেই, তবে লোকসমক্ষে হলে পর্দার স্বার্থে কিছু অঙ্গভঙ্গিতে ভিন্নতা অনুমোদন করেন।
    সূত্র: الشرح الكبير للدردير، ج 1، ص 289

    ৩. শাফঈ মাযহাব

    শাফেয়ি মাযহাবে মূল নিয়মে ভিন্নতা নেই, তবে পর্দার কারণে বসার সময় পা গুটিয়ে বসা বা সিজদায় শরীর ঢেকে রাখা শ্রেয়।
    সূত্র: المجموع للنووي، ج 3، ص 392

    ৪. হাম্বলী মাযহাব

    ইমাম আহমাদ (রহ.) নারীদেরকে বসা ও সিজদায় শরীর গুটিয়ে রাখার পক্ষে বলেন।
    সূত্র: المغني لابن قدامة، ج 1، ص 293


    ইসলামিক স্কলারদের মতামত

    দারুল উলুম দেওবন্দের শায়খুল হাদীস, মুফতি রশীদ আহমদ গাঙ্গোহী (রহ.) বলেন:
    “নারীর শরীর অধিক সতর হওয়ায় তাদের নামাজে রুকু ও সিজদায় শরীর গুটিয়ে রাখা উত্তম এবং পর্দানির্ভর ভিন্নতা শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে যথার্থ।”
    সূত্র: ফাতাওয়া রশীদিয়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১০৫


    দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়া

    প্রশ্ন: নারীর নামাজে পুরুষের তুলনায় ভিন্নতা কি শরয়ীভাবে প্রমাণিত?

    ফতোয়া: হ্যাঁ, নারীদের শরীর সতর হওয়ায় শরীয়তের দৃষ্টিতে তাদের নামাজের পদ্ধতি ভিন্ন। যেমন—তারা কেবল তাকবীরে তাহরীমায় হাত তোলে, সিজদায় পেট ও উরু একত্র রাখে, রুকু ও বসার সময় শরীর গুটিয়ে রাখে।
    আরবী:
    المرأة تضم بدنها في الصلاة وتخفض صوتها وتجلس متوركة ولا ترفع يديها إلا في تكبيرة الإحرام.
    সূত্র: ফাতাওয়া দারুল উলুম দেওবন্দ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৯৫


    উপসংহার

    উপরোক্ত কুরআন, হাদীস, সাহাবা ও তাবেয়ী আছার, চার মাজহাবের ইমামদের মতামত এবং দেওবন্দের ফতোয়া স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, নারী ও পুরুষের নামাজের ফরয ও রুকনসমূহ এক হলেও অঙ্গভঙ্গি ও পদ্ধতিগত কিছু বিষয়ে শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে ভিন্নতা রয়েছে। এর মূল ভিত্তি হলো: নারীর সতর, পর্দা ও লজ্জাশীলতা সংরক্ষণ।


     

    10 thoughts on “পুরুষ ও নারীর নামাজের পদ্ধতি

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *