একজন মুসলমানের উপর অন্য মুসলমানের দায়িত্ব ও কর্তব্য কোরআন, সহিহ হাদিস ও আলেমদের ব্যাখ্যার আলোকে একটি পরিপূর্ণ আলোচনা
ভূমিকা
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এখানে ইবাদতের পাশাপাশি সমাজব্যবস্থা ও পারস্পরিক সম্পর্কের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একজন মুসলমান একা নয়; সে একটি উম্মাহর অংশ। তাই এক মুসলমানের উপর অন্য মুসলমানের বহু দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে, যা কোরআন ও সহিহ হাদিসে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে।
—
১. মুসলিম ভ্রাতৃত্বের মূলনীতি (কোরআনের আলোকে)
📖 কোরআনের আয়াত
﴿ إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ ﴾
(سورة الحجرات: ١٠)
বাংলা অনুবাদ:
নিশ্চয়ই মুমিনরা পরস্পর ভাই। সুতরাং তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করে দাও এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা রহমতপ্রাপ্ত হও।
ব্যাখ্যা:
এই আয়াত মুসলিম সমাজের ভিত্তি স্থাপন করেছে। ইবনে কাসীর (রহ.) বলেন—ঈমানের সম্পর্ক রক্তের সম্পর্কের চেয়েও শক্তিশালী। তাই একজন মুসলমান অন্য মুসলমানের দুঃখ-কষ্ট, ঝগড়া-বিবাদ ও সংকটে দায়িত্বশীল।
📚 তাফসীর ইবনে কাসীর
—
২. মুসলমানের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা
📖 কোরআনের আয়াত
﴿ وَلَا تَلْمِزُوا أَنفُسَكُمْ وَلَا تَنَابَزُوا بِالْأَلْقَابِ ﴾
(سورة الحجرات: ١١)
বাংলা অনুবাদ:
তোমরা একে অপরকে দোষারোপ করো না এবং অপমানসূচক উপনামে ডাকো না।
ব্যাখ্যা:
ইমাম কুরতুবী (রহ.) বলেন—এই আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে মুসলমানের ইজ্জত, সম্মান ও আত্মমর্যাদা রক্ষা করা ফরজ। গীবত, অপবাদ ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য এ আয়াতের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
📚 তাফসীর আল-কুরতুবী
—
৩. মুসলমানের উপর মুসলমানের পাঁচটি মৌলিক অধিকার
🕌 সহিহ হাদিস (সনদসহ)
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ:
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ:
« حَقُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ خَمْسٌ: رَدُّ السَّلَامِ، وَعِيَادَةُ الْمَرِيضِ، وَاتِّبَاعُ الْجَنَائِزِ، وَإِجَابَةُ الدَّعْوَةِ، وَتَشْمِيتُ الْعَاطِسِ »
(رواه مسلم، حديث: 2162)
বাংলা অনুবাদ:
এক মুসলমানের উপর অন্য মুসলমানের পাঁচটি অধিকার রয়েছে—
১. সালামের জবাব দেওয়া
২. অসুস্থ হলে দেখতে যাওয়া
৩. জানাযায় অংশগ্রহণ করা
৪. দাওয়াতে সাড়া দেওয়া
৫. হাঁচি দিলে ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বলা
ব্যাখ্যা:
ইমাম নববী (রহ.) বলেন—এই অধিকারগুলো আদায় করা মুসলিম সমাজের জন্য ফরজে কিফায়া। সমাজে এগুলো বিলুপ্ত হলে সবাই গুনাহগার হবে।
📚 শরহ সহিহ মুসলিম
—
৪. মুসলমান মুসলমানের ভাই – জুলুম ও অবহেলা নিষিদ্ধ
🕌 সহিহ হাদিস
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ:
« الْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمِ، لَا يَظْلِمُهُ وَلَا يَخْذُلُهُ وَلَا يَحْقِرُهُ »
(رواه البخاري: 2442، ومسلم: 2580)
বাংলা অনুবাদ:
মুসলমান মুসলমানের ভাই। সে তার উপর জুলুম করে না, তাকে একা ফেলে দেয় না এবং তাকে তুচ্ছ মনে করে না।
ব্যাখ্যা:
ইবনে হাজর (রহ.) বলেন—এই হাদিস মুসলিম সমাজে জুলুম, অহংকার ও স্বার্থপরতার সব দরজা বন্ধ করে দেয়।
📚 ফাতহুল বারী
—
৫. দোষ গোপন করা ও সাহায্য করা
🕌 সহিহ হাদিস
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ:
« مَنْ سَتَرَ مُسْلِمًا سَتَرَهُ اللَّهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ »
(رواه مسلم: 2699)
বাংলা অনুবাদ:
যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের দোষ গোপন রাখে, আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ গোপন রাখবেন।
ব্যাখ্যা:
ইমাম গাজ্জালী (রহ.) বলেন—গীবত ও দোষচর্চা ঈমান দুর্বল করে এবং মুসলিম ভ্রাতৃত্ব ধ্বংস করে।
📚 ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন
—
৬. আলেমদের সম্মিলিত মতামত (Ijma)
ইমাম নববী (রহ.): মুসলমানের জান, মাল ও সম্মান হারাম—এ বিষয়ে আলেমদের ইজমা রয়েছে।
ইবনে তাইমিয়্যা (রহ.): মুসলমানের সাহায্য করা ঈমানের অপরিহার্য দাবি।
ইমাম আহমদ (রহ.): মুসলমানের হক নষ্ট করা কবিরা গুনাহ।
—
উপসংহার
এক মুসলমানের উপর অন্য মুসলমানের দায়িত্ব শুধু নৈতিক বিষয় নয়; এটি ঈমানের অংশ। সালাম, সাহায্য, দোয়া, সম্মান রক্ষা—এসবের মাধ্যমেই একটি আদর্শ ইসলামী সমাজ গড়ে ওঠে।

আরো বিস্তারিত আলোচনা।
ইসলামে মানুষ দুই প্রকার হকের অধীন—
1. হক্কুল্লাহ (আল্লাহর হক)
2. হক্কুল ইবাদ (বান্দার হক)
আল্লাহ তাআলা নিজ হক চাইলে ক্ষমা করে দেন,
কিন্তু বান্দার হক আদায় না হলে আল্লাহ নিজেও ক্ষমা করেন না, যতক্ষণ না হকদার ক্ষমা করে।
ইমাম ইবনু কাসীর (রহ.) বলেন—
> “হক্কুল ইবাদ আখিরাতের সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায়।”
প্রথম অধ্যায়
মুসলমানদের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব — সমস্ত অধিকারের ভিত্তি
📖 কোরআনের আয়াত
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ
📚 সূরা আল-হুজুরাত: ১০
শব্দভিত্তিক ব্যাখ্যা
إِنَّمَا = নিশ্চয়ই, একমাত্র
إِخْوَةٌ = প্রকৃত ভাই
فَأَصْلِحُوا = বাধ্যতামূলকভাবে মীমাংসা করো
তাফসির (ইবনু কাসীর)
> “এই আয়াত মুসলমানদের মধ্যে শত্রুতা হারাম ঘোষণা করেছে।”
—
দ্বিতীয় অধ্যায়
একজন মুসলমানের উপর অন্য মুসলমানের ছয়টি হক
📖 হাদিসের পূর্ণ আরবি ইবারত (সনদসহ)
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ:
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ:
حَقُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ سِتٌّ
قِيلَ: مَا هُنَّ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟
قَالَ:
إِذَا لَقِيتَهُ فَسَلِّمْ عَلَيْهِ،
وَإِذَا دَعَاكَ فَأَجِبْهُ،
وَإِذَا اسْتَنْصَحَكَ فَانْصَحْ لَهُ،
وَإِذَا عَطَسَ فَحَمِدَ اللَّهَ فَشَمِّتْهُ،
وَإِذَا مَرِضَ فَعُدْهُ،
وَإِذَا مَاتَ فَاتَّبِعْهُ
📚 সহিহ মুসলিম, কিতাবুস সালাম, হাদিস: ২১৬২
📚 রাবি: আবু হুরায়রা (রা.)
—
পূর্ণ বাংলা অনুবাদ
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত—
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
এক মুসলমানের উপর অন্য মুসলমানের ছয়টি অধিকার রয়েছে।
জিজ্ঞেস করা হলো: হে আল্লাহর রাসূল! সেগুলো কী?
তিনি বললেন—
1. যখন তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে, তাকে সালাম দেবে
2. সে দাওয়াত দিলে তা গ্রহণ করবে
3. সে তোমার কাছে নসিহত চাইলে খাঁটি নসিহত করবে
4. সে হাঁচি দিয়ে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বললে, ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বলবে
5. সে অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাবে
6. সে মারা গেলে তার জানাজায় অংশগ্রহণ করবে
প্রত্যেক হকের বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১️⃣ সালাম দেওয়া
সালাম দেওয়া সুন্নত,
কিন্তু সালামের জবাব দেওয়া ওয়াজিব।
📖 হাদিস:
أَفْشُوا السَّلَامَ بَيْنَكُمْ
📚 সহিহ মুসলিম: ৫৪
ইমাম নববী (রহ.) বলেন—“সালাম মুসলমানদের হৃদয়কে সংযুক্ত করে।”
২️⃣ দাওয়াত কবুল করা
📖 হাদিস:
إِذَا دُعِيَ أَحَدُكُمْ فَلْيُجِبْ
📚 সহিহ বুখারি: ৫১৭৩
ফিকহি মাসআলা:
ওয়ালিমার দাওয়াত → ওয়াজিব
সাধারণ দাওয়াত → সুন্নত
—
৩️⃣ নসিহত করা
📖 হাদিস:
الدِّينُ النَّصِيحَةُ
📚 সহিহ মুসলিম: ৫৫
ইমাম গাজ্জালী (রহ.) বলেন—
> “নসিহত ছাড়া দ্বীন অপূর্ণ।”
—
৪️⃣ হাঁচির জবাব দেওয়া
📖 হাদিস:
فَشَمِّتُوهُ
📚 সহিহ বুখারি: ৬২২৩
এটি সামাজিক সৌজন্য নয়, বরং ইবাদত।
—
৫️⃣ অসুস্থকে দেখতে যাওয়া
📖 হাদিস:
إِنَّ اللَّهَ يَقُولُ… مَرِضْتُ فَلَمْ تَعُدْنِي
📚 সহিহ মুসলিম: ২৫৬৯
ইমাম ইবনু হাজার (রহ.) বলেন—
> “রোগী দর্শনে আল্লাহর রহমত নাযিল হয়।”
—
৬️⃣ জানাজায় অংশগ্রহণ
📖 হাদিস:
مَنْ شَهِدَ الْجَنَازَةَ… فَلَهُ قِيرَاطَانِ
📚 সহিহ বুখারি: ১৩২৫
এক কিরাত = উহুদ পাহাড় সমান সওয়াব।
—
তৃতীয় অধ্যায়
মুসলমানের জান, মাল ও সম্মান রক্ষা
📖 পূর্ণ হাদিস
كُلُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ حَرَامٌ: دَمُهُ، وَمَالُهُ، وَعِرْضُهُ
“প্রত্যেক মুসলমানের ওপর অপর মুসলমানের জান, মাল ও সম্মান হারাম।”
📚 সহিহ মুসলিম: ২৫৬৪
হাদিসের মূল শিক্ষা
এই হাদিস ইসলামের সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তি। এখানে রাসূল ﷺ স্পষ্ট করে দিয়েছেন—
একজন মুসলমানের জীবন, সম্পদ এবং সম্মান অন্য মুসলমানের জন্য অলঙ্ঘনীয় (Inviolable)।
১. জিহ্বা দ্বারা আঘাত → গীবত, অপবাদ ও কটুক্তি
▪ গীবত কী?
কোনো ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার এমন দোষ বলা—
যা শুনলে সে কষ্ট পায়, যদিও তা সত্য হয়।
📖 কুরআন:
“তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে?”
— (সূরা হুজুরাত: ১২)
▪ এর অন্তর্ভুক্ত:
-
কাউকে ছোট করা
-
উপহাস, ব্যঙ্গ
-
নামে ডাকা, বদনাম করা
-
সত্য কথা হলেও অপ্রয়োজনে প্রকাশ করা
পরিণতি:
গীবত মুসলমানের সম্মানহানি, যা কিয়ামতের দিন নেক আমল দিয়ে শোধ করতে হবে।
২. কলম দ্বারা আঘাত → অপবাদ, মিথ্যা লেখা ও চরিত্রহনন
আজকের যুগে কলম মানে শুধু কাগজ নয়—
-
ফেসবুক পোস্ট
-
মন্তব্য (Comment)
-
ব্লগ, নিউজ, স্ক্রিনশট
কোনো প্রমাণ ছাড়া কারো বিরুদ্ধে লেখা:
-
মিথ্যা অভিযোগ
-
সন্দেহ ছড়ানো
-
বিকৃত তথ্য উপস্থাপন
📖 কুরআন:
“যারা মুমিন নারী-পুরুষের প্রতি অপবাদ দেয়… তারা স্পষ্ট পাপ বহন করে।”
— (সূরা আহযাব: ৫৮)
গুরুত্বপূর্ণ কথা:
লিখিত অপবাদ অনেক সময় স্থায়ী ক্ষতি করে—
একটি পোস্ট মুছে ফেললেও তার প্রভাব থেকে যায়।
৩. মিডিয়া দ্বারা আঘাত → জুলুম ও ফিতনা
মিডিয়া শক্তিশালী মাধ্যম—
ভুল ব্যবহারে তা ভয়াবহ জুলুমে পরিণত হয়।
▪ মিডিয়ায় জুলুমের উদাহরণ:
-
যাচাই ছাড়া সংবাদ প্রচার
-
শিরোনামে অতিরঞ্জন
-
নির্দোষ ব্যক্তিকে অপরাধী বানানো
-
একটি পক্ষকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হেয় করা
📖 কুরআন:
“হে মুমিনগণ! যদি কোনো ফাসিক তোমাদের কাছে খবর আনে, তবে তা যাচাই কর।”
— (সূরা হুজুরাত: ৬)
ফলাফল:
-
সামাজিক বিভেদ
-
নিরপরাধের সম্মান ধ্বংস
-
বড় গুনাহ ও আল্লাহর শাস্তি
চতুর্থ অধ্যায়
দেউলিয়া মুসলমান — ভয়াবহ পরিণতি
📖 পূর্ণ হাদিস
আরবি:
أَتَدْرُونَ مَا الْمُفْلِسُ؟ قَالُوا: الْمُفْلِسُ فِينَا مَنْ لَا دِرْهَمَ لَهُ وَلَا مَتَاعَ. فَقَالَ: إِنَّ الْمُفْلِسَ مِنْ أُمَّتِي يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِصَلَاةٍ وَصِيَامٍ وَزَكَاةٍ، وَيَأْتِي قَدْ شَتَمَ هَذَا، وَقَذَفَ هَذَا، وَأَكَلَ مَالَ هَذَا، وَسَفَكَ دَمَ هَذَا، وَضَرَبَ هَذَا؛ فَيُعْطَى هَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ، وَهَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ، فَإِنْ فَنِيَتْ حَسَنَاتُهُ قَبْلَ أَنْ يُقْضَى مَا عَلَيْهِ، أُخِذَ مِنْ خَطَايَاهُمْ فَطُرِحَتْ عَلَيْهِ، ثُمَّ طُرِحَ فِي النَّارِ.
📚 সহিহ মুসলিম: ২৫৮১
বাংলা অনুবাদ (ভাবার্থ)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, “তোমরা কি জানো দেউলিয়া কে?”
সাহাবিরা বললেন, “আমাদের মধ্যে দেউলিয়া সে, যার কাছে কোনো দিরহাম নেই, কোনো সম্পদ নেই।”
তিনি বললেন, “আমার উম্মতের মধ্যে প্রকৃত দেউলিয়া সে ব্যক্তি, যে কিয়ামতের দিন নামাজ, রোজা ও যাকাত নিয়ে আসবে; কিন্তু সে কাউকে গালি দিয়েছে, কাউকে অপবাদ দিয়েছে, কারো সম্পদ আত্মসাৎ করেছে, কারো রক্তপাত করেছে, কাউকে প্রহার করেছে। তখন তার নেক আমল থেকে একে দেওয়া হবে, ওকে দেওয়া হবে। যদি হক আদায়ের আগেই তার নেক আমল শেষ হয়ে যায়, তবে হকদারদের গুনাহ তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে, অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।”
ব্যাখ্যা ও বিস্তারিত আলোচনা
১) দুনিয়ার দেউলিয়াপনা বনাম আখিরাতের দেউলিয়াপনা
দুনিয়ায় দেউলিয়া হওয়া মানে অর্থ-সম্পদ না থাকা। কিন্তু আখিরাতে দেউলিয়া হওয়া মানে—নামাজ, রোজা, যাকাতের মতো বড় বড় আমল থাকা সত্ত্বেও সেগুলোর কোনো উপকার না পাওয়া। কারণ এসব আমল মানুষের হক নষ্ট করার কারণে হকদারদের মধ্যে বণ্টিত হয়ে যাবে।
২) মানুষের হক (حُقُوقُ الْعِبَادِ) কেন ভয়াবহ?
আল্লাহ তাআলা নিজের অধিকারের ক্ষেত্রে ক্ষমাশীল—তাওবা করলে তিনি মাফ করেন। কিন্তু বান্দার হক আল্লাহ নিজে মাফ করেন না, যতক্ষণ না হকদার মাফ করে বা তার হক আদায় করা হয়। এ কারণেই মানুষের হক নষ্ট করা সবচেয়ে ভয়ংকর অপরাধগুলোর একটি।
৩) কোন কোন কাজ মানুষকে ‘মুফলিস’ বানায়?
এই হাদিসে কয়েকটি বড় অপরাধ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে—
- গালি দেওয়া ও অপমান করা (شتم)
- অপবাদ দেওয়া (قذف)
- অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করা
- অন্যায়ভাবে রক্তপাত করা
- শারীরিক নির্যাতন করা
এগুলো সবই মানুষের হকের অন্তর্ভুক্ত। এগুলো যত ছোটই মনে হোক, আখিরাতে এর হিসাব অত্যন্ত কঠিন।
৪) নেক আমল কীভাবে ‘হস্তান্তর’ হবে?
কিয়ামতের ময়দানে কোনো টাকা-পয়সা থাকবে না। সেখানে লেনদেন হবে নেক আমল ও গুনাহ দিয়ে।
- জালিমের নেক আমল হকদারদের দেওয়া হবে।
- নেক আমল শেষ হয়ে গেলে, হকদারদের গুনাহ তার ঘাড়ে চাপানো হবে।
এটাই প্রকৃত দেউলিয়াপনা—সব কিছু থাকা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত শূন্য হয়ে যাওয়া।
৫) নামাজ–রোজা থাকা সত্ত্বেও কেন শাস্তি?
নামাজ ও রোজা মানুষকে তাকওয়ার শিক্ষা দেয়। কিন্তু যদি এসব ইবাদতের প্রভাব চরিত্রে না পড়ে, যদি ইবাদত মানুষকে জুলুম থেকে বিরত না রাখে—তবে সে ইবাদত আল্লাহর কাছে কাঙ্ক্ষিত ফল বয়ে আনে না।
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
“নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।” (সূরা আনকাবুত: ৪৫)
যে নামাজ মানুষকে জুলুম থেকে বিরত রাখে না, সে নামাজ তার বিরুদ্ধে সাক্ষী হয়ে যেতে পারে।
৬) আমাদের জন্য শিক্ষা
- শুধু ইবাদত করাই যথেষ্ট নয়, মানুষের সাথে লেনদেন ও আচরণ ঠিক করাও ফরজ।
- কারো হক নষ্ট করলে দুনিয়াতেই তা মিটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা জরুরি।
- ক্ষমা চাওয়া, ক্ষতিপূরণ দেওয়া, অপবাদ ফিরিয়ে নেওয়া—এসব আখিরাতের ভয়াবহ শাস্তি থেকে বাঁচার উপায়।
৭) বাঁচার পথ
- নিয়মিত আত্মসমালোচনা করা
- কারো প্রতি জুলুম হলে দ্রুত তাওবা ও হক আদায়
- বেশি বেশি দোয়া: “আল্লাহুম্মা সাল্লিম সাল্লিম”—হে আল্লাহ, নিরাপদ রাখুন
উপসংহার
যে ব্যক্তি নামাজি, রোজাদার হয়েও মানুষের হক নষ্ট করে, সে কিয়ামতের দিন সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই প্রকৃত সফলতা কেবল ইবাদতে নয়—ইবাদত ও উত্তম চরিত্রের সমন্বয়েই।

