“নিশ্চয় আমিই এই উপদেশগ্রন্থ (কোরআন) অবতীর্ণ করেছি, এবং নিশ্চয় আমিই একে সংরক্ষিত রাখব।” (সূরা আল-হিজর, আয়াত ৯)
সহজ ব্যাখ্যা:
এই আয়াতে মহান আল্লাহ্ তায়ালা ঘোষণা করেছেন যে, কোরআন তাঁরই অবতীর্ণ করা বাণী। অর্থাৎ কোরআন কোনো মানুষের লেখা নয়; বরং এটি সরাসরি আল্লাহ্র পক্ষ থেকে প্রেরিত এক ঐশী বার্তা। এখানে আরবি শব্দ “إِنَّا نَحْنُ” ব্যবহৃত হয়েছে, যার আক্ষরিক অর্থ “আমরাই”। কিন্তু আরবি ভাষায় আল্লাহ যখন “আমরা” বলেন, তা বহুবচন অর্থে নয় — বরং সম্মান, গৌরব ও মহিমা প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত হয়। সুতরাং এর প্রকৃত অর্থ “আমিই”। এজন্য অনুবাদে একবচন “আমি” ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে পাঠক বিভ্রান্ত না হন।
এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তিনি নিজেই কোরআন অবতীর্ণ করেছেন এবং তিনিই একে যুগে যুগে সংরক্ষিত রাখবেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—নবী করিম ﷺ-এর যুগ থেকে আজ পর্যন্ত কোরআনের একটি অক্ষরও পরিবর্তিত হয়নি। কোটি কোটি মুসলমান মুখস্থ করে রেখেছে, লিখিত আকারে নির্ভুলভাবে সংরক্ষিত রয়েছে, এবং একই কোরআন সারা পৃথিবীতে পাঠ করা হচ্ছে।
এটাই প্রমাণ করে যে কোরআন আল্লাহ্ তায়ালার বাণী — মানব রচিত কোনো গ্রন্থ নয়। কারণ পৃথিবীর অন্য কোনো ধর্মগ্রন্থ এমন নিখুঁতভাবে সংরক্ষিত থাকতে পারেনি, অথচ কোরআন ১৪ শতাধিক বছর পরেও একই রূপে টিকে আছে। এটি আল্লাহ্র সেই অলৌকিক প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রমাণ—
“নিশ্চয় আমিই কোরআন অবতীর্ণ করেছি, এবং আমিই একে সংরক্ষিত রাখব।”
“আর যদি তোমরা সন্দেহে থাকো সেই বিষয়ে যা আমি আমার বান্দার (মুহাম্মদ ﷺ-এর) ওপর অবতীর্ণ করেছি, তবে তোমরা এর মতো একটি সূরা এনে দেখাও।”
সহজ ব্যাখ্যা :
এই আয়াতে আল্লাহ্ তায়ালা মানুষকে এক মহান চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন—যদি তোমাদের মনে কোনো সন্দেহ থাকে যে, কোরআন সত্যিই আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিল হয়েছে কি না, তবে তোমরা চেষ্টা করে দেখো—এ রকম একটি সূরা (অর্থাৎ কোরআনের ছোট্ট একটি অধ্যায়) তৈরি করে আনো। এখানে “আমাদের বান্দা” বলতে নবী মুহাম্মদ ﷺ-কে বোঝানো হয়েছে, যাঁর উপর কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে।
এই চ্যালেঞ্জ শুধু সেই সময়ের আরব কবি, সাহিত্যিক ও বিদ্বানদের জন্যই ছিল না—এটি আজও সমানভাবে বিদ্যমান। কোরআনের ভাষা, বর্ণনা, ভাবগাম্ভীর্য ও অর্থবহতা এতই অনন্য ও নিখুঁত যে, ইতিহাসে কেউ এর অনুরূপ একটি সূরাও সৃষ্টি করতে পারেনি। মহান আল্লাহ এই চ্যালেঞ্জের মাধ্যমে প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, কোরআন কোনো মানব-রচিত গ্রন্থ নয়; এটি একমাত্র আল্লাহ্ তায়ালার পক্ষ থেকে প্রেরিত ওহি।
এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ মানবজাতিকে আহ্বান জানিয়েছেন—যদি কেউ সত্যের সন্ধান চায়, তবে সে যেন কোরআনের গভীরতা, যুক্তি ও সৌন্দর্য নিয়ে চিন্তা করে। কারণ কোরআনের মতো একটি গ্রন্থ রচনা করা মানুষের পক্ষে অসম্ভব—এটাই কোরআনের ঐশ্বরিকতা ও অলৌকিকতার জীবন্ত প্রমাণ।
“তারা কি কোরআন নিয়ে চিন্তাভাবনা করে না? যদি এটি আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো পক্ষ থেকে হতো, তবে তারা এতে বহু অসঙ্গতি ও বিরোধ দেখতে পেত।”
সহজ ব্যাখ্যা :
এই আয়াতে আল্লাহ্ তায়ালা মানুষকে আহ্বান জানিয়েছেন কোরআন সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করার জন্য। আল্লাহ বলেন — তোমরা কি কোরআন নিয়ে মনোযোগ দিয়ে ভাব না? অর্থাৎ কোরআনের অর্থ, বাণী ও বার্তাগুলো নিয়ে যদি মানুষ আন্তরিকভাবে চিন্তা করে, তাহলে সহজেই বুঝবে যে এটি কোনো মানুষের রচিত গ্রন্থ নয়। আল্লাহ আরও বলেন — যদি কোরআন আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো কাছ থেকে আসত, তাহলে এতে নানা রকম বিরোধ, অসামঞ্জস্য ও ভুল পাওয়া যেত।
কিন্তু বাস্তবে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে দীর্ঘ ২৩ বছরের ব্যবধানে, নানা পরিস্থিতি, ঘটনা ও পরিবেশে; তবুও এর বক্তব্যে কোথাও কোনো বিরোধ বা অসামঞ্জস্য নেই। প্রতিটি আয়াত অন্য আয়াতকে ব্যাখ্যা করে, প্রতিটি বিষয় একই স্রোতে সংযুক্ত — এটি প্রমাণ করে যে কোরআনের উৎস এক এবং অখণ্ড, আর তিনি হলেন মহান আল্লাহ্।
এই আয়াত আমাদের শেখায়, কোরআন শুধু পাঠ করার জন্য নয় — বরং গভীরভাবে বিবেচনা, অনুধাবন ও চিন্তা করার জন্য। কারণ চিন্তাশীল দৃষ্টি দিয়েই মানুষ বুঝতে পারে, কোরআনের ভেতরে কোনো মানবসৃষ্ট ত্রুটি নেই। এটি এক অবিকৃত, নিখুঁত এবং পরিপূর্ণ গ্রন্থ — যা আল্লাহ্ তায়ালার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ এক অলৌকিক বাণী।
সংক্ষেপে: কোরআন নিজেই দাবি করে — এটি মানবসৃষ্ট নয়, আল্লাহর বাণী; এ বাণীর অদ্বিতীয়তা (ইʻজাজ) ও সংরক্ষণ-প্রতিশ্রুতি কোরআনের মধ্যে স্পষ্ট। (সূত্র: উল্লিখিত আয়াতসমূহ)
বাংলা অনুবাদ: “আমি তোমাদের মধ্যে দুটি ভারী বস্তু রেখে যাচ্ছি; প্রথমটি আল্লাহর কিতাব — এতে সরল পথ ও আলো (হেদায়াত ও নূর) আছে; তাই আল্লাহর কিতাবকে ধরো এবং তাতে দৃঢ় হও।”
ব্যাখ্যা : এই হাদিসে নবী ﷺ নিজে কোরআনকে “প্রথম এবং অভিন্ন দিক” হিসেবে নির্দিষ্ট করেছেন—যা উম্মাহর রাহ ও আলো। এটি স্পষ্ট করে যে কোরআন আলাদা ও প্রাধান্যপ্রাপ্ত, অন্য কোনো মানুষের বাণীর সঙ্গে মিশে যাওয়ার কটুতা ছাড়া। যখন নবী নিজেই কোরআনকে সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ বলছেন এবং মানুষের কাছে তাকে ধরার নির্দেশ দিচ্ছেন, তখন সেটি কোরআনকে ঐশ্বরিক উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে—এটি মানুষের কল্পনা-ফল হতে পারে না, বরং ঐক্যবদ্ধ নির্দেশনা। Sunnah.com
বাংলা অনুবাদ: “যে আল্লাহর কিতাব থেকে একটি হরফও পাঠ করে, তার জন্য তার দ্বারা একটি সদকা (সাওয়াব) আছে; এবং প্রতি সদকার গুণ দশ গুণ পর্যন্ত।” (বক্তব্যে স্পষ্ট করা হয়েছে—‘আলিফ-লাম-মীম’কে আলাদা অক্ষর হিসেবে গণ্য করা হয় না; প্রতিটি অক্ষরই আলাদা হয়ে পুরস্কৃত হবে।)
ব্যাখ্যা : এই হাদিস কোরআনের মর্যাদা ও ঐশ্বরিক উৎসকে অন্য এক প্রামাণিক দিক থেকে নিশ্চিত করে: কোরআনকে “কিতাব-ইল্লাহ” (আল্লাহর কিতাব) হিসেবে নির্দেশ করা হয়েছে—অর্থাৎ এটি আল্লাহর বক্তব্য, এবং কোরআন পাঠ করা বিনা প্রকার মানব-রচিত সাহিত্য পাঠের সমতুল্য নয়; বরং আল্লাহর বাণীর সঙ্গে জড়িত এবারের পুরস্কার। হাদিসটি নবী ও সাহাবাদের কথার মধ্যেই কোরআনকে আলাদা, পবিত্র ও আকাশীয় উৎস হিসেবে স্বীকার করে।
৩) «لَا تَكْتُبُوا عَنِّي غَيْرَ الْقُرْآنِ …» (নবী বলেছেন: আমার কথা ছাড়া আর কিছু লিখবে না)
আরবি (পূর্ণ হাদিস — সনদসহ): حَدَّثَنَا هَدَّابُ بْنُ خَالِدٍ الأَزْدِيُّ، حَدَّثَنَا هَمَّامٌ، عَنْ زَيْدِ بْنِ أَسْلَمَ، عَنْ عَطَاءِ بْنِ يَسَارٍ، عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ: «لاَ تَكْتُبُوا عَنِّي وَمَنْ كَتَبَ عَنِّي غَيْرَ الْقُرْآنِ فَلْيَمْحُهُ …» সনদ/সূত্র: রিয়ায়ত: আবু সাঈদ আল-খুদরী থেকে; গ্রন্থ: Ṣaḥīḥ Muslim 3004। Sunnah.com
বাংলা অনুবাদ: “আমার (নবীর) কথা মিশিয়ে লেখো না; যে আমার কথা লিখেছে (কিন্তু কোরআন ছাড়া), সে তা মুছিয়ে ফেলুক; এবং আমার কাছ থেকে কিছুও আড়ালে মিথ্যাবাদ করলে—তার অবস্থান জাহান্নামের হবে।”
ব্যাখ্যা : এই হাদিস দুটি বিষয় স্পষ্ট করে: (১) কোরআন ও নবীর বাক্যভাণ্ডার আলাদাভাবে বিবেচ্য — কোরআন ‘আল্লাহর কিতাব’, নবীর কথাবার্তা (সুন্নাহ) আলাদা; মুয়াহাদ্দিসগণও তাই সাজেস্ট করেছেন। (২) নবী সাহাবাদের মধ্যে কোরআনকে অন্য সব বক্তব্য থেকে আলাদা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন—এটি কোরআনের ঐশ্বরিকতা ও অনন্যতা রক্ষার একটি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ। অর্থাৎ নবী নিজে কোরআনকে আলাদা করে দেখিয়েছেন—এখানেই কোরআনকে আল্লাহর বক্তব্য হিসাবে স্বীকৃতি মেলে। Sunnah.com
সংক্ষিপ্ত লজিকাল সারমর্ম — কেন এই হাদিসগুলো মিলে কোরআনকে আল্লাহ্র বাণী প্রমাণ করে :
উপরে প্রদত্ত অনুচ্ছেদসমূহ—(ক) নবী নিজে কোরআনকে সর্বোচ্চ স্থান বলেছেন ও মানুষকে তাতে আঁকড়ে ধরে চলতে বলেছেন, (খ) কোরআনকে “কিতাব-ইল্লাহ” বলা হয়েছে (হাদিসে ও কোরআনে স্বয়ং), (গ) কোরআন পাঠ করা আল্লাহর কিতাব হিসাবে আলাদা পুরস্কার পাবে, ও (ঘ) নবী নিজে কোরান ও তাঁর বাক্য আলাদা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন—এসব মিলিয়ে স্পষ্ট হয় যে কোরআনকে ইসলামী ঐতিহ্যে আল্লাহ্র বাণী হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। এগুলো কেবল আলেমদের অনুমান নয়; প্রত্যক্ষ নবীর বাণী ও সাহাবিদের রিয়ায়ত-ই (চোখে দেখা ইতিহাস) এই মর্যাদা প্রদান করে। Sunnah.com+2Sunnah.com+2
নাস্তিক ও সমালোচক যারা বলে—“কোরআন মানুষ রচনা” — তাদের দাঁতভাঙা যুক্তিযুক্ত প্রতিউত্তর
ভাষাগত ও সাহিত্যিক ই’জাজ (বিমূর্ত অলৌকিকতা): কোরআনের আরবি ভাষা ও বর্ণনার এমন এক অনন্য স্তর ও সংহতি রয়েছে যা ৭ম শতাব্দীর আরব সাহিত্যে অনুকরণ করা প্রায় অসম্ভব বলে সমকালীন বিশ্লেষকরা স্বীকার করেছেন। কোরআন নিজেই চ্যালেঞ্জ করেছে—“আপনারা যদি সন্দেহ করেন, তাহলে এর মতো একটি সূরা সৃষ্টি করে আনো।” ইতিহাসে কেউ এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণে সফল হয়নি — এটাই ভাষাগত অলৌকিকতার প্রমাণ। (সূত্র: কোরআন 2:23; হাদিসে অনুরূপ চ্যালেঞ্জের উল্লেখ)। Sunnah.com+1
নবীর উম্মি অবস্থান : মুহাম্মদ ﷺ কে ঐতিহাসিকভাবে “উম্মি” বলা হয়েছে (যিনি দুনিয়ার প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী লেখাপড়া করেননি)। কীভাবে একজন উম্মি ব্যক্তি এমন ধারাবাহিক, বিষয়ভিত্তিক, স্বরূপগত ও গভীর গ্রন্থ রচনা করলেন—যদি তিনি একা লেখক হন? এর যুক্তি প্রাক-গতিশীল। (হাদিস ও ঐতিহাসিক বর্ণনা এ বিষয়ে স্বাধীন প্রমাণ দেয়)। Sunnah.com
সংরক্ষণ ও মৌখিক প্রচার (হিফজ) — ঐতিহাসিক বাস্তবতা: নবীর সময় থেকে হাফেজদের দ্বারা কোরআন মুখস্থ রাখা হয়েছে; উসমানী যুগে একধারায় মূসলিমদের মধ্যে কোরআন সংকলন ও প্রতিলিপি করা হয়; এরপর থেকে কোরআন-বিভিন্নতা (textual corruption) সম্পর্কিত ঐতিহাসিক কোনো গ্রহণযোগ্য দলিল পাওয়া যায় না। এই ধারাবাহিক সংরক্ষণ কেবল মানব-লিখনীয় গ্রন্থের ক্ষেত্রে বিরল—এটি কোরআনের অক্ষুন্নতার প্রমাণ। Sunnah.com
অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্য ও ভবিষ্যদ্বাণী: কোরআনে বহু পদক্ষেপে ঐতিহাসিক, বৈজ্ঞানিক ও প্রাকৃতিক বিষয়াবলী উল্লিখিত আছে—এগুলো প্রমাণ-স্বরূপ প্রস্তাব করা যায় (তবে বিজ্ঞান-কোরআন সম্পর্কিত বিতর্কে সাবধানতা নিয়ে বিশ্লেষণ দরকার)। একই সাথে, কোরআনের অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্যও মানব-রচিত গ্রন্থের ক্ষেত্রে বিরল। Sunnah.com
হাদিসগুলো নিজেই কোরআনকে আলাদা করেছে: উপরোক্ত হাদিসগুলো (উদাহরণ: “আমি তোমাদের মধ্যে দুটি ভারী বস্তু রেখে যাচ্ছি…”; “কোরআন ছাড়া আমার কথা লিখবে না”) স্পষ্টভাবে নবীর মুখেই কোরআনকে আলাদা স্থানে বসিয়ে দিয়েছে—অর্থাৎ নবীর কথাই বলে দেয় কোরআন আল্লাহর বাণী। হাদিস ও কোরআন একসঙ্গে এই সত্যটি প্রতিষ্ঠা করে। Sunnah.com+1
সুতরাং “কোরআন মানুষ রচিত” প্রচারণা হলো সাধারণত (ক) ভাষাগত/সাহিত্যিক বিশ্লেষণের অপর্যাপ্ততা, (খ) ইতিহাস-নাইভিটি, বা (গ) ধর্মীয় পক্ষপাতের ফলে জন্ম নেওয়া ব্যাখ্যার ফলাফল—কিন্তু উপরের ঐতিহ্যবদ্ধ, গ্রন্থ-ভিত্তিক ও ইতিহাস-সমর্থিত সুত্রগুলো এসব সন্দেহের বিরুদ্ধেই শক্ত প্রতিরোধ গড়ে দেয়।
কোরআন আল্লাহ তায়ালার বাণী — নাস্তিকদের ১০টি প্রচলিত প্রশ্ন ও ইসলামের প্রমাণভিত্তিক উত্তর
❓ ১. নাস্তিকদের দাবি:
“কোরআন তো মানুষের লেখা বই, মুহাম্মদ (সা.) নিজেই লিখেছেন।”
✅ উত্তর: কোরআন নবী মুহাম্মদ ﷺ নিজে লেখেননি; তিনি ছিলেন “উম্মি” (যিনি দুনিয়ার প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী লেখাপড়া করেননি) — কোনো শিক্ষক বা লেখাপড়ার অভিজ্ঞতা ছিল না (সূরা আল-আনকাবুত 29:48)। তবু তাঁর মুখ থেকে এমন এক সাহিত্যিক, বৈজ্ঞানিক ও আইনভিত্তিক গ্রন্থ এসেছে যা ১৪০০ বছর পরও অপরিবর্তিত। কোরআন নিজেই চ্যালেঞ্জ করেছে—
“যদি সন্দেহে থাকো, তবে এর মতো একটি সূরা রচনা করে আনো।” (সূরা আল-বাকারা 2:23) কেউ তা করতে পারেনি, আরবের শ্রেষ্ঠ কবিরাও ব্যর্থ। ইতিহাসে এমন উদাহরণ একটিও নেই।
❓ ২. নাস্তিকদের দাবি:
“কোরআনে অনেক বিরোধ আছে, তাই এটি আল্লাহর বাণী হতে পারে না।”
✅ উত্তর: আল্লাহ নিজেই বলেছেন—
“তারা কি কোরআন নিয়ে চিন্তা করে না? যদি এটি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছ থেকে হতো, তবে এতে অনেক বিরোধ পাওয়া যেত।” (সূরা আন-নিসা 4:82) ২৩ বছরে নানা পরিস্থিতিতে কোরআন নাজিল হয়েছে, কিন্তু একটি বিরোধও পাওয়া যায়নি। প্রতিটি আয়াত পরস্পরের ব্যাখ্যা দেয়, বিরোধ নয় — এটি ঐশী উৎসের প্রমাণ।
❓ ৩. নাস্তিকদের দাবি:
“কোরআন পুরনো আরবদের সংস্কৃতি ও গল্প।”
✅ উত্তর: কোরআনের গল্পগুলো ঐতিহাসিক, প্রতীকী নয়। এর মধ্যে বহু জাতির (নূহ, মূসা, ফেরাউন, আদ, সামূদ) ঘটনার উল্লেখ আছে — যেগুলোর প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পরে পাওয়া গেছে। এছাড়া কোরআনের বার্তা সার্বজনীন — আরব সংস্কৃতির সীমা ছাড়িয়ে মানবতার দিকনির্দেশনা দেয় (সূরা আল-আম্বিয়া 21:107)।
❓ ৪. নাস্তিকদের দাবি:
“বিজ্ঞান কোরআনের সঙ্গে মেলে না।”
✅ উত্তর: বরং বহু জায়গায় কোরআন এমন তথ্য দিয়েছে যা পরবর্তীকালে বিজ্ঞান দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে — যেমন:
ভ্রূণ গঠনের ধাপ (সূরা আল-মু’মিনূন 23:12–14)
মহাবিশ্বের প্রসারণ (সূরা আয-যারিয়াত 51:47)
পর্বতমালার ভূমির ভারসাম্য রক্ষা (সূরা আন-নাবা 78:6–7) এসব বক্তব্য নবী ﷺ-এর যুগে কেউ জানত না — যা প্রমাণ করে এটি মানুষের লেখা নয়।
❓ ৫. নাস্তিকদের দাবি:
“কোরআন পরিবর্তিত হয়েছে, মূল লেখা আর নেই।”
✅ উত্তর: এটি মিথ্যা ধারণা। কোরআন মুখস্থ ও লিখিত — দুইভাবে সংরক্ষিত একমাত্র ধর্মগ্রন্থ। হাজার হাজার সাহাবি কোরআন মুখস্থ করেছিলেন, খলিফা উসমান (রা.) একক সংকলিত কপি প্রেরণ করেন, যা আজও অপরিবর্তিত। ১৪০০ বছরে একটি অক্ষরও পরিবর্তিত হয়নি — এটি আল্লাহর প্রতিশ্রুতির পূর্ণতা:
“আমিই কোরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই একে সংরক্ষিত রাখব।” (সূরা আল-হিজর 15:9)
❓ ৬. নাস্তিকদের দাবি:
“মুহাম্মদ (সা.) হয়তো অন্য ধর্মগ্রন্থ থেকে নকল করেছেন।”
✅ উত্তর: নবী ﷺ ছিলেন নিরক্ষর, তাঁর সময়ে আরব অঞ্চলে বাইবেল বা তাওরাতের আরবি অনুবাদ ছিল না। তাছাড়া কোরআনের শিক্ষা পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থের ত্রুটি সংশোধন করে। কোরআনের ভাষা, শৈলী ও বার্তা সম্পূর্ণ ভিন্ন — এটি অনুলিপি নয়, বরং ঐশ্বরিক সংশোধন।
❓ ৭. নাস্তিকদের দাবি:
“কোরআনে সহিংসতা শেখানো হয়েছে।”
✅ উত্তর: কোরআনের যুদ্ধসংক্রান্ত আয়াতগুলো নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে—আত্মরক্ষার জন্য। কোরআন স্পষ্ট বলেছে:
“ধর্মে কোনো জবরদস্তি নেই।” (সূরা আল-বাকারা 2:256) “তোমরা ন্যায়ের সঙ্গে লড়ো, কিন্তু সীমা অতিক্রম করো না।” (সূরা আল-বাকারা 2:190) কোরআন শান্তি, ন্যায় ও মানবতার পক্ষে — সহিংসতা নয়।
❓ ৮. নাস্তিকদের দাবি:
“কোরআন শুধু ধর্মীয় কল্পকাহিনী, বাস্তব নয়।”
✅ উত্তর: কোরআন শুধু আধ্যাত্মিক গ্রন্থ নয় — এটি আইন, সমাজ, পরিবার, বিজ্ঞান ও মানবধর্মের পূর্ণ সংবিধান। এর নীতিগুলো আজও আধুনিক সমাজে প্রাসঙ্গিক। কল্পনা নয় — বাস্তব জীবনের নৈতিক দিশা।
❓ ৯. নাস্তিকদের দাবি:
“যদি কোরআন আল্লাহর বাণী হয়, তবে এর ভাষা সব মানুষের বোধগম্য কেন নয়?”
✅ উত্তর: আল্লাহ বলেন—
“আমি কোরআনকে সহজ করেছি স্মরণ ও বোঝার জন্য; কেউ কি শিক্ষা গ্রহণ করবে না?” (সূরা আল-কামার 54:17) কোরআন আরবিতে নাজিল হয়েছে কারণ নবীর জাতি ছিল আরব; কিন্তু বার্তাটি সার্বজনীন। আজ কোরআনের অনুবাদ পৃথিবীর সব প্রধান ভাষায় রয়েছে — তাই এর বার্তা সবার জন্যই সহজলভ্য।
❓ ১০. নাস্তিকদের দাবি:
“কোরআন অলৌকিক নয়, সাধারণ বইয়ের মতো।”
✅ উত্তর: কোরআনের অলৌকিকতা তিনভাবে প্রমাণিত:
ভাষাগত: এর ছন্দ, শৈলী ও শব্দ বিন্যাস মানব-অতিক্রমী।
অর্থগত: এতে এমন ভবিষ্যদ্বাণী ও গভীর যুক্তি আছে যা মানুষের জ্ঞানসীমার বাইরে।
ঐতিহাসিক: এটি ১৪০০ বছর ধরে অপরিবর্তিত, কোটি কোটি মানুষ মুখস্থ রেখেছে — পৃথিবীর অন্য কোনো বই এমন নয়।
এগুলো মিলিয়ে কোরআন কেবল একটি বই নয় — বরং আল্লাহর জীবন্ত বাণী।
🌟 সারসংক্ষেপ:
কোরআনকে “মানুষের লেখা” বলার দাবি যুক্তিহীন, ইতিহাসবিরুদ্ধ এবং প্রমাণহীন। বরং আল্লাহ তায়ালা নিজেই চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছেন — এবং ১৪ শতাব্দী ধরে কেউ সেই চ্যালেঞ্জ পূরণ করতে পারেনি। কোরআন অলৌকিক, সংরক্ষিত এবং নিখুঁত — এটাই প্রমাণ করে এটি একমাত্র আল্লাহ্ তায়ালার বাণী।
https://shorturl.fm/3at78
https://shorturl.fm/FUvZ4
https://shorturl.fm/LRVCs