ইসলামে জাতীয়তাবাদ (আসাবিয়্যাহ) : হাদিসের আলোকে বিশ্লেষণ
ভূমিকা
ইসলাম মানবজাতিকে বিভক্ত করার জন্য জাতি, বংশ বা ভূখণ্ডকে ভিত্তি করেনি; বরং ঈমান ও তাকওয়াকে একমাত্র মর্যাদার মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে। কিন্তু জাহেলি যুগের একটি মারাত্মক ব্যাধি ছিল জাতীয়তাবাদ ও গোত্রগত অহংকার (আসাবিয়্যাহ)—যা ইসলাম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। নিচে এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর চারটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস আলোচনা করা হলো।
জাতীয়তাবাদের দিকে আহ্বানকারী আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়

📜 আরবি হাদিস
عَنْ جُبَيْرِ بْنِ مُطْعِمٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ، قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ:
> لَيْسَ مِنَّا مَنْ دَعَا إِلَى عَصَبِيَّةٍ، وَلَيْسَ مِنَّا مَنْ قَاتَلَ عَلَى عَصَبِيَّةٍ، وَلَيْسَ مِنَّا مَنْ مَاتَ عَلَى عَصَبِيَّةٍ
বাংলা অনুবাদ
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়, যে জাতীয়তাবাদে আহ্বান করে; সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়, যে জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে যুদ্ধ করে; এবং সে ব্যক্তিও আমাদের দলভুক্ত নয়, যে জাতীয়তাবাদের ওপর মৃত্যুবরণ করে।”
ব্যাখ্যা
এই হাদিসে রাসূল ﷺ তিনটি স্তরে জাতীয়তাবাদকে প্রত্যাখ্যান করেছেন—আহ্বান, কর্ম ও পরিণতি। অর্থাৎ যে ব্যক্তি জাতি, বংশ বা গোষ্ঠীর নামে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে চায় সত্য–মিথ্যার বিচার ছাড়াই, সে ইসলামের আদর্শ থেকে বিচ্যুত। এখানে “لَيْسَ مِنَّا” বলার মাধ্যমে কাজটিকে মারাত্মক গুনাহ ও জাহেলিয়্যাতের বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
📚 রেফারেন্স: সুনান আবু দাউদ ৫১২১; মুসনাদ আহমাদ ১৬৮৬৩ (হাদিস: হাসান)
আসাবিয়্যাহর প্রকৃত সংজ্ঞা
📜 আরবি হাদিস
عَنْ وَاثِلَةَ بْنِ الْأَسْقَعِ قَالَ: قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ، مَا الْعَصَبِيَّةُ؟ قَالَ:
> أَنْ تُعِينَ قَوْمَكَ عَلَى الظُّلْمِ
বাংলা অনুবাদ
ওয়াসিলা ইবনুল আসকা (রাঃ) বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম: “হে আল্লাহর রাসূল! আসাবিয়্যাহ কী?” তিনি ﷺ বললেন—“নিজ জাতি বা গোষ্ঠীকে জুলুমের কাজে সাহায্য করাই আসাবিয়্যাহ।”
ব্যাখ্যা
এই হাদিসটি জাতীয়তাবাদের সঠিক সংজ্ঞা স্পষ্ট করে দিয়েছে। নিজের লোক ভুল করলেও তাকে সমর্থন করা, অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া কিংবা সত্যের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়াই হলো হারাম জাতীয়তাবাদ। সুতরাং ইসলাম জাতিগত ভালোবাসা নিষিদ্ধ করেনি; বরং অন্যায়ে পক্ষপাতিত্বকে নিষিদ্ধ করেছে।
📚 রেফারেন্স: সুনান আবু দাউদ ৫১১৯ (হাদিস: হাসান)
জাতীয়তাবাদের পতাকার নিচে যুদ্ধ = জাহেলিয়্যাতের মৃত্যু
📜 আরবি হাদিস
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ:
> مَنْ قَاتَلَ تَحْتَ رَايَةٍ عُمِّيَّةٍ، يَدْعُو عَصَبِيَّةً، أَوْ يَنْصُرُ عَصَبِيَّةً، فَقُتِلَ، فَقِتْلَتُهُ جَاهِلِيَّةٌ
বাংলা অনুবাদ
“যে ব্যক্তি অন্ধ পতাকার নিচে যুদ্ধ করে, জাতীয়তাবাদের আহ্বান জানায় বা জাতীয়তাবাদকে সমর্থন করে এবং সে নিহত হয়—তার মৃত্যু হবে জাহেলিয়্যাতের মৃত্যু।”
ব্যাখ্যা
এখানে “অন্ধ পতাকা” বলতে বোঝানো হয়েছে—যেখানে সত্য ও ন্যায়ের মানদণ্ড নেই, কেবল দলীয় বা জাতিগত স্বার্থই মুখ্য। এমন সংগ্রামে নিহত ব্যক্তির মৃত্যু ইসলামি শাহাদাত নয়; বরং জাহেলি যুগের ন্যায় করুণ পরিণতি।
📚 রেফারেন্স: সহিহ মুসলিম ১৮৫০
—
জাতীয়তাবাদ নিয়ে অহংকারকারীর বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি
📜 আরবি হাদিস
عَنْ أُبَيِّ بْنِ كَعْبٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ:
> مَنْ تَعَزَّى بِعَزَاءِ الْجَاهِلِيَّةِ فَأَعِضُّوهُ بِهَنِ أَبِيهِ وَلَا تَكْنُوا
বাংলা অনুবাদ
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“যে ব্যক্তি জাহেলিয়্যাতের জাতীয়তাবাদ নিয়ে অহংকার করে, তাকে বলো—সে যেন তার পিতার পুরুষাঙ্গ কামড়িয়ে দেয়; এবং এ ক্ষেত্রে তোমরা কোনো রূপক বা ভদ্রতা অবলম্বন করবে না।”
ব্যাখ্যা
এই হাদিসের ভাষা অত্যন্ত কঠোর ও ধাক্কামূলক। এর উদ্দেশ্য হলো—জাতীয়তাবাদী অহংকারকে ঘৃণ্য ও লজ্জাজনক হিসেবে সমাজের সামনে প্রকাশ করা। ইসলাম চায়, এ ধরনের জাহেলি মানসিকতা যেন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য না হয়। ভাষার কঠোরতা অপরাধের ভয়াবহতাকেই প্রকাশ করে।
📚 রেফারেন্স: মুসনাদ আহমাদ ২১২৪৯; সুনান তিরমিজি ৩৯৫৫
(ইমাম তিরমিজি: হাসান সহিহ, শাইখ আলবানী রহ.)
উপসংহার
ইসলাম মানবতার ধর্ম—যেখানে জাতি নয়, তাকওয়াই পরিচয়। যে জাতীয়তাবাদ মানুষকে জুলুমে ঠেলে দেয়, উম্মাহকে বিভক্ত করে এবং সত্যের বিরুদ্ধে দাঁড় করায়—তা ইসলাম স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।


Good