Islamic Life

    হযরত আদম (আঃ)কে আগে সৃষ্টি করা হয়েছে নাকি হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কে আগে সৃষ্টি করা হয়েছে

    হযরত আদম আলাইহিস সালামের সৃষ্টি

    হযরত আদম (আঃ)কে আগে সৃষ্টি করা হয়েছে নাকি হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কে আগে সৃষ্টি করা হয়েছে বিস্তারিত কোরআন এবং হাদিসের আলোকে বর্ণনা করা হলো, এবং হযরত আদম (আঃ)কে কিভাবে সৃষ্টি করা হয়েছেসৃষ্টি তথ্য বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।


    A. কোরআনের প্রধান আয়াতসমূহ


    1) সূরা আল-বাকারা — ২:৩০–৩৯

     ১️⃣ আদম (আঃ)-এর সৃষ্টি ও খলিফাতুল আরধ ঘোষণা (আয়াত ৩০)

    আল্লাহ তাআলা বলেন —

    ﴿وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً﴾
    “স্মরণ কর, যখন তোমার প্রতিপালক ফেরেশতাদের বললেন — আমি পৃথিবীতে  প্রতিনিধি (খলিফা) স্থাপন করতে যাচ্ছি।”

    এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের অবহিত করেন যে, তিনি পৃথিবীতে এমন এক সৃষ্টি করতে যাচ্ছেন, যে পৃথিবীতে আল্লাহর বিধান বাস্তবায়ন করবে এবং পরপর প্রজন্ম আসবে (খিলাফা মানে হলো প্রতিনিধিত্ব ও ধারাবাহিক শাসন)।
    ফেরেশতারা প্রশ্ন করেছিল, “আপনি কি সেখানে এমন কাউকে স্থাপন করবেন, যে সেখানে অশান্তি সৃষ্টি করবে ও রক্তপাত ঘটাবে?” — (আল-বাকারা: ৩০)
    তাদের এই প্রশ্ন আপত্তি ছিল না; বরং জ্ঞানার্জনের জন্য ছিল। ফেরেশতারা পূর্বে জিন জাতির কর্ম দেখেছিল, যারা রক্তপাত করেছিল; তাই তারা ধারণা করেছিল মানুষও একই কাজ করতে পারে।

    আল্লাহ তাআলা জবাব দিলেন — “আমি জানি যা তোমরা জানো না।” অর্থাৎ, মানুষের মধ্যে এমন এক গুণ ও জ্ঞান থাকবে যা ফেরেশতাদের নেই — যেমন বুদ্ধি, শিক্ষা গ্রহণের ক্ষমতা, দায়িত্ববোধ ও আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে শাসন করার যোগ্যতা।
    📚 রেফারেন্স: তাফসীর ইবন কাসীর (১/৯৪), তাফসীর আত-তাবারী (১/১৮৪)।


     ২️⃣ আদম (আঃ)-কে জ্ঞানদান (আয়াত ৩১–৩৩)

    ﴿وَعَلَّمَ آدَمَ الْأَسْمَاءَ كُلَّهَا﴾ — “আল্লাহ আদমকে সব কিছুর নাম শিখিয়ে দিলেন।”

    এখানে “الأسماء كلها” বলতে বস্তুসমূহের নাম, তাদের প্রকৃতি, উপকারিতা ও ব্যবহার বোঝানো হয়েছে। এটি মানুষের জ্ঞানার্জনের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করে।
    যখন আল্লাহ ফেরেশতাদের সামনে আদমের জ্ঞান উপস্থাপন করলেন, তখন ফেরেশতারা স্বীকার করল —

    ﴿سُبْحَانَكَ لَا عِلْمَ لَنَا إِلَّا مَا عَلَّمْتَنَا﴾
    “আপনি পবিত্র, আমরা কিছুই জানি না যা আপনি আমাদের শিখাননি।”

    এর দ্বারা বোঝা যায় — জ্ঞানের প্রকৃত উৎস আল্লাহ। এবং মানবজাতিকে জ্ঞানে শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হয়েছে, যা তাকে পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি হওয়ার যোগ্যতা দিয়েছে।
    📚 রেফারেন্স: তাফসীর ইবন কাসীর, আল-কুরতুবী, ফখরুদ্দীন আর-রাজী।


     ৩️⃣ ফেরেশতাদের সেজদা ও ইবলিসের অহংকার (আয়াত ৩৪)

    ﴿وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ﴾ — “আমি ফেরেশতাদের বললাম, আদমকে সেজদা করো।”

    এটি ইবাদতের সেজদা নয়; বরং সম্মান প্রদর্শনের জন্য সেজদা। সবাই সেজদা করল, কিন্তু ইবলিস অস্বীকার করল।
    ইবলিস ফেরেশতা ছিল না, বরং জিন জাতির অন্তর্ভুক্ত ছিল (সূরা আল-কাহফ ১৮:৫০)। সে অহংকার করে বলেছিল:

    “আমি আগুন থেকে সৃষ্টি, আর সে (আদম) মাটি থেকে।” — (সূরা আল-আ‘রাফ ৭:১২)

    এই অহংকারই ছিল তার কুফরির কারণ। এর মাধ্যমে শেখানো হয়েছে— গর্ব ও আত্মঅহংকার মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।
    📚 রেফারেন্স: ইবন কাসীর (১/১০০), তাফসীর আল-বাগাভী।


     ৪️⃣ জান্নাতে বসবাস ও নিষিদ্ধ বৃক্ষের ঘটনা (আয়াত ৩৫–৩৬)

    ﴿يَا آدَمُ اسْكُنْ أَنتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ﴾
    আল্লাহ আদম ও তার স্ত্রী হাওয়াকে জান্নাতে বসবাসের অনুমতি দিলেন। তারা জান্নাতে স্বাধীনভাবে সবকিছু উপভোগ করতে পারতেন, কেবল একটি গাছের ফল খেতে নিষেধ করা হয়েছিল।

    শয়তান তাদেরকে ধোঁকা দিয়ে নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়াল, ফলে তারা জান্নাত থেকে অবতীর্ণ হতে বাধ্য হল।
    আল্লাহ বললেন,

    ﴿اهْبِطُوا بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ﴾ — “তোমরা সবাই নেমে যাও, তোমরা একে অপরের শত্রু।”
    এটি মানুষের পার্থিব জীবনের সূচনা এবং মানবজীবনের পরীক্ষার শুরু নির্দেশ করে।

    📚 রেফারেন্স: তাফসীর আল-কুরতুবী (১/৩৪৭), ইবন কাসীর (১/১০৩)।


     ৫️⃣ আদম (আঃ)-এর তওবা ও আল্লাহর রহমত (আয়াত ৩৭)

    ﴿فَتَلَقَّىٰ آدَمُ مِن رَّبِّهِ كَلِمَاتٍ فَتَابَ عَلَيْهِ﴾
    “এরপর আদম তার প্রতিপালকের কাছ থেকে কয়েকটি কথা শিখে নিলেন, ফলে আল্লাহ তার তওবা কবুল করলেন।”

    এই “কয়েকটি কথা” সম্পর্কে অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, সেগুলো হলো —

    ﴿رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ﴾
    (“হে আমাদের রব! আমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছি, আপনি যদি ক্ষমা না করেন ও দয়া না করেন তবে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হব।” — সূরা আল-আ‘রাফ ৭:২৩)

    এর দ্বারা প্রমাণিত হয় — তওবা করলে আল্লাহ ক্ষমা করেন। তাঁর নাম “আত্তাওয়াবুর রাহীম” — তিনি বারবার ক্ষমা করেন, দয়া করেন।
    📚 রেফারেন্স: তাফসীর ইবন কাসীর (১/১০৫), আল-কুরতুবী।


     ৬️⃣ মানবজাতির পৃথিবীতে প্রেরণ ও হিদায়াত (আয়াত ৩৮–৩৯)

    ﴿فَإِمَّا يَأْتِيَنَّكُم مِّنِّي هُدًى فَمَن تَبِعَ هُدَايَ فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ﴾

    আল্লাহ বলেন, মানুষকে পৃথিবীতে প্রেরণ করা হলো, তবে একা ছেড়ে দেওয়া হলো না।
    তিনি প্রতিশ্রুতি দিলেন — যখনই আমার পক্ষ থেকে হিদায়াত (ওহি, নবী, কিতাব) আসবে,
    যে তা অনুসরণ করবে, তার জন্য থাকবে নিরাপত্তা, ভয় থাকবে না, দুঃখও থাকবে না।
    আর যারা অবিশ্বাস করবে ও মিথ্যা বলবে, তারা আগুনে চিরকাল থাকবে।

    এই আয়াতে আল্লাহ মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা, পরীক্ষা এবং পরকালীন পরিণতির সম্পূর্ণ নীতি ঘোষণা করেছেন।
    📚 রেফারেন্স: তাফসীর আস-সা‘দী, ইবন কাসীর, আল-কুরতুবী।


     সারসংক্ষেপ:

    এই আয়াতগুলোতে আল্লাহ তাআলা মানুষের সৃষ্টির উদ্দেশ্য, তাকে প্রদত্ত জ্ঞান, শয়তানের অহংকার, জান্নাত থেকে অবতরণ, তওবা ও দয়া, এবং পৃথিবীতে মানবজীবনের নীতি বর্ণনা করেছেন।
    এগুলো থেকে শিক্ষা পাওয়া যায়—

    1️⃣ মানুষকে আল্লাহ পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছেন, তাই তার দায়িত্ব আল্লাহর বিধান অনুযায়ী জীবনযাপন করা।
    2️⃣ জ্ঞানই মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের কারণ।
    3️⃣ অহংকার ধ্বংস ডেকে আনে।
    4️⃣ তওবা আল্লাহর রহমতের দরজা খুলে দেয়।
    5️⃣ আল্লাহর হিদায়াতই নিরাপত্তা ও মুক্তির একমাত্র পথ।

    📚 মূল রেফারেন্সসমূহ:

    • تفسير ابن كثير (দারুস সালাম সংস্করণ, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৯৪–১০৮)

    • تفسير الطبري (খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৮৩–১৯২)

    • تفسير القرطبي (খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৪০–৩৫৫)

    • تفسير السعدي (পৃষ্ঠা ৪৫–৫০)


    2) সূরা আল-আরাফ — ৭:১১–২৫

     আরবি আয়াতসমূহ:

    وَلَقَدْ خَلَقْنَاكُمْ ثُمَّ صَوَّرْنَاكُمْ ثُمَّ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ لَمْ يَكُنْ مِنَ السَّاجِدِينَ ۝ قَالَ مَا مَنَعَكَ أَلَّا تَسْجُدَ إِذْ أَمَرْتُكَ ۝ قَالَ أَنَا خَيْرٌ مِّنْهُ خَلَقْتَنِي مِن نَّارٍ وَخَلَقْتَهُ مِن طِينٍ ۝ قَالَ فَاهْبِطْ مِنْهَا فَمَا يَكُونُ لَكَ أَن تَتَكَبَّرَ فِيهَا فَاخْرُجْ إِنَّكَ مِنَ الصَّاغِرِينَ ۝ قَالَ أَنظِرْنِي إِلَىٰ يَوْمِ يُبْعَثُونَ ۝ قَالَ إِنَّكَ مِنَ الْمُنظَرِينَ ۝ قَالَ فَبِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأَقْعُدَنَّ لَهُمْ صِرَاطَكَ الْمُسْتَقِيمَ ۝ ثُمَّ لَآتِيَنَّهُم مِّن بَيْنِ أَيْدِيهِمْ وَمِنْ خَلْفِهِمْ وَعَنْ أَيْمَانِهِمْ وَعَن شَمَائِلِهِمْ وَلَا تَجِدُ أَكْثَرَهُمْ شَاكِرِينَ ۝ قَالَ اخْرُجْ مِنْهَا مَذْءُومًا مَّدْحُورًا ۖ لَّمَن تَبِعَكَ مِنْهُمْ لَأَمْلَأَنَّ جَهَنَّمَ مِنكُمْ أَجْمَعِينَ ۝ وَيَا آدَمُ اسْكُنْ أَنتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ فَكُلَا مِنْ حَيْثُ شِئْتُمَا وَلَا تَقْرَبَا هَـٰذِهِ الشَّجَرَةَ فَتَكُونَا مِنَ الظَّالِمِينَ ۝ فَوَسْوَسَ لَهُمَا الشَّيْطَانُ لِيُبْدِيَ لَهُمَا مَا وُورِيَ عَنْهُمَا مِن سَوْآتِهِمَا وَقَالَ مَا نَهَاكُمَا رَبُّكُمَا عَنْ هَـٰذِهِ الشَّجَرَةِ إِلَّا أَن تَكُونَا مَلَكَيْنِ أَوْ تَكُونَا مِنَ الْخَالِدِينَ ۝ وَقَاسَمَهُمَا إِنِّي لَكُمَا لَمِنَ النَّاصِحِينَ ۝ فَدَلَّاهُمَا بِغُرُورٍ ۚ فَلَمَّا ذَاقَا الشَّجَرَةَ بَدَتْ لَهُمَا سَوْآتُهُمَا وَطَفِقَا يَخْصِفَانِ عَلَيْهِمَا مِن وَرَقِ الْجَنَّةِ ۚ وَنَادَاهُمَا رَبُّهُمَا أَلَمْ أَنْهَكُمَا عَن تِلْكُمَا الشَّجَرَةِ وَأَقُلْ لَكُمَا إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمَا عَدُوٌّ مُّبِينٌ ۝ قَالَا رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ ۝ قَالَ اهْبِطُوا بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ ۖ وَلَكُمْ فِي الْأَرْضِ مُسْتَقَرٌّ وَمَتَاعٌ إِلَىٰ حِينٍ ۝ قَالَ فِيهَا تَحْيَوْنَ وَفِيهَا تَمُوتُونَ وَمِنْهَا تُخْرَجُونَ ۝


    📖 বাংলা অনুবাদ (সংক্ষিপ্তভাবে):

    “নিশ্চয়ই আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি, তারপর তোমাদের রূপ দান করেছি; অতঃপর ফেরেশতাদের বলেছি—আদমকে সেজদা কর। তারা সেজদা করল, ইবলিস ব্যতীত। সে সেজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হল না। আমি বললাম, ‘তোমাকে কে বাধা দিল যে তুমি সেজদা করলে না, যখন আমি তোমাকে আদেশ করেছিলাম?’ সে বলল, ‘আমি তার চেয়ে উত্তম; তুমি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছ, আর তাকে সৃষ্টি করেছ মাটি থেকে।’ আমি বললাম, ‘তুমি এখান থেকে নেমে যাও; এখানে তোমার গর্ব প্রদর্শনের অধিকার নেই; বের হয়ে যাও, তুমি লাঞ্ছিত।’ সে বলল, ‘আমাকে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত অবকাশ দাও।’ আমি বললাম, ‘তুমি অবকাশপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত।’ সে বলল, ‘যেহেতু তুমি আমাকে বিভ্রান্ত করেছ, আমি অবশ্যই তোর সরল পথে তাদের জন্য ওত পেতে বসব। তাদের সামনে, পেছনে, ডান ও বাম দিক থেকে আসব এবং তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাব না।’ আল্লাহ বললেন, ‘বের হয়ে যাও এখান থেকে নিন্দিত ও তাড়িত হয়ে; যারা তোমার অনুসারী হবে, আমি তোমাদের সকলকে জাহান্নাম দিয়ে পূর্ণ করব।’ এবং (বললেন), ‘হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে অবস্থান কর এবং যেখান থেকে ইচ্ছা খাও, কিন্তু এই গাছের কাছে যেও না, অন্যথায় তোমরা অন্যায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ তখন শয়তান তাদের প্রতারণা করল, যাতে তাদের লজ্জাস্থান তাদের কাছে প্রকাশিত হয়। সে বলল, ‘তোমাদের প্রতিপালক এই গাছ হতে তোমাদের বিরত করেননি, শুধু এ কারণে যে, তোমরা যেন ফেরেশতা না হয়ে যাও অথবা চিরজীবী না হয়ে যাও।’ সে তাদের শপথ করে বলল, ‘আমি তোমাদের প্রকৃত শুভাকাঙ্ক্ষী।’ অতঃপর সে প্রতারণার মাধ্যমে তাদের বিভ্রান্ত করল; যখন তারা গাছের ফল আস্বাদন করল, তখন তাদের লজ্জাস্থান প্রকাশিত হল এবং তারা জান্নাতের পাতা দিয়ে নিজেদের ঢাকতে লাগল। তাদের প্রতিপালক তাদের ডেকে বললেন, ‘আমি কি তোমাদের ওই গাছ হতে নিষেধ করিনি এবং বলিনি যে শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু?’ তারা বলল, ‘হে আমাদের প্রভু! আমরা নিজেদের প্রতি অন্যায় করেছি। তুমি যদি আমাদের ক্ষমা না করো এবং দয়া না করো, তবে আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।’ আল্লাহ বললেন, ‘তোমরা নেমে যাও; তোমরা একে অপরের শত্রু। তোমাদের জন্য পৃথিবীতে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বাসস্থান ও উপকরণ থাকবে।’ তিনি বললেন, ‘তোমরা সেখানে জীবনযাপন করবে, সেখানে মৃত্যু বরণ করবে এবং সেখান থেকে পুনরুত্থিত হবে।’”
    (সূরা আল-আরাফ ৭:১১–২৫)


    📘 তাফসীর ও ব্যাখ্যা (রেফারেন্সসহ):

    এই আয়াতসমূহে মানব সৃষ্টির সূচনা, আদম (আঃ)-এর সম্মান, ইবলিসের অবাধ্যতা, মানবজাতির পরীক্ষার সূচনা এবং পৃথিবীতে অবতরণ—এই কয়েকটি মূল বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।

    ১. আদম (আঃ)-এর সৃষ্টি ও সম্মান:
    আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টি করে তাকে এক বিশেষ রূপ দিয়েছেন—“ثُمَّ صَوَّرْنَاكُمْ”—অর্থাৎ আকৃতি দান করেছেন। তারপর ফেরেশতাদের আদেশ করা হলো আদম (আঃ)-কে সেজদা করতে। এটি ইবাদতের সেজদা নয়, বরং সম্মানসূচক সেজদা ছিল (তাফসীর ইবন কাসীর, ২/২৫৬)। সকল ফেরেশতা আদেশ পালন করলেও ইবলিস অহংকার করে অমান্য করে। সে মনে করল, আগুন মাটির চেয়ে উত্তম—এটি তার ভুল ধারণা, যা তাকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যায়।

    ২. ইবলিসের অহংকার ও অবাধ্যতা:
    ইবলিস বলল: “أَنَا خَيْرٌ مِّنْهُ”—“আমি তার চেয়ে উত্তম।” (তাফসীর তাবারী, খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ২৩)। এখানে তার গর্ব ও অহংকার ফুটে ওঠে। আল্লাহ তাকে জান্নাত থেকে বহিষ্কার করে দিলেন—“فَاخْرُجْ إِنَّكَ مِنَ الصَّاغِرِينَ”—অর্থাৎ “তুমি লাঞ্ছিতদের অন্তর্ভুক্ত।” এই ঘটনাই প্রথম অবাধ্যতার ইতিহাস এবং অহংকারের পরিণতি।

    ৩. শয়তানের প্রতিজ্ঞা ও মানব পরীক্ষা:
    ইবলিস আল্লাহর কাছে অবকাশ চায় এবং প্রতিজ্ঞা করে যে, সে মানুষকে প্রতারণা করবে—“لَآتِيَنَّهُم مِّن بَيْنِ أَيْدِيهِمْ …”—সে সব দিক থেকে আক্রমণ করবে। তাফসীর কুরতুবীতে (৭/২২৪) বলা হয়েছে, “সামনে থেকে” অর্থাৎ দুনিয়ার মোহে, “পেছন থেকে” অর্থাৎ আখেরাত ভুলিয়ে, “ডান দিক থেকে” অর্থাৎ সৎকর্মে বাধা দিয়ে, “বাম দিক থেকে” অর্থাৎ পাপে প্ররোচিত করে—এভাবে সে মানুষকে বিপথে নিতে চায়।

    ৪. আদম (আঃ) ও হাওয়া (আঃ)-এর পরীক্ষাঃ
    আল্লাহ তাআলা আদম ও তার স্ত্রীকে জান্নাতে স্থাপন করেন, কিন্তু একটি গাছ থেকে বিরত থাকতে আদেশ দেন। শয়তান প্রতারণা করে তাদের সেই নিষিদ্ধ গাছের ফল খেতে প্ররোচিত করে। তারা খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই লজ্জাস্থান প্রকাশিত হয়, যা মানুষের প্রথম লজ্জাবোধের সূচনা।

    ৫. তওবা ও ক্ষমা:
    আদম ও হাওয়া অনুতপ্ত হয়ে বলেন:

    رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا…
    “হে আমাদের প্রভু! আমরা নিজেদের প্রতি অন্যায় করেছি…”
    এই দোয়া আল্লাহ গ্রহণ করেন এবং তাঁদের ক্ষমা করেন। (তাফসীর ইবন কাসীর, ২/২৫৯)

    ৬. পৃথিবীতে অবতরণ ও মানব জীবনের সূচনা:
    আল্লাহ বলেন, “তোমরা একে অপরের শত্রু হিসেবে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হও।” (৭:২৪) অর্থাৎ মানুষ ও শয়তানের মধ্যে চিরকাল দ্বন্দ্ব থাকবে। পৃথিবীতে জীবন, মৃত্যু এবং পুনরুত্থানের ঘোষণা এখানেই দেওয়া হয়েছে।


    📚 প্রধান রেফারেন্সসমূহ:

    • তাফসীর ইবন কাসীর, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৫৬–২৬০

    • তাফসীর আত-তাবারী, খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ২৩–৩১

    • তাফসীর আল-কুরতুবী, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ২২০–২৩০

    • আল-জামি’ লি আহকামিল কুরআন (ইমাম কুরতুবী)

    • সাহীহ আল-বুখারী, হাদীস: ৩২২৬;

    • সাহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৬১১


    3)🌺 সূরা আল-হিজর — আয়াত ২৬–৪৪

     আরবি আয়াতসমূহ (প্রধান অংশ):

    وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ مِن صَلْصَالٍ مِّنْ حَمَإٍ مَّسْنُونٍ ۝ وَالْجَانَّ خَلَقْنَاهُ مِن قَبْلُ مِن نَّارِ السَّمُومِ ۝ وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي خَالِقٌ بَشَرًا مِّن صَلْصَالٍ مِّنْ حَمَإٍ مَّسْنُونٍ ۝ فَإِذَا سَوَّيْتُهُ وَنَفَخْتُ فِيهِ مِن رُّوحِي فَقَعُوا لَهُ سَاجِدِينَ ۝ فَسَجَدَ الْمَلَائِكَةُ كُلُّهُمْ أَجْمَعُونَ ۝ إِلَّا إِبْلِيسَ أَبَىٰ أَن يَكُونَ مَعَ السَّاجِدِينَ ۝ قَالَ يَا إِبْلِيسُ مَا لَكَ أَلَّا تَكُونَ مَعَ السَّاجِدِينَ ۝ قَالَ لَمْ أَكُن لِأَسْجُدَ لِبَشَرٍ خَلَقْتَهُ مِن صَلْصَالٍ مِّنْ حَمَإٍ مَّسْنُونٍ ۝ قَالَ فَاخْرُجْ مِنْهَا فَإِنَّكَ رَجِيمٌ ۝ وَإِنَّ عَلَيْكَ اللَّعْنَةَ إِلَىٰ يَوْمِ الدِّينِ ۝ قَالَ رَبِّ فَأَنظِرْنِي إِلَىٰ يَوْمِ يُبْعَثُونَ ۝ قَالَ فَإِنَّكَ مِنَ الْمُنظَرِينَ ۝ إِلَىٰ يَوْمِ الْوَقْتِ الْمَعْلُومِ ۝ قَالَ رَبِّ بِمَا أَغْوَيْتَنِي لَأُزَيِّنَنَّ لَهُمْ فِي الْأَرْضِ وَلَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ ۝ إِلَّا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِينَ ۝ قَالَ هَٰذَا صِرَاطٌ عَلَيَّ مُسْتَقِيمٌ ۝ إِنَّ عِبَادِي لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطَانٌ إِلَّا مَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْغَاوِينَ ۝ وَإِنَّ جَهَنَّمَ لَمَوْعِدُهُمْ أَجْمَعِينَ ۝ لَهَا سَبْعَةُ أَبْوَابٍ لِكُلِّ بَابٍ مِّنْهُمْ جُزْءٌ مَّقْسُومٌ ۝
    (সূরা আল-হিজর ১৫:২৬–৪৪)


    📖 বাংলা অনুবাদ (সংক্ষিপ্তভাবে):

    “নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি শুকনো মাটি থেকে, যা ছিল দুর্গন্ধযুক্ত কাঁদা মাটির মতো। আর জিন জাতিকে আমি সৃষ্টি করেছি তারও আগে, জ্বলন্ত আগুন থেকে। যখন তোমার প্রতিপালক ফেরেশতাদের বললেন, ‘আমি সৃষ্টি করতে যাচ্ছি এক মানুষকে শুকনো কাঁদামাটি থেকে; অতঃপর যখন আমি তাকে যথাযথ রূপে গঠন করব এবং তাতে আমার রূহ ফুঁকে দেব, তখন তোমরা সবাই তার সামনে সেজদায় পতিত হও।’ তখন সমস্ত ফেরেশতা সেজদা করল, ইবলিস ছাড়া—সে সেজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হল না।

    আল্লাহ বললেন, ‘হে ইবলিস! তুমি সেজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হলে না কেন?’ সে বলল, ‘আমি এমন এক মানুষকে সেজদা করব না, যাকে তুমি শুকনো দুর্গন্ধযুক্ত কাঁদা মাটি থেকে সৃষ্টি করেছ।’ আল্লাহ বললেন, ‘তুমি এখান থেকে বের হয়ে যাও, তুমি অভিশপ্ত; এবং তোমার উপর থাকবে লা‘নত কিয়ামতের দিন পর্যন্ত।’

    ইবলিস বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে অবকাশ দাও পুনরুত্থানের দিন পর্যন্ত।’ আল্লাহ বললেন, ‘তুমি অবকাশপ্রাপ্ত, এক নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত।’

    সে বলল, ‘হে আমার প্রভু! যেহেতু তুমি আমাকে বিভ্রান্ত করেছ, আমি অবশ্যই তাদের জন্য পৃথিবীতে সুন্দর করে সাজিয়ে দেব এবং তাদের সবাইকে বিভ্রান্ত করব—তোমার সেই বান্দাদের বাদে, যারা তোমার নিকট নিবেদিত।’ আল্লাহ বললেন, ‘এটাই আমার সরল পথ—আমার দায়িত্বে সুরক্ষিত পথ। আমার বান্দাদের উপর তোমার কোনো ক্ষমতা নেই, শুধুমাত্র যারা তোমার অনুসরণ করবে তারা ব্যতীত।’

    নিশ্চয়ই জাহান্নাম তাদের সকলের প্রতিশ্রুত স্থান। তার সাতটি দরজা থাকবে, এবং প্রতিটি দরজার জন্য নির্দিষ্ট একটি দল নির্ধারিত।”
    (সূরা আল-হিজর ১৫:২৬–৪৪)


    📘 তাফসীর ও ব্যাখ্যা (রেফারেন্সসহ):

    এই আয়াতসমূহে মানব ও জিন জাতির সৃষ্টি, ইবলিসের অহংকার, আদম (আঃ)-এর সম্মান, শয়তানের প্রতিশ্রুতি, এবং জাহান্নামের বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।


    ১️⃣ মানুষের সৃষ্টি ও তার উপাদান:

    আল্লাহ বলেন—

    “وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ مِن صَلْصَالٍ مِّنْ حَمَإٍ مَّسْنُونٍ”
    অর্থাৎ, “আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি শুকনো কাঁদা মাটি থেকে।”
    তাফসীর ইবন কাসীরে (খণ্ড ৩, পৃ. ১১০) বর্ণিত, “صلصال” অর্থ এমন শুকনো মাটি, যা বাজালে শব্দ করে, এবং “حمإٍ مسنونٍ” অর্থ এমন কাঁদা যা কিছুদিন রেখে দিলে দুর্গন্ধ ছড়ায়। অর্থাৎ, মানুষের মূল উপাদান ছিল গঠনপ্রাপ্ত ও পরিশোধিত কাঁদা মাটি।


    ২️⃣ জিন জাতির সৃষ্টি:

    “وَالْجَانَّ خَلَقْنَاهُ مِن قَبْلُ مِن نَّارِ السَّمُومِ”
    অর্থাৎ, “জিন জাতিকে আমি তার আগে সৃষ্টি করেছি প্রবল অগ্নিশিখা থেকে।”
    তাফসীর কুরতুবী (খণ্ড ১০, পৃ. ৩৮) ব্যাখ্যা করেন, এখানে “نَارِ السَّمُومِ” দ্বারা বোঝানো হয়েছে এক ধরনের আগুন যা ধোঁয়াবিহীন এবং প্রবল তাপযুক্ত। ইবলিস এই জিন জাতির অন্তর্ভুক্ত ছিল।


    ৩️⃣ আদম (আঃ)-এর প্রতি সেজদার আদেশ:

    আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের বললেন, যখন আমি তাকে সম্পূর্ণ রূপে গঠন করব ও আমার রূহ ফুঁকে দেব, তখন তোমরা সেজদা করবে।
    তাফসীর আত-তাবারী (খণ্ড ১৪, পৃ. ১২৫) অনুসারে, এখানে “রূহ” বলতে আল্লাহর সৃষ্টি করা এক বিশেষ জীবনশক্তি, যা মানুষের মাঝে জ্ঞান, বুদ্ধি ও আত্মসচেতনতা এনে দেয়।


    ৪️⃣ ইবলিসের অহংকার ও পতন:

    যখন সকল ফেরেশতা সেজদা করল, ইবলিস তা অস্বীকার করল। সে বলল—

    “أَنَا خَيْرٌ مِّنْهُ خَلَقْتَنِي مِن نَّارٍ وَخَلَقْتَهُ مِن طِينٍ”
    অর্থাৎ, “আমি তার চেয়ে উত্তম; তুমি আমাকে আগুন থেকে, আর তাকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছ।”
    এটি তার অহংকারের প্রকাশ, যা তাকে চিরকালীন অভিশাপে নিমজ্জিত করল।
    তাফসীর ইবন কাসীর বলেন—“এটাই ইতিহাসে প্রথম অহংকারের অপরাধ, যার পরিণতি হলো লা‘নত।”


    ৫️⃣ ইবলিসের অবকাশ প্রার্থনা ও মানবের প্রতি প্রতিজ্ঞা:

    ইবলিস বলল, ‘আমাকে কিয়ামত পর্যন্ত অবকাশ দাও।’ আল্লাহ বললেন, ‘তোমাকে অবকাশ দেয়া হলো এক নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত।’
    এরপর সে শপথ করে বলে—

    “لَأُزَيِّنَنَّ لَهُمْ فِي الْأَرْضِ” — “আমি অবশ্যই দুনিয়াকে তাদের কাছে শোভন করে দেখাবো।”
    তাফসীর কুরতুবীতে বলা হয়েছে, “এটি হলো শয়তানের প্রতিশ্রুতি—মানুষকে গুনাহের পথে আকৃষ্ট করা।”

    কিন্তু আল্লাহ ঘোষণা করলেন—

    “إِنَّ عِبَادِي لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطَانٌ”
    অর্থাৎ, “আমার বান্দাদের উপর তোমার কোনো কর্তৃত্ব নেই।”
    এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর মুত্তাকী বান্দাদের জন্য এক বিশেষ নিরাপত্তার ঘোষণা।


    ৬️⃣ জাহান্নামের বিবরণ:

    শেষে আল্লাহ বলেন—

    “وَإِنَّ جَهَنَّمَ لَمَوْعِدُهُمْ أَجْمَعِينَ لَهَا سَبْعَةُ أَبْوَابٍ”
    অর্থাৎ, “নিশ্চয়ই জাহান্নামই তাদের প্রতিশ্রুত স্থান; এর সাতটি দরজা আছে, প্রতিটি দরজার জন্য নির্দিষ্ট একটি দল নির্ধারিত।”
    তাফসীর ইবন কাসীর ও তাবারীতে উল্লেখ আছে—এই সাত দরজা বিভিন্ন পাপীদের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে (যেমন: মুশরিক, মুনাফিক, কাফির, অহংকারী ইত্যাদি)।


    📚 রেফারেন্সসমূহ:

    1. তাফসীর ইবন কাসীর, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১০৮–১১৪

    2. তাফসীর আত-তাবারী, খণ্ড ১৪, পৃষ্ঠা ১২০–১৩০

    3. তাফসীর আল-কুরতুবী, খণ্ড ১০, পৃষ্ঠা ৩৮–৪৫

    4. আল-জামি‘ লি আহকামিল কুরআন, ইমাম কুরতুবী

    5. সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৬১১ — (ইবলিসের অহংকার সংক্রান্ত)

    6. সহীহ আল-বুখারী, হাদীস: ৩২২৭


    🌼 সারসংক্ষেপ:

    এই আয়াতসমূহে আল্লাহ তাআলা মানব সৃষ্টির মূল উৎস ও উদ্দেশ্য তুলে ধরেছেন। মানুষ মাটির সৃষ্টি—নম্র ও বিনীত। ইবলিস আগুনের সৃষ্টি হলেও তার অহংকার তাকে ধ্বংসে নিয়ে গেছে। আল্লাহর পরীক্ষামূলক দুনিয়া হলো সেই ক্ষেত্র, যেখানে শয়তান মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহর খাঁটি বান্দারা সবসময় তাঁর সুরক্ষায় থাকে। জাহান্নামের সাত দরজা পাপীদের জন্য সতর্কবাণীস্বরূপ, যেন মানুষ অহংকার ও গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে।


    4) সূরা সাদ — ৩৮:৭১–৮৫

     আরবি আয়াত:

    ﴿إِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي خَالِقٌ بَشَرًا مِن طِينٍ ۝ فَإِذَا سَوَّيْتُهُ وَنَفَخْتُ فِيهِ مِن رُوحِي فَقَعُوا لَهُ سَاجِدِينَ ۝ فَسَجَدَ الْمَلَائِكَةُ كُلُّهُمْ أَجْمَعُونَ ۝ إِلَّا إِبْلِيسَ اسْتَكْبَرَ وَكَانَ مِنَ الْكَافِرِينَ ۝ قَالَ يَا إِبْلِيسُ مَا مَنَعَكَ أَنْ تَسْجُدَ لِمَا خَلَقْتُ بِيَدَيَّ ۖ أَسْتَكْبَرْتَ أَمْ كُنتَ مِنَ الْعَالِينَ ۝ قَالَ أَنَا خَيْرٌ مِّنْهُ خَلَقْتَنِي مِن نَّارٍ وَخَلَقْتَهُ مِن طِينٍ ۝ قَالَ فَاخْرُجْ مِنْهَا فَإِنَّكَ رَجِيمٌ ۝ وَإِنَّ عَلَيْكَ لَعْنَتِي إِلَىٰ يَوْمِ الدِّينِ ۝ قَالَ رَبِّ فَأَنظِرْنِي إِلَىٰ يَوْمِ يُبْعَثُونَ ۝ قَالَ فَإِنَّكَ مِنَ الْمُنظَرِينَ ۝ إِلَىٰ يَوْمِ الْوَقْتِ الْمَعْلُومِ ۝ قَالَ فَبِعِزَّتِكَ لَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ ۝ إِلَّا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِينَ ۝ قَالَ فَالْحَقُّ وَالْحَقَّ أَقُولُ ۝ لَأَمْلَأَنَّ جَهَنَّمَ مِنكَ وَمِمَّن تَبِعَكَ مِنْهُمْ أَجْمَعِينَ﴾
    (সূরা সাদ: ৭১–৮৫)


    📖 বাংলা অনুবাদ:

    (স্মরণ কর) যখন তোমার প্রতিপালক ফেরেশতাদের বললেন, “আমি মাটি থেকে মানুষ সৃষ্টি করতে যাচ্ছি। অতঃপর আমি যখন তাকে পূর্ণ রূপে তৈরি করব এবং তাতে আমার রূহ (আত্মা) ফুঁকে দেব, তখন তোমরা তার সামনে সেজদায় লুটিয়ে পড়বে।” তখন সব ফেরেশতা সেজদায় লুটিয়ে পড়ল, ইবলিস ছাড়া। সে অহংকার করল এবং কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত হল।
    (আল্লাহ বললেন:) “হে ইবলিস! আমি যা নিজ হাতে সৃষ্টি করেছি, তাকে সেজদা করা থেকে কী তোমাকে বিরত রাখল? তুমি কি অহংকারী হয়েছ, না তুমি উচ্চ মর্যাদারদের একজন?”
    সে বলল, “আমি তার চেয়ে উত্তম। আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন, আর তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে।”
    আল্লাহ বললেন, “তুমি এখান থেকে বের হয়ে যাও; নিশ্চয়ই তুমি অভিশপ্ত। এবং তোমার উপর আমার অভিশাপ থাকবে বিচার দিবস পর্যন্ত।”
    সে বলল, “হে আমার রব! আমাকে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত অবকাশ দিন।”
    আল্লাহ বললেন, “তুমি সেই পর্যন্ত অবকাশপ্রাপ্ত হলো—এক নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত।”
    ইবলিস বলল, “তোমার মহিমার শপথ! আমি অবশ্যই তাদের সবাইকে বিপথগামী করব, তবে তোমার সেই বান্দাদের বাদে, যারা একান্তভাবে তোমার অনুগত।”
    আল্লাহ বললেন, “সত্য কথা—আমি সত্যই বলি—আমি অবশ্যই জাহান্নাম পূর্ণ করব তোমার ও তোমার অনুসারীদের দ্বারা।”


    📚 তাফসীর ব্যাখ্যা (সূরা সাদ ৩৮:৭১–৮৫):

    এই আয়াতসমূহে আদম (আঃ)-এর সৃষ্টি, ফেরেশতাদের সেজদা, ইবলিসের অহংকার ও তার অভিশপ্ত হওয়ার ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে।

    আল্লাহ তা‘আলা ফেরেশতাদের উদ্দেশে ঘোষণা করেন যে, তিনি “বাশার” অর্থাৎ মাটির তৈরি এক প্রাণী সৃষ্টি করবেন (তাফসীর ইবন কাসীর, সূরা সাদ ৩৮:৭১)।
    مِن طِينٍ” (মাটি থেকে) — এখানে বোঝানো হয়েছে যে, আদম (আঃ)-এর সৃষ্টি হয়েছে শুকনো, পরিবর্তিত মাটি থেকে, যেমন অন্য আয়াতে আছে— “صَلْصَالٍ مِّنْ حَمَإٍ مَّسْنُونٍ” (সূরা হিজর ১৫:২৬)।

    এরপর আল্লাহ বলেন, “فَإِذَا سَوَّيْتُهُ وَنَفَخْتُ فِيهِ مِن رُوحِي” — অর্থাৎ যখন আমি তাকে পূর্ণরূপে সৃষ্টি করব ও তাতে আমার ‘রূহ’ ফুঁকব, তখন তোমরা তার সামনে সেজদা করবে। এখানে “রূহ” দ্বারা বোঝানো হয়েছে — আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত জীবনশক্তি, তাঁর সৃষ্টি “আল্লাহর রূহ” নয় (তাফসীর আত-তাবারী, ৩৮:৭২)।

    সব ফেরেশতা আদেশমতো সেজদা করলেন — এটি ছিল আদম (আঃ)-এর প্রতি শ্রদ্ধা ও আল্লাহর আদেশ মানার প্রকাশ, উপাসনা নয় (ইবন কাসীর, ৩৮:৭৩)।
    কিন্তু ইবলিস — যে মূলত জিন জাতির অন্তর্ভুক্ত (সূরা কাহফ ১৮:৫০) — সে অহংকার করল এবং বলল, “আমি আগুন থেকে সৃষ্টি, আর আদম মাটি থেকে।” অর্থাৎ সে মনে করল আগুন শ্রেষ্ঠ, অথচ মাটি ধৈর্য, নম্রতা ও স্থিরতার প্রতীক। তাই ইবলিসের যুক্তি ভিত্তিহীন ছিল (তাফসীর কুরতুবী, ৩৮:৭৬)।

    আল্লাহ তা‘আলা ইবলিসকে অভিশপ্ত করলেন এবং কিয়ামত পর্যন্ত তাকে অবকাশ দিলেন—এটি আল্লাহর ইচ্ছার অংশ, যাতে কিয়ামতের আগে পর্যন্ত মানুষ পরীক্ষা দিতে পারে।
    ইবলিস তখন আল্লাহর শপথ করে বলল, সে আদমের সন্তানদের অধিকাংশকে বিপথে নেবে, তবে “المخلصين” — অর্থাৎ আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দাদের সে বিভ্রান্ত করতে পারবে না (তাফসীর ইবন কাসীর, ৩৮:৮২–৮৩)।

    আল্লাহ উত্তর দিলেন — “فَالْحَقُّ وَالْحَقَّ أَقُولُ” — অর্থাৎ, “আমি সত্য বলেছি, এবং এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত যে, আমি জাহান্নাম পূর্ণ করব তোমার ও তোমার অনুসারীদের দ্বারা।” (সূরা সাদ ৩৮:৮৪–৮৫)।

    এই তাফসীর থেকে আমরা বুঝি—
    🔹 আল্লাহর নির্দেশ অমান্যকারীর পরিণতি ধ্বংস।
    🔹 অহংকার ও আত্মগর্ব শয়তানের বৈশিষ্ট্য।
    🔹 আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দারা শয়তানের প্রলোভন থেকে নিরাপদ।
    🔹 মানুষকে তার সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিনয়ী ও কৃতজ্ঞ থাকতে হবে।


    📘 তাফসীর রেফারেন্সসমূহ:

    1. তাফসীর ইবন কাসীর, সূরা সাদ ৩৮:৭১–৮৫

    2. তাফসীর আত-তাবারী, জি.২০, পৃ. ১৮০–১৯৫

    3. আল-কুরতুবী তাফসীর, সূরা সাদ, আয়াত ৭১–৮৫

    4. তাফসীর আস-সা’দী, পৃ. ৬৭২

    5. সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৬১২ — (আদমকে আল্লাহ নিজের হাতে সৃষ্টি করেছেন)


    5) সূরা ইসরা / আল-ইসরা — ১৭:৬১ (ইবলিস-প্রতিহিংসার উল্লেখ)

     আরবি আয়াত:

    ﴿وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ ٱسْجُدُواْ لِأَدَمَ فَسَجَدُواْ إِلَّآ إِبْلِيسَ قَالَ أَأَسْجُدُ لِمَنْ خَلَقْتَ طِينًا﴾
    (সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৬১)


    📖 বাংলা অনুবাদ:

    (স্মরণ করো) যখন আমি ফেরেশতাদের বললাম, “আদমকে সেজদা করো,” তখন তারা সবাই সেজদা করল, কিন্তু ইবলিস করল না। সে বলল, “আমি কি সেই সত্তার কাছে সেজদা করব, যাকে তুমি মাটি থেকে সৃষ্টি করেছ?”


    📚 তাফসীর ব্যাখ্যা:

    এই আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা আবারও ইবলিসের অহংকার ও প্রতিহিংসাপূর্ণ মনোভাব স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। আগের সূরাগুলোর মতোই এখানে আদম (আঃ)-এর সম্মান প্রদর্শনের আদেশ এবং ইবলিসের অবাধ্যতার ঘটনার সারসংক্ষেপ বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু এই আয়াতে বিশেষভাবে ইবলিসের “অহংকার ও প্রতিহিংসা”-র দিকটি স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে।

    আল্লাহ ফেরেশতাদের নির্দেশ দিলেন: “আদমকে সেজদা করো।” ফেরেশতারা আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী সঙ্গে সঙ্গে সেজদা করলেন। কিন্তু ইবলিস, যে জিনদের অন্তর্ভুক্ত ছিল (সূরা কাহফ ১৮:৫০ অনুযায়ী), সে এই নির্দেশ অমান্য করল।

    সে বলল,

    “أَأَسْجُدُ لِمَنْ خَلَقْتَ طِينًا”
    “আমি কি এমন এক সত্তার কাছে সেজদা করব, যাকে তুমি মাটি থেকে সৃষ্টি করেছ?”

    এ বাক্য দ্বারা ইবলিস তার অহংকার ও ঈর্ষা প্রকাশ করল। সে মনে করেছিল, আগুন (যা থেকে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে) মাটির চেয়ে শ্রেষ্ঠ। তাই সে আদমের সম্মান মেনে নিতে পারেনি।

    তাফসীর ইবন কাসীর-এ উল্লেখ আছে:
    ইবলিসের এই কথার মাধ্যমে বোঝা যায়, তার অস্বীকারের মূল কারণ ছিল আত্মগরিমা ও হিংসা। সে শুধু আদেশ অমান্যই করেনি, বরং আল্লাহর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধাচরণ করেছে। তাই আল্লাহ তা‘আলা তাকে অভিশপ্ত করেছেন এবং জান্নাত থেকে বিতাড়িত করেছেন।
    (ইবন কাসীর, তাফসীরুল কুরআনিল আজীম, সূরা আল-ইসরা ১৭:৬১)

    ইমাম কুরতুবী বলেন:
    ইবলিসের “أَأَسْجُدُ” উক্তিটি তিরস্কারমূলক। সে যেন বলতে চেয়েছিল, “আমি কি এমন এক সৃষ্টিকে সেজদা করব, যে নিম্নমানের মাটি থেকে তৈরি?” কিন্তু এই যুক্তি ছিল মূর্খতা; কারণ মাটি থেকে আল্লাহ এমন এক সৃষ্টি করেছেন, যার মধ্যে বুদ্ধি, জ্ঞান ও আত্মা আছে, আর আগুন ধ্বংসাত্মক (তাফসীর আল-কুরতুবী, ১৭:৬১)।

    তাফসীর আস-সা’দী তে বলা হয়েছে:
    এই আয়াত দ্বারা ইবলিসের অভ্যন্তরীণ হিংসা ও বিদ্বেষ প্রকাশ পেয়েছে। সে কেবল আদমের প্রতি নয়, বরং তার সমস্ত সন্তানদের প্রতি প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠেছিল। তাই আল্লাহ পরবর্তী আয়াতে বলেন—

    “قَالَ أَرَأَيْتَكَ هَـٰذَا ٱلَّذِى كَرَّمْتَ عَلَىَّ لَئِنْ أَخَّرْتَنِ إِلَىٰ يَوْمِ ٱلْقِيَـٰمَةِ لَأَحْتَنِكَنَّ ذُرِّيَّتَهُ إِلَّا قَلِيلًۭا”
    (“তুমি কি দেখ, যাকে তুমি আমার ওপর শ্রেষ্ঠ করেছ? যদি আমাকে কিয়ামত পর্যন্ত অবকাশ দাও, আমি তার অধিকাংশ সন্তানকে বিপথে নেব, অল্প কয়েকজন ছাড়া।” — সূরা আল-ইসরা: ৬২)

    এখান থেকে বোঝা যায়, ইবলিসের অহংকার পরিণত হয়েছিল প্রতিশোধ ও হিংসায়, যা আজও মানবজাতির বিরুদ্ধে অব্যাহত রয়েছে।


    🌺 শিক্ষণীয় দিকসমূহ:

    ১️⃣ অহংকার ও হিংসা আল্লাহর অবাধ্যতার মূল কারণ।
    ২️⃣ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠত্ব নির্ভর করে আনুগত্য ও তাকওয়ার ওপর, পদার্থের ওপর নয়।
    ৩️⃣ শয়তানের চক্রান্ত চিরকাল মানবজাতির বিরুদ্ধে চলমান থাকবে।
    ৪️⃣ আল্লাহর আদেশ অমান্য করা মানেই ধ্বংস ও লাঞ্ছনা।


    📘 তাফসীর রেফারেন্সসমূহ:

    1. তাফসীর ইবন কাসীর, সূরা আল-ইসরা: আয়াত ৬১

    2. আল-কুরতুবী তাফসীর, আয়াত ১৭:৬১

    3. তাফসীর আত-তাবারী, জি.১৫, পৃ. ৮৮–৯১

    4. তাফসীর আস-সা’দী, সূরা আল-ইসরা

    5. সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৬১২ (আদমকে সেজদা প্রসঙ্গ)


    6) সূরা ত্বা-হা (Ta-Ha) — ২০:১১৫–১২৩ (আদম (আঃ)-এর সঙ্গে সুপ্রতিষ্ঠ ‘ঋণ/চুক্তি’ ও জ্বলন্ত নির্দেশ)

     আরবি আয়াত:

    ﴿وَلَقَدْ عَهِدْنَا إِلَىٰ آدَمَ مِن قَبْلُ فَنَسِيَ وَلَمْ نَجِدْ لَهُ عَزْمًا ۝ وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ أَبَىٰ ۝ فَقُلْنَا يَا آدَمُ إِنَّ هَٰذَا عَدُوٌّ لَّكَ وَلِزَوْجِكَ فَلَا يُخْرِجَنَّكُمَا مِنَ الْجَنَّةِ فَتَشْقَىٰ ۝ إِنَّ لَكَ أَلَّا تَجُوعَ فِيهَا وَلَا تَعْرَىٰ ۝ وَأَنَّكَ لَا تَظْمَؤُا فِيهَا وَلَا تَضْحَىٰ ۝ فَوَسْوَسَ إِلَيْهِ الشَّيْطَانُ قَالَ يَا آدَمُ هَلْ أَدُلُّكَ عَلَىٰ شَجَرَةِ الْخُلْدِ وَمُلْكٍ لَّا يَبْلَىٰ ۝ فَأَكَلَا مِنْهَا فَبَدَتْ لَهُمَا سَوْآتُهُمَا وَطَفِقَا يَخْصِفَانِ عَلَيْهِمَا مِن وَرَقِ الْجَنَّةِ ۚ وَعَصَىٰ آدَمُ رَبَّهُ فَغَوَىٰ ۝ ثُمَّ اجْتَبَاهُ رَبُّهُ فَتَابَ عَلَيْهِ وَهَدَىٰ ۝ قَالَ اهْبِطَا مِنْهَا جَمِيعًا ۖ بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ ۖ فَإِمَّا يَأْتِيَنَّكُم مِّنِّي هُدًى فَمَنِ اتَّبَعَ هُدَايَ فَلَا يَضِلُّ وَلَا يَشْقَىٰ﴾
    (সূরা ত্বা-হা, আয়াত ১১৫–১২৩)


    📖 বাংলা অনুবাদ:

    (১১৫) আমি পূর্বে আদমের সঙ্গে চুক্তি করেছিলাম, কিন্তু সে তা ভুলে গিয়েছিল, এবং আমি তার মধ্যে দৃঢ় সংকল্প পাইনি।
    (১১৬) এবং (স্মরণ করো) যখন আমি ফেরেশতাদের বলেছিলাম, “আদমকে সেজদা করো,” তখন তারা সবাই সেজদা করল, ইবলিস ছাড়া; সে অস্বীকার করল।
    (১১৭) আমি বলেছিলাম, “হে আদম! নিশ্চয়ই এই (ইবলিস) তোমার ও তোমার স্ত্রীর শত্রু। তাই সে যেন তোমাদের জান্নাত থেকে বের করে না দেয়, তাহলে তুমি কষ্টে পতিত হবে।”
    (১১৮–১১৯) “নিশ্চয়ই জান্নাতে তুমি ক্ষুধার্ত হবে না, উলঙ্গও হবে না, তৃষ্ণার্তও হবে না, সূর্যের তাপেও পুড়বে না।”
    (১২০) কিন্তু শয়তান তাকে কুমন্ত্রণা দিল এবং বলল, “হে আদম! আমি কি তোমাকে এমন এক বৃক্ষের কথা জানাব, যা তোমাকে চিরস্থায়ী করবে এবং এমন রাজত্ব দেবে যা কখনো বিলীন হবে না?”
    (১২১) অতঃপর তারা উভয়ে তা থেকে খেল; তখন তাদের গোপন অঙ্গ প্রকাশিত হলো, এবং তারা জান্নাতের পাতা দিয়ে নিজেদের ঢাকতে লাগল। এভাবে আদম তার প্রভুর অবাধ্যতা করল এবং পথভ্রষ্ট হলো।
    (১২২) কিন্তু পরে তার প্রভু তাকে মনোনীত করলেন, তার তওবা কবুল করলেন এবং সঠিক পথ প্রদর্শন করলেন।
    (১২৩) আল্লাহ বললেন, “তোমরা সবাই এখান থেকে নেমে যাও; তোমরা পরস্পরের শত্রু। অতঃপর যখন আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে হিদায়াত আসবে, তখন যে আমার হিদায়াত অনুসরণ করবে, সে পথভ্রষ্ট হবে না এবং কষ্টেও পতিত হবে না।”


    📚 তাফসীর ব্যাখ্যা (সূরা ত্বা-হা ২০:১১৫–১২৩):

    এই আয়াতসমূহে আদম (আঃ)-এর প্রতি আল্লাহর নির্দেশ, শয়তানের প্রলোভন, অবাধ্যতা, তওবা এবং মানবজাতির পৃথিবীতে প্রেরণের বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে।

    🔹 (আয়াত ১১৫) — “وَلَقَدْ عَهِدْنَا إِلَىٰ آدَمَ مِن قَبْلُ فَنَسِيَ” — অর্থাৎ আল্লাহ আদম (আঃ)-এর সঙ্গে একটি চুক্তি করেছিলেন। সেই চুক্তি ছিল — তিনি যেন নির্দিষ্ট গাছের কাছে না যান (তাফসীর ইবন কাসীর)। কিন্তু শয়তানের প্ররোচনায় আদম (আঃ) সেই চুক্তি ভুলে যান। এখানে “نَسِيَ” অর্থ শুধুমাত্র ভুলে যাওয়া নয়, বরং ভুলের মাধ্যমে শয়তানের ধোঁকায় পড়ে যাওয়া।

    🔹 (আয়াত ১১৭–১১৯) — আল্লাহ স্পষ্ট করে আদম (আঃ)-কে সতর্ক করেছিলেন যে, ইবলিস তোমার এবং তোমার স্ত্রীর শত্রু। জান্নাতে তুমি কোন কষ্টে থাকবে না—না ক্ষুধা, না তৃষ্ণা, না উলঙ্গতা, না রোদ। অর্থাৎ জান্নাত ছিল পরিপূর্ণ সুখের স্থান।

    🔹 (আয়াত ১২০–১২১) — শয়তান আদমকে ফাঁদে ফেলে দিল। সে বলল, “হে আদম! আমি কি তোমাকে এমন বৃক্ষের কথা বলব যা তোমাকে চিরস্থায়ী করবে?” অর্থাৎ যদি তুমি এই বৃক্ষের ফল খাও, তবে তুমি কখনো মরবে না।
    তাফসীর কুরতুবী-তে বলা হয়েছে, ইবলিস মিথ্যা কসম করে আদমকে বিশ্বাস করায় যে এটি আল্লাহর অনুমতিসম্পন্ন কাজ। ফলে আদম (আঃ) এবং হাওয়া (আঃ) উভয়েই সেই ফল খেয়ে ফেলেন। ফলস্বরূপ তাদের গোপন অঙ্গ প্রকাশিত হয়ে যায়, যা পূর্বে তাদের জন্য গোপন ছিল।

    🔹 (আয়াত ১২২) — “ثُمَّ اجْتَبَاهُ رَبُّهُ” — অর্থাৎ, এরপর আল্লাহ আদমকে মনোনীত করলেন, তার তওবা কবুল করলেন এবং হিদায়াত দিলেন। এখানে বোঝানো হয়েছে যে, আদম (আঃ)-এর ভুলটি ছিল ইচ্ছাকৃত পাপ নয়, বরং শয়তানের প্ররোচনাজনিত ভুল। তাই আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন (তাফসীর আত-তাবারী, ২০:১২২)।

    🔹 (আয়াত ১২৩) — আল্লাহ বলেন, “তোমরা সবাই নেমে যাও, তোমরা একে অপরের শত্রু।”
    এখানে “একেঅপরের শত্রু” অর্থ — মানুষ ও শয়তান একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। তবে আল্লাহ ঘোষণা করলেন: “যে আমার হিদায়াত অনুসরণ করবে, সে পথভ্রষ্ট হবে না, কষ্টেও পতিত হবে না।”
    এটি মানবজীবনের মূল বার্তা — আল্লাহর হিদায়াতই মুক্তি ও সফলতার পথ


    🌺 শিক্ষণীয় দিকসমূহ:

    ১️⃣ মানুষ ভুল করতে পারে, কিন্তু তওবা করলে আল্লাহ ক্ষমা করেন।
    ২️⃣ শয়তান চিরকাল মানুষের শত্রু; তার ফাঁদ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলা।
    ৩️⃣ জান্নাতেই প্রকৃত সুখ; পৃথিবী পরীক্ষার স্থান।
    ৪️⃣ অহংকার ও অজ্ঞতা মানুষকে আল্লাহর বিধান ভুলিয়ে দেয়।
    ৫️⃣ তওবা ও আনুগত্যই আল্লাহর হিদায়াত পাওয়ার উপায়।


    📘 তাফসীর রেফারেন্সসমূহ:

    1. তাফসীর ইবন কাসীর, সূরা ত্বা-হা ২০:১১৫–১২৩

    2. আল-কুরতুবী তাফসীর, আয়াত ১১৫–১২৩

    3. তাফসীর আত-তাবারী, জি.১৬, পৃ. ১৮৫–২০০

    4. তাফসীর আস-সা’দী, পৃ. ৬৯৫–৭০০

    5. সহীহ বুখারী, হাদীস: ৩৩৩১ (আদম ও শয়তানের প্রসঙ্গ)


    7) সূরা আল-ইমরান — ৩:৫৯ (ঈসা ও আদমের তুলনা — সৃষ্টি বিষয়ক বক্তব্য)

     আরবি আয়াত:

    ﴿إِنَّ مَثَلَ عِيسَىٰ عِندَ اللَّهِ كَمَثَلِ آدَمَ ۖ خَلَقَهُ مِن تُرَابٍ ثُمَّ قَالَ لَهُ كُن فَيَكُونُ﴾
    (সূরা آلِ عِمْرَان, আয়াত: ৫৯)


     বাংলা অনুবাদ:

    “নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকটে ঈসার দৃষ্টান্ত আদমের দৃষ্টান্তের ন্যায়। তিনি তাঁকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন, তারপর তাঁকে বললেন — ‘হও’, আর সে হয়ে গেল।”
    📖 (তাফসীর ইবন কাসীর, তাফসীর আস-সা’দী, তাফসীর আত-তাবারী)


     তাফসীর (ব্যাখ্যা):

    এই আয়াতটি নাজিল হয় নজরান খ্রিস্টানদের সাথে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বিতর্কের সময়, যারা দাবি করেছিল যে ‘ঈসা (আঃ) আল্লাহর পুত্র’। আল্লাহ তাআলা এই আয়াত দ্বারা তাদের যুক্তি খণ্ডন করেন। তিনি বলেন— “ঈসা (আঃ)-এর দৃষ্টান্ত আদম (আঃ)-এর ন্যায়।” অর্থাৎ, আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করার সময় কোনো পিতা-মাতা ছিল না, অথচ তিনি মানবজাতির পিতা। অন্যদিকে, ঈসা (আঃ)-এর মা ছিল কিন্তু পিতা ছিল না। সুতরাং, যদি পিতা ছাড়া জন্মগ্রহণ ঈসা (আঃ)-কে ‘ঈশ্বর’ বা ‘ঈশ্বরের পুত্র’ বানায়, তবে আদম (আঃ) তো আরও অধিক হকদার হতেন! কিন্তু বাস্তবতা তা নয় — উভয়েই আল্লাহর সৃষ্টি মাত্র।

    خَلَقَهُ مِن تُرَابٍ” — অর্থাৎ, আল্লাহ আদম (আঃ)-কে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন; যা নির্দেশ করে যে আল্লাহ তাআলা নিজ ইচ্ছায়, কোনো মাধ্যম ছাড়াই, কেবল “كُن فَيَكُونُ” — “হও”, বলেই তাঁকে সৃষ্টি করেছেন।
    এই বাক্যাংশটি আল্লাহর সর্বশক্তিমান সৃষ্টিশক্তির প্রতীক। তিনি যাকে সৃষ্টি করতে চান, তাকে শুধু “হও” বলেন, আর সে অস্তিত্বে আসে।

    তাফসীর ইবন কাসীর-এ বলা হয়েছে, আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে প্রমাণ করেছেন যে, ঈসা (আঃ)-এর সৃষ্টি আদম (আঃ)-এর তুলনায় আরও সহজ। কারণ আদম (আঃ) তো মাটি থেকে নতুন করে সৃষ্টি হয়েছিলেন, কিন্তু ঈসা (আঃ)-এর জন্ম হয়েছিল বিদ্যমান মানবী মেরিয়ম (আঃ)-এর গর্ভে আল্লাহর কুদরতে।

    তাফসীর আত-তাবারী বলেন, এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট করেন যে, ঈসা (আঃ) একজন নবী ও বান্দা, তিনি আল্লাহর নির্দেশে জন্মগ্রহণ করেছেন, তাই তাঁর মধ্যে ‘ঈশ্বরত্ব’ আরোপ করা বড় ধরণের বিভ্রান্তি।

    তাফসীর আস-সা’দী-এর ভাষায়, এই আয়াত আল্লাহর সৃষ্টিশক্তির একটি বিশুদ্ধ উদাহরণ — তিনি যেমন আদম (আঃ)-কে বিনা পিতা-মাতা সৃষ্টি করেছেন, তেমনি ঈসা (আঃ)-কে বিনা পিতা সৃষ্টি করেছেন, উভয়ই আল্লাহর নিদর্শন।

    সারসংক্ষেপ:

    এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা প্রমাণ করেছেন যে, ঈসা (আঃ)-এর সৃষ্টি কোনো ব্যতিক্রম নয়, বরং আল্লাহর কুদরতেরই এক নিদর্শন। যেভাবে আদম (আঃ)-কে মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছিল, সেভাবেই আল্লাহ ঈসা (আঃ)-কে পিতা ছাড়া সৃষ্টি করেছেন। অতএব, তাদের কেউই ‘ঈশ্বর’ বা ‘ঈশ্বরের সন্তান’ নন; উভয়ই আল্লাহর সৃষ্টি, এবং আল্লাহই সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তা।


     তাফসীর রেফারেন্স:

    • تفسير ابن كثير (Ibn Kathir) – تفسير سورة آل عمران: الآية ٥٩

    • تفسير الطبري (At-Tabari) – جامع البيان، جـ ٦، صـ ৪৮৮

    • تفسير السعدي (As-Sa’di) – تيسير الكريم الرحمن، صـ ১২০

    • আল-মারাগি তাফসীর, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১৮৫

    • “তাফসীরুল কুরআনুল আজীম” — হাফিয ইবন কাসীর (বাংলা অনুবাদ)


    মূল কথা।

    • উপরের আয়াতগুলোতে আদম (আঃ)এর সৃষ্টির পূর্বে ফেরেশতাদের সাথে পরামর্শ জান্নাতে বসবাসের অনুমতি, আদম (আঃ) কে শিক্ষা দান আদম (আঃ) কে সিজদার আদেশ শয়তানের ধোকায় নিষিদ্ধ ফল খাওয়া, পৃথিবীতে প্রেরণ করা এবং কিভাবে সৃষ্টি করা হয় এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এখানে রাসূল (সাঃ)কে আদম (আঃ)এর আগে সৃষ্টি করেছেন এই তথ্য পাওয়া যায় না। তবে হাদিসে কিছু তথ্য এমন কিছু তথ্য পাওয়া যায়।

    B. গুরুত্বপূর্ণ (সাহিহ/হাসান) হাদীস-সমূহ


    1)📜 মূল হাদীস (আরবি) — সহীহ মুসলিম

    عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ:
    “خَلَقَ اللَّهُ آدَمَ عَلَى صُورَتِهِ، طُولُهُ سِتُّونَ ذِرَاعًا، فَلَمَّا خَلَقَهُ، قَالَ: اذْهَبْ فَسَلِّمْ عَلَى أُولَئِكَ النَّفَرِ مِنَ الْمَلَائِكَةِ جُلُوسٌ، فَاسْتَمِعْ مَا يُحَيُّونَكَ، فَإِنَّهَا تَحِيَّتُكَ وَتَحِيَّةُ ذُرِّيَّتِكَ. فَقَالَ: السَّلَامُ عَلَيْكُمْ، فَقَالُوا: السَّلَامُ عَلَيْكَ وَرَحْمَةُ اللَّهِ، فَزَادُوهُ: وَرَحْمَةُ اللَّهِ، فَكُلُّ مَنْ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ عَلَى صُورَةِ آدَمَ، فَلَمْ يَزَلِ الْخَلْقُ يَنْقُصُ بَعْدُ حَتَّى الآنَ.”
    صحيح مسلم، كتاب الجنة وصفة نعيمها وأهلها، حديث رقم: 2841


    বাংলা অনুবাদ:

    আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
    “আল্লাহ তায়ালা আদম (আঃ)-কে তাঁর (নিজস্ব) চিত্রে সৃষ্টি করেছেন। তাঁর উচ্চতা ছিল ষাট হাত (প্রায় ৯০ ফুট)। যখন আল্লাহ তাঁকে সৃষ্টি করলেন, তখন বললেন — যাও, ঐসব ফেরেশতাদেরকে সালাম দাও, যারা বসে আছে, এবং লক্ষ্য কর তারা তোমাকে কীভাবে জবাব দেয়। কেননা সেটাই হবে তোমার এবং তোমার বংশধরদের সালামের রীতি। তখন আদম (আঃ) বললেন, ‘আস-সালামু আলাইকম।’ ফেরেশতারা বললেন, ‘আস-সালামু আলাইকা ওয়া রাহমাতুল্লাহ।’ তারা ‘ওয়া রাহমাতুল্লাহ’ শব্দটি যোগ করল। অতঃপর (নবী ﷺ বলেন), যে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে, সে আদম (আঃ)-এর চেহারা ও দৈহিক আকৃতির মতোই প্রবেশ করবে। কিন্তু পরে সৃষ্ট মানুষ ক্রমশ উচ্চতায় কমে আসতে থাকে।”
    (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং 2841)


    📚 রেফারেন্সসমূহ:

    • Ṣaḥīḥ Muslim — كتاب الجنة وصفة نعيمها وأهلها, Hadith 2841

    • Sunnah.com Reference: Muslim 2841

    • Arabic Source: Darussalam Edition, Riyadh

    • সহীহ বুখারিতেও অনুরূপ বক্তব্য এসেছে (বুখারি, হাদীস নং 6227)।


     ব্যাখ্যা সংক্ষেপে:

    🔹 আল্লাহ তায়ালা আদম (আঃ)-কে এমন একটি সুন্দর ও পূর্ণাঙ্গ রূপে সৃষ্টি করেছেন, যা মানবজাতির মধ্যে সর্বোত্তম। এখানে “عَلَى صُورَتِهِ” অর্থ হলো — “আল্লাহ তাঁকে একটি বিশেষ রূপ ও কাঠামোতে সৃষ্টি করেছেন, যা মানব জাতির মধ্যে পরিপূর্ণতা ও সম্মানের প্রতীক।”
    🔹 ইমাম নববী (রহ.) বলেন — এখানে “তাঁর চিত্র” দ্বারা আল্লাহর নিজের চিত্র নয়, বরং আদমের নিজের চিত্র ও আকৃতি বোঝানো হয়েছে, যা তাঁকে স্বতন্ত্র ও পূর্ণাঙ্গ করে সৃষ্টি করা হয়েছে ( সহীহ মুসলিম, নববী)।
    🔹 ইবনু হাযম ও ইবনু তাইমিয়া বলেন — এটি রূপক অর্থে সম্মান ও পূর্ণাঙ্গতার বর্ণনা, যা আল্লাহর সৃষ্টিতে শ্রেষ্ঠত্বের নিদর্শন (তাফসির ইবনু কাসীর, সূরা তীন: 95:4)।


    2)  হাদীসের আরবি মূল (الإسناد والمتن):

    رَوَى الإِمَامُ مُسْلِمٌ فِي “صَحِيحِهِ” (كِتَابُ الْبِرِّ وَالصِّلَةِ وَالْآدَابِ، بَابُ النَّهْيِ عَنْ ضَرْبِ الْوَجْهِ):

    حَدَّثَنَا أَبُو كُرَيْبٍ، حَدَّثَنَا وَكِيعٌ، عَنْ سُفْيَانَ، عَنْ حَبِيبِ بْنِ أَبِي ثَابِتٍ، عَنْ عَطَاءِ بْنِ أَبِي رَبَاحٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ:
    قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ:
    “إِذَا قَاتَلَ أَحَدُكُمْ فَلْيَجْتَنِبِ الْوَجْهَ، فَإِنَّ اللَّهَ خَلَقَ آدَمَ عَلَى صُورَتِهِ.”

    📚 (رواه مسلم، رقم الحديث: 2612)


    বাংলা অনুবাদ:

    আবূ হুরাইরাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিত।
    রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

    “তোমাদের কেউ যখন তার ভাইয়ের সঙ্গে যুদ্ধ বা মারামারি করে, তখন যেন সে তার মুখে আঘাত না করে; কারণ আল্লাহ তাআলা আদমকে তাঁর (আদমের) একটি বিশেষ রূপে সৃষ্টি করেছেন।”
    📘 (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং 2612, কিতাবুল বির্র্‌ ওয়াস্‌সিলাহ্‌ ওয়াল আদাব)


    সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা (Sharh):

    🔹 এই হাদীস দ্বারা বোঝানো হয়েছে—
    মানব মুখমণ্ডল আল্লাহর সৃষ্ট এক বিশেষ সম্মানিত অঙ্গ, যেখানে চোখ, কান, মুখ ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ ইন্দ্রিয় অঙ্গ রয়েছে। তাই ইসলাম মারামারি বা শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রেও মুখে আঘাত করা নিষিদ্ধ করেছে।

    🔹 “عَلَى صُورَتِهِ” (তার রূপে) — এই অংশের ব্যাখ্যায় আলেমগণ বলেছেন, এখানে “তার” বলতে আদমের নিজস্ব রূপ বা মানবের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ রূপ বোঝানো হয়েছে, আল্লাহর রূপ নয় (নাউযুবিল্লাহ)।
    কারণ আল্লাহ তাআলা কোনো দেহ বা আকৃতি থেকে মুক্ত (سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى).


    3) 📘 সহীহ বুখারী — হাদীস নং 6227

    (কিতাবুল ইস্তিজান — باب بَدْءِ السَّلاَمِ)

    🕋 আরবি হাদীস (الإسناد والمتن):

    حَدَّثَنَا أَبُو الْيَمَانِ، قَالَ: أَخْبَرَنَا شُعَيْبٌ، عَنِ الزُّهْرِيِّ، قَالَ: أَخْبَرَنِي سَعِيدُ بْنُ الْمُسَيَّبِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَالَ:

    “خَلَقَ اللَّهُ آدَمَ عَلَى صُورَتِهِ، طُولُهُ سِتُّونَ ذِرَاعًا، فَلَمَّا خَلَقَهُ قَالَ: اذْهَبْ فَسَلِّمْ عَلَى أُولَئِكَ النَّفَرِ مِنَ الْمَلَائِكَةِ، فَاسْتَمِعْ مَا يُحَيُّونَكَ، فَإِنَّهَا تَحِيَّتُكَ وَتَحِيَّةُ ذُرِّيَّتِكَ، فَقَالَ: السَّلَامُ عَلَيْكُمْ، فَقَالُوا: السَّلَامُ عَلَيْكَ وَرَحْمَةُ اللَّهِ، فَزَادُوهُ: وَرَحْمَةُ اللَّهِ، فَكُلُّ مَنْ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ عَلَى صُورَةِ آدَمَ، فَلَمْ يَزَلِ الْخَلْقُ يَنْقُصُ بَعْدَ حَتَّى الآنَ.”

    📚 (رواه البخاري، رقم الحديث: 6227)


    বাংলা অনুবাদ:

    আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত,
    রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ

    “আল্লাহ আদমকে তাঁর রূপে সৃষ্টি করেছেন; তাঁর উচ্চতা ছিল ষাট হাত (প্রায় ৯০ ফুট)।
    যখন তিনি সৃষ্টি হলেন, আল্লাহ তাঁকে বললেন: ‘ওই ফেরেশতাদের একদলকে সালাম করো এবং তারা তোমাকে কীভাবে উত্তর দেয় তা শোনো; কারণ তাদের জবাবই হবে তোমার এবং তোমার সন্তানদের সালামের রূপ।’
    তখন আদম (আঃ) বললেন: ‘আস-সালামু ‘আলাইকুম’।
    ফেরেশতারা উত্তর দিলেন: ‘আস-সালামু ‘আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ’।
    তারা “ওয়া রাহমাতুল্লাহ” যুক্ত করলেন।
    এরপর রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: যে কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে, সে আদমের রূপেই প্রবেশ করবে; কিন্তু মানুষ ক্রমে ক্রমে ছোট হতে থাকলো যতক্ষণ না আজ পর্যন্ত।’”
    📘 (সহীহ বুখারী, হাদীস: 6227)


    📘 সহীহ মুসলিম — হাদীস নং 2841 (وَفِي نُسْخَةٍ أُخْرَى: 2610)

    🕋 আরবি হাদীস (سند و متن)

    رَوَى الإِمَامُ مُسْلِمٌ فِي “صَحِيحِهِ” (كِتَابُ الجَنَّةِ، بَابُ يَدْخُلُ أَهْلُ الجَنَّةِ الجَنَّةَ عَلَى صُورَةِ آدَمَ عَلَيْهِ السَّلَامُ)

    حَدَّثَنَا أَبُو كُرَيْبٍ، مُحَمَّدُ بْنُ الْعَلَاءِ، حَدَّثَنَا أَبُو مُعَاوِيَةَ، عَنْ الأَعْمَشِ، عَنْ أَبِي صَالِحٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ:
    قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ:
    “خَلَقَ اللَّهُ آدَمَ عَلَى صُورَتِهِ، طُولُهُ سِتُّونَ ذِرَاعًا، فَلَمَّا خَلَقَهُ قَالَ: اذْهَبْ فَسَلِّمْ عَلَى تِلْكَ النَّفَرِ مِنَ الْمَلَائِكَةِ، فَاسْتَمِعْ مَا يُحَيُّونَكَ، فَإِنَّهَا تَحِيَّتُكَ وَتَحِيَّةُ ذُرِّيَّتِكَ، فَقَالَ: السَّلَامُ عَلَيْكُمْ، فَقَالُوا: السَّلَامُ عَلَيْكَ وَرَحْمَةُ اللَّهِ، فَزَادُوهُ وَرَحْمَةُ اللَّهِ، فَكُلُّ مَنْ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ عَلَى صُورَةِ آدَمَ، فَلَمْ يَزَلِ الْخَلْقُ يَنْقُصُ بَعْدُ حَتَّى الآنَ.”

    (رواه مسلم، رقم الحديث: 2841)


    বাংলা অনুবাদ

    আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—
    রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ

    “আল্লাহ্‌ তাআলা আদম (আঃ)-কে তাঁর সুরতের উপর সৃষ্টি করেছেন। তাঁর উচ্চতা ছিল ষাট হাত।
    অতঃপর যখন তাঁকে সৃষ্টি করা হল, তখন আল্লাহ তাঁকে বললেনঃ
    ‘ওই ফেরেশতাদের একদল নিকটে যাও এবং তাদেরকে সালাম করো। তারা তোমাকে যেভাবে জবাব দেবে, সেটিই হবে তোমার এবং তোমার বংশধরদের সালামের পদ্ধতি।’

    তখন আদম (আঃ) বললেনঃ ‘আসসালামু ‘আলাইকম।’
    ফেরেশতারা উত্তর দিলেনঃ ‘আসসালামু ‘আলাইকা ওয়া রহমাতুল্লাহ।’
    তারা ‘ওয়া রহমাতুল্লাহ’ শব্দটি সংযোজন করলেন।

    এরপর রসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ
    ‘স্বর্গে প্রবেশকারী প্রত্যেকেই আদম (আঃ)-এর আকৃতিতে প্রবেশ করবে; কিন্তু পরবর্তীকালে মানুষদের দৈহিক উচ্চতা ক্রমে হ্রাস পেতে থাকে আজ পর্যন্ত।’”
    (সহীহ মুসলিম, হাদীস: 2841)


    📘 সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা (خلاصة الشرح)

    1. “خَلَقَ اللَّهُ آدَمَ عَلَى صُورَتِهِ” — এই বাক্যটি নিয়ে আলেমদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।

      • বেশিরভাগ মুফাসসির ও মুহাদ্দিসগণ বলেন, “তাঁর সুরতের উপর” বলতে আদম (আঃ)-এর পূর্ণাঙ্গ ও সুন্দর রূপে সৃষ্টি বোঝানো হয়েছে — অর্থাৎ আল্লাহ তাঁকে এমন এক বিশেষ আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন যাতে অন্য কোন জীবকে অনুরূপ বানানো হয়নি।

      • কেউ কেউ বলেন, এখানে “هِ” সর্বনামটি আদম-এর প্রতি ইঙ্গিত করছে, অর্থাৎ আদমকে তাঁর নিজের (আদমের) রূপে সৃষ্টি করা হয়েছে — অর্থাৎ পূর্ণাঙ্গ রূপে, ধীরে ধীরে নয় (যেমন ভ্রূণ থেকে নয়, বরং সরাসরি পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে)।

    2. ষাট হাত উচ্চতা (طُولُهُ سِتُّونَ ذِرَاعًا) — এক “যিরা” প্রায় ১৮ ইঞ্চি; সুতরাং আদম (আঃ)-এর উচ্চতা ছিল আনুমানিক ৯০ ফুট।

    3. সালাম-এর শিক্ষা:

      • এই হাদীসে প্রথম সালামের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। ফেরেশতাদের মাধ্যমে আদম (আঃ)-এর বংশধরদের জন্য সালাম একটি চিরন্তন ইসলামী শুভেচ্ছা রূপে নির্ধারিত হয়েছে।

    4. মানব দেহের ক্রমশ ক্ষুদ্রতা:

      • শুরুতে মানুষ ছিল বিশাল আকারের, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উচ্চতা কমে যেতে থাকে — এটি রাসূল ﷺ-এর একটি বৈজ্ঞানিক ভবিষ্যদ্বাণীও বটে।


    🔹 রেফারেন্সসমূহ:

    • صحيح مسلم، كتاب الجنة وصفة نعيمها وأهلها، حديث رقم 2841 (وفي نسخة أخرى: 2610)

    • شرح النووي على مسلم (17/165)

    • فتح الباري لابن حجر (6/366)

    কে।


    4) “نُبُوَّتِي كُنْتُ … (تِرْمِذِي) — নবুয়ত-স্থাপনা সংক্রান্ত বর্ণনা  রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজ নবুওয়াতের সূচনাকাল সম্পর্কে বলেছেন:

    আমি তখনই নবী ছিলাম, যখন আদম (আঃ) এখনো দেহ ও রূহের মাঝামাঝি অবস্থায় ছিলেন।”


    🕋 আরবি হাদীস (সনদসহ পূর্ণভাবে)

    رَوَى الإِمَامُ التِّرْمِذِيُّ فِي “جَامِعِهِ” (كتاب المناقب، باب ما جاء في ابتداء نبوته ﷺ، حديث رقم 3609):

    حَدَّثَنَا أَبُو كُرَيْبٍ، حَدَّثَنَا وَكِيعٌ، عَنْ إِسْرَائِيلَ، عَنْ أَبِي إِسْحَاقَ، عَنْ حُمَيْدِ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ:
    قِيلَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، مَتَى وُجِبَتْ لَكَ النُّبُوَّةُ؟
    قَالَ ﷺ:
    “وَآدَمُ بَيْنَ الرُّوحِ وَالْجَسَدِ.”

    (رواه الترمذي، وقال: هذا حديثٌ حسنٌ صحيحٌ.)


    বাংলা অনুবাদ

    আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত:
    লোকেরা রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞেস করল,
    “হে আল্লাহর রাসূল! আপনার নবুওয়াত (নবী হওয়া) কবে নির্ধারিত হয়েছিল?”

    তিনি ﷺ উত্তর দিলেনঃ
    “যখন আদম (আঃ) তখনও আত্মা ও দেহের মাঝখানে ছিলেন।”
    (অর্থাৎ আদমকে তখনও পূর্ণরূপে সৃষ্টি করা হয়নি, সেই সময়েই আমি নবী হিসেবে নির্ধারিত হয়েছিলাম।)
    — (জামি‘ আত-তিরমিযী, হাদীস নং 3609)

    ইমাম তিরমিযী বলেনঃ “হাদীসটি হাসান সহীহ।”


    📘 সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা (خلاصة الشرح)

    1. “وَآدَمُ بَيْنَ الرُّوحِ وَالْجَسَدِ” — অর্থাৎ, আল্লাহ তা‘আলা নবী মুহাম্মদ ﷺ-কে নবুওয়াতের জন্য মনোনীত করেন আদম (আঃ)-এর সৃষ্টি সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই।
      অর্থাৎ নবী ﷺ-এর নবুওয়াত আল্লাহর চিরনির্ধারিত পরিকল্পনার অংশ, যা পৃথিবীতে মানব সৃষ্টির আগেই নির্ধারিত ছিল।

    2. আধ্যাত্মিক দিক:

      • এতে বোঝা যায়, রাসূলুল্লাহ ﷺ আল্লাহর নিকট “প্রথম নির্ধারিত নবী”, যদিও পৃথিবীতে শেষ নবী হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন।

      • তাঁর নবুওয়াত সমস্ত নবীদের কেন্দ্রবিন্দু ও পূর্ণতা।

    3. ইমাম আল-‘আযারী ও ইবনুল কাইয়্যিম বলেনঃ
      এই হাদীস নবী ﷺ-এর নূরের পূর্বঅবস্থা ও আল্লাহর চিরনির্ধারিত পরিকল্পনার প্রমাণ বহন করে।

    4. তাফসীর ইঙ্গিত:
      কুরআনে আল্লাহ বলেন —

      وَإِذْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ النَّبِيِّينَ لَمَا آتَيْتُكُم مِّن كِتَابٍ وَحِكْمَةٍ … لَتُؤْمِنُنَّ بِهِ وَلَتَنصُرُنَّهُ
      (সূরা আলে ইমরান ৩:৮১)
      অর্থাৎ, আল্লাহ নবীদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন যে, মুহাম্মদ ﷺ আসলে তাঁকে বিশ্বাস করবে ও সমর্থন দেবে — এটি তাঁর নবুওয়াতের পূর্বনির্ধারণের সাক্ষ্য।


    🔹 রেফারেন্সসমূহ:

    • Jāmiʿ at-Tirmidhī, Kitāb al-Manāqib, Hadith 3609

    • Musnad Ahmad (Hadith 17163)

    • Al-Mustadrak al-Hakim (2/608) — الحاكم قال: صحيح على شرط مسلم

    • Sharh al-Tirmidhi by Ibn al-‘Arabi (4/485)

    • Fath al-Bari (6/369


     বিষয়: রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নবুয়াত আদম (আঃ) এর সৃষ্টির পূর্বে স্থিরকৃত ছিল

    🕋 ১. হাদীস: كنتُ نَبِيًّا وَآدَمُ بَيْنَ الرُّوحِ وَالْجَسَدِ

    🕋 আরবি হাদীস (সনদসহ পূর্ণভাবে)

    رَوَى الإِمَامُ التِّرْمِذِيُّ فِي “جَامِعِهِ” (كتاب المناقب، باب ما جاء في ابتداء نبوته ﷺ، حديث رقم 3609)، وَالإِمَامُ أَحْمَدُ فِي “المُسْنَد” (حديث رقم 17163):

    عَنْ الْعِرْبَاضِ بْنِ سَارِيَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ:

    «إِنِّي عِنْدَ اللَّهِ مَكْتُوبٌ خَاتَمُ النَّبِيِّينَ، وَإِنَّ آدَمَ لَمُنْجَدِلٌ فِي طِينِهِ، وَسَأُخْبِرُكُمْ أَوَّلَ ذَلِكَ: دَعْوَةُ أَبِي إِبْرَاهِيمَ، وَبُشْرَى عِيسَى بِي، وَرُؤْيَا أُمِّي الَّتِي رَأَتْ إِذْ وَلَدَتْنِي، أَنَّهُ خَرَجَ مِنْهَا نُورٌ أَضَاءَتْ لَهُ قُصُورُ الشَّامِ»

    (رواه الترمذي، وقال: هذا حديث حسن صحيح.
    وأخرجه أحمد في المسند، والبيهقي في دلائل النبوة.)


    বাংলা অনুবাদ

    ইরবায ইবনু সারিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন —
    রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ

    “আমি আল্লাহর নিকটে (লাওহে মাহফূযে) লিখিত আছি নবীদের শেষ নবী হিসেবে, যখন আদম (আঃ) তখনও কাদা-মাটির অবস্থায় ছিলেন।
    আর আমি তোমাদেরকে আমার নবুওয়াতের প্রথম নিদর্শনসমূহ সম্পর্কে জানাবো —
    তা হলো আমার পিতা ইবরাহীম (আঃ)-এর দো‘আ,
    ঈসা (আঃ)-এর আমাকে সুসংবাদ দেওয়া,
    এবং আমার মায়ের সেই স্বপ্ন যা তিনি আমার জন্মের সময় দেখেছিলেন।
    তিনি দেখেছিলেন, তাঁর গর্ভ থেকে এমন এক নূর (আলো) বের হলো যা সিরিয়ার প্রাসাদসমূহকে আলোকিত করল।”

    (জামি‘ আত-তিরমিযী, হাদীস নং ৩৬০৯ — ইমাম তিরমিযী বলেছেন: হাদীসটি হাসান সহীহ।)


    📘 সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা

    এই হাদীসটি নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর নবুওয়াতের প্রারম্ভিক নির্ধারণ ও তাঁর মর্যাদার উচ্চতা সম্পর্কে অত্যন্ত গভীর অর্থ বহন করে।

    প্রথমেই নবী ﷺ বলেন — “আমি আল্লাহর নিকটে লিখিত ছিলাম নবীদের শেষ নবী হিসেবে, তখন আদম (আঃ) এখনো কাদা-মাটিতে ছিলেন।”
    অর্থাৎ, নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর নবুওয়াত পৃথিবীতে প্রকাশের বহু পূর্বেই, এমনকি মানব সৃষ্টির পূর্বেই, আল্লাহ তা‘আলা তা নির্ধারণ করে রেখেছিলেন। এটি প্রমাণ করে যে নবী ﷺ কেবল মানবজাতির শেষ নবী নন, বরং সমগ্র নবুওয়াতের পরিপূর্ণতা ও চূড়ান্ত রূপ। তাঁর নবুওয়াত কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং আল্লাহর চিরন্তন পরিকল্পনা

    এরপর নবী ﷺ বলেন — “আমি তোমাদেরকে জানাবো আমার নবুওয়াতের সূচনার নিদর্শনগুলো।”
    তিনি তিনটি বিষয় উল্লেখ করেন:

    1. ইবরাহীম (আঃ)-এর দো‘আ
      — নবী ইবরাহীম (আঃ) কা‘বার পুনর্নির্মাণের সময় আল্লাহর দরবারে দো‘আ করেছিলেন:

      رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْهُمْ (সূরা আল-বাকারা ২:১২৯)
      অর্থাৎ, “হে আমাদের রব! তাদের মধ্য থেকে একজন রসূল প্রেরণ করুন।”
      এই দো‘আর ফলেই নবী মুহাম্মদ ﷺ-কে প্রেরণ করা হয়।

    2. ঈসা (আঃ)-এর সুসংবাদ
      — কুরআনে বর্ণিত আছে:

      وَمُبَشِّرًا بِرَسُولٍ يَأْتِي مِن بَعْدِي اسْمُهُ أَحْمَدُ (সূরা আস-সাফ ৬১:৬)
      অর্থাৎ, “আমার পর এমন এক রসূল আসবেন, যার নাম হবে আহমদ।”
      এটি নবী ঈসা (আঃ)-এর পক্ষ থেকে মুহাম্মদ ﷺ সম্পর্কে পূর্বাভাস।

    3. আমিনা (রাঃ)-এর স্বপ্ন
      — নবী ﷺ-এর মা আমিনা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) স্বপ্নে দেখেছিলেন যে, তাঁর গর্ভ থেকে এক নূর (আলো) নির্গত হয়েছে যা সিরিয়ার প্রাসাদসমূহ আলোকিত করেছে।
      এটি তাঁর জন্মের সময় নবুওয়াতের আলোক প্রকাশের প্রতীক — অর্থাৎ তাঁর আগমন এমন এক বরকত ও হিদায়াতের আলো নিয়ে আসবে, যা বিশ্বজগৎ আলোকিত করবে।

    এই তিনটি ঘটনাই প্রমাণ করে যে নবী ﷺ আল্লাহর বিশেষ পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর নবুওয়াত কেবল আরব সমাজের জন্য নয়, বরং সমস্ত মানবজাতির জন্য আলোকিত বার্তা


     আধ্যাত্মিক তাৎপর্য

    এই হাদীস আমাদের শেখায় যে নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর নবুওয়াত আদম (আঃ)-এর পূর্বেই নির্ধারিত ছিল; তাই তাঁর আগমন ছিল আল্লাহর সৃষ্টিজগতের উদ্দেশ্য পূরণের মূল অংশ।
    তিনি নবীদের সারির সমাপ্তি টানেন এবং তাঁর মাধ্যমে আল্লাহর বার্তা পূর্ণতা লাভ করে।
    এই হাদীস নবী ﷺ-এর মর্যাদা, পূর্বনির্ধারিত নবুওয়াত ও আল্লাহর নিকটে তাঁর বিশেষ স্থান স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে।


    📚 রেফারেন্সসমূহ

    • Jāmiʿ at-Tirmidhī, Kitāb al-Manāqib, Hadith 3609

    • Musnad Ahmad (17163)

    • Al-Bayhaqi, Dalā’il an-Nubuwwah (5/449)

    • Al-Hākim, Al-Mustadrak (2/608) — “Sahih upon the condition of Muslim”

    • Ibn Kathir, Al-Bidāyah wan-Nihāyah (3/409)


    গ্রেডিং ও বিশ্লেষণ:

    • ইমাম আল-হাকিম বলেছেন: “هَذَا حَدِيثٌ صَحِيحُ الإِسْنَادِ.”
      ➤ “এই হাদীসের সনদ সহীহ।”
    • ইমাম আল-আলবানী (السلسلة الصحيحة, হাদীস 1545) বলেছেন: إسناده صحيح.
    • ইমাম আল-তাবারানী এটিকে Dalā’il an-Nubuwwah-এ উল্লেখ করেছেন।

    🟢 উপসংহার: এটি সহীহ হাদীস এবং এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, নবুয়াত আল্লাহর নিকট স্থির ছিল আদম (আঃ)-এর সৃষ্টি পূর্বেই।


     ২. হাদীস: كنتُ نَبِيًّا وَآدَمُ بَيْنَ الْمَاءِ وَالطِّينِ

     হাদীসের পূর্ণ আরবি ইবারত ও সনদসহ বর্ণনা:

    عَنْ مَيْسَرَةَ الْفَجَرِ، قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، مَتَى كُنْتَ نَبِيًّا؟ قَالَ ﷺ:
    «كُنْتُ نَبِيًّا وَآدَمُ بَيْنَ الْمَاءِ وَالطِّينِ»

    📚 রেফারেন্স:
    رواه الإمام أحمد في “المسند” (جـ 4، صـ 66، حديث رقم: 17163)
    وأخرجه الحاكم في “المستدرك” (جـ 2، صـ 608) وصححه الذهبي.


    🌸 বাংলা অনুবাদ:

    মাইসারা আল-ফাজার (রহঃ) থেকে বর্ণিত:
    তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞাসা করলাম —
    “হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কবে নবী হয়েছিলেন?”
    তিনি উত্তরে বললেনঃ
    “আমি তখনই নবী ছিলাম, যখন আদম পানি ও মাটির মাঝে ছিলেন।”


    🌼 সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা (مختصر شرح):

    এই হাদীসটি নবীজী ﷺ-এর নবুওয়াতের পূর্বনির্ধারণ (تقدير النبوة) সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

    রাসূলুল্লাহ ﷺ এখানে বোঝাতে চেয়েছেন যে, তাঁর নবুওয়াত আল্লাহ তা‘আলার হুকুম ও সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আদম (আঃ)-এর সৃষ্টিরও পূর্বেই নির্ধারিত ছিল। অর্থাৎ, নবুওয়াত কেবল পৃথিবীতে আগমনের পর বা ওহি প্রাপ্তির মাধ্যমে শুরু হয়নি, বরং এটি আল্লাহর চিরকালীন পরিকল্পনার অংশ ছিল।

    🔹 “بين الماء والطين” বাক্যাংশের অর্থ হলো — আদম (আঃ)-এর সৃষ্টি এখনো সম্পূর্ণ হয়নি, তিনি তখনো পানি ও মাটির মাঝে ছিলেন; অর্থাৎ আল্লাহ তখনো তাঁকে আকার দিচ্ছিলেন। এই অবস্থায়ও আল্লাহ তা‘আলা তাঁর প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ﷺ-কে নবী হিসেবে মনোনীত করেছিলেন।

    🔹 এই হাদীস দ্বারা বোঝা যায়, নবীজীর মর্যাদা এবং তাঁর নবুওয়াত মানবজাতির অস্তিত্বেরও পূর্বে নির্ধারিত — যা তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও আল্লাহর পরিকল্পনায় তাঁর কেন্দ্রীয় অবস্থান নির্দেশ করে।

    🔹 অন্য বর্ণনায় এসেছে —
    «كنت نبيًّا وآدم بين الروح والجسد» (তিরমিযি, হাদীস 3609)
    অর্থাৎ “আমি নবী ছিলাম, যখন আদমের মধ্যে এখনো রূহ প্রবেশ করানো হয়নি।” — যা একই অর্থ বহন করে, নবুওয়াতের পূর্বনির্ধারণেরই প্রমাণ।


    🌺 মূল শিক্ষা:

    1. নবী মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর সৃষ্টিকর্মের সূচনালগ্নেই নবুওয়াতের মর্যাদা প্রাপ্ত।

    2. নবুওয়াত কোনো পার্থিব উপাধি নয়; এটি আল্লাহর চিরন্তন পরিকল্পনার অংশ।

    3. নবীজীর মহত্ত্ব ও মর্যাদা আদম (আঃ)-এরও পূর্বে নির্ধারিত — যা “خَاتَمُ النَّبِيِّينَ” (শেষ নবী) হিসেবে তাঁর মর্যাদা আরও স্পষ্ট করে।


    গ্রেডিং ও মতামত:

    • ইমাম হাকিম এই বর্ণনাকে সহীহ ইসনাদ বলেছেন।
    • কিন্তু কিছু মুহাদ্দিস (যেমন আল-ধাহাবী ও ইবন হাজার) বলেছেন:
      “এই হাদীসের isnad দুর্বল (ضعيف) কারণ কিছু বর্ণনাকারী অজানা।”
    • ইমাম আল-আলবানী এটিকে বলেছেন: ضعيف  ( দুর্বল)।

    উপসংহার: অর্থ সঠিক হলেও, isnad দুর্বল। তাই এটি শাওয়াহিদ (সহায়ক) হিসেবে গ্রহণযোগ্য, কিন্তু একক প্রমাণ নয়।


     ৩. হাদীস: প্রথম সৃষ্টি ছিল নবীর নূর (আলো)

     হাদীস: প্রথম সৃষ্টি ছিল নবীজীর নূর (আলো)

    📖 আরবি ইবারত (সম্পূর্ণ সনদসহ):

    رُوِيَ عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ:
    قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، بِأَبِي أَنْتَ وَأُمِّي، أَخْبِرْنِي عَنْ أَوَّلِ شَيْءٍ خَلَقَهُ اللَّهُ قَبْلَ الأَشْيَاءِ.
    فَقَالَ ﷺ:

    «يَا جَابِرُ، إِنَّ اللَّهَ خَلَقَ قَبْلَ الأَشْيَاءِ نُورَ نَبِيِّكَ مِنْ نُورِهِ،
    فَجَعَلَ ذَلِكَ النُّورَ يَدُورُ بِقُدْرَتِهِ حَيْثُ شَاءَ اللَّهُ،
    وَلَمْ يَكُنْ فِي ذَلِكَ الْوَقْتِ لَوْحٌ وَلَا قَلَمٌ وَلَا جَنَّةٌ وَلَا نَارٌ،
    وَلَا مَلَكٌ وَلَا سَمَاءٌ وَلَا أَرْضٌ وَلَا شَمْسٌ وَلَا قَمَرٌ،
    وَلَا إِنْسٌ وَلَا جَانٌّ…»

    📚 রেফারেন্স:
    এই হাদীসটি ইমাম ʿAbd ar-Razzāq তাঁর Musannaf-এ এবং ইমাম ʿAbd al-Raḥmān al-Suyūṭī তাঁর al-Ḥāwī lil Fatāwī (Vol. 2, p. 134)–এ বর্ণনা করেছেন।
    এটি হাদীসবিদদের মতে “মাওকূফ বা হাসান” স্তরের, তবে সুফি মাশায়িখ ও প্রাথমিক সালাফগণ একে ফজায়েলের হাদীস হিসেবে গ্রহণ করেছেন।


    🌸 বাংলা অনুবাদ:

    জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন,
    আমি জিজ্ঞেস করলাম,
    “হে আল্লাহর রাসূল ﷺ! আমার পিতা-মাতা আপনার উপর কুরবান হোক — আমাকে বলুন, আল্লাহ তাআলা সর্বপ্রথম কী সৃষ্টি করেছেন?”

    নবী করিম ﷺ বললেনঃ

    “হে জাবির! আল্লাহ তাআলা সর্বপ্রথম সমস্ত কিছুর আগে তোমার নবীর নূর (আলো) তাঁর নিজের নূর থেকে সৃষ্টি করেছেন।
    তারপর সেই নূরকে তিনি তাঁর ক্ষমতার দ্বারা যেভাবে চাইলেন, সেভাবেই চলমান রাখলেন।
    তখন কোনো লওহ (সংরক্ষিত পটিকা) ছিল না, কলম ছিল না, জান্নাত বা জাহান্নাম ছিল না,
    কোনো ফেরেশতা, আসমান, জমিন, সূর্য, চাঁদ, মানুষ বা জিন — কিছুই ছিল না।”


     সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা (مختصر شرح):

    এই হাদীসটি নবীজী ﷺ–এর অস্তিত্বের সূচনাআদম (আঃ)-এরও পূর্বে তাঁর নবুওয়াতের নির্ধারণের ব্যাখ্যা দেয়।

    🔹 নবী করিম ﷺ বলেছেন, তাঁর নূর (আলো) আল্লাহ তাআলা নিজের নূর থেকে সৃষ্টি করেছেন। এটি দুনিয়াবি আলো নয়, বরং রূহানী ও আধ্যাত্মিক এক নূর — যা সমস্ত সৃষ্টির মূল।

    🔹 আল্লাহ প্রথমে নবীজীর নূর সৃষ্টি করে তাকে তাঁর ইচ্ছামতো চলমান রেখেছিলেন; পরে সেই নূর থেকেই সমস্ত সৃষ্টি (আসমান, জমিন, ফেরেশতা, মানুষ ইত্যাদি) ধীরে ধীরে সৃষ্টি করা হয়।

    🔹 অনেক মুফাসসির ও সুফি আলেম (যেমন ইমাম বায়হাকী, ইমাম কুরতুবী, ইমাম সিউতী) বলেন — এই হাদীসের মাধ্যমে বোঝা যায় যে, নবী মুহাম্মাদ ﷺ হচ্ছেন সমস্ত সৃষ্টির কারণ ও কেন্দ্রবিন্দু।

    🔹 ইমাম জাজরী (رحمه الله) বলেন —

    “النبي ﷺ هو أول المخلوقات وجودًا، وآخرهم بعثًا.”
    অর্থাৎ: “নবী ﷺ হচ্ছেন সৃষ্টির প্রথম অস্তিত্ব এবং প্রেরিত নবীদের মধ্যে শেষ নবী।”


    🌺 মূল শিক্ষা:

    1. নবী মুহাম্মাদ ﷺ হলেন আল্লাহর সৃষ্টিকর্মের সূচনালগ্নেই নির্ধারিত এক নূর — মানবজাতির দিশারী ও চূড়ান্ত নবী।

    2. আল্লাহর ভালোবাসা ও হিকমতের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন এই “নূর মুহাম্মাদ ﷺ”।

    3. এই হাদীস নবীজীর মর্যাদা, সৃষ্টি জগতের মূল উৎস ও আল্লাহর পরিকল্পনার গভীর রহস্য প্রকাশ করে।


    গ্রেডিং ও মতামত:

    • ইমাম সাখাওয়ী, আল-আলবানী, ইবন তাইমিয়াহ একে বলেছেন:
      “ليس له أصل” — “এর কোনো সহীহ উৎস নেই।”
    • তবে সুফি ও তাফসীরকারদের মধ্যে (যেমন কস্তালানী, বুসিরী, আজিজ দাহলান) অনেকেই এটি আধ্যাত্মিক সত্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

    উপসংহার: এটি হাদীস হিসেবে দুর্বল  কিন্তু নবীর মর্যাদা প্রকাশে অনেক সুফি চিন্তাধারায় এটি প্রচলিত।


     ৪. ইসলামী আলেমদের মতামত

    আলেম মতামত
    ইমাম আল-হাকিম নবীর নবুয়াত আদমের পূর্বে আল্লাহর নিকট নির্ধারিত ছিল
    ইমাম আল-বায়হাকী নবীর নূর প্রথম সৃষ্টিগুলির একটি
    ইবন তাইমিয়াহ নূর মুহাম্মাদী হাদীস বানোয়াট, তবে নবীর মর্যাদা বিশেষ
    ইমাম সাবুনী ও আল-তাবারী নবী ﷺ “নবুয়াতের নূর” ছিলেন, অর্থাৎ আল্লাহর কাছে পূর্বনির্ধারিত নবুয়াত
    সুফি আলেমগণ (যেমন কস্তালানী, বুসিরী) নবীর নূর প্রথম সৃষ্টি এবং আকাশের তারকার মতো আলোকিত বাস্তবতা

    4 thoughts on “হযরত আদম (আঃ)কে আগে সৃষ্টি করা হয়েছে নাকি হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কে আগে সৃষ্টি করা হয়েছে

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *