স্বামী স্ত্রী একে অপরের লজ্জাস্থান চুষতে পারবে কিনা?
স্বামী-স্ত্রী একে অপরের লজ্জাস্থানে মুখ দিয়ে চোষা (oral sex) ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে একটি আলোচিত ও বিতর্কিত বিষয়। এতে ইসলামিক স্কলারদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। নিচে কুরআন, হাদীস, ফিকহ এবং সমসাময়িক আলেমদের মতামত অনুযায়ী একটি বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো।
১. কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি
আল-কুরআনে সরাসরি এই বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা বা অনুমোদন নেই। তবে যৌন সম্পর্কের নীতিমালার কিছু সাধারণ দিক বর্ণিত হয়েছে, যেমন:তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের জন্য শস্যক্ষেত্র; অতএব, তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছা প্রবেশ করো…”— সূরা আল-বাকারা, ২:২২৩
ইবনে কাসীর, তাফসীরুল জালালাইন প্রভৃতি তাফসীরে উল্লেখ করা হয়েছে যে এই আয়াত যৌনসংগমের ভঙ্গি ও পদ্ধতির ব্যাপারে শিথিলতা দেখায়, তবে সঙ্গম যেন যৌনাঙ্গে হয় (না-যে, পায়ুপথে নয়)। কিন্তু মুখমেহনের বিষয়ে এখানে কিছু বলা হয়নি।
স্বামী ও স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্ক ইসলাম ধর্মে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তা শুধু দৈহিক নয় বরং আত্মিক ঘনিষ্ঠতার সম্পর্ক। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন:
“هن لباس لكم وأنتم لباس لهن”
“তারা তোমাদের জন্য পোশাক, আর তোমরা তাদের জন্য পোশাক।”
(সূরা আল-বাকারা: ১৮৭)
এই আয়াতে স্বামী-স্ত্রীর ঘনিষ্ঠতা, নিরাপত্তা, ভালোবাসা ও শারীরিক সম্পর্ককে সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরা হয়েছে
২. হাদীসের আলোকে
সরাসরি এই বিষয়ে সহীহ হাদীস পাওয়া যায় না। তবে কিছু জেনারেল হাদীস আছে যা যৌনতা ও স্ত্রীর সাথে ভাল ব্যবহারের কথা বলে:
“তোমাদের মধ্যে উত্তম হলো সে ব্যক্তি যে তার স্ত্রীর প্রতি উত্তম আচরণ করে।”
— সহীহ তিরমিযী: ৩৮৯৫
এই হাদীস যৌনতেও পারস্পরিক সম্মান ও ভালোবাসার দিকটি প্রাধান্য দেয়। মুখমেহন হারাম কি না, এ বিষয়ে সরাসরি দলিল না থাকায় ফিকহ বিশেষজ্ঞদের মতামত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
হাদীসে এসেছে,
“وفي بضع أحدكم صدقة.”
“তোমাদের কেউ যখন স্ত্রীর সাথে সহবাস করে, তাতেও সওয়াব রয়েছে।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১০০৬)
ইসলামী শরীয়তে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে সহবাস ও যৌন সম্পর্ক বৈধ ও প্রশংসনীয়, যতক্ষণ তা ইসলামি সীমারেখার মধ্যে থাকে এবং হারাম কোনো পদ্ধতি ব্যবহার না করা হয়।
৩. ইসলামিক স্কলারদের মতামত
(ক) হানাফী মাযহাবের মতামত:
- হানাফী আলেমগণ সাধারণত মুখমেহনকে মাকরূহ তানযীহী (অপছন্দনীয়) বলেছেন। হারাম নয়, কিন্তু সম্মানজনক নয়।
- হানাফি মাযহাবের অধিকাংশ ফকীহগণ বলেন, স্বামী-স্ত্রী একে অপরের শরীরের যেকোনো অংশ স্পর্শ করতে ও চুম্বন করতে পারে, তবে যা নাজায়েয তা হলো পশ্চাৎদ্বারে সহবাস
(খ) মালিকী ও শাফেয়ী মাযহাব:
- মুখমেহনকে স্পষ্টভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। শরীরের নাপাক অংশ (যেমন: প্রস্রাব ও রজঃস্রাবের রাস্তা) মুখে নেওয়া ইসলামিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী।
(গ) হাম্বলী মাযহাব:
- যদি কোনো হানিফা না হয় (যেমন বীর্য বা মযী মুখে প্রবেশ না করে), তবে এটি জায়েয (অনুমোদিত) হতে পারে, তবে অপছন্দনীয়।
৪. সমসাময়িক আলেমদের মতামত
(১) শেখ ইউসুফ আল-কারাযাভী (রহ.):
- তিনি বলেন, মুখমেহন শরীয়তের দৃষ্টিতে স্পষ্ট হারাম নয়, তবে এটি অপছন্দনীয় এবং ইসলামী শালীনতার পরিপন্থী হতে পারে।
(২) শেখ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ (islamqa.info):
- মুখমেহন যদি স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সম্মতিতে হয় এবং মুখে বীর্য প্রবেশ না করে, তবে এটি জায়েয হতে পারে। তবে নৈতিকভাবে এটি পরিহার করাই উত্তম।
(৩) দারুল উলুম দেওবন্দ ফতোয়া:
- তারা একে মাকরূহ বলেছেন এবং এর চেয়ে উত্তম বিকল্পে যৌনতা নির্ভর করার পরামর্শ দিয়েছেন।
ড. যাকির নায়েক:
এক প্রশ্নোত্তরে বলেন, মুখ দ্বারা এমন আচরণ হারাম বলা যায় না, তবে তা বিবেচনার বিষয় এবং স্বামী-স্ত্রী দুজনের সম্মতির উপর নির্ভরশীল। কিন্তু তিনি জোর দিয়ে বলেন যে এতে যেন অপবিত্রতা গলাধঃকরণ না হয়, এবং অশ্লীলতা ও বিকৃতি যেন এর মাধ্যমে দাম্পত্য জীবনে প্রবেশ না করে।
৫. মুখমেহনের ক্ষেত্রে মূল বিবেচনা:

| বিষয় | মূল্যায়ন |
|---|---|
| দলিলের অবস্থান | সরাসরি নিষেধ বা অনুমোদন নেই |
| শরীয়তের দৃষ্টিকোণ | হারাম নয়, কিন্তু অপছন্দনীয় |
| শর্ত | মুখে বীর্য/মযী প্রবেশ না করা |
| সম্মতি | স্বামী-স্ত্রীর সম্মতি থাকা আবশ্যক |
| ইসলামিক রুচি ও শালীনতা | মুখমেহন ইসলামী শালীনতার পরিপন্থী হতে পারে |
৬. উপসংহার
ইসলামী শরীয়তে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে মুখমেহন স্পষ্ট হারাম নয়, তবে অপছন্দনীয় বা মাকরূহ হিসেবে বিবেচিত। এটি করলে গুনাহ হবে না, তবে রুচিগত ও নৈতিকভাবে ইসলাম এতে উৎসাহ দেয় না। উত্তম হলো—স্বামী-স্ত্রীর যৌন জীবনে পরস্পরের আরাম, সম্মান ও আত্মার পরিশুদ্ধি বজায় রেখে সম্পর্ক গঠন করা।
সূত্রসমূহ:
- ইসলামিক ফিকহ একাডেমি
- فتاوى الشيخ ابن عثيمين
- فتاوى دار الإفتاء المصرية
- islamqa.info (Fatwa No: 20221)
- কিতাব: فقه السنة – السيد سابق
- তাফসীর ইবনে কাসীর, সূরা আল-বাকারা: ২২৩

