Islamic Life

সুন্নতে মুয়াক্কাদা ও গায়রে মুয়াক্কাদা নামাজের বিধান

সুন্নতে মুয়াক্কাদা

ফরজ নামাজের আগে ও পরে সুন্নতে মুয়াক্কাদা ও গায়রে মুয়াক্কাদা নামাজের বিধান

ভূমিকা

ইসলামি শরিয়তে পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পাশাপাশি কিছু অতিরিক্ত নামাজ রয়েছে, যেগুলোকে সুন্নত নামাজ বলা হয়। এগুলোর মধ্যে কিছু সুন্নতে মুয়াক্কাদা (জোরালো সুন্নত) এবং কিছু সুন্নতে গায়রে মুয়াক্কাদা (কম গুরুত্বের সুন্নত)। মুসলমানের দৈনন্দিন ইবাদতে এসব নামাজের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। প্রশ্ন হলো—হঠাৎ যদি কেউ দুই–একবার এসব সুন্নত নামাজ ছেড়ে দেয়, তার বিধান কী? আর কেউ যদি নিয়মিতভাবে বর্জন করে, তার শরঈ অবস্থান কী?

এই প্রবন্ধে কুরআন, সহিহ হাদিসের আরবি ইবারত, এবং চার মাজহাবের ইমামদের মতামতের আলোকে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

সুন্নতে মুয়াক্কাদা ও গায়রে মুয়াক্কাদা কী?

১. সুন্নতে মুয়াক্কাদা

যে নামাজগুলো রাসূলুল্লাহ ﷺ নিয়মিত আদায় করতেন এবং খুব কম ক্ষেত্রেই ত্যাগ করেছেন, সেগুলোকে সুন্নতে মুয়াক্কাদা বলা হয়। যেমন:

সুন্নতে মুয়াক্কাদা
সুন্নতে মুয়াক্কাদা

ফজরের ফরজের আগে ২ রাকাত

যোহরের আগে ৪ রাকাত ও পরে ২ রাকাত

মাগরিবের পরে ২ রাকাত

এশার পরে ২ রাকাত

২. সুন্নতে গায়রে মুয়াক্কাদা

যে নামাজগুলো রাসূল ﷺ কখনো আদায় করেছেন, আবার কখনো ছেড়ে দিয়েছেন—সেগুলো সুন্নতে গায়রে মুয়াক্কাদা। যেমন:

আসরের আগে ৪ রাকাত

এশার আগে ৪ রাকাত

 

কুরআনের দৃষ্টিতে নফল ও অতিরিক্ত ইবাদতের গুরুত্ব

যদিও কুরআনে সরাসরি সুন্নত নামাজের সংখ্যা নির্ধারণ করে বলা হয়নি, তবে নফল ও অতিরিক্ত ইবাদতের প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

> وَمَا تَقَدَّمُوا لِأَنفُسِكُم مِّنْ خَيْرٍ تَجِدُوهُ عِندَ اللَّهِ

“তোমরা নিজেদের জন্য যে কোনো ভালো কাজ অগ্রিম পাঠাও, তা আল্লাহর কাছে পাবে।” (সূরা আল-বাকারা: ১১০)

 

ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেন, এই আয়াতের অন্তর্ভুক্ত ফরজের পাশাপাশি সুন্নত ও নফল আমলও।

হাদিসে সুন্নত নামাজের গুরুত্ব (আরবি ইবারতসহ)

ফজরের সুন্নত সম্পর্কে

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

> رَكْعَتَا الْفَجْرِ خَيْرٌ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا

“ফজরের দুই রাকাত সুন্নত দুনিয়া ও দুনিয়ার সবকিছুর চেয়েও উত্তম।” (সহিহ মুসলিম: ৭২৫)

 

১২ রাকাত সুন্নতের ফজিলত

> مَنْ صَلَّى فِي يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ اثْنَتَيْ عَشْرَةَ رَكْعَةً بُنِيَ لَهُ بَيْتٌ فِي الْجَنَّةِ

“যে ব্যক্তি দিনে ও রাতে বারো রাকাত (সুন্নত) নামাজ আদায় করবে, তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করা হবে।” (সহিহ মুসলিম: ৭২৮)

 

হঠাৎ দুই–একবার সুন্নত নামাজ ছেড়ে দিলে বিধান

চার মাজহাবের ফকিহদের মতে:

ভুলে, ব্যস্ততায় বা বিশেষ কারণে সুন্নতে মুয়াক্কাদা দুই–একবার ছেড়ে দিলে গুনাহ হবে না।

তবে এটি অভ্যাসে পরিণত করা ঠিক নয়।

ইমাম নববি (রহ.) বলেন:

> “সুন্নতে মুয়াক্কাদা কখনো ছেড়ে দেওয়া গুনাহ নয়, কিন্তু তা নিয়মে পরিণত করা মাকরূহ।” (শরহু সহিহ মুসলিম)

 

নিয়মিত সুন্নতে মুয়াক্কাদা বর্জন করলে বিধান

এখানে ফকিহদের মতামত কিছুটা কঠোর:

হানাফি মাজহাব

নিয়মিত সুন্নতে মুয়াক্কাদা ছেড়ে দেওয়া গুনাহের কাছাকাছি এবং ফাসিকি স্বভাবের আলামত।

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, ইচ্ছাকৃত অভ্যাসগত বর্জন নিন্দনীয়।

শাফেয়ি, মালিকি ও হাম্বলি মাজহাব

নিয়মিত বর্জন মাকরূহে তাহরিমি বা মাকরূহে শাদিদ।

এতে রাসূল ﷺ–এর সুন্নতের প্রতি অবহেলা প্রকাশ পায়।

রাসূল ﷺ বলেন:

> مَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي

“যে আমার সুন্নত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সে আমার দলভুক্ত নয়।” (সহিহ বুখারি: ৫০৬৩)

 

উলামায়ে কেরাম বলেন, এখানে ‘মুখ ফিরিয়ে নেওয়া’ বলতে সুন্নতকে তুচ্ছ মনে করে নিয়মিত বর্জন করাকে বোঝানো হয়েছে।

সুন্নতে গায়রে মুয়াক্কাদা ছেড়ে দেওয়ার বিধান

এগুলো আদায় করলে সওয়াব রয়েছে

নিয়মিত না পড়লেও গুনাহ নেই

তবে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অবহেলা করা তাকওয়ার পরিপন্থী

 

উপসংহার

ফরজ নামাজের আগে ও পরে সুন্নত নামাজগুলো মুসলিম জীবনের সৌন্দর্য ও পূর্ণতার অংশ। হঠাৎ দুই–একবার ছেড়ে দিলে গুনাহ না হলেও নিয়মিত বর্জন করা সুন্নতের প্রতি অবজ্ঞার শামিল। বিশেষ করে সুন্নতে মুয়াক্কাদা নিয়মিত আদায় করার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর নৈকট্য ও রাসূল ﷺ–এর ভালোবাসা অর্জন করতে পারে।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *