শবে বরাত, লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান, বিদ‘আত না কি? ফজিলত, গবেষণামূলক আলোচনা ও বিশ্লেষণ
ভূমিকা
শাবান মাসের ১৪ তারিখের দিবাগত রাত, যা মুসলিম সমাজে শবে বরাত বা লাইলাতুন নিসফি মিন শা‘বান নামে পরিচিত—এ রাতের ফজিলত নিয়ে উম্মাহর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা ও মতভেদ বিদ্যমান। একদল এটিকে রহমত ও মাগফিরাতের রাত হিসেবে গুরুত্ব দিয়ে আসছেন, অন্যদিকে আরেকদল এটিকে সম্পূর্ণভাবে বিদ‘আত বলে অস্বীকার করছেন। এই প্রবন্ধে আবেগ বা প্রচলন নয়; বরং হাদিস, সনদ, সালাফ ও ইমামদের বক্তব্যের আলোকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও গবেষণামূলক আলোচনা উপস্থাপন করা হলো।
(لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَان)
গবেষণামূলক আলোচনা: হাদিস, সনদ, মান ও বিশ্লেষণ
১️⃣ প্রথম হাদিস (মু‘আয ইবনু জাবাল রা.)
عَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، عَنِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ: يَطَّلِعُ اللَّهُ إِلَى خَلْقِهِ فِي لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، فَيَغْفِرُ لِجَمِيعِ خَلْقِهِ، إِلَّا لِمُشْرِكٍ أَوْ مُشَاحِنٍ
🔹 বাংলা অনুবাদ
মু‘আয ইবনু জাবাল (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“শাবানের মধ্যরাতে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সৃষ্টির প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেন এবং সকল সৃষ্টিকে ক্ষমা করে দেন; তবে মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যক্তি ছাড়া।”—
🔹 ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ
এখানে يَطَّلِعُ اللَّهُ শব্দ দ্বারা আল্লাহর বিশেষ রহমত ও করুণা প্রকাশ বোঝানো হয়েছে।
“মুশরিক” ও “মুশাহিন (বিদ্বেষী)”—এই দুই শ্রেণিকে বাদ দেওয়ার মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে আকীদা ও অন্তরের পরিশুদ্ধতা এই রাতে ক্ষমা পাওয়ার মূল শর্ত।
এই হাদিসটি একাধিক সনদে বর্ণিত হওয়ায় মুহাদ্দিসগণ একে গ্রহণযোগ্য বলেছেন।
🔹 হাদিসের মান

✔️ সহিহ (صحيح)
🔹 রেফারেন্স
সহিহ ইবনু হিব্বান, হাদিস: 5665
আত-তাবারানী, আল-মু‘জামুল কাবীর
শাইখ আল-আলবানী (রহ.): সহিহুল জামি‘, হাদিস: 1819
—
২️⃣ দ্বিতীয় হাদিস (আবু মূসা আল-আশ‘আরী রা.)
عَنْ أَبِي مُوسَى الْأَشْعَرِيِّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، عَنْ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ قَالَ: > إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يَطَّلِعُ فِي لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، فَيَغْفِرُ لِجَمِيعِ خَلْقِهِ، إِلَّا لِمُشْرِكٍ أَوْ مُشَاحِنٍ
🔹 বাংলা অনুবাদ
আবু মূসা আশ‘আরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা শাবানের মধ্যরাতে তাঁর সকল সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টি দেন এবং সবাইকে ক্ষমা করে দেন; তবে মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া।”
—
🔹 ব্যাখ্যা
এই হাদিসটি পূর্ববর্তী হাদিসের অর্থকে শক্তিশালী করে এবং প্রমাণ করে যে শবে বরাতের ফজিলত একক বর্ণনার ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং একাধিক সাহাবির সূত্রে বর্ণিত।
—
একাধিক সাহাবি থেকে বর্ণনা: হাদিসের শক্তি
শবে বরাতের ফজিলত সম্পর্কিত হাদিসসমূহ বর্ণিত হয়েছে—
মু‘আয ইবনু জাবাল, আবু মূসা আশ‘আরী, আবু হুরাইরা, আয়শা (রাঃ), আউফ ইবনু মালিক (রাঃ) প্রমুখ সাহাবিদের মাধ্যমে।
উসূলুল হাদিস অনুযায়ী, একই مضمون যদি একাধিক সাহাবি থেকে আসে, তবে কিছু সনদ দুর্বল হলেও সমষ্টিগতভাবে (مجموع الطرق) তা حسن لغيره বা গ্রহণযোগ্য স্তরে উন্নীত হয়।
—
“শবে বরাত বিদ‘আত”—এই দাবির বিশ্লেষণ
বিদ‘আতের সংজ্ঞা হলো— যে আমলের কোনো ভিত্তি কুরআন, সুন্নাহ, সাহাবা বা সালাফের যুগে নেই।
এখন প্রশ্ন হলো—শবে বরাতের ভিত্তি আছে কি?
উত্তর: আছে—হাদিসে, সাহাবি বর্ণনায় ও তাবেয়ীদের আমলে।
—
ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহ.)-এর বক্তব্য
> “ليلة النصف من شعبان قد رُوي في فضلها أحاديث متعددة وآثار عن السلف”
📚 مجموع الفتاوى (23/132)
অর্থ:
“শাবান মাসের মধ্যরাতের ফজিলত সম্পর্কে একাধিক হাদিস ও সালাফদের থেকে বর্ণনা পাওয়া যায়।”
যাকে অনেকেই বিদ‘আত বলার জন্য ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহকে উদ্ধৃত করেন, তিনি নিজেই এই রাতের ফজিলতের ভিত্তি স্বীকার করেছেন।
—
সালাফ ও তাবেয়ীদের আমল
ইমাম ইবনু রজব হাম্বলী (রহ.) বলেন—
> “وكان التابعون من أهل الشام ويجتهدون فيها في العبادة”
📚 لطائف المعارفيعظمونها
অর্থ:
“শাম অঞ্চলের তাবেয়ীগণ এই রাতকে গুরুত্ব দিতেন এবং ইবাদতে মশগুল থাকতেন।”
যে রাতে তাবেয়ীরা ইবাদত করেছেন, সে রাতকে বিদ‘আত বলা সালাফের পথের বিরোধী।
—
তাহলে বিদ‘আত কোথায়?
বিদ‘আত রাতটিকে মানায় না, বরং বিদ‘আত হলো—
নির্দিষ্ট রাকাত নির্ধারণ করা
নির্দিষ্ট সূরা বাধ্যতামূলক করা
রাতটিকে উৎসব বা ঈদের মতো পালন করা
এসবের কোনো সহিহ দলিল নেই—এগুলোই পরিত্যাজ্য।
🔹 হাদিসের মান
✔️ হাসান (حسن)
🔹 রেফারেন্স
সুনান ইবনু মাজাহ, হাদিস: 1390
ইমাম বুসাইরী – مصباح الزجاجة
শাইখ আল-আলবানী (রহ.) – হাসান বলেছেন
৩️⃣ তৃতীয় হাদিস (হযরত আয়িশা রা.)
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: > فَقَدْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ لَيْلَةً، فَخَرَجْتُ فَإِذَا هُوَ بِالْبَقِيعِ،فَقَالَ: إِنَّ اللَّهَ يَنْزِلُ لَيْلَةَ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا، فَيَغْفِرُ لِأَكْثَرَ مِنْ عَدَدِ شَعَرِ غَنَمِ بَنِي كَلْبٍ
🔹 বাংলা অনুবাদ
হযরত আয়িশা (রাঃ) বলেন—
আমি এক রাতে রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে না পেয়ে বের হলাম, দেখি তিনি জান্নাতুল বাকীতে আছেন। তিনি বললেন—
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা শাবানের মধ্যরাতে নিকটবর্তী আকাশে অবতরণ করেন এবং বনি কালব গোত্রের ভেড়ার লোমের সংখ্যার চেয়েও বেশি মানুষকে ক্ষমা করেন।”
—
🔹 হাদিসের মান
✔️ হাসান (مجموع الطرق)
(এককভাবে দুর্বল হলেও একাধিক সনদের কারণে গ্রহণযোগ্য)
🔹 রেফারেন্স
সুনান তিরমিজি, হাদিস: 739
মুসনাদ আহমাদ
ইমাম তিরমিজি: “هذا حديث حسن”
—
সামগ্রিক গবেষণামূলক সিদ্ধান্ত
✔ শাবান মাসের ১৪ তারিখের দিবাগত রাতের ফজিলত হাদিস দ্বারা প্রমাণিত
✔ সালাফ ও তাবেয়ীদের আমল দ্বারা সমর্থিত
✔ এই রাতে আল্লাহর বিশেষ রহমত ও ক্ষমা বর্ষিত হয়
✔ সাধারণ নফল ইবাদত, দোয়া, তওবা—মুস্তাহাব
❌ নির্দিষ্ট রাকাত বা নির্দিষ্ট আমলের জন্য সহিহ দলিল নেই
❌ একে সম্পূর্ণ বিদ‘আত বলা দলিলবিহীন চরমপন্থা
❌ নির্দিষ্ট আমল বানানো বাস্তব বিদ‘আত
সঠিক পথ হলো:
নির্দিষ্ট রীতি ছাড়া সাধারণ নফল ইবাদত, তওবা ও ইস্তিগফার।
উপসংহার
শবে বরাত সম্পর্কে হাদিসসমূহ একত্রে বিবেচনায় গ্রহণযোগ্য।
এটি কোনো উৎসবের রাত নয়, বরং— আত্মশুদ্ধি, তওবা ও বিদ্বেষমুক্ত হৃদয়ের রাত।

