মূসা আলাইহিস সালাম ও কারূণ-এর ঘটনা ইসলামী ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য এবং শিক্ষনীয় কাহিনী, যা অহংকার, কৃত্রিম বৈভব ও নবীদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের পরিণতি কী ভয়াবহ হতে পারে তা ব্যাখ্যা করে। কুরআন, হাদীস এবং তাফসীর গ্রন্থসমূহে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা পাওয়া যায়।
কারূণ কে ছিলেন
কারূণ ছিলেন হযরত মূসা আলাইহিস সালামের গোত্রীয় লোক, অর্থাৎ তিনি বনী ইসরাইলের একজন। তিনি প্রাথমিকভাবে ধার্মিক ছিলেন এবং তাওরাত তিলাওয়াত করতেন। আল্লাহ তাকে অসাধারণ ধন-সম্পদ দান করেছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি অহংকারে নিমজ্জিত হয়ে পড়েন এবং তার সম্পদকে নিজের কৃতিত্ব বলে দাবি করতে শুরু করেন।
কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী কারূণের সম্পদের বিশালতা
القصص – ৭৬
إِنَّ قَارُونَ كَانَ مِنْ قَوْمِ مُوسَى فَبَغَىٰ عَلَيْهِمْ ۖ وَآتَيْنَاهُ مِنَ الْكُنُوزِ مَا إِنَّ مَفَاتِحَهُ لَتَنُوءُ بِالْعُصْبَةِ أُولِي الْقُوَّةِ
অর্থাৎ: “নিশ্চয় কারূণ ছিল মূসার জাতির অন্তর্ভুক্ত, কিন্তু সে তাদের বিরুদ্ধে অহংকার করেছিল। আমি তাকে এত সম্পদ দিয়েছিলাম যে, তার ধনের চাবিগুলো শক্তিশালী লোকদের জন্যও ভারী ছিল।”
সূরা আল-কাসাস (২৮): ৭৬
কারূণের ষড়যন্ত্র: এক নারীর মিথ্যা সাক্ষ্য
হযরত মূসা আলাইহিস সালাম যখন আল্লাহর পয়গাম প্রচার করছিলেন এবং নেতৃত্বে আসীন ছিলেন, তখন কারূণ ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েন। সে নবীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে শুরু করে। বিভিন্ন কিতাবে (বিশেষত তাফসীর ইবনে কাসীর, রূহুল মা’আনী, কাসাসুল আম্বিয়া প্রভৃতি) উল্লেখ রয়েছে যে, কারূণ এক দুষ্ট কৌশল নেয়।
কারূণ এক নারীর কাছে অর্থ ও প্রতিশ্রুতি দিয়ে মূসা আলাইহিস সালামের বিরুদ্ধে চরিত্রহননের অপচেষ্টা চালায়।
সে ঐ নারীকে বলে, “তুমি বলবে মূসা তোমার সাথে জেনার কাজ করেছেন।
মহিলার সাক্ষ্য ও তার পরিণতি
মহিলা শুরুতে কারূণের প্রস্তাবে রাজি হয়। কিন্তু যখন মূসা আলাইহিস সালাম কওমের সামনে আল্লাহর আহকাম বর্ণনা করছিলেন, তখন সেই নারী দাঁড়িয়ে মিথ্যা অভিযোগ করার জন্য প্রস্তুত হয়। হযরত মূসা (আঃ) তখন আল্লাহর নাম নিয়ে বলেন, “যদি আমি এই অপরাধ করে থাকি, তবে আল্লাহর লানত আমার উপর নেমে আসুক।”
এই শপথ শুনে **মহিলা কেঁদে ফেলে এবং বলে দেয়: হে নবী, আমি মিথ্যা বলছি। আমাকে কারূণ অর্থ দিয়ে শিখিয়েছে এই মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে।”
কারূণের পরিণতি
এই ষড়যন্ত্রের পরে আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি আসে। হযরত মূসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করেন, এবং তখনই আল্লাহ তাঁর দোআ কবুল করেন।
القصص – ৮১
فَخَسَفْنَا بِهِ وَبِدَارِهِ الْأَرْضَ
অর্থাৎ: “অতঃপর আমি তাকে এবং তার ঘর-বাড়িকে ভূগর্ভে ধসিয়ে দিলাম।”
সূরা আল-কাসাস (২৮): ৮১
ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, আল্লাহ তা’আলা কারূণকে তার সমস্ত ধন-সম্পদসহ এমনভাবে মাটির নিচে ঢুকিয়ে দেন যে, তার কোনো চিহ্নই আর অবশিষ্ট থাকে না।
কারূণের সম্পদ ও অহংকারের ধ্বংসের শিক্ষা
কারূণ তার ধন-সম্পদ ও প্রতিপত্তির অহংকারে অন্ধ হয়ে নবীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিল। তার অহংকার ও ষড়যন্ত্র তাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। আল্লাহ তাকে এমনভাবে শাস্তি দেন, যা কিয়ামত পর্যন্ত এক ভয়ংকর দৃষ্টান্ত হিসেবে থেকে যাবে।
উপসংহার
কারূণ ছিলেন হযরত মূসা আলাইহিস সালামের কওমের একজন ধনী ও গর্বিত ব্যক্তি। সে হিংসা, অহংকার ও ষড়যন্ত্রের পথে গিয়ে এক নারীর মাধ্যমে নবীর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলতে চেয়েছিল। কিন্তু সেই নারী শেষ মুহূর্তে সত্য বলে ফেলে। আল্লাহ তাঁর নবীকে রক্ষা করেন এবং ষড়যন্ত্রকারী কারূণকে তার ধন-সম্পদসহ মাটির নিচে ধসিয়ে দেন। এটি প্রমাণ করে, আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের রক্ষা করেন এবং ষড়যন্ত্রকারীদের কঠিন পরিণতি দেন।

