Islamic Life

গুইসাপ খাওয়া জায়েজ কি?

গুইসাপ খাওয়া জায়েজ কি?

 

গুইসাপ খাওয়া জায়েজ কি?

কুরআন, হাদীস ও ইসলামী স্কলারদের আলোকে বিশ্লেষণ

ইসলামী শরীয়তের আলোকে কোন খাবার হালাল আর কোনটি হারাম তা নির্ধারিত হয় কুরআন, হাদীস, সাহাবীদের আমল এবং ইসলামি ফিকহ বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যার ভিত্তিতে। গুইসাপ একটি মরুভূমির প্রাণী, বিশেষ করে আরব অঞ্চলে দেখা যায়। এ প্রাণী খাওয়া শরীয়তসম্মত কি না—এ বিষয়ে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

গুইসাপ খাওয়া জায়েজ কি?

কুরআনের আলোকে

১. পবিত্র ও অপবিত্র খাদ্য নির্ধারণ প্রসঙ্গে কুরআনের ইবারত:

قُل لَّا أَجِدُ فِي مَا أُوحِيَ إِلَيَّ مُحَرَّمًا عَلَىٰ طَاعِمٍ يَطْعَمُهُ إِلَّا أَن يَكُونَ مَيْتَةً أَوْ دَمًا مَّسْفُوحًا أَوْ لَحْمَ خِنزِيرٍ فَإِنَّهُ رِجْسٌ
সুরা আন’আম, আয়াত: ১৪৫

অনুবাদ: বলুন, আমার প্রতি যা ওহি করা হয়েছে তাতে আমি এমন কিছু পাই না, যা কোনো ভক্ষণকারীর জন্য হারাম, যদি না তা মৃত জানোয়ার হয়, বা প্রবাহিত রক্ত, কিংবা শূকরের মাংস — নিশ্চয়ই তা অপবিত্র।

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, হারাম খাদ্যের নির্দিষ্ট তালিকা রয়েছে, এবং তার বাইরে কিছু হারাম প্রমাণ করতে হলে নির্দিষ্ট দলিল থাকতে হবে।

২. আরও একটি কুরআনি দিকনির্দেশনা:

وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ
সুরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ১৫৭

অনুবাদ: তিনি (আল্লাহ) তাদের জন্য পবিত্র বস্তুসমূহ হালাল করেছেন এবং অপবিত্র বস্তুসমূহ হারাম করেছেন।

এই আয়াত দ্বারা বোঝা যায়, কোনো বস্তু যদি স্বভাবগতভাবে অপবিত্র হয় তাহলে তা হারাম হতে পারে। কিন্তু গুইসাপ কি প্রকৃতিগতভাবে খবীস বা অপবিত্র — এ ব্যাপারে স্পষ্টভাবে কিছু বলা হয়নি।

হাদীসের আলোকে

 গুইসাপ খাওয়ার বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে সাহাবীদের খাওয়া:

عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ: أَكَلَ خَالِدُ بْنُ الْوَلِيدِ، ضَبًّا، وَرَسُولُ اللَّهِ ﷺ يَنْظُرُ إِلَيْهِ
(সহীহ মুসলিম: হাদীস 1946)

অনুবাদ: ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রাঃ) গুইসাপ খেয়েছেন, আর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন (কোনো নিষেধ করেননি)।

আরেকটি হাদীস:
عَنْ خَالِدِ بْنِ الْوَلِيدِ، أَنَّهُ دَخَلَ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ عَلَى مَيْمُونَةَ، وَأُتِيَ بِضَبٍّ مَشْوِيٍّ، فَأَهْوَى رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يَدَهُ إِلَيْهِ، فَقِيلَ لَهُ: إِنَّهُ ضَبٌّ، فَكَفَّ يَدَهُ، فَقَالَ خَالِدٌ: أَحَرَامٌ الضَّبُّ؟ قَالَ: “لَا، وَلَكِنَّهُ لَمْ يَكُنْ بِأَرْضِ قَوْمِي، فَأَجِدُنِي أَعَافُهُ”.
— সহীহ মুসলিম, হাদীস: 1943

বাংলা অর্থ: খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রাঃ) বলেন, আমি একবার রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সঙ্গে মাইমুনা (রাঃ)-এর ঘরে গিয়েছিলাম। সেখানে গুইসাপ রান্না করে আনা হলো। রাসূলুল্লাহ ﷺ তার হাত বাড়ালেন, তখন বলা হলো এটা গুইসাপ। তিনি হাত সরিয়ে নিলেন। খালিদ (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, এটা কি হারাম? তিনি বললেন, “না, তবে এটা আমার এলাকার খাবার নয়, তাই আমি এটি খেতে অপছন্দ করি।”

▶ হাদীস

عَنْ خَالِدِ بْنِ الْوَلِيدِ: أُهْدِيَ لِرَسُولِ اللَّهِ ﷺ ضَبٌّ فَلَمْ يَأْكُلْهُ، وَقَالَ: لَا، وَلَكِنَّهُ لَمْ يَكُنْ بِأَرْضِ قَوْمِي، فَأَجِدُنِي أَعَافُهُ
— সহীহ মুসলিম, হাদীস: 1943

বাংলা অনুবাদ: রাসূল ﷺ বলেন, “এটি আমার এলাকার খাবার নয়, তাই আমার ভালো লাগছে না।” কিন্তু তিনি নিষেধ করেননি।

তাফসির: এই হাদীস থেকে বোঝা যায় যে রাসূল ﷺ গুইসাপ খেতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছেন, যা একজন উম্মতের জন্য বিরত থাকার যথেষ্ট প্রমাণ।

চার ইমামের মতামত

১. ইমাম আবু হানিফা (রহ.): গুইসাপ খাওয়া মাকরূহে তাহরিমি, অর্থাৎ না খাওয়াই ভালো; তবে হারাম নয়।

২. ইমাম মালিক (রহ.): গুইসাপ খাওয়া জায়েজ; যদিও তিনি নিজে খেতে অনিচ্ছুক ছিলেন।

৩. ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমদ (রহ.): গুইসাপ খাওয়াকে হালাল বলেছেন। কারণ, রাসূল (সাঃ) তা নিষিদ্ধ করেননি এবং সাহাবীরা তা খেয়েছেন।

ইসলামি স্কলারদের ব্যাখ্যা

১. ইমাম নববী (রহ.):
তিনি বলেন, “الضب حلال عند جمهور العلماء”، অর্থাৎ “গুইসাপ অধিকাংশ আলেমদের মতে হালাল।”
(শরহ সহীহ মুসলিম)

২. ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.):
তিনি ব্যাখ্যা করেন, “وعدم أكل النبي ﷺ له لا يدل على تحريمه بل على كراهته له بطبعه”، অর্থাৎ, রাসূল (সাঃ)-এর না খাওয়া এর হারাম হওয়ার প্রমাণ নয়, বরং তার স্বাভাবিক অপছন্দের ইঙ্গিত মাত্র। (ফাতহুল বারী)

৩. ড. ইউসুফ আল-কারযাভি:
তিনি বলেন, “যে জিনিস মানুষ সাধারণত ঘৃণা করে, তা খাওয়া থেকে বিরত থাকা উত্তম; তবে তা নিজে থেকে হারাম নয় যদি শরীয়তে তা নিষিদ্ধ না করা হয়।” (আল-হালাল ওয়াল হারাম ফিল ইসলাম)

আধুনিক ইসলামি স্কলারদের অভিমত

শাইখ ইবনে বায (রহ.): বলেন, “যেহেতু নবী করিম ﷺ তা বর্জন করেছেন এবং এটি ঘৃণিত, তাই মুসলমানের জন্য তা পরিহার করা উত্তম।”

শাইখ উছাইমিন (রহ.): বলেন, “রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজে না খাওয়া ও ঘৃণা প্রকাশ করাই প্রমাণ করে, এটি খাওয়া অনুচিত। এমনকি তা যদি সরাসরি হারাম না হয়, তবুও পরিত্যাগ করাই উচিত।”

যারা গুইসাপ খাওয়া জায়েজ নয় মনে করেন

তাদের যুক্তি হলো, কুরআনের “الخبائث” শব্দের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। হানাফি মাজহাবের কিছু আলেম বলেন, যেহেতু এটি দেখতে বিকট ও অস্বাভাবিক, তাই না খাওয়াই উত্তম। তবে তাঁরা একে হারাম বলেননি।

 কুরআনের সাধারণ নাজাসত বা গর্হিত প্রাণী বর্জনের নির্দেশনা

আল্লাহ তাআলা বলেন:

﴿وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ﴾
— সূরা আল-আ‘রাফ: ১৫৭

অনুবাদ: “তিনি তাদের জন্য অপবিত্র বস্তুসমূহ হারাম করেন।”

তাফসির: খবাইস (الخَبَائِثَ) বলতে গর্হিত, নিকৃষ্ট, বর্জনীয় বস্তু বোঝানো হয়েছে। অধিকাংশ মুফাসসির বলেন, এতে এমন প্রাণীর গোশত অন্তর্ভুক্ত যা প্রকৃতিগতভাবে নিকৃষ্ট এবং ঘৃণিত। গুইসাপ তার আকৃতি, জীবনধারা ও খাদ্যাভ্যাসের দিক থেকে এ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।

সমকালীন ও পূর্ববর্তী ইসলামি আলেমদের ফতোয়া

১. শায়খ আব্দুল আজীজ ইবন বায (রহ.) — প্রাক্তন গ্র্যান্ড মুফতি, সৌদি আরব
তিনি বলেন:

যদিও রাসূলুল্লাহ ﷺ গুইসাপকে সরাসরি হারাম বলেননি, তবে তিনি নিজে খেতে অস্বীকৃতি জানান। এই কারণে উত্তম হলো, একজন মুসলমান যেন এজাতীয় প্রাণী থেকে বিরত থাকে। কারণ, তিনি বলেন ‘আমি তা অপছন্দ করি।’ রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর অপছন্দই মুসলমানদের জন্য বিরত থাকার যথেষ্ট কারণ।❞

📚 মারজু আল-ফাতাওয়া: ২২/৩০৭


২. শায়খ মুহাম্মদ ইবনে সালিহ আল-উসাইমীন (রহ.) — প্রসিদ্ধ সালাফি আলেম
তিনি বলেন:

❝গুইসাপ খাওয়া হারাম নয়, তবে এটি ঘৃণিত ও অপছন্দনীয়। রাসূল ﷺ এর প্রতি অনীহা প্রকাশ করেছেন, এ থেকে বোঝা যায় এটি খাওয়া আদব ও শালীনতার বিরোধী। সুতরাং উত্তম হলো, এটি না খাওয়া।❞

📚 আশ-শারহুল মুমতি’, খণ্ড ১৫, পৃষ্ঠা ২২৩


৩. ইমাম ইবনু কুদামাহ (রহ.) — হাম্বলি মাজহাবের বড় মুজতাহিদ
তিনি বলেন:

গুইসাপ খাওয়া মুবাহ, তবে রাসূলুল্লাহ ﷺ তা খেতে অপছন্দ করেছেন। এজন্য গাইর আরবদের মধ্যে এর প্রতি নিরুৎসাহ দেখা যায়। সুতরাং উত্তম হলো, এটা পরিহার করা।❞

📚 আল-মুগনী, খণ্ড ১৩, পৃষ্ঠা ৩৩০


৪. দারুল উলূম দেওবন্দের ফতোয়া বিভাগ (ভারত)
তাদের এক ফতোয়ায় বলা হয়েছে:

গুইসাপ খাওয়া শরীয়তসম্মত নয়, যদিও স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা নেই। এটি খবাইসের অন্তর্ভুক্ত এবং অপবিত্র শ্রেণির প্রাণী হওয়ায় খাওয়া অনুচিত ও মাকরূহ।❞

📚 ফতোয়া নম্বর: ৫৮৯/৪০৯/ডি


৫. শায়খ সালেহ আল মুনাজ্জিদ (সমসাময়িক সালাফি স্কলার)
তিনি ইসলাম QA-তে বলেন:

রাসূলুল্লাহ ﷺ গুইসাপ খেতে অস্বীকৃতি জানান। অতএব, তা থেকে বিরত থাকাই উত্তম এবং মুসলিমদের জন্য এটাই কাম্য।❞

📚 IslamQA Fatwa No: ২৮৮৩

উপসংহার

রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ অনুযায়ী এবং ফুকাহা ও মুজতাহিদিনদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, গুইসাপের গোশত খাওয়া থেকে বিরত থাকাই উত্তম। যদিও সরাসরি হারাম ঘোষণা করা হয়নি, তবুও তার জীবনধারা, খাদ্যাভ্যাস, আকৃতি ও ইসলামী সৌন্দর্যবোধের আলোকে এটি অপবিত্র ও ঘৃণিত প্রাণীর অন্তর্ভুক্ত, যাকে কুরআন ‘الخَبَائِثَ’ এর মধ্যে গণ্য করেছে। সুতরাং মুসলিমের উচিত তা খাওয়া থেকে বিরত থাকা।

ইসলামের মূলনীতি অনুসারে, এমন কিছু যা রাসূল ﷺ নিজে বর্জন করেছেন এবং ইসলামি আলেমরা যাকে খবাইস তথা অপবিত্র বা মাকরূহ বলেছেন—তা থেকে বিরত থাকাই একমাত্র উত্তম পথ। গুইসাপ তার আকৃতি, স্বভাব, খাদ্য ও বসবাসের পরিবেশ অনুযায়ী নিকৃষ্ট ও অপছন্দনীয়, যার কারণে তা খাওয়া থেকে বিরত থাকার ব্যাপারে নির্ভরযোগ্য আলেমগণ ঐকমত্যে পৌঁছেছেন।


 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *