Islamic Life

গরুর অন্ডকোষ খাওয়া জায়েজ কিনা?

গরুর অন্ডকোষ

গরুর অন্ডকোষ খাওয়া জায়েজ কিনা? ইমামদের মতামত সহ।

১. অন্ডকোষ খাওয়া জায়েজ নয়

গরুর অন্ডকোষ (خصيتين) খাওয়া ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েজ নয়। কারণ, এটি “فروج” (গোপন অঙ্গ)-এর অন্তর্ভুক্ত, আর শরীফ শরীয়ত এ ধরনের লজ্জাস্থান জাতীয় অঙ্গ ভক্ষণ করতে নিষেধ করেছে।

ইবনে কুদামাহ (রহ.) বলেন:

“ولا يؤكل الفرجان ولا الخصيتان.”
অর্থ: “ফরজ (গোপন অঙ্গ) এবং অন্ডকোষ ভক্ষণ করা জায়েজ নয়।” (المغني لابن قدامة، ج 9، ص 324)

ইমাম নববী (রহ.) বলেন:

“والخصيتان من الفرج، فهي محرمة عند الجمهور.”
অর্থ: “অন্ডকোষ গোপন অঙ্গের অন্তর্ভুক্ত। তাই তা খাওয়া অধিকাংশ ইমামের মতে হারাম।”
 (شرح المهذب، ج 6، ص 155)

গরুর অন্ডকোষ, আরবি ভাষায় “الخصيتين”, খাওয়া সম্পর্কে ইসলামী ফিকহে ভিন্নমত রয়েছে। হানাফি মাজহাবের মতে, এটি মাকরূহ তাহরিমি, অর্থাৎ হারামের কাছাকাছি অপছন্দনীয়। এই মতের ভিত্তি একটি হাদীস, যেখানে বলা হয়েছে:

عَنْ مُجَاهِدٍ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَكْرَهُ مِنَ الشَّاةِ سَبْعًا: الدَّمَ، وَالْفَرْجَ، وَالْأَنْثَيَيْنِ، وَالْغُدَّةَ، وَالذَّكَرَ، وَالْمَثَانَةَ، وَالْمَرَارَةَ.

অনুবাদ: মুজাহিদ (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) ভেড়ার সাতটি অংশ অপছন্দ করতেন: রক্ত, গোপন অঙ্গ, অন্ডকোষ, গ্রন্থি, পুরুষাঙ্গ, মূত্রথলি এবং পিত্তথলি।

এই হাদীস এবং ফুকাহাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী স্পষ্ট যে, গরু হোক বা ছাগল—যেকোনো হালাল পশুর নিম্নলিখিত সাতটি অঙ্গ খাওয়া থেকে বিরত থাকা জরুরি:
১. রক্ত (الدَّمَ)
২. যৌনাঙ্গ (الفرج)
৩. অণ্ডকোষ (الأنثيين)
৪. গ্রন্থি (الغدة)
৫. পুরুষাঙ্গ (الذَّكَرَ)
৬. মূত্রাশয় (المثانة)
৭. পিত্তথলি (المرارة)

الغدة-এর অর্থ ও ব্যাখ্যা:
لغوي (ভাষাগত অর্থে):
الغُدَّةُ হলো শরীরের এমন একটি অঙ্গ যা পিচ্ছিল ও ফুলে থাকে—এটি কোনো রস, তরল বা হরমোন নিঃসরণ করতে পারে।

শরীয়তের দৃষ্টিতে:
হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ পশুর “الغدة” খাওয়া অপছন্দ করেছেন, কারণ এতে পুঁজ, রক্ত, বা ক্ষতিকর বর্জ্য পদার্থ থাকতে পারে, যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে

এই হাদীস থেকে সরাসরি বোঝা যায় যে, অণ্ডকোষ (الأنثيين) খাওয়া জায়েজ নয়, বরং তা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিষেধকৃত অঙ্গের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।

ফিকহী ব্যাখ্যা ও ইমামদের মতামত:

  1. ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও হানাফী মাজহাব মতে, হাদীসে যেসব অঙ্গ নিষিদ্ধ করা হয়েছে সেগুলো অপবিত্র বা নাপাক হওয়ার কারণে খাওয়া হারাম বা কমপক্ষে মাকরূহ তাহরীমি।

  2. ইমাম মালেক (রহ.) ও মালিকী মাজহাবেও এসব অঙ্গ খাওয়াকে অপছন্দনীয় মনে করা হয়েছে।

  3. ইমাম শাফেয়ী ও আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.) থেকেও এগুলো না খাওয়ার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, বিশেষ করে রক্ত, অণ্ডকোষ ও যৌনাঙ্গের বেলায়।

এই হাদীস থেকে সরাসরি বোঝা যায় যে, অণ্ডকোষ (الأنثيين) খাওয়া জায়েজ নয়


২. প্রবাহমান রক্ত খাওয়া হারাম

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:

قُلْ لَا أَجِدُ فِي مَا أُوحِيَ إِلَيَّ مُحَرَّمًا عَلَىٰ طَاعِمٍ يَطْعَمُهُ إِلَّا أَنْ يَكُونَ مَيْتَةً أَوْ دَمًا مَسْفُوحًا أَوْ لَحْمَ خِنزِيرٍ…

অনুবাদ: বলুন, আমি যে ওহি পেয়েছি, তাতে আমি কোনো খাদ্যভোজীর জন্য হারাম কিছু পাই না, যদি না তা হয় মৃত জন্তু, প্রবাহমান রক্ত বা শুকরের মাংস… (সূরা আল-আন’আম: ১৪৫)

এই আয়াতে “دمًا مسفوحًا” অর্থাৎ প্রবাহমান রক্ত খাওয়া স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জবাইয়ের সময় বের হওয়া রক্ত, রক্ত জমাট বা রান্না করা হলেও তা খাওয়া সম্পূর্ণরূপে হারাম।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

“حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ…”
অর্থ: “তোমাদের জন্য মৃত জন্তু, রক্ত… হারাম করা হয়েছে।” (সূরা আল-মায়েদা: ৩)

 তাফসিরে কুরতুবি তে বলা হয়েছে, এই আয়াতের “الدم” (রক্ত) দ্বারা উদ্দেশ্য প্রবাহমান রক্ত। তাই গোশতের সঙ্গে মিশে থাকা রক্ত জায়েজ, কিন্তু রান্না বা সংগ্রহযোগ্য রক্ত হারাম।


৩. গরুর মলদ্বার খাওয়া নিষিদ্ধ

গরুর মলদ্বার বা পায়ুপথ, আরবি ভাষায় “الدبر”, খাওয়া শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েজ নয়। এটি নাপাক অঙ্গ এবং মানুষের মল ত্যাগের মত গুরুত্বপূর্ণ বর্জ্য নির্গমনের স্থান হওয়ায়, এর ব্যবহার বা ভক্ষণ ইসলামি শালীনতা ও পবিত্রতার পরিপন্থী।

গোশতের পশুর মলদ্বার তথা “الدبر” খাওয়া জায়েজ নয়। কেননা তা অপবিত্র এবং লজ্জাস্থান জাতীয় অঙ্গ।

ইমাম ইবনে হাজার (রহ.) বলেন:

“الدبر والفرج لا يؤكلان، لأنهما موضع القذر.”
অর্থ: “মলদ্বার ও গোপনাঙ্গ খাওয়া যায় না, কারণ এগুলো নাপাক স্থানের অন্তর্ভুক্ত।”  (فتح الباري، ج 9، ص 618)


৪. গরুর যৌনাঙ্গ খাওয়া হারাম

গরুর গোপন অঙ্গ বা যৌনাঙ্গ, আরবি ভাষায় “الفرج”، খাওয়া ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণরূপে হারাম। গোপন অঙ্গ হচ্ছে লজ্জাস্থান, আর লজ্জাস্থানের ব্যবহার শুধু বৈধ সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ। খাওয়ার ক্ষেত্রে এসব অঙ্গকে শরীয়ত নিষিদ্ধ করেছে।

গরুর গোপন অঙ্গ বা যৌনাঙ্গ খাওয়া সম্পূর্ণরূপে হারাম। কারণ তা অশ্লীলতার শামিল এবং শরীয়তের মৌলিক লজ্জাস্থানের আদবের বিরুদ্ধে।

 হাদীসে এসেছে:

“ما أسكر كثيره فقليله حرام، وما خبث كثيره فقليله خبيث.”
অর্থ: “যার অধিকাংশ নাপাক, তার অল্পও নাপাক।” (আবু দাউদ: ৩৬৮১)

এই কায়েদার আলোকে গোপন অঙ্গ, যেটি ব্যবহার হয় যৌন উদ্দেশ্যে, তা খাওয়া ইসলামী সৌন্দর্যবোধ ও তাহারাতবোধের পরিপন্থী।


৫. মূত্রথলি ও পিত্তথলি খাওয়া নিষিদ্ধ

গরুর মূত্রথলি, আরবি ভাষায় “المثانة” এবং পিত্তথলি “المرارة” – এই দুটি অঙ্গও খাওয়া ইসলামি শরীয়তের দৃষ্টিতে নাজায়েজ। কারণ, এগুলো বর্জ্য পদার্থ ধারণ করে এবং নাপাক অঙ্গ হিসেবে বিবেচিত।

গরুর মূত্রথলি (مثانة) এবং পিত্তথলি (مرارة) খাওয়া জায়েজ নয়, কারণ এগুলো অপবিত্র এবং বর্জ্যদ্রব্য বহনকারী অঙ্গ।

ইবনে আবেদীন (রহ.) বলেন:

“ولا يؤكل المرارة ولا المثانة لأنها موضع النجاسة.”
অর্থ: “পিত্তথলি ও মূত্রথলি খাওয়া যায় না, কারণ এগুলো নাপাকির স্থান।” (رد المحتار، ج 6، ص 306)


৬. অতিরিক্ত রক্ত জমে থাকা রগ বা শিরা খাওয়া মাকরূহ

গরুর সমস্ত শিরা-উপশিরা খাওয়া নিষিদ্ধ নয়, তবে যেসব রগ বা শিরার মধ্যে অতিরিক্ত রক্ত জমে থাকে, সেগুলো খাওয়া মাকরূহ বা অপছন্দনীয়। কারণ শরীয়ত প্রবাহমান রক্ত নিষিদ্ধ করেছে এবং রগে জমে থাকা রক্ত প্রায়শই অপবিত্র হয়ে যায়।

শিরা-উপশিরা এবং রগসমূহ (العروق)

গরুর রগ বা শিরা-উপশিরা সম্পূর্ণরূপে জায়েজ নয় এমন নয়, কিন্তু যেসব রগে অধিক রক্ত জমে থাকে, সেগুলো খাওয়া মাকরুহ। শরীয়তের আদেশ অনুযায়ী, প্রবাহমান রক্ত নিষিদ্ধ।

 (الدر المختار مع الرد: ج 6، ص 306)


৭. পাকস্থলির আবর্জনা বহনকারী অঙ্গসমূহ খাওয়া জায়েজ নয়

পশুর দেহে এমন কিছু অঙ্গ আছে যেগুলোতে সরাসরি বর্জ্য, ময়লা বা অপচনীয় বস্তু জমা হয়। যেমন: রেকটাম বা অন্ত্রের শেষ অংশ, কোলন বা বৃহৎ অন্ত্র, যেখানে মল তৈরি হয়। এই অঙ্গগুলোতে নাপাক বস্তু জমা হওয়ায় এগুলো খাওয়া শরীয়তের দৃষ্টিতে নাজায়েজ।

যেসব অঙ্গে সরাসরি ময়লা বা বর্জ্য জমা হয় যেমন- গরুর রেকটাম, মলমূত্র বহনকারী অংশ, ইত্যাদি খাওয়া জায়েজ নয়।

ইমাম আহমদ (রহ.) বলেন:

“لا تؤكل الأعضاء النجسة وما كان موضع القذر.”
অর্থ: “নাপাক অঙ্গসমূহ এবং যেসব অঙ্গে ময়লা জমে সেগুলো খাওয়া যাবে না।” (المغني لابن قدامة، ج 9، ص 325)


উপসংহার

ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে শুধুমাত্র হালাল পশু জবাই করে খাওয়া যথেষ্ট নয়, বরং সেই পশুর কোন কোন অঙ্গ খাওয়া যাবে আর কোনটি যাবে না—তাও গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে হবে। শরীয়ত সৌন্দর্য, পবিত্রতা এবং মানবিক রুচির সমন্বয় রেখে খাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। তাই অন্ডকোষ, গোপন অঙ্গ, মলদ্বার, মূত্রথলি, পিত্তথলি, রক্ত এবং বর্জ্য জমা হওয়া অঙ্গ খাওয়া নিষিদ্ধ বা অপছন্দনীয় বলে ইসলামী ফিকহের আলোকেই আমরা জানতে পারি।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *