কুরআনের আয়াত সংখ্যা: গবেষণামূলক বিশ্লেষণ
বিভিন্ন মুফাসসির ও উলূমুল কুরআনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী
ভূমিকা
আল্লাহ তাআলা বলেন —
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ
“নিশ্চয়ই আমি নিজেই এই স্মারক (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি, এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষণকারী।” (সূরা আল-হিজর: ১৫:৯)
কুরআন সংরক্ষিত, অপরিবর্তিত ও সমগ্র মানবজাতির জন্য হিদায়াতের উৎস।
তবে এর আয়াতের সংখ্যা গণনা বিষয়ে প্রাথমিক যুগ থেকেই কিছু আনুষ্ঠানিক পার্থক্য দেখা যায় —
যা পাঠভেদ (কিরাআত), মুশাফের রিসম (লেখনরীতি) ও বিসমিল্লাহ গণনা পদ্ধতির ভিন্নতার কারণে সৃষ্টি হয়েছে।
১. আয়াত শব্দের সংজ্ঞা
“আয়াত” (آية) অর্থ চিহ্ন, নিদর্শন বা প্রমাণ।
কুরআনুল কারিমে এটি একাধিক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে —
কখনো মহাবিশ্বের নিদর্শন, কখনো ঐতিহাসিক ঘটনা, আবার কখনো একেকটি বাক্যাংশ বা বাক্য হিসেবে।
কুরআনের প্রতিটি অংশকে “আয়াত” বলা হয় কারণ তা আল্লাহর নিদর্শন ও অলৌকিকতার বহিঃপ্রকাশ।
২. আয়াত গণনার প্রথাগত পদ্ধতি
ইসলামি ইতিহাসে আয়াত গণনায় পাঁচটি বিখ্যাত রেওয়ায়াতি স্কুল আছে, যেগুলো সাহাবা ও তাবেঈদের মাধ্যমে প্রচলিত হয়েছে:

| ক্রম | স্কুল / অঞ্চল | গণনার ভিত্তি | আনুমানিক আয়াত সংখ্যা |
|---|---|---|---|
| ১ | কূফা (Iraq) – হাফস | কিরাআত হাফস | ৬২৩৬ |
| ২ | মাদিনা | ইবন কাসির / নাফি | ৬২১৭ – ৬২১৪ |
| ৩ | বসরা | ইবন সিরিন প্রমুখ | ৬২০৪ – ৬২০৫ |
| ৪ | শাম (সিরিয়া) | ইবন আমের | ৬২২৭ |
| ৫ | মক্কা | ইবন কাসির | ৬২২০ |
এ পার্থক্য মূলত “বিসমিল্লাহ” গণনা, আয়াত বিভাজন ও বিরতি নির্ধারণে ভিন্নতার কারণে।
তবে আয়াতের মূল বিষয়বস্তুতে কোনো পার্থক্য নেই;
শুধু সংখ্যা গণনার দিকেই মতভেদ।
৩. সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মত
আজকের দুনিয়ায় প্রচলিত কুরআন (Cairo Mushaf, 1924 Edition) যা কিরাআত হাফস আন আসিম অনুযায়ী রচিত,
সেখানে মোট ৬,২৩৬ আয়াত গণ্য করা হয়েছে।
এটাই মুসলিম বিশ্বের সর্বাধিক স্বীকৃত ও সরকারি কপির মানদণ্ড।
৪. যারা ৬,৬৬৬ আয়াত বলেছেন — তাদের বক্তব্য ও দলিল
(ক) প্রাচীন যুগের উল্লেখ
কিছু প্রাচীন ইসলামি আলেম ও মুফাসসিরদের কাছে কুরআনের আয়াত সংখ্যা ৬,৬৬৬ বলে উল্লেখিত পাওয়া যায়।
এটি সাধারণত প্রতীকী ও পূর্ণতার সংখ্যা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে,
যার দ্বারা কুরআনের সর্বাঙ্গীনতা ও পূর্ণাঙ্গ হিদায়াতের দিক নির্দেশ করা হয়েছে।
-
ইমাম সুতিউতি (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আল-ইতকান ফি উলূমিল কুরআন-এ বলেন:
“বিভিন্ন রেওয়ায়াত অনুযায়ী কুরআনের আয়াত সংখ্যা ৬২০৪ থেকে ৬৬০০ পর্যন্ত পার্থক্য পাওয়া যায়।”
(সূত্র: আল-ইতকান, জ.১, অধ্যায়: معرفة عدد آي القرآن)এখানে তিনি ৬৬০০ পর্যন্ত পার্থক্য দেখিয়েছেন — কিছু লোকজন এটিকে প্রতীকীভাবে ৬৬৬৬ বলে বর্ণনা করেছেন।
-
ইমাম জারকশি (রহ.) তাঁর আল-বুরহান ফি উলূমিল কুরআন-এ বলেন:
“কিছু কিরা’আতে আয়াত সংখ্যা ৬২০০ এর কাছাকাছি, আবার কেউ কেউ ৬৬০০ বলেছে।”
(সূত্র: আল-বুরহান ফি উলূমিল কুরআন, খণ্ড ১)
এতে বোঝা যায়, ৬,৬৬৬ সংখ্যা বাস্তব গণনা নয় বরং আনুমানিক বা বৃত্তাকার সংখ্যারূপে ব্যবহৃত হয়েছে।
(খ) প্রতীকী ব্যাখ্যা
কিছু মুফাসসিরের মতে, ৬,৬৬৬ আয়াত সংখ্যা দ্বারা বোঝানো হয় যে —
“কুরআন ৬টি বিষয়বস্তু ও ৬টি দিকের পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা বহন করে,
আর সংখ্যাগত পূর্ণতা বোঝাতে ৬,৬৬৬ ব্যবহার করা হয়েছে।”
এটা কোনো কোরআনি বা সহীহ সূত্র নয়; বরং সাহিত্যিক বা প্রতীকী ব্যাখ্যা।
এ ধরনের বর্ণনা কিছু পারস্য ও উর্দু ভাষার তাফসীরগ্রন্থে (যেমন তাফসীর মদারিক ইত্যাদি) ব্যবহৃত হয়েছে।
(গ) ঐতিহাসিক ভুল গণনা
উলূমুল কুরআনের গবেষকরা বলেন,
অনেক সাধারণ লেখক ও প্রচারক অতীতে “৬,৬৬৬ আয়াত” সংখ্যা মুখে মুখে চালু করেছেন —
সম্ভবত ৬,২৩৬ আয়াতের সঙ্গে বিসমিল্লাহ (১১৩) ও কিছু বিরতি বা বাক্যগণনা যোগ করে ৬,৩৪৯,
তারপর রাউন্ড ফিগার আকারে ৬,৬৬৬ বলে প্রচারিত হয়েছে।
তবে এটি কোনো সহীহ সূত্র বা নির্ভরযোগ্য গণনা নয়।
ইবনুল জাযরী (রহ.) বলেন:
“যারা কুরআনের আয়াত সংখ্যা ৬৬৬৬ বলে নির্ধারণ করেছে, তারা কেবল আনুমানিকভাবে বলেছে,
প্রকৃত গণনায় এর কোনো ভিত্তি নেই।”
(সূত্র: নাশর ফি কিরাআতুল আশর, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৪২)
৫. উলূমুল কুরআনের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ
ইমাম আস-সিউতী (রহ.) তাঁর আল-ইতকান গ্রন্থে উল্লেখ করেন —
“কিরা’আতের পার্থক্য, বিসমিল্লাহ গণনা, বিরতি নির্ধারণ এবং দীর্ঘ-ছোট বাক্য বিভাজনের কারণেই
আয়াত সংখ্যা ভিন্ন হয়েছে। কিন্তু তাতে কুরআনের প্রকৃত অংশে কোনো কমবেশি নেই।”
(আল-ইতকান, জ.১, অধ্যায়: معرفة عدد آي القرآن)
অতএব, এই ভিন্নতা গণনাগত, বস্তুগত নয়।
কুরআনের পাঠ সর্বত্র একই;
শুধু আয়াত নম্বরায়ন পদ্ধতি ভিন্ন।
৬. উপসংহার
-
সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য গণনা অনুযায়ী কুরআনের মোট আয়াত সংখ্যা ৬,২৩৬ (হাফস রেওয়ায়াত)।
-
কিছু রেওয়ায়াতে এটি ৬,২১৪, ৬,২২৭, ৬,২০৪ পর্যন্ত ভিন্ন।
-
৬,৬৬৬ আয়াত বলা কোনো সহীহ বা ইজমাঈ মত নয়;
এটি কেবল আনুমানিক বা প্রতীকী সংখ্যারূপে কিছু গ্রন্থে উল্লেখ আছে,
বাস্তব গণনায় এর কোনো ভিত্তি নেই।
তবে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য এখানে —
কুরআনের বিষয়বস্তু, শব্দ, অক্ষর, অর্থ ও সংরক্ষণে কোনো পার্থক্য নেই।
আয়াত সংখ্যা যেভাবেই গণনা করা হোক না কেন,
আল্লাহর বাণী এক ও অক্ষুণ্ণ।
৭. রেফারেন্স / সূত্র তালিকা
-
الإمام السيوطي، الإتقان في علوم القرآن، دار الفكر، بيروت।
-
بدر الدين الزركشي، البرهان في علوم القرآن، دار المعرفة।
-
ابن الجزري، النشر في القراءات العشر।
-
আল-কুরতুবী, আল-জামি লি আহকামিল কুরআন।
-
মুফতী মুহাম্মদ তাকি উসমানী, উলূমুল কুরআন (বাংলা অনুবাদ)।
-
ড. সুবহি সালেহ, মাবাহিস ফি উলূমিল কুরআন।
সারসংক্ষেপ:
➤ কুরআনের প্রকৃত আয়াত সংখ্যা (হাফস অনুযায়ী): ৬২৩৬
➤ অন্যান্য রেওয়ায়াতে ভিন্নতা: ৬২০৪ – ৬২২৭
➤ ৬৬৬৬ সংখ্যা: কোনো সহীহ দলিল নয়, বরং আনুমানিক / ঐতিহাসিক ভুল গণনা
➤ সর্বসম্মত মত: কুরআনের পাঠ এক ও সংরক্ষিত; আয়াত সংখ্যা পার্থক্য কেবল গণনাগত।


https://shorturl.fm/e6oHF
https://shorturl.fm/aSERM