Islamic Life

ওযু ছাড়া কুরআন স্পর্শ করা যায় কি না

ওযু ছাড়া কুরআন স্পর্শ

 ওযু ছাড়া কুরআন স্পর্শ করা যায় কি না

(কুরআন, হাদীস ও চার ইমামের আলোকে গবেষণামূলক বিশ্লেষণ)


🕋 ভূমিকা

পবিত্র কুরআন আল্লাহ তায়ালার কালাম। মুসলমানের জন্য এটি শুধু পাঠ ও তিলাওয়াতের গ্রন্থ নয়, বরং জীবনব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ সংবিধান। তাই কুরআনের প্রতি শ্রদ্ধা, মর্যাদা ও পবিত্রতা রক্ষা করা ঈমানেরই দাবি।
ইসলামি শরীয়ত পবিত্রতার বিষয়টিকে এত গুরুত্ব দিয়েছে যে, নামাজ, তাওয়াফ এমনকি কুরআন স্পর্শের ক্ষেত্রেও পবিত্রতা (অজু) অপরিহার্য শর্ত হিসেবে নির্ধারণ করেছে।

কিন্তু আজকাল কিছু লোক যুক্তি দেখায়—“ওযু ছাড়া কুরআন স্পর্শ করা যায়, কারণ কুরআনে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা নেই।”
এই ভুল ধারণা দূর করতে নিচে কুরআন, সহীহ হাদীস, চার ইমামের মতামত ও সালাফদের ব্যাখ্যার আলোকে বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।


📖 প্রথম প্রমাণ: কুরআনের নির্দেশনা

ওযু ছাড়া কুরআন স্পর্শ
ওযু ছাড়া কুরআন স্পর্শ

আয়াত:

لَا يَمَسُّهُ إِلَّا الْمُطَهَّرُونَ
(سورة الواقعة، الآية: 79)

বাংলা অনুবাদ:
“এটি (কুরআন) স্পর্শ করে না, শুধুমাত্র যারা পবিত্র (المطهرون)।”

ব্যাখ্যা:

এ আয়াতের দ্বারা অধিকাংশ মুফাসসির বোঝিয়েছেন—‘মুতাহহারূন’ বলতে সেই সব মানুষকে, যারা ওযু বা গোসলের মাধ্যমে অপবিত্রতা থেকে পবিত্র হয়েছে

ইমাম ইবন কাসীর (রহ.) বলেন—“أي لا يمس القرآن إلا من هو طاهر من الحدثين الأصغر والأكبر.”

অর্থাৎ, “কুরআনকে স্পর্শ করবে না, কেবল সে-ই, যে ছোট ও বড় দুই ধরনের অপবিত্রতা থেকে পবিত্র।”
(তাফসীর ইবন কাসীর, ৫৬:৭৯)

 

ইমাম কুরতুবী (রহ.) বলেন— “المراد بالمطهرين: الذين تطهروا من الحدث الأصغر والأكبر، فلا يجوز لمس المصحف إلا بطهارة.”

অর্থাৎ, “এখানে মুতাহহারীন ( بالمطهرين)  দ্বারা বোঝানো হয়েছে—যারা ছোট ও বড় হাদস থেকে পবিত্র। অতএব, অজু ছাড়া মুসহাফ স্পর্শ করা জায়েয নয়।”
(তাফসীর আল-কুরতুবী, ১৭/২২৭)

এই আয়াতের মাধ্যমে স্পষ্ট প্রমাণিত হয়—কুরআন স্পর্শ করতে হলে পবিত্রতা আবশ্যক।


 দ্বিতীয় প্রমাণ: হাদীসের নির্দেশ

১️⃣ নবী ﷺ–এর চিঠি আমর ইবন হাজম (রাঃ)-এর প্রতি

📜 হাদীসের পূর্ণ আরবি ইবারত ও সনদসহ

روى الإمام مالك في الموطأ (حديث رقم 534) بإسناده، قال: حَدَّثَنِي يَحْيَى، عَنْ مَالِكٍ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي بَكْرِ بْنِ حَزْمٍ، أَنَّ فِي الْكِتَابِ الَّذِي كَتَبَهُ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ لِعَمْرِو بْنِ حَزْمٍ:

أَنْ لَا يَمَسَّ الْقُرْآنَ إِلَّا طَاهِرٌ.

(رواه الإمام مالك في الموطأ، كتاب القرآن، باب ما جاء في القرآن، حديث رقم: 534، وصححه الألباني في إرواء الغليل 1/158)


📖 বাংলা অনুবাদ:

ইমাম মালিক (রহঃ) তাঁর মুওয়াত্তা গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন —
আব্দুল্লাহ ইবনু আবি বকর ইবনু হাযম (রহঃ) থেকে বর্ণিত, যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ আমর ইবন হাযম (রাঃ)-এর জন্য যে পত্র লিখেছিলেন, তাতে বলা ছিল: “কুরআনকে কেউ স্পর্শ করবে না, مگر সে ব্যক্তি যে পবিত্র।”

ব্যাখ্যা:
এই হাদীসটি নবী ﷺ–এর সরকারি নির্দেশনাপত্রে ছিল, যা ইয়েমেনের গভর্নর হযরত আমর ইবন হাজম (রাঃ)-কে পাঠানো হয়েছিল।
এটি কেবল আদব নয়, বরং একটি শরয়ী হুকুম হিসেবে বিবেচিত।

ইমাম ইবন আবদুল বার (রহ.) বলেন— “هذا الحديث مشهور عند الفقهاء، تلقاه الناس بالقبول، وعمل به الأئمة.”

অর্থাৎ, “এই হাদীস ফুকাহাদের নিকট সুপরিচিত এবং চার ইমামসহ সমগ্র উম্মাহ এটির ওপর আমল করেছেন।”
(আল-ইস্তিজকার, ৮/১০)

এই হাদীসটি ইসলামী শরীয়তের একটি মৌলিক নীতি নির্ধারণ করে—কুরআন মাজীদ স্পর্শ করার জন্য শারীরিক ও আধ্যাত্মিক পবিত্রতা (طهارة) আবশ্যক।

হাদীসের শেষাংশে বলা হয়েছে —

“إِلَّا طَاهِرٌ”
অর্থাৎ, “শুধুমাত্র পবিত্র ব্যক্তি।”

এখানে “طاهر” শব্দের ব্যাখ্যা নিয়ে মুহাদ্দিস ও ফকীহগণের মধ্যে বিশদ আলোচনা হয়েছে।


🕌 “طَاهِر” শব্দের ব্যাখ্যা (ইমামগণের ব্যাখ্যা অনুযায়ী):

  1. ইমাম মালিক (رحمه الله):

    • তিনি বলেন, এখানে طاهر অর্থ হলো অযু করা ব্যক্তি, অর্থাৎ যার শরীর হাদস (অপবিত্রতা) থেকে মুক্ত।

    • (ইমাম মালিক, المدونة الكبرى 1/83)

  2. ইমাম শাফেয়ী (رحمه الله):

    • বলেন, “طاهر” শব্দ দ্বারা উদ্দেশ্য — যে ব্যক্তি অযু ও গুসল দ্বারা শরীরকে পবিত্র রেখেছে

    • (ইমাম শাফেয়ী, الأم 1/97)

  3. ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (رحمه الله):

    • বলেন, “কুরআনকে অযু ছাড়া কেউ স্পর্শ করতে পারবে না; এ বিষয়ে সাহাবাগণের সর্বসম্মত ঐক্যমত রয়েছে।”

    • (ইবন কুদামা, المغني 1/94)

  4. ইমাম আবু হানিফা (رحمه الله):

    • তাঁর ফিকহ অনুযায়ীও, অযু ছাড়া কুরআন স্পর্শ করা হারাম; তবে তিনি ব্যতিক্রম করেছেন — শিশু ও শিক্ষানবিশদের ক্ষেত্রে তালিমের উদ্দেশ্যে, তাও অযু করা উত্তম

    • (আল-কাশানী, بدائع الصنائع 1/37)


⚖️ শরীয়তী বিধান:

এই হাদীসটি “অযু ছাড়া কুরআন স্পর্শ করা নিষিদ্ধ” — এই বিধানের মূল দলিল।
এ বিষয়ে চার মাযহাবের সকল ইমাম একমত (إجماع): “لا يجوز مس المصحف إلا بطهارة كاملة من الحدثين.” — অর্থাৎ, “বড় ও ছোট উভয় প্রকার অপবিত্রতা থেকে মুক্ত না হয়ে কুরআন স্পর্শ করা বৈধ নয়।”

(ইবন আবদুল বার, التمهيد 17/396)


২️⃣ সাহাবিদের আমল ও ফতোয়া

ইবন উমর (রাঃ) বলেন— «لَا يَمَسُّ الْقُرْآنَ إِلَّا وَهُوَ طَاهِرٌ»

(رواه الطبراني في المعجم الكبير، رقم: 13657)

বাংলা অনুবাদ:
“কেউ যেন কুরআন স্পর্শ না করে, যতক্ষণ না সে পবিত্র হয়।”

এটি সাহাবিদের ঐক্যমত্যপূর্ণ (إجماع الصحابة) অবস্থানকে প্রতিফলিত করে।


🕌 চার ইমামের (الأئمة الأربعة) মতামত

১️⃣ ইমাম আবু হানিফা (رحمه الله):

তিনি বলেন— “لا يحل لمس المصحف إلا بطهارة.” অর্থাৎ, “অজু ছাড়া কুরআন স্পর্শ করা জায়েয নয়।”

(আল-হিদায়া, কিতাবুস সালাত)

হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, মুসহাফ, তার কাভার, এমনকি এর মধ্যে লেখা আয়াতও স্পর্শ করা নিষিদ্ধ যদি ওযু না থাকে।


২️⃣ ইমাম মালিক (رحمه الله):

“لا يمس القرآن إلا طاهر من الحدث الأكبر أو الأصغر.” (আল-মুদাওয়ানা الكبرى 1/84)

তিনি স্পষ্টভাবে বলেন—ওযু বা গোসল ছাড়া কুরআন স্পর্শ করা হারাম। তাঁর মতে, এটি নবী ﷺ–এর চিঠি দ্বারা প্রমাণিত শরীয় হুকুম।


৩️⃣ ইমাম শাফেয়ী (رحمه الله):

“يحرم على المحدث مس المصحف.”
(আল-উম্ম 1/97)

তিনি বলেন—“অপবিত্র ব্যক্তির জন্য কুরআন স্পর্শ করা হারাম।”
শাফেয়ী ফিকহে, ওযু ব্যতীত শুধু কাভার স্পর্শ করা গেলেও পৃষ্ঠা বা আয়াত স্পর্শ করা নিষিদ্ধ।


৪️⃣ ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (رحمه الله):

“لا يمس القرآن إلا من هو طاهر من الحدث.”
(আল-মুগনী 1/93)

তিনি বলেন—“যে ব্যক্তি ওযু ছাড়া মুসহাফ স্পর্শ করবে, সে গুনাহগার হবে।”


⚖️ ফুকাহা ও তাবেঈনদের ঐকমত্য

ইমাম নাওয়াবী (রহ.) বলেন— “أجمع المسلمون على أنه يحرم على المحدث مس المصحف.”

অর্থাৎ, “সমস্ত মুসলমানের ঐক্যমত—অজু ছাড়া কুরআন স্পর্শ করা হারাম।”
(আল-মাজমূ’ ২/৭০)


 যারা বলে “ওযু ছাড়া কুরআন স্পর্শ করা যায়”—তাদের বক্তব্যের খণ্ডন

তাদের প্রথম যুক্তি:

“সূরা ওয়াকিআহ ৭৯–এর ‘المطهرون’ দ্বারা ফেরেশতাদের বোঝানো হয়েছে।”

খণ্ডন:
হ্যাঁ, কিছু মুফাসসির ফেরেশতা অর্থ নিয়েছেন; তবে অধিকাংশ ক্লাসিকাল মুফাসসির (কুরতুবী, ইবন কাসীর, রাজী, তাবারী) স্পষ্ট বলেছেন—এতে মানুষও অন্তর্ভুক্ত।
তারপরও যদি আয়াতে ফেরেশতাদের ধরা হয়, হাদীসের নির্দেশ “لا يمس القرآن إلا طاهر” মানুষ সম্পর্কে সরাসরি প্রযোজ্য, তাই যুক্তিটি বাতিল।


তাদের দ্বিতীয় যুক্তি:

“কুরআন মুখে পড়া যায়, তাহলে হাতে ধরায় সমস্যা কী?”

খণ্ডন:
মুখে পড়া মানে স্মৃতিতে থাকা আয়াত পাঠ করা। এতে স্পর্শের বিষয় আসে না।
কিন্তু স্পর্শ করা মানে শারীরিকভাবে “মুসহাফ” ধরা, যা পবিত্রতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
আল্লাহ বলেন—

ذَٰلِكَ وَمَن يُعَظِّمْ شَعَائِرَ اللَّهِ فَإِنَّهَا مِن تَقْوَى الْقُلُوبِ
(সূরা হাজ্জ, ৩২) “যে আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে সম্মান করে, নিশ্চয় তা অন্তরের তাকওয়ার পরিচায়ক।”

তাহলে কুরআন স্পর্শের আগে ওযু করা কুরআনের প্রতি সম্মান ও তাকওয়ার প্রতিফলন।


🌙 উপসংহার

পবিত্র কুরআন মহান আল্লাহর কালাম।
একজন মু’মিনের উচিত এই মহাগ্রন্থের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও পবিত্রতা বজায় রাখা।
কুরআন, সহীহ হাদীস, চার মাযহাব, সাহাবা ও তাবেঈন—সবাই একমত হয়েছেন যে,
ওযু ছাড়া কুরআন স্পর্শ করা হারাম ও নিষিদ্ধ।

যারা বলে “ওযু ছাড়া কুরআন ধরা যায়,” তারা কুরআন ও হাদীস উভয়েরই স্পষ্ট নির্দেশের বিরোধিতা করে, এবং মুসলিম উম্মাহর সর্বসম্মত ফিকহি সিদ্ধান্তকে অস্বীকার করে।


📚 সারসংক্ষেপ

বিষয় দলিল ও সূত্র
কুরআনের আয়াত সূরা ওয়াকিআহ ৫৬:৭৯ — “لا يمسه إلا المطهرون”
সহীহ হাদীস “لا يمس القرآن إلا طاهر” — (মুআত্তা মালিক)
চার ইমামের ফতোয়া সর্বসম্মতভাবে ওযু ছাড়া কুরআন স্পর্শ হারাম
ইজমা ইমাম নাওয়াবী, ইবন আবদুল বার প্রমুখের বর্ণিত সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত
ভ্রান্ত মতের খণ্ডন ফেরেশতা ব্যাখ্যা বা তিলাওয়াত যুক্তি হাদীস দ্বারা বাতিল

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *