ইহুদি ধর্মের পরিচয়
ইহুদি ধর্ম (Judaism) হলো পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন ধর্ম, যা মূলত হযরত মুসা (عليه السلام)-এর প্রতি অবতীর্ণ তাওরাতের ওপর ভিত্তি করে গঠিত হয়েছে। ইহুদি জাতির মূল আদি পুরুষ ছিলেন হযরত ইবরাহিম (عليه السلام) এবং তাদের বংশধরগণ হযরত ইসহাক (عليه السلام) ও হযরত ইয়াকুব (عليه السلام)-এর মাধ্যমে বিস্তার লাভ করেছে। কুরআনুল কারিমে ইহুদিদের বারবার উল্লেখ করা হয়েছে এবং তাদের অতীত কর্মকাণ্ড ও বর্তমান অবস্থার ব্যাপারে সতর্কবাণী প্রদান করা হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَلَقَدْ آتَيْنَا مُوسَى ٱلتَّوْرَىٰةَ وَقَفَّيْنَا مِنۢ بَعْدِهِۦ بِٱلرُّسُلِ ۖ
“আমি মূসাকে তাওরাত দিয়েছিলাম এবং তার পরে একের পর এক নবী পাঠিয়েছি।”
(সূরা আল-মায়িদাহ: ৪৪)
ইহুদি ধর্মের মৌলিক বিষয়গুলো
১. তাওহীদের ধারণা
ইহুদিরা এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখে, কিন্তু তাদের বিশ্বাসে তাওহীদের মূলনীতি বিকৃত হয়েছে। তারা আল্লাহকে কেবল নিজেদের জাতিগত উপাস্য মনে করে এবং অন্য জাতিগুলোর ওপর নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করে।
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
وَقَالَتِ ٱلْيَهُودُ وَٱلنَّصَـٰرَىٰ نَحْنُ أَبْنَٰٓؤُا۟ ٱللَّهِ وَأَحِبَّٰٓؤُهُ
“ইহুদি ও খ্রিস্টানরা বলে, আমরা আল্লাহর সন্তান এবং তার প্রিয়জন।”
(সূরা আল-মায়িদাহ: ১৮)
২. নবীগণের প্রতি বিশ্বাস
তারা হযরত মুসা (عليه السلام) ও অন্যান্য নবীদের (عليهم السلام) প্রতি বিশ্বাস রাখে, কিন্তু নবীদের আনীত প্রকৃত শিক্ষাকে পরিবর্তন করেছে এবং অনেক নবীদের হত্যা করেছে।
আল্লাহ বলেন:
فَبِمَا نَقْضِهِم مِّيثَـٰقَهُمْ وَكُفْرِهِم بِـَٔايَـٰتِ ٱللَّهِ وَقَتْلِهِمُ ٱلْأَنۢبِيَآءَ بِغَيْرِ حَقٍّ
“তারা তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে, আল্লাহর নিদর্শনকে অস্বীকার করেছে এবং অন্যায়ভাবে নবীদের হত্যা করেছে।”
(সূরা আন-নিসা: ১৫৫)
৩. আখিরাতে বিশ্বাস
তাদের মধ্যে পরকাল সম্পর্কিত বিভ্রান্তি রয়েছে। তারা মনে করে, তারা চিরকাল জান্নাতে থাকবে এবং দুনিয়াতে তাদের জন্য বিশেষ অধিকার নির্ধারিত।
৪. ধর্মীয় গ্রন্থসমূহ
তারা মূলত তাওরাতের অনুসারী, কিন্তু তাওরাতের বহু অংশ পরিবর্তন করে নিজেদের ইচ্ছামতো শরিয়ত তৈরি করেছে।
আল্লাহ বলেন:
يُحَرِّفُونَ ٱلْكَلِمَ عَن مَّوَاضِعِهِ
“তারা আল্লাহর বাণীকে তার যথাযথ স্থান থেকে বিকৃত করে।”
(সূরা আল-মায়িদাহ: ৪১)
৫. হালাল-হারাম ও বিধি-বিধান
তাদের শরিয়তে কিছু বিশেষ বিধান ছিল, যা পরবর্তীতে কুরআন দ্বারা রহিত করা হয়েছে। তারা কিছু হারাম বস্তু নিজেদের জন্য বৈধ করেছিল এবং কিছু হালালকে হারাম করেছিল।
আল্লাহ বলেন:
فَبِظُلْمٍۢ مِّنَ ٱلَّذِينَ هَادُوا۟ حَرَّمْنَا عَلَيْهِمْ طَيِّبَـٰتٍۢ أُحِلَّتْ لَهُمْ
“ইহুদিদের অবিচারের কারণে, আমি তাদের জন্য পূর্বে হালাল কিছু ভালো জিনিস হারাম করে দিয়েছি।”
(সূরা আন-নিসা: ১৬০)
ইসলাম ও ইহুদি ধর্মের মধ্যে পার্থক্য
১. তাওহীদ: ইসলাম এক আল্লাহর নিখুঁত তাওহীদে বিশ্বাসী, কিন্তু ইহুদিরা আল্লাহকে কেবল তাদের জাতির জন্য সীমাবদ্ধ মনে করে।
২. নবুয়ত: ইসলাম সকল নবীকে মেনে চলে, কিন্তু ইহুদিরা শুধু হযরত মূসা (عليه السلام)-এর অনুসারী বলে দাবি করে।
৩. ধর্মগ্রন্থ: ইসলাম কুরআনকে চূড়ান্ত গ্রন্থ হিসেবে গ্রহণ করে, কিন্তু ইহুদিরা বিকৃত তাওরাত অনুসরণ করে।
৪. আখিরাত: ইসলাম আখিরাতে প্রতিদান ও শাস্তির ব্যাপারে নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দেয়, কিন্তু ইহুদিদের মধ্যে এ বিষয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে।
উপসংহার
ইহুদি ধর্ম একসময় সত্য ধর্ম ছিল, কিন্তু তারা কুরআন ও হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী তাদের ধর্মীয় বিধান পরিবর্তন করেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত সত্য ধর্ম হলো ইসলাম, যা আল্লাহর চূড়ান্ত নির্দেশনা অনুযায়ী পরিচালিত হয় এবং যার সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (ﷺ)।
আল্লাহ বলেন:
إِنَّ ٱلدِّينَ عِندَ ٱللَّهِ ٱلْإِسْلَـٰمُ
“নিশ্চয় আল্লাহর নিকট একমাত্র গ্রহণযোগ্য ধর্ম হলো ইসলাম।”
(সূরা আলে ইমরান: ১৯)

