ইলমে কেরাত কাকে বলে?
‘কেরাত’ শব্দটি আরবি قراءة (কিরাআত) শব্দ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ পাঠ করা, তিলাওয়াত করা বা পড়া। কুরআন মাজিদের বিশুদ্ধ উচ্চারণ, শুদ্ধ ও নির্ভুলভাবে তিলাওয়াত করার পদ্ধতি এবং কুরআনের বিভিন্ন তিলাওয়াতের ধরণকে ইলমে কেরাত বলা হয়। কেরাত শেখা ও চর্চা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআন পাঠের ক্ষেত্রে সঠিক উচ্চারণের ওপর জোর দিয়েছেন।
ইলমে কেরাতের পরিচয়
ইলমে কেরাত মূলত কুরআন তিলাওয়াতের এমন একটি জ্ঞান, যা নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ও সাহাবায়ে কেরামের মাধ্যমে উম্মতের নিকট পৌঁছেছে। এটি আল্লাহ প্রদত্ত এক বিশেষ নেয়ামত, যা বিভিন্ন সাহাবা ও তাবিঈনের মাধ্যমে প্রসার লাভ করেছে এবং পরবর্তীকালে প্রসিদ্ধ কারী ও ইমামগণের মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়েছে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيلًا
“আর তুমি কুরআনকে যথাযথভাবে তিলাওয়াত করো।”
(সূরা মুয্জাম্মিল: ৪)
হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:
خَيْرُكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ الْقُرْآنَ وَعَلَّمَهُ
“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে ব্যক্তি, যে কুরআন শিক্ষা করে এবং অন্যকে শিক্ষা দেয়।”
(বুখারি: ৫০২৭)
ইলমে কেরাতের প্রকারভেদ
ইলমে কেরাত প্রধানত সাতটি স্বীকৃত কেরাত ও তিনটি শাখা কেরাতসহ মোট দশটি কেরাতের মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। এই কেরাতগুলো প্রসিদ্ধ ইমামদের মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়েছে।
১. মুতাওয়াতির কেরাত (প্রামাণ্য ও সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য)
এটি সেই কেরাত, যা নির্ভরযোগ্য সনদসহ একাধিক পরম্পরা দ্বারা সংরক্ষিত হয়েছে। এই কেরাত সমূহ নিম্নরূপ:
- ইমাম নাফি’ (রহ.)
- ইমাম ইবনু কাসির (রহ.)
- ইমাম আবু আমর (রহ.)
- ইমাম ইবনে আমির (রহ.)
- ইমাম আসিম (রহ.)
- ইমাম হামযা (রহ.)
- ইমাম কিসাই (রহ.)
২. আহাদ কেরাত
এটি এমন কেরাত, যা প্রসিদ্ধ নয়, বরং নির্দিষ্ট কয়েকজন রাবির মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে।
৩. শাযয কেরাত
এটি এমন কেরাত, যা নির্ভরযোগ্য সনদ দ্বারা প্রমাণিত নয় এবং যা সাধারণ মুসলিম সমাজের মাঝে প্রসার লাভ করেনি।
কেরাত শেখার গুরুত্ব ও ফজিলত
ইলমে কেরাত শিক্ষার মাধ্যমে একজন মুসলিম কুরআনের বিশুদ্ধ উচ্চারণ শিখতে পারে। এটি কুরআনের অর্থ বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করে এবং ইবাদতে আরও বেশি একাগ্রতা ও সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে।
হাদিসে এসেছে:
إِنَّ الَّذِي لَيْسَ فِي جَوْفِهِ شَيْءٌ مِنَ الْقُرْآنِ كَالْبَيْتِ الْخَرِبِ
“যে ব্যক্তি তার অন্তরে কুরআনের কিছুই রাখেনি, সে এক废墟সম বাড়ির মতো।”
(তিরমিজি: ২৯১৪)
উপসংহার
ইলমে কেরাত কুরআনের বিশুদ্ধ পাঠের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে প্রাপ্ত একটি মহান শিক্ষা, যা যুগ যুগ ধরে প্রসার লাভ করেছে। সঠিক কেরাত শিখতে হলে যোগ্য শিক্ষকের কাছ থেকে তা শিখতে হবে এবং যথাযথভাবে তা চর্চা করতে হবে।

