Islamic Life

ইউরোপীয় সভ্যতায় নারীর মর্যাদা ও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

ইউরোপীয় সভ্যতায় নারীর মর্যাদা ও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

ইউরোপীয় সভ্যতায় নারীর মর্যাদা ও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি


১. ইউরোপে গির্জার দৃষ্টিতে নারীর অবস্থান: পাপের উৎস ধরা হয় (প্রায় ২য় থেকে ১৮শ শতাব্দী পর্যন্ত):
খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্বে, বিশেষ করে মধ্যযুগীয় ইউরোপে গির্জার দৃষ্টিভঙ্গি নারীর প্রতি ছিল অত্যন্ত নেতিবাচক। ইভ (Hawwa)-কে আদমের (Adam) পাপের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল এবং সেখান থেকেই নারীকেই পাপ ও শয়তানের মাধ্যম বলে গণ্য করা হতো। চার্চ ফাদার টার্টুলিয়ান (Tertullian, ২য় শতক) নারীদের “শয়তানের দরজা” (The Devil’s Gateway) বলে অভিহিত করেন। গির্জার এই দৃষ্টিভঙ্গি বহু শতাব্দী ধরে নারীকে সামাজিক ও ধর্মীয়ভাবে অবনমিত করে রেখেছিল।


২. মধ্যযুগীয় ইউরোপে নারীকে পাপের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করা হতো:
গির্জার মতবাদ অনুসারে নারী দুর্বল, বিভ্রান্তকারী এবং পুরুষকে পাপের পথে চালিত করার মাধ্যম। ফলে নারীদের পড়াশোনা, ধর্মীয় আলোচনায় অংশগ্রহণ, এমনকি কিছুক্ষেত্রে গির্জায় প্রবেশ পর্যন্ত সীমিত করা হতো। অনেক নারীকে “জাদুকরী” বা “উইচ” আখ্যা দিয়ে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছে। বিশেষ করে ১৫শ থেকে ১৭শ শতাব্দীর ইউরোপে লক্ষাধিক নারী “উইচ-হান্টিং” এর শিকার হন, যেটা গির্জা-সমর্থিত ছিল।


৩. নারীর উত্তরাধিকার সংক্রান্ত অবস্থা ইউরোপে:
মধ্যযুগীয় খ্রিস্টান আইনে নারীদের উত্তরাধিকার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সীমিত ছিল। পুত্ররা পিতার সম্পত্তির প্রধান উত্তরাধিকারী হতো, আর কন্যারা যদি কিছু পেতো, তা হতো যৌতুকের আকারে বা চুক্তির ভিত্তিতে। অনেক ক্ষেত্রে, নারীকে সম্পূর্ণভাবে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হতো। ইংল্যান্ডে ১১শ শতকে প্রচলিত ছিল “Primogeniture” নীতি, যেখানে প্রথম পুত্রই সম্পূর্ণ সম্পত্তির মালিক হতো। নারী যদি স্বামী হারাতো, তাহলে কিছু বিধবা অধিকার থাকলেও তা ছিল সমাজ বা গির্জার করুণার ওপর নির্ভরশীল, অধিকার হিসেবে স্বীকৃত ছিল না।


৪. ইসলামে নারীর মর্যাদা:
ইসলাম নারীর মর্যাদাকে ঈমানের অংশ হিসেবে গণ্য করে। কুরআনে আল্লাহ বলেন:
“আমি তোমাদের প্রত্যেককে একটি নর ও একটি নারী থেকে সৃষ্টি করেছি।” (সূরা হুজুরাত, ৪৯:১৩)
নারীকে ইসলাম শিক্ষা, ব্যবসা, উপার্জন, সম্পত্তির মালিকানা, বিবাহ ও তালাকের অধিকার দেয়। মা হিসেবে নারীকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। হাদীসে এসেছে:
“তোমার মায়ের সাথে সদ্ব্যবহার কর, তারপর তোমার মায়ের সাথে, তারপর তোমার মায়ের সাথে, তারপর তোমার পিতার সাথে।” (সহীহ মুসলিম: ২৫৪৮)


৫. ইসলামে নারীর উত্তরাধিকার সংক্রান্ত অধিকার:
ইসলাম নারীর জন্য নির্দিষ্টভাবে উত্তরাধিকার নির্ধারণ করেছে। যেমন, পিতা মারা গেলে কন্যা উত্তরাধিকার পায়; স্বামী মারা গেলে স্ত্রী পায়; এমনকি মা, বোন, খালা—সবার অংশ নির্ধারিত। কুরআনে বলা হয়েছে:
“আল্লাহ তোমাদের তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে আদেশ দেন: এক পুত্রের সমান অংশ দুটি কন্যার।…” (সূরা নিসা, ৪:১১)
এটি ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম নারীর উত্তরাধিকারকে রাষ্ট্রীয়ভাবে এবং ধর্মীয়ভাবে নির্ধারিত করা।


৬. তুলনামূলক বিশ্লেষণ:
ইউরোপের খ্রিস্টীয় গির্জা নারীকে পাপ ও অপবিত্রতার প্রতীক হিসেবে দেখেছে, ফলে নারী শতাব্দীর পর শতাব্দী অধিকারবঞ্চিত ছিল। অন্যদিকে, ইসলাম নারীকে সৃষ্টির পূর্ণাঙ্গ অংশ হিসেবে মর্যাদা দিয়েছে এবং সমাজে তার শিক্ষা, উত্তরাধিকার ও ব্যক্তিসত্তা স্বীকার করেছে।


ইউরোপীয় সভ্যতায় নারীর মর্যাদা ও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
ইউরোপীয় সভ্যতায় নারীর মর্যাদা ও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

13 thoughts on “ইউরোপীয় সভ্যতায় নারীর মর্যাদা ও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *