Islamic Life

কুরআনের আলোকে হারুন (আ.)-এর নবুয়তের প্রমাণ

কুরআনের আলোকে হারুন (আ.)-এর নবুয়তের প্রমাণ

কুরআনের আলোকে হারুন (আ.)-এর নবুয়তের প্রমাণ

নবী হারুন (আলাইহিস সালাম)-এর নবুয়তের প্রমাণ কুরআন ও হাদীস—উভয় উৎসেই সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিছু বিভ্রান্তিকর মতবাদে হারুন (আ.)-কে নবী না মেনে শুধু একজন “ওলি” বা “সহযোগী ব্যক্তি” বলা হয়, তবে এ মত কুরআনের সরাসরি বর্ণনার বিরোধী এবং ভুল।

১. সূরা মারইয়াম – নবুওতের স্পষ্ট ঘোষণা:

 وَوَهَبْنَا لَهُ مِن رَّحْمَتِنَا أَخَاهُ هَارُونَ نَبِيًّا
আর আমি আমার রহমতের মাধ্যমে তার (মূসার) ভাই হারুনকে নবী করেছিলাম।”
— সূরা মারইয়াম, ১৯:৫৩

এখানে “نَبِيًّا” (নবী) শব্দটি সরাসরি ব্যবহার হয়েছে। আরবি ভাষায় এটি একটি বিশুদ্ধ ও স্পষ্ট শব্দ, যার মানে নবী, কোনো আলঙ্কারিক অর্থ বা রূপক বোঝানো হয়নি।

 

২. সূরা আশ-শো‘আরা – দাওয়াতি দায়িত্বে শামিল:

فَأْتِيَا فِرْعَوْنَ فَقُولا إِنَّا رَسُولا رَبِّ الْعَالَمِينَ
তোমরা উভয়ে ফিরআউনের নিকট যাও এবং বলো, আমরা জগতসমূহের প্রভুর পক্ষ থেকে প্রেরিত (রাসূল)।” — সূরা আশ-শু‘আরা, ২৬:১৬

এখানে “إِنَّا رَسُولا” বলা হয়েছে — “আমরা দুইজন রাসূল”। এতে প্রমাণিত হয় হারুন (আ.) কেবল সহযোগী ছিলেন না, বরং মূসা (আ.)-এর সঙ্গে সমানভাবে নবুয়তের দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন।

 

৩. সূরা আল-কাসাস – মূসা (আ.)-এর দোয়া এবং কবুল:

 وَأَخِي هَارُونُ هُوَ أَفْصَحُ مِنِّي لِسَانًا فَأَرْسِلْهُ مَعِيَ رِدْءًا يُصَدِّقُنِي
“আর আমার ভাই হারুন, সে কথা বলার ক্ষেত্রে আমার চেয়ে পারদর্শী; তাকে আমার সঙ্গে সাহায্যকারী হিসেবে প্রেরণ করো যেন সে আমাকে সমর্থন করতে পারে।” — সূরা আল-কাসাস, ২৮:৩৪

আল্লাহ এরপর বলেন:

 قَالَ سَنَشُدُّ عَضُدَكَ بِأَخِيكَ وَنَجْعَلُ لَكُمَا سُلْطَانًا
“আমি তোমার বাহুকে তোমার ভাইয়ের মাধ্যমে শক্তিশালী করব এবং আমি তোমাদের উভয়ের জন্য কর্তৃত্ব দেব।”
— ২৮:৩৫

এই আয়াতদ্বয়ে আল্লাহ স্বয়ং স্পষ্টভাবে বলেন যে মূসা ও হারুন উভয়েই কর্তৃত্বপ্রাপ্ত, অর্থাৎ উভয়ই নবুয়তের দায়িত্বপ্রাপ্ত।

 

সহীহ হাদীসের আলোকে প্রমাণ

১. সহীহ বুখারী – নবীদের তালিকায়

রাসূলুল্লাহ ﷺ মি’রাজের সময় নবীদের সঙ্গে সাক্ষাত করেন। এতে স্পষ্টভাবে হারুন (আ.)-এর অবস্থান নবী হিসেবে উল্লেখিত:

عَنْ أَنَسٍ، عَنِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ: “ثُمَّ رُفِعْتُ إِلَى السَّمَاءِ الرَّابِعَةِ، فَإِذَا أَنَا بِإِدْرِيسَ، ثُمَّ خَامِسَةٍ… ثُمَّ رُفِعْتُ إِلَى السَّابِعَةِ، فَإِذَا أَنَا بِإِبْرَاهِيمَ، قَالَ: فَرَأَيْتُ مُوسَى، ثُمَّ عِيسَى، ثُمَّ هَارُونَ…” — সহীহ বুখারী, হাদীস: ৩২০৭

এখানে হারুন (আ.)-এর বর্ণনা অন্যান্য নবীদের মতোই এসেছে। তাঁর উপস্থিতি আসমানে প্রমাণ করে তিনি নবী ছিলেন।

عَنْ أَنَسٍ، عَنِ النَّبِيِّ ﷺ قَال:

“ثُمَّ رُفِعْتُ إِلَى السَّمَاءِ الرَّابِعَةِ، فَإِذَا أَنَا بِإِدْرِيسَ، فَقَالَ: مَرْحَبًا بِالنَّبِيِّ الصَّالِحِ وَالْأَخِ الصَّالِحِ، ثُمَّ رُفِعْتُ إِلَى السَّمَاءِ الْخَامِسَةِ، فَإِذَا أَنَا بِهَارُونَ، فَقَالَ: مَرْحَبًا بِالنَّبِيِّ الصَّالِحِ وَالْأَخِ الصَّالِحِ،…”
— صحيح البخاري، رقم الحديث: ٣٢٠٧

অনুবাদ: আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ বলেন:

“তারপর আমাকে চতুর্থ আকাশে উত্তোলন করা হলো, সেখানে আমি ইদরীস (আ.)-কে দেখতে পেলাম। তিনি বললেন: ‘নেক নবী ও নেক ভাইকে স্বাগতম।’ তারপর আমাকে পঞ্চম আকাশে উত্তোলন করা হলো, সেখানে আমি হারুন (আ.)-কে দেখতে পেলাম। তিনিও বললেন: ‘নেক নবী ও নেক ভাইকে স্বাগতম।’…”

 

এই হাদীস থেকে প্রমাণ:

  1. হারুন (আ.)-কে আসমানে নবীদের মাঝে দেখা গেছে।
    এটা প্রমাণ করে তিনি নবীদের অন্তর্ভুক্ত। 
  2. তাঁর সম্বোধন ‘النَّبِيِّ الصَّالِحِ’ অর্থাৎ ‘সৎ নবী’ হিসেবে করা হয়েছে।
    এতে বোঝা যায় যে, উভয়েই (হারুন এবং রাসূল ﷺ) নবী ছিলেন — ও পরস্পরের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেছেন। 

 

ভ্রান্ত দাবির খণ্ডন: হারুন (আ.) ছিলেন না নবী — এই মতের উত্তর

দাবির মূল ভিত্তি:

কিছু মতবাদ বিশেষত কিছু শিয়া বা বাতিল দল দাবী করে যে, হারুন (আ.) শুধু মূসা (আ.)-এর সহযোগী ছিলেন, নবী ছিলেন না। তারা বলে, “নবুয়ত শুধু মূসা (আ.)-এর জন্য ছিল”।

খণ্ডন:

১. কুরআনে সরাসরি “نَبِيًّا” (নবী) শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, যা কোনোভাবেই “ওলি” বা শুধু “সাহায্যকারী” অর্থে ব্যাখ্যা করা যায় না। এ দাবির বিপক্ষে কুরআনই প্রধান প্রমাণ।

 

২. আল্লাহ তাআলা নিজেই বলেন:

وَقَدْ آتَيْنَا مُوسَى الْكِتَابَ وَجَعَلْنَا مَعَهُ أَخَاهُ هَارُونَ وَزِيرًا
“আমি মূসাকে কিতাব দিয়েছি এবং তার সঙ্গে তার ভাই হারুনকে সহযোগী করেছি। — সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৩٥

যদি শুধু সাহায্যকারী হতেন তবে কুরআনে এতবার “নবী” শব্দ ব্যবহার করা হতো না।

 

৩. সহীহ হাদীসে নবীদের তালিকায় হারুন (আ.)-এর উপস্থিতি নিশ্চিত করে যে তিনি একজন নবী ছিলেন।

হারুন (আ.) ছিলেন নিঃসন্দেহে একজন আল্লাহ-প্রদত্ত নবী। কুরআনের পরিপূর্ণ, স্পষ্ট ও নির্ভুল ভাষায় তাঁর নবুয়তের ঘোষণা এসেছে। যারা এ বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করে, তারা কুরআনের অস্বীকারকারীদের দলভুক্ত। হারুন (আ.)-এর নবুয়তের অস্বীকৃতি শুধু ভুলই নয়, বরং ঈমানের জন্য হুমকিস্বরূপ।

 নির্ভরযোগ্য সূত্র:

  • কুরআন: সূরা মারইয়াম ১৯:৫৩,
  • সূরা আশ-শু‘আরা ২৬:১৬,
  • সূরা আল-কাসাস ২৮:৩৪–৩৫
  • সহীহ বুখারী, হাদীস: ৩২০৭
  • তাফসির ইবনে কাসীর,
  • তাফসির কুরতুবি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *