প্রসিদ্ধ পরবর্তী মুফাসসিরগণ
ভূমিকা:
কোরআনের তাফসীর বা ব্যাখ্যা হলো এক গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানশাখা, যা মুসলিম উম্মাহর জন্য সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করে। কোরআনের গভীর তাৎপর্য বুঝতে হলে এর ব্যাখ্যা প্রয়োজন, যা মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্বয়ং সাহাবীগণকে শিখিয়েছেন এবং পরবর্তী সময়ে তাবেয়ীগণ ও তাবে-তাবেয়ীগণ এই জ্ঞানকে সংরক্ষণ করেছেন। এ প্রবন্ধে আমরা প্রসিদ্ধ মুফাসসির সাহাবীগণ, তাবেয়ীগণ, তাবে-তাবেয়ীগণ এবং পরবর্তী যুগের শ্রেষ্ঠ মুফাসসিরগণের পরিচয় ও অবদান নিয়ে আলোচনা করব।
মুফাসসির সাহাবীগণ ও তাঁদের অবদান:
সাহাবীগণ রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সরাসরি শিক্ষাগ্রহণকারী ছিলেন এবং তাঁর নিকট থেকেই কোরআনের তাফসীর শিখেছিলেন। তাঁরা ছিলেন তাফসীর শাস্ত্রের প্রকৃত প্রবক্তা। কয়েকজন প্রসিদ্ধ মুফাসসির সাহাবী হলেন:
১. আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) – তাঁকে “তরজুমানুল কোরআন” বলা হয়। তিনি নবীজির (সা.) দোয়ার বরকতে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে অসাধারণ পারদর্শী হয়ে ওঠেন। তাঁর তাফসীর বহু তাবেয়ীর মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়েছে।
২. আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) – কোরআনের ব্যাখ্যায় তিনি ছিলেন অন্যতম শীর্ষস্থানীয় সাহাবী। তাঁর বর্ণিত তাফসীরসমূহ তাবেয়ীদের মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়েছে।
৩. উবাই ইবনে কা’ব (রা.) – তিনি কোরআনের কিরাত ও তাফসীর বিষয়ে নবীজির (সা.) অন্যতম শিক্ষক ছিলেন।
৪. জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) – তিনি বহু আয়াতের শানে নুযুল এবং ব্যাখ্যা বর্ণনা করেছেন।
মুফাসসির তাবেয়ীগণ ও তাঁদের অবদান:
তাবেয়ীগণ সাহাবীদের সংস্পর্শে থেকে কোরআনের তাফসীর শিক্ষালাভ করেছেন। তাঁদের মধ্যে বিখ্যাত মুফাসসিরগণ হলেন:
১. মুজাহিদ ইবনে জাবির (রহ.) – তিনি ইবনে আব্বাস (রা.)-এর অন্যতম ছাত্র ছিলেন এবং তাফসীরশাস্ত্রে বিশেষ অবদান রেখেছেন।
২. আতা ইবনে আবি রাবাহ (রহ.) – তিনি সাহাবীদের কাছ থেকে কোরআনের ব্যাখ্যা শিখে তা সংরক্ষণ করেছেন।
৩. ইকরিমা (রহ.) – ইবনে আব্বাস (রা.)-এর প্রসিদ্ধ শিষ্য এবং তাফসীরবিদ ছিলেন।
৪. হাসান বসরী (রহ.) – তিনি একজন প্রসিদ্ধ মুফাসসির ও মুহাদ্দিস ছিলেন।
মুফাসসির তাবে-তাবেয়ীগণ ও তাঁদের অবদান:
তাবে-তাবেয়ীগণ ছিলেন তাবেয়ীদের শিষ্য। তাঁদের মধ্যে প্রসিদ্ধ মুফাসসিরগণ হলেন:
১. সুফিয়ান সাওরি (রহ.) – তিনি তাফসীর ও ফিকহশাস্ত্রে বিখ্যাত ছিলেন।
২. আবু উবাইদ কাসিম ইবনে সালাম (রহ.) – তিনি কোরআনের শব্দার্থ ও ব্যাখ্যা বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন।
৩. ইবনে জারির তাবারি (রহ.) – তাঁর “তাফসীর আত-তাবারি” ইসলামের অন্যতম প্রসিদ্ধ তাফসীর গ্রন্থ।
প্রসিদ্ধ পরবর্তী মুফাসসিরগণ ও তাঁদের অবদান:
পরবর্তী যুগের প্রসিদ্ধ মুফাসসিরগণ কোরআনের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখেছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল:
১. ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) – তাঁর “তাফসীর ইবনে কাসির” সর্বাধিক প্রসিদ্ধ তাফসীর গ্রন্থ।
- কুরতুবী (রহ.) – তিনি “আল-জামি লি আহকামিল কোরআন” রচনা করেছেন।
- ফখরুদ্দিন রাজী (রহ.) – তাঁর “তাফসীর আল-কবীর” কোরআনের গভীর ব্যাখ্যার জন্য বিখ্যাত।
- শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহ.) – তিনি কোরআনের ব্যাখ্যায় দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত করেছেন।
উপসংহার:
কোরআনের তাফসীর মুসলিম উম্মাহর জন্য অপরিহার্য। সাহাবীগণ থেকে শুরু করে পরবর্তী যুগের প্রসিদ্ধ মুফাসসিরগণ পর্যন্ত সকলেই তাঁদের জ্ঞান ও গবেষণার মাধ্যমে ইসলামী জ্ঞানভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁদের তাফসীর গ্রন্থগুলো আজও আমাদের জন্য দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করছে।

