তৃতীয় অধ্যায় – ফেরেশতাদের আলোচনা
ইসলামী আকিদার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ফেরেশতাদের প্রতি বিশ্বাস। কালাম শাস্ত্রের তৃতীয় অধ্যায়ে ফেরেশতাদের অস্তিত্ব, তাদের প্রকৃতি, দায়িত্ব ও গুণাবলী সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। ফেরেশতারা আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি, যারা কোনো পানাহার করেন না, ঘুমান না এবং তাঁর আদেশ পালন করতে কখনও অবহেলা করেন না। তারা আল্লাহর বিশেষ সৃষ্টি, যাদের সম্পর্কে কুরআন ও হাদিসে সুস্পষ্ট আলোচনা পাওয়া যায়।
📖 আল্লাহ বলেন:
﴿ لَّا يَعْصُونَ ٱللَّهَ مَآ أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ ﴾
“তারা কখনো আল্লাহর আদেশ অমান্য করে না এবং যা আদেশ করা হয় তাই সম্পাদন করে।”
📖 (সুরা আত-তাহরিম: ৬)
ফেরেশতাদের প্রতি বিশ্বাস ইসলামের ছয়টি ঈমানের মৌলিক স্তম্ভের একটি। কালাম শাস্ত্রের আলোকে তাদের অস্তিত্বের দার্শনিক ও যৌক্তিক ভিত্তি বিশ্লেষণ করা হয়, যা ইসলামী আকিদাকে আরও সুদৃঢ় করে।
নিচে কুরআন ও হাদিসের আলোকে ফেরেশতাদের পরিচয় এবং প্রধান প্রধান ফেরেশতাদের কাজগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
ফেরেশতাদের পরিচয়
ফেরেশতারা আল্লাহ তাআলার এক বিশেষ সৃষ্টি, যাদের সৃষ্টি করা হয়েছে নূর বা আলো থেকে। তারা আল্লাহর হুকুমের বাইরে কখনো যায় না এবং সম্পূর্ণরূপে তাঁর আনুগত্য করে। কুরআনে এসেছে:
وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ
“এবং তারা সে সবই করে, যা তাদেরকে আদেশ করা হয়।”
—(সুরা আন-নাহল: ৫০)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
خُلِقَتِ الْمَلَائِكَةُ مِنْ نُورٍ
“ফেরেশতাদের সৃষ্টি করা হয়েছে নূর থেকে।”
—(সহিহ মুসলিম: ২৯৯৬)
ফেরেশতারা খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করে না এবং তাদের কোনো লিঙ্গ নেই। তারা সর্বদা আল্লাহর ইবাদতে রত থাকে।
প্রধান প্রধান ফেরেশতা ও তাদের দায়িত্ব
১. জিবরাঈল (عليه السلام)
তিনি ওহী বা বার্তা পৌঁছানোর দায়িত্বে নিয়োজিত। কুরআনে বলা হয়েছে:
نَزَلَ بِهِ الرُّوحُ الْأَمِينُ عَلَىٰ قَلْبِكَ لِتَكُونَ مِنَ ٱلْمُنذِرِينَ
“এটি (কুরআন) ‘রূহুল আমিন’ (বিশ্বস্ত আত্মা) নিয়ে এসেছেন, তোমার অন্তরে যেন তুমি সতর্ককারীদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারো।”
—(সুরা আশ-শু’আরা: ১৯৩-১৯৪)
তিনি নবীগণের প্রতি ওহী নিয়ে আসতেন এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী ছিলেন।
২. মিকাঈল (عليه السلام)
তিনি বৃষ্টিপাত, রিজিকের ব্যবস্থা ও প্রকৃতির কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা।
হাদিসে এসেছে:
“জিবরাঈল হলো ওহীর দায়িত্বপ্রাপ্ত, আর মিকাঈল হলো রিজিক ও বৃষ্টিপাতের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা।”
—(মুসনাদ আহমদ: ২৩৪৮২)
৩. ইস্রাফীল (عليه السلام)
তিনি কিয়ামতের দিন শিঙ্গায় ফুঁক দেবেন, যার মাধ্যমে সমস্ত সৃষ্টির জীবনাবসান হবে এবং পুনরুত্থান ঘটবে।
কুরআনে এসেছে:
وَنُفِخَ فِي ٱلصُّورِ فَصَعِقَ مَن فِي ٱلسَّمَاوَٰتِ وَمَن فِي ٱلْأَرْضِ إِلَّا مَن شَآءَ ٱللَّهُ
“আর শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে, ফলে আসমান ও জমিনের সবাই মৃত্যুবরণ করবে, তবে যাকে আল্লাহ চাহেন সে ছাড়া।”
—(সুরা আজ-জুমার: ৬৮)
৪. আজরাঈল (عليه السلام) (মালাকুল মাউত – ملك الموت)
তিনি মানুষের রূহ কবজ করার দায়িত্বে রয়েছেন।
কুরআনে এসেছে:
قُلْ يَتَوَفَّاكُمْ مَّلَكُ ٱلْمَوْتِ ٱلَّذِي وُكِّلَ بِكُمْ
“বলুন, তোমাদের মৃত্যু দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তোমাদের মৃত্যু ঘটাবে।”
—(সুরা আস-সাজদাহ: ১১)
৫. মুনকার ও নাকির (عليهما السلام)
এরা কবরের পরীক্ষা গ্রহণকারী ফেরেশতা। মুমিনদের জন্য তারা কোমলভাবে প্রশ্ন করেন, আর কাফেরদের জন্য কঠিনভাবে।
হাদিসে এসেছে:
“যখন কোনো বান্দাকে কবরস্থ করা হয়, তখন দুটি কালো-নীল ফেরেশতা তার কাছে আসে, তাদের একজনকে বলা হয় মুনকার, আরেকজনকে নাকির।”
—(তিরমিজি: ১০৭১)
৬. রকিব ও অতিদ (عليهما السلام)
তারা মানুষের সমস্ত কাজ লিপিবদ্ধ করেন।
কুরআনে এসেছে:
مَّا يَلْفِظُ مِن قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ
“মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করুক, তার জন্য প্রস্তুত রয়েছে একজন পর্যবেক্ষক ফেরেশতা।”
—(সুরা ক্বাফ: ১৮)
৭. মালিক (عليه السلام)
তিনি জাহান্নামের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা।
কুরআনে এসেছে:
وَنَادَوْا يَٰمَٰلِكُ لِيَقْضِ عَلَيْنَا رَبُّكَ
“তারা বলবে, ‘হে মালিক! আমাদের রব যেন আমাদের শেষ করে দেন।'”
—(সুরা আয-যুখরুফ: ৭৭)
৮. রিদওয়ান (عليه السلام)
তিনি জান্নাতের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা।
হাদিসে এসেছে:
“জান্নাতের দারওয়ান হলেন রিদওয়ান।”
—(তাফসির ইবনে কাসির)
উপসংহার
ফেরেশতারা আল্লাহর বিশেষ সৃষ্টি, যারা নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন করেন। তাদের প্রতি বিশ্বাস ঈমানের একটি অপরিহার্য অংশ। কুরআন ও হাদিসে তাদের সম্পর্কে সুস্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে, যা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়। আল্লাহ আমাদেরকে তাদের প্রতি সঠিক বিশ্বাস রাখার তাওফিক দান করুন। আমীন।
ফেরেশতাদের সংখ্যা
ফেরেশতাদের সংখ্যা সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো সংখ্যা কুরআন ও হাদিসে উল্লেখ নেই, তবে অনেক হাদিস ও ইসলামিক স্কলারগণ বলেছেন যে তাদের সংখ্যা সীমাহীন।
কুরআনের বর্ণনা
কুরআনে এসেছে:
وَمَا يَعْلَمُ جُنُودَ رَبِّكَ إِلَّا هُوَ ۚ
“আর তোমার রবের সৈন্যদের সংখ্যা তিনিই ভালো জানেন।”
—(সুরা আল-মুদ্দাসসির: ৩১)
এই আয়াতের মাধ্যমে বোঝা যায় যে, ফেরেশতাদের সংখ্যা এত বেশি যে, একমাত্র আল্লাহই তাদের সঠিক সংখ্যা জানেন।
হাদিসের বর্ণনা
হাদিসেও ফেরেশতাদের বিপুল সংখ্যার উল্লেখ পাওয়া যায়। নবী (সা.) মিরাজের রাতে দেখেছিলেন যে, বায়তুল মামুরে (আকাশের কাবা) প্রতিদিন ৭০,০০০ ফেরেশতা প্রবেশ করেন এবং একবার প্রবেশ করা ফেরেশতা দ্বিতীয়বার আসার সুযোগ পান না।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
يُدْخِلُهُ كُلَّ يَوْمٍ سَبْعُونَ أَلْفَ مَلَكٍ، إِذَا خَرَجُوا مِنْهُ لَمْ يَعُودُوا آخِرَ مَا عَلَيْهِمْ
“প্রতিদিন এতে ৭০,০০০ ফেরেশতা প্রবেশ করে, যারা একবার প্রবেশ করে, তারা আর কখনও ফিরে আসে না।”
—(সহিহ বুখারি: ৩২০৭, সহিহ মুসলিম: ১৬৪)
ইসলামিক স্কলারদের মতামত
- ইমাম নববি (রহ.) বলেন: “এই হাদিস প্রমাণ করে যে, ফেরেশতাদের সংখ্যা সীমাহীন এবং কেবল আল্লাহই তা জানেন।”
- ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) বলেন: “আকাশ, জমিন এবং সৃষ্টি জগতে ফেরেশতাদের ব্যাপক উপস্থিতি প্রমাণ করে যে তারা অসংখ্য।”
ফেরেশতাদের আকার ও আকৃতি
ফেরেশতারা আল্লাহ তাআলার বিশেষ সৃষ্টি, যারা বিভিন্ন আকার ও আকৃতিতে থাকতে পারেন। তারা নূর বা আলো থেকে সৃষ্টি এবং তাদের নিজস্ব রূপ রয়েছে, যা আল্লাহ তাদের দিয়েছেন।
জিবরাঈল (আ.)-এর প্রকৃত আকৃতি
হাদিসে এসেছে যে, নবী মুহাম্মদ (সা.) ফেরেশতা জিবরাঈল (আ.)-কে তার প্রকৃত আকৃতিতে দেখেছেন।
وَلَقَدْ رَآهُ نَزْلَةً أُخْرَىٰ عِندَ سِدْرَةِ ٱلْمُنتَهَىٰ
“নিশ্চয়ই তিনি (নবী সা.) তাকে (জিবরাঈলকে) আরেকবার দেখেছিলেন সিদরাতুল মুনতাহার নিকটে।”
—(সুরা আন-নাজম: ১৩-১৪)
নবী (সা.) বলেছেন:
رَأَيْتُ جِبْرِيلَ لَهُ سِتُّمِئَةِ جَنَاحٍ
“আমি জিবরাঈলকে দেখেছি, তার ৬০০টি ডানা ছিল।”
—(সহিহ বুখারি: ৩২৩২)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, ফেরেশতারা বিশাল আকারের হতে পারেন।
ফেরেশতাদের বিভিন্ন আকৃতি ধারণ করার ক্ষমতা
ফেরেশতারা বিভিন্ন আকৃতি নিতে পারেন। যেমন, জিবরাঈল (আ.) অনেক সময় মানুষের রূপে নবী (সা.)-এর কাছে আসতেন।
হাদিসে এসেছে:
“একদিন আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে বসেছিলাম, এমন সময় হঠাৎ একজন অপরিচিত ব্যক্তি আমাদের সামনে উপস্থিত হলেন, যাঁর কাপড় ছিল ধবধবে সাদা এবং চুল ছিল ঘন কালো…”
—(সহিহ মুসলিম: ৮)
এই ব্যক্তি ছিলেন ফেরেশতা জিবরাঈল (আ.), যিনি মানব আকৃতিতে নবীর (সা.) কাছে আসেন।
ইসলামিক স্কলারদের ব্যাখ্যা
- ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) বলেন: “ফেরেশতারা নূরের সৃষ্টি, তাই তারা তাদের প্রকৃত আকৃতি পরিবর্তন করতে পারেন।”
- ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেন: “কুরআন ও হাদিস থেকে প্রমাণিত যে ফেরেশতারা মানুষ, পশু বা অন্য যে কোনো রূপ ধারণ করতে পারেন।”
উপসংহার
ফেরেশতাদের সংখ্যা সীমাহীন, যা কেবল আল্লাহ জানেন। তারা বিশাল আকৃতির হতে পারেন এবং বিভিন্ন রূপ ধারণ করার ক্ষমতা রাখেন। কুরআন ও হাদিসে ফেরেশতাদের প্রকৃত আকৃতি সম্পর্কে কিছু বর্ণনা রয়েছে, যা আমাদের জন্য ঈমানের বিষয়। আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক আকিদা অনুযায়ী ফেরেশতাদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

