জালিম শাসকের পরিচয়: কুরআন ও হাদিসের আলোকে কাফির, জালিম ও ফাসিক শাসকের বাস্তব চিত্র
ভয়াবহ, কঠিন সতর্কবার্তা, চমকপ্রদ সত্য, আল্লাহর হুকুম, ধ্বংস, জবাবদিহি, ঈমান, ন্যায়বিচার, গুনাহ, পরিণতি
ভূমিকা
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। ব্যক্তি জীবন থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার বিধান অনুসরণ করার নির্দেশ রয়েছে। শাসনব্যবস্থা ইসলামি জীবনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একজন শাসক যদি আল্লাহর বিধান অনুযায়ী বিচার ও শাসন পরিচালনা করেন, তবে সমাজে ন্যায়, শান্তি ও বরকত প্রতিষ্ঠিত হয়। আর যদি শাসক নিজের খেয়াল, স্বার্থ, অন্যায় আইন ও জুলুমের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা করে, তবে সে শুধু জনগণের নয়, আল্লাহর কাছেও অপরাধী হয়ে যায়।
কুরআনে আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেছেন—যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচার করে না, তারা কখনো “কাফির”, কখনো “জালিম”, আবার কখনো “ফাসিক”। এই তিনটি শব্দ একই প্রসঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে। কেন? এর অর্থ কী? সবাই কি সরাসরি কাফির হয়ে যায়? নাকি এর মধ্যে স্তরভেদ আছে?
এই আলোচনায় আমরা কুরআন, সহিহ হাদিস এবং মুফাসসিরদের ব্যাখ্যার আলোকে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে জানব।
—
আল্লাহর বিধান অনুযায়ী শাসন করা ফরজ
রাষ্ট্র পরিচালনা, বিচার, আইন এবং সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা—এসব আল্লাহর আমানত। শাসক নিজের ইচ্ছায় নয়, আল্লাহর বিধান অনুযায়ী চলবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন
إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ
অর্থঃ “হুকুম তো একমাত্র আল্লাহরই।”
— সূরা ইউসুফ, ১২:৪০
এই আয়াত স্পষ্ট করে দেয়—চূড়ান্ত বিধানদাতা মানুষ নয়, আল্লাহ।
—

সূরা মায়িদার তিনটি আয়াত: কাফির, জালিম ও ফাসিক
এই বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি আয়াত হলো সূরা মায়িদার ৪৪, ৪৫ ও ৪৭ নম্বর আয়াত।
—
প্রথম আয়াত: কাফির
আল্লাহ বলেন
وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ
অর্থঃ “যারা আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তদনুযায়ী বিচার করে না—তারাই কাফির।”
— সূরা মায়িদা, ৫:৪৪
তাফসীর ইবনে কাসীর
ইমাম ইবনে কাসীর (রহ.) এই আয়াতের তাফসীরে প্রথমে উল্লেখ করেন যে, আল্লাহ তাআলা এখানে তাওরাতের মর্যাদা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, তাওরাতে হিদায়াত ও নূর ছিল, এবং আল্লাহর নবীগণ, আলেমগণ ও ফকীহগণ সেই তাওরাত অনুযায়ী ইয়াহুদিদের মাঝে বিচার করতেন। কিন্তু ইয়াহুদিরা আল্লাহর বিধান গোপন করতে শুরু করে। বিশেষ করে ব্যভিচারের শাস্তি রজম এবং কিসাসের বিধানে তারা পরিবর্তন এনে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করত।
ইবনে কাসীর বলেন, এই অবস্থায় আল্লাহ তাদের সতর্ক করে বলেন—মানুষকে ভয় করো না, আমাকে ভয় করো। অর্থাৎ শাসক, বিচারক এবং আলেমদের জন্য এটি কঠিন সতর্কবার্তা—মানুষের চাপ, ক্ষমতার প্রভাব কিংবা দুনিয়াবী লাভের জন্য আল্লাহর বিধান গোপন করা যাবে না।
এরপর তিনি “ومن لم يحكم بما أنزل الله” অংশের ব্যাখ্যায় হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বিখ্যাত উক্তি তুলে ধরেন—
كفر دون كفر
অর্থাৎ “এটি এমন কুফর নয় যা মানুষকে ইসলাম থেকে সম্পূর্ণ বের করে দেয়।”
ইবনে কাসীর ব্যাখ্যা করেন, যদি কেউ আল্লাহর বিধানকে অস্বীকার করে, মনে করে মানুষের তৈরি আইন আল্লাহর আইনের চেয়ে উত্তম, অথবা শরীয়তকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে—তাহলে সে বড় কুফরে (কুফর আকবর) পতিত হবে। কিন্তু যদি কেউ আল্লাহর বিধানকে সত্য বলে বিশ্বাস করে, অথচ ঘুষ, ক্ষমতা, লোভ, ভয় বা প্রবৃত্তির কারণে সে অনুযায়ী বিচার না করে—তবে সে ছোট কুফরে (কুফর দুনা কুফর) পতিত হবে। অর্থাৎ সে ফাসিক ও গুনাহগার হবে, তবে সরাসরি ইসলাম থেকে বের হবে না।
—
তাফসীর তাবারী
ইমাম তাবারী (রহ.) বলেন, এই আয়াত মূলত ইয়াহুদিদের প্রসঙ্গে নাযিল হয়েছিল। তারা আল্লাহর বিধানকে গোপন করত এবং নিজেদের সামাজিক মর্যাদা অনুযায়ী আলাদা আলাদা বিচার করত। ধনী ও প্রভাবশালীদের জন্য শাস্তি কমিয়ে দিত, আর দুর্বলদের উপর কঠোরতা আরোপ করত। বিশেষ করে রজমের বিধান তারা বিকৃত করে ফেলেছিল।
তাবারী বলেন, যদিও আয়াতের শানে নুযূল ইয়াহুদিদের সঙ্গে সম্পর্কিত, কিন্তু আয়াতের শব্দ সাধারণ। তাই এর শিক্ষা শুধু ইয়াহুদিদের জন্য নয়; মুসলিমদের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য। যে ব্যক্তি জেনেশুনে আল্লাহর বিধান বাদ দিয়ে অন্যায় বিচার করবে, সে এই হুমকির অন্তর্ভুক্ত হবে।
তিনি আরও বলেন, এখানে “কাফির” বলা হয়েছে কারণ তারা শুধু বিচার না করেই ক্ষান্ত হয়নি; বরং সত্যকে গোপন করেছে, আল্লাহর বিধানকে পরিবর্তন করেছে এবং নিজেদের স্বার্থকে শরীয়তের উপরে স্থান দিয়েছে। এই কাজই তাদের কুফরের কারণ হয়েছে।
—
তাফসীর রূহুল মাআনী
আল্লামা আলূসী (রহ.) তাফসীর রূহুল মাআনীতে বলেন, এখানে “কাফির” শব্দের অর্থ সব সময় এক নয়। কখনও এটি প্রকৃত ঈমানহীনতা বোঝায়, আবার কখনও এটি বড় গুনাহ ও মারাত্মক অবাধ্যতাকে বোঝায়।
তিনি বলেন, যদি ব্যক্তি বিশ্বাস করে যে শরীয়তের বিধান সঠিক নয়, অথবা মনে করে মানুষের আইন আল্লাহর আইনের চেয়ে উত্তম—তাহলে এটি নিঃসন্দেহে কুফর আকবর। কিন্তু যদি ব্যক্তি শরীয়তের শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাস রাখে, অথচ বাস্তবে প্রবৃত্তি বা স্বার্থের কারণে তা প্রয়োগ না করে—তবে সে কাফির শব্দের অধীনে রূপক অর্থে এসেছে; অর্থাৎ সে বড় গুনাহগার, যালিম ও ফাসিক।
আল্লামা আলূসী বলেন, এজন্যই পরবর্তী দুই আয়াতে “যালিম” ও “ফাসিক” শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে বোঝা যায়—সব বিচারহীনতাই এক স্তরের কুফর নয়।
—
দ্বিতীয় আয়াত: জালিম
আল্লাহ বলেন
وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
অর্থঃ “যারা আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তদনুযায়ী বিচার করে না—তারাই জালিম।”
— সূরা মায়িদা, ৫:৪৫
তাফসীর ইবনে কাসীর
এই আয়াতের পূর্বে আল্লাহ তাআলা কিসাসের বিধান বর্ণনা করেছেন—প্রাণের বদলে প্রাণ, চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক, কান-এর বদলে কান এবং দাঁতের বদলে দাঁত। এটি ন্যায়বিচারের পূর্ণরূপ। ইসলামের আগে সমাজে শক্তিশালী ও দুর্বল মানুষের জন্য ভিন্ন বিচার ছিল। কোনো অভিজাত ব্যক্তি অপরাধ করলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হতো, কিন্তু গরিব ব্যক্তি একই কাজ করলে কঠিন শাস্তি দেওয়া হতো।
ইবনে কাসীর বলেন, ইয়াহুদিরা কিসাসের ক্ষেত্রেও এই বৈষম্য করত। এজন্য আল্লাহ তাদের যালিম বলেছেন। কারণ আল্লাহর বিধান ছেড়ে অন্যায় বিচার করা সরাসরি জুলুম। এতে শুধু অন্যের অধিকার নষ্ট হয় না, বরং বিচারক নিজের উপরও জুলুম করে, কারণ সে আল্লাহর আদেশ অমান্য করে।
তিনি আরও বলেন, “فهو كفارة له” অংশ দ্বারা বোঝানো হয়েছে—যদি মজলুম ব্যক্তি ক্ষমা করে দেয়, তবে তা তার জন্য কাফফারা হবে। অর্থাৎ কিসাস ন্যায়সঙ্গত হলেও ক্ষমা করা অধিক উত্তম।
—
তাফসীর তাবারী
ইমাম তাবারী বলেন, এখানে “যালিম” শব্দ ব্যবহারের কারণ হলো—আল্লাহর বিধান বাদ দিয়ে বিচার করা মূলত জুলুম। কারণ আল্লাহর আইন ন্যায়ের প্রতীক। যখন কেউ সেই ন্যায়কে বাদ দিয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ, গোত্রপ্রীতি বা ক্ষমতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দেয়, তখন সে জুলুম করে।
তিনি বলেন, ইয়াহুদিরা বিচার ব্যবস্থাকে নিজেদের সামাজিক শ্রেণি অনুযায়ী পরিচালনা করত। ফলে দুর্বলদের উপর অত্যাচার হতো। আল্লাহ এই অবিচারকে কঠোরভাবে নিন্দা করেছেন। তাই এখানে “কাফির” নয়, “যালিম” শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে—কারণ অন্যায় বিচার জুলুমের সবচেয়ে বড় রূপ।
—
তাফসীর রূহুল মাআনী
আল্লামা আলূসী বলেন, “যালিম” এখানে সেই ব্যক্তিকে বোঝায়, যে নিজের নফসের ইচ্ছাকে আল্লাহর বিধানের উপরে স্থান দেয়। সে আল্লাহর নির্ধারিত ন্যায়কে অগ্রাহ্য করে ব্যক্তিগত সুবিধাকে অগ্রাধিকার দেয়।
তিনি বলেন, এই জুলুম দ্বিমুখী—একদিকে নিজের আত্মার উপর জুলুম, কারণ সে গুনাহে পতিত হয়; অন্যদিকে মানুষের উপর জুলুম, কারণ সে তাদের হক নষ্ট করে। তাই আল্লাহ এখানে জুলুম শব্দ ব্যবহার করে বিচারহীনতার সামাজিক ক্ষতি স্পষ্ট করেছেন।
—
তৃতীয় আয়াত: ফাসিক
আল্লাহ বলেন
وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
অর্থঃ “যারা আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তদনুযায়ী বিচার করে না—তারাই ফাসিক।”
— সূরা মায়িদা, ৫:৪৭
তাফসীর ইবনে কাসীর
এখানে আল্লাহ তাআলা নাসারাদের উদ্দেশ্যে বলেন—তারা যেন ইঞ্জিল অনুযায়ী বিচার করে। অর্থাৎ প্রত্যেক আসমানী কিতাবের অনুসারীদের উপর আল্লাহর বিধান অনুযায়ী চলা ফরয ছিল। কিন্তু নাসারারা নিজেদের প্রবৃত্তি ও বিকৃত মতবাদের অনুসরণ করে আল্লাহর বিধান ত্যাগ করেছিল।
ইবনে কাসীর বলেন, “ফাসিক” অর্থ হলো—আনুগত্যের সীমা থেকে বের হয়ে যাওয়া। যে ব্যক্তি আল্লাহর আদেশ জানে, কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে তা লঙ্ঘন করে, সে ফাসিক। এখানে নাসারাদের সেই কারণেই ফাসিক বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, এটি মুসলিমদের জন্যও সতর্কবার্তা—যদি তারা আল্লাহর বিধান ত্যাগ করে, তবে তারাও একই হুমকির অন্তর্ভুক্ত হবে।
—
তাফসীর তাবারী
ইমাম তাবারী বলেন, ফিসক অর্থ হলো সত্য পথ থেকে বেরিয়ে যাওয়া। যখন কেউ আল্লাহর নির্দেশ জেনেও অন্য পথ বেছে নেয়, তখন সে ফাসিক হয়। এখানে নাসারারা ইঞ্জিলের বিধান ছেড়ে নিজেদের তৈরি পথ অনুসরণ করেছিল।
তিনি বলেন, এটি শুধু নাসারাদের ইতিহাস নয়; বরং মুসলিমদের জন্যও শিক্ষা। শরীয়তের বাইরে বিচার করা মানে আল্লাহর আনুগত্যের সীমা অতিক্রম করা, আর এটিই ফিসকের মূল অর্থ।
—
তাফসীর রূহুল মাআনী
আল্লামা আলূসী বলেন, “ফাসিক” শব্দের মূল অর্থ হলো সীমা অতিক্রম করা। শরীয়তের সীমা ছেড়ে ব্যক্তি যখন নিজের নফসের অনুসরণ করে, তখন সে ফাসিক হয়।
তিনি বলেন, এই তিনটি শব্দ—কাফির, যালিম, ফাসিক—পরস্পর বিরোধী নয়; বরং একই অপরাধের তিনটি ভিন্ন দিক। যদি বিচার না করার কারণ হয় আকীদাগত অস্বীকার, তবে তা কুফর; যদি তা অন্যের অধিকার নষ্ট করে, তবে তা জুলুম; আর যদি তা আল্লাহর আনুগত্য থেকে বেরিয়ে যাওয়ার রূপে হয়, তবে তা ফিসক।
—
কেন তিন জায়গায় তিনটি ভিন্ন শব্দ?
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আল্লাহ একই বিষয়ের জন্য কখনো কাফির, কখনো জালিম, কখনো ফাসিক বলেছেন—কেন?
মুফাসসিরগণ এর গভীর ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
—
ইবনে আব্বাস (রা.)-এর ব্যাখ্যা
প্রখ্যাত সাহাবি Abd Allah ibn Abbas (রা.) বলেন—
আরবি বর্ণনা
كُفْرٌ دُونَ كُفْرٍ
অর্থঃ “এটি এমন কুফর, যা সব সময় ইসলাম থেকে বের করে দেয় এমন বড় কুফর নয়।”
অর্থাৎ—যদি কেউ আল্লাহর বিধানকে অস্বীকার করে, তুচ্ছ মনে করে, মানুষের আইনকে উত্তম মনে করে—তবে তা বড় কুফর হতে পারে।
কিন্তু যদি ব্যক্তি আল্লাহর বিধানকে সত্য মনে করে, তবুও লোভ, ভয়, স্বার্থ বা দুর্বলতার কারণে তা প্রয়োগ না করে—তবে সে বড় গুনাহগার, জালিম, ফাসিক; সব ক্ষেত্রে সরাসরি ইসলাম থেকে বের হয়ে যায় না।
এ ব্যাখ্যা তাফসিরে ব্যাপকভাবে উল্লেখিত।
—
কখন শাসক কাফির হয়?
একজন শাসক তখন কাফির হয় যখন—
আল্লাহর আইনকে অস্বীকার করে
শরিয়াহকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে
মানুষের বানানো আইনকে আল্লাহর আইনের চেয়ে উত্তম মনে করে
ইসলামি বিধানকে অপমান করে
হালালকে হারাম বা হারামকে হালাল ঘোষণা করে বিশ্বাসগতভাবে
এটি আকীদাগত সমস্যা।
—
কখন শাসক জালিম হয়?
যখন—
জনগণের হক নষ্ট করে
বিচার বিক্রি করে
ঘুষ গ্রহণ করে
নিরপরাধকে শাস্তি দেয়
দুর্বলকে পিষে শক্তিশালীর পক্ষ নেয়
নিজের স্বার্থে ক্ষমতা ব্যবহার করে
এগুলো তাকে জালিম বানায়।
—
কখন শাসক ফাসিক হয়?
যখন—
আল্লাহর আদেশ জেনেও অবাধ্য হয়
প্রকাশ্যে গুনাহ করে
অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়
সত্যকে চাপা দেয়
ইসলামের সীমা লঙ্ঘন করে
এগুলো তাকে ফাসিক বানায়।
—
হাদিসে জালিম শাসকের পরিচয়
১. সবচেয়ে নিকৃষ্ট নেতা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—
আরবি হাদিস
شِرَارُ أَئِمَّتِكُمُ الَّذِينَ تُبْغِضُونَهُمْ وَيُبْغِضُونَكُمْ
অর্থঃ “তোমাদের সবচেয়ে নিকৃষ্ট শাসক তারা, যাদের তোমরা ঘৃণা কর এবং তারাও তোমাদের ঘৃণা করে।”
— Sahih Muslim
এটি জালিম নেতৃত্বের লক্ষণ।
—
২. জনগণের সঙ্গে প্রতারণা
রাসূল ﷺ বলেন—
আরবি হাদিস
مَا مِنْ عَبْدٍ يَسْتَرْعِيهِ اللَّهُ رَعِيَّةً فَيَمُوتُ وَهُوَ غَاشٌّ لِرَعِيَّتِهِ إِلَّا حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ
অর্থঃ “যে শাসক জনগণের দায়িত্ব পেয়ে তাদের সঙ্গে প্রতারণা করে মারা যায়, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেন।”
— Sahih al-Bukhari, হাদিস: ৭১৫০
—
৩. মজলুমের দোয়া
রাসূল ﷺ বলেন—
আরবি হাদিস
اتَّقِ دَعْوَةَ الْمَظْلُومِ فَإِنَّهُ لَيْسَ بَيْنَهَا وَبَيْنَ اللَّهِ حِجَابٌ
অর্থঃ “মজলুমের দোয়া থেকে বাঁচো; কারণ তার দোয়া ও আল্লাহর মাঝে কোনো পর্দা নেই।”
— Sahih al-Bukhari
জালিম শাসকের পতনের অন্যতম কারণ এই মজলুমের দোয়া।
—
ইতিহাসের উদাহরণ: ফিরআউন
ফিরআউন শুধু একজন শাসক ছিল না; সে ছিল জুলুমের প্রতীক।
সে মানুষ হত্যা করত
নিজেকে সর্বোচ্চ ক্ষমতার মালিক ভাবত
আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করত
সত্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করত
আল্লাহ বলেন
فَأَخَذْنَاهُ وَجُنُودَهُ فَنَبَذْنَاهُمْ فِي الْيَمِّ
অর্থঃ “অতঃপর আমি তাকে ও তার সৈন্যবাহিনীকে পাকড়াও করলাম এবং সাগরে নিক্ষেপ করলাম।”
— সূরা আল-কাসাস, ২৮:৪০
ফিরআউনের পরিণতি সব জালিম শাসকের জন্য শিক্ষা।
—
ন্যায়পরায়ণ শাসকের মর্যাদা
যেখানে জালিম শাসকের জন্য ধ্বংস, সেখানে ন্যায়পরায়ণ শাসকের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ।
রাসূল ﷺ বলেন—
আরবি হাদিস
سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللَّهُ فِي ظِلِّهِ… إِمَامٌ عَادِلٌ
অর্থঃ “সাত শ্রেণির মানুষকে আল্লাহ তাঁর আরশের ছায়ায় স্থান দেবেন… তাদের একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক।”
— Sahih Muslim
—
বর্তমান সময়ে আমাদের করণীয়
অন্যায়কে সমর্থন না করা
সত্য কথা বলা
ঘুষ ও দুর্নীতিকে ঘৃণা করা
ন্যায়পরায়ণ নেতৃত্ব কামনা করা
নিজের পরিবার ও সমাজে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা
দোয়া ও তাওবার মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চাওয়া
—
উপসংহার
জালিম শাসকের পরিচয় শুধু ক্ষমতার অপব্যবহারে নয়; বরং আল্লাহর বিধান থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়াতেও। কুরআনে আল্লাহ তাআলা একই অপরাধের জন্য কখনো কাফির, কখনো জালিম, কখনো ফাসিক বলেছেন—কারণ অপরাধের স্তর ও নিয়ত ভিন্ন হতে পারে।
যে শাসক আল্লাহর আইনকে অস্বীকার করে, সে কাফির হতে পারে; যে হক নষ্ট করে, সে জালিম; আর যে অবাধ্যতা করে, সে ফাসিক।
ক্ষমতা মানুষের পরীক্ষা। কেউ এই পরীক্ষায় জান্নাত অর্জন করে, কেউ জাহান্নামের আগুন।
তাই প্রত্যেক শাসক, নেতা, প্রশাসক এবং দায়িত্বশীল মানুষের উচিত—ক্ষমতাকে নিজের সম্পদ না মনে করে আল্লাহর আমানত মনে করা।
আল্লাহ আমাদের জুলুম থেকে রক্ষা করুন, ন্যায়ের পথে পরিচালিত করুন এবং সমাজে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

