হজের ফরজ ও ওয়াজিবসমূহ
কোরআন ও হাদিসের আলোকে বিশদ বিবরণ
হজ ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি নির্দিষ্ট শর্তযুক্ত মুসলমানদের জন্য ফরজ করা হয়েছে। হজ পালন করার সময় কিছু কাজ ফরজ এবং কিছু কাজ ওয়াজিব হিসেবে নির্ধারিত আছে। ফরজ কাজগুলো সম্পন্ন না করলে হজ শুদ্ধ হবে না, আর ওয়াজিব কাজগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে পরিত্যাগ করলে দম (একটি পশু কোরবানি) দিতে হয়।
হজের ফরজ সমূহ
১. ইহরাম বাঁধা (الإحرام)
কোরআনে বর্ণিত হয়েছে:
وَأَتِمُّوا الْحَجَّ وَالْعُمْرَةَ لِلَّهِ
“তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ ও ওমরাহ পূর্ণ করো।” (সূরা আল-বাকারা: ১৯৬)
ইহরাম হলো হজের প্রথম ফরজ। নির্দিষ্ট মিকাত থেকে ইহরামের নিয়ত করা বাধ্যতামূলক। ইহরামের মাধ্যমে হজযাত্রী নিজেকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিশেষ কিছু বিধিনিষেধের অধীনে নিয়ে আসে।
২. আরাফাতের ময়দানে অবস্থান (الوقوف بعرفة)
হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“الحج عرفة”
“হজ হলো আরাফাতের ময়দানে অবস্থান।” (সুনান আন-নাসাঈ: ৩০১৬)
হজের মূল রোকন বা স্তম্ভ হলো ৯ জিলহজের দিনে আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা। যে ব্যক্তি আরাফাতে না পৌঁছাতে পারে, তার হজ শুদ্ধ হবে না।
৩. কাবা শরিফের তাওয়াফ করা (طواف الإفاضة)
আল্লাহ বলেন:
ثُمَّ لْيَقْضُوا تَفَثَهُمْ وَلْيُوفُوا نُذُورَهُمْ وَلْيَطَّوَّفُوا بِالْبَيْتِ الْعَتِيقِ
“অতঃপর তারা যেন নিজেদের পরিচ্ছন্ন করে, মানত পূরণ করে এবং প্রাচীন গৃহ (কাবা) তাওয়াফ করে।” (সূরা আল-হাজ্জ: ২৯)
হজের ফরজ কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ১০ জিলহজ তারিখে কাবা শরিফের তাওয়াফ করা, যা ‘তাওয়াফে ইফাদা’ নামে পরিচিত। এটি আদায় না করলে হজ সম্পূর্ণ হবে না।
হজের ওয়াজিব সমূহ
১. মুজদালিফায় রাতযাপন করা (المبيت بالمزدلفة)
হজের রাত (৯ জিলহজ) আরাফাত থেকে ফিরে এসে মুজদালিফায় রাতযাপন করা ওয়াজিব। এখানে ফজরের নামাজ আদায়ের পর কিছুক্ষণ অবস্থান করা হয়।
কোরআনে বলা হয়েছে:
فَإِذَا أَفَضْتُم مِّنْ عَرَفَاتٍ فَاذْكُرُوا اللَّهَ عِندَ الْمَشْعَرِ الْحَرَامِ
“অতঃপর তোমরা যখন আরাফাত থেকে ফিরে আসবে, তখন মাশআরুল হারামে আল্লাহকে স্মরণ করো।” (সূরা আল-বাকারা: ১৯৮)
২. শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করা (رمي الجمار)
হজযাত্রীরা মিনার জামারাতে শয়তানের প্রতীকী স্তম্ভে পাথর নিক্ষেপ করে, যা ওয়াজিব।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“خذوا عني مناسككم”
“তোমরা আমার কাছ থেকে হজের নিয়ম শেখো।” (সহিহ মুসলিম: ১২৯৭)
৩. কুরবানির পশু জবাই করা (ذبح الهدي)
হাজিরা যদি তামাত্তু’ বা কিরান হজ পালন করেন, তবে কুরবানি করা তাদের জন্য ওয়াজিব।
আল্লাহ বলেন:
فَصِيَامُ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ فِي الْحَجِّ وَسَبْعَةٍ إِذَا رَجَعْتُمْ
“যদি কেউ কুরবানি দিতে না পারে তবে তার জন্য হজে তিন দিন এবং ফিরে এসে সাত দিন রোজা রাখা নির্ধারিত।” (সূরা আল-বাকারা: ১৯৬)
৪. মাথা মুন্ডানো বা চুল ছোট করা (الحلق أو التقصير)
১০ জিলহজের দিনে কুরবানির পর মাথা মুন্ডানো বা চুল ছোট করা ওয়াজিব।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“اللهم اغفر للمحلقين”
“হে আল্লাহ, মাথা মুন্ডানোকারীদের ক্ষমা করো।” (সহিহ বুখারি: ১৭২৭)
৫. বিদায়ী তাওয়াফ (طواف الوداع)
হজ শেষ করে কাবা শরিফ ত্যাগ করার আগে বিদায়ী তাওয়াফ করা ওয়াজিব।
হাদিসে এসেছে:
“لا ينفرن أحد حتى يكون آخر عهده بالبيت”
“কেউ যেন কাবা শরিফকে শেষ তাওয়াফ না করে মক্কা ত্যাগ না করে।” (সহিহ মুসলিম: ১৩২৭)
উপসংহার
হজের ফরজ ও ওয়াজিব বিষয়গুলো ইসলামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধান। ফরজ সমূহ পরিপূর্ণভাবে পালন করা ছাড়া হজ শুদ্ধ হয় না, আর ওয়াজিব সমূহ পরিত্যাগ করলে কাফফারা (দম) দিতে হয়। মুসলমানদের উচিত হজের নিয়ম-কানুন সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা নিয়ে তা যথাযথভাবে পালন করা।

