কুরবানী কাকে বলে ও কুরবানীর সূচনা
কুরবানী কাকে বলে
ইসলাম ধর্মে কুরবানী বলা হয় নির্দিষ্ট সময়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে পশু জবাই করার নাম। আরবি শব্দ “قربان” (কুরবান) থেকে “কুরবানী” শব্দটি এসেছে, যার অর্থ হলো নৈকট্য লাভ বা আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের একটি উপায়। এটি শুধুমাত্র একটি আনুষ্ঠানিক পশু জবাই নয়, বরং তা তাকওয়া, আত্মত্যাগ এবং আনুগত্যের প্রতীক।
আদম আলাইহিস সালামের সন্তান থেকে কুরবানীর সূচনা
কুরবানীর ইতিহাস কেবল হজরত ইব্রাহিম (আঃ) থেকেই নয়, বরং আরও প্রাচীন, হজরত আদম (আঃ) এর সন্তানদের সময় থেকে এর সূচনা দেখা যায়। হাদীস ও তাফসীরের আলোকে জানা যায়, হজরত আদম (আঃ) এর দুই পুত্র, হাবীল ও কাবীল, উভয়ে আল্লাহর কাছে কুরবানী পেশ করেছিলেন। তাদের কুরবানী আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়া ও প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ঘটনা থেকেই কুরবানীর প্রথম শিক্ষা পাওয়া যায়।
আল্লাহ তা’আলা বলেন:
﴿وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ ابْنَيْ آدَمَ بِالْحَقِّ إِذْ قَرَّبَا قُرْبَانًا فَتُقُبِّلَ مِنْ أَحَدِهِمَا وَلَمْ يُتَقَبَّلْ مِنَ الْآخَرِ﴾
— সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত ২৭
অর্থ: আপনি তাদেরকে আদমের দুই পুত্রের প্রকৃত কাহিনী শুনিয়ে দিন, যখন তারা উভয়ে কুরবানী পেশ করেছিল, তখন এক জনের কুরবানী কবুল করা হলো, অপর জনের কুরবানী কবুল করা হলো না।
ইমাম ইবনে কাসীর (রহঃ) তাঁর তাফসীরে বলেন, হাবীল পশু কুরবানী করেছিলেন, যা তার পশুপাল থেকে ছিল। আর কাবীল কিছু ফলমূল কুরবানী করেছিল, কিন্তু তার কুরবানী খাঁটি ইখলাসপূর্ণ ছিল না বলে তা কবুল হয়নি। এই ঘটনাই মানব ইতিহাসে প্রথম কুরবানীর ঘটনা, যা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল।
এই শিক্ষার তাৎপর্য
এই ঘটনা আমাদের শেখায় যে, কুরবানীর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ইখলাস বা আন্তরিকতা। কুরবানীর মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে হলে কেবল বাহ্যিক রূপ যথেষ্ট নয়, বরং আল্লাহর জন্য ত্যাগের মানসিকতা থাকতে হবে। আল্লাহ বলেন:
﴿لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَٰكِن يَنَالُهُ التَّقْوَىٰ مِنكُمْ﴾
— সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত ৩৭
অর্থ: আল্লাহর কাছে পৌঁছে না তাদের গোশত ও রক্ত, বরং পৌঁছে যায় তোমাদের তাকওয়া।
সুতরাং, হাবীল ও কাবীলের ঘটনা থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, কুরবানীর আত্মা হলো খাঁটি ইচ্ছা ও তাকওয়া। এই নৈতিক শিক্ষা ইসলামি কুরবানীর ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় পরবর্তী যুগে, বিশেষ করে ইব্রাহিম (আঃ) এর ঘটনার মধ্য দিয়ে।
এইভাবে কুরবানীর ইতিহাস হজরত আদম (আঃ) এর সময় থেকে শুরু হয়ে, নবী ইব্রাহিম (আঃ) ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত বিস্তৃত এবং মুসলিম উম্মাহর একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হিসেবে আজও তা বহমান।

মূল ধারার কোরবানি এর সূচনা
কুরআন ও হাদীসের আলোকে বর্তমানে যে মূল ধারার কুরবানী চলমান আছে ইহার সূচনা হয়েছে হজরত ইব্রাহিম (আঃ) এর সময় থেকে। মহান আল্লাহ তাঁকে স্বপ্নে আদেশ করেন তাঁর প্রিয় পুত্র ইসমাঈল (আঃ) কে কুরবানী করতে। ইব্রাহিম (আঃ) আল্লাহর আদেশ পালনে প্রস্তুত হন এবং ইসমাঈল (আঃ) ও আত্মসমর্পণ করেন। তখন আল্লাহ তা’আলা তাঁর আনুগত্যের পুরস্কার স্বরূপ ইসমাঈল (আঃ) কে রক্ষা করে জান্নাত থেকে একটি দুম্বা পাঠিয়ে দেন।
কুরআনের আলোকে কুরবানীর ঘটনা
আল-কুরআনে বলা হয়েছে:
﴿فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعْيَ قَالَ يَا بُنَيَّ إِنِّي أَرَىٰ فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ فَانظُرْ مَاذَا تَرَىٰ قَالَ يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِي إِن شَاءَ اللَّهُ مِنَ الصَّابِرِينَ﴾
— সূরা আস-সাফফাত, আয়াত ১০২
অর্থ: অতঃপর যখন সে (ইসমাঈল) পিতার সঙ্গে চলাফেরা করার বয়সে পৌঁছল, তখন ইব্রাহিম বললেন, “হে আমার প্রিয় পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখি যে, আমি তোমাকে কুরবানী করছি। এখন তুমি চিন্তা করে দেখো, তোমার কী মত?” সে বলল, “হে আমার পিতা! আপনি যা আদিষ্ট হয়েছেন, তা-ই করুন। ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন।”
হাদীসের আলোকে কুরবানী
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
«ما عمل آدمي من عمل يوم النحر أحب إلى الله من إهراق الدم، وإنه ليأتي يوم القيامة بقرونها وأشعارها وأظلافها، وإن الدم ليقع من الله بمكان قبل أن يقع من الأرض، فطيبوا بها نفساً»
— (জামে তিরমিযী, হাদীস: ১৪৯৩)
অর্থ: কুরবানীর দিনে মানুষের সবচেয়ে প্রিয় কাজ আল্লাহর নিকট হলো কুরবানীর জন্য রক্ত প্রবাহিত করা। নিশ্চয়ই কুরবানীর পশু কিয়ামতের দিন তার শিং, পশম ও খুরসহ উপস্থিত হবে। রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই তা আল্লাহর কাছে পৌঁছে যায়। সুতরাং খুশি মনে কুরবানী করো।
ইমামদের মতামত
চার ইমামের (ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমদ) মধ্যে ইমাম আবু হানিফার (রহঃ) মতে, কুরবানী সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর ওয়াজিব। আর বাকি তিন ইমাম কুরবানীকে সুন্নাতে মুয়াক্কাদা বলেছেন। তবে কেউ যদি কুরবানী না করে, তাহলে তারা তাকে গুনাহগার মনে করেন না; তবে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ, যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো ত্যাগ করেননি।
উপসংহার
কুরবানী একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত যা তাকওয়া, আনুগত্য, ত্যাগ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রতীক। এটি শুধুমাত্র পশু জবাই নয়, বরং আল্লাহর প্রতি ভালবাসা ও নিকটবর্তী হওয়ার চেষ্টা। তাই মুসলমানদের উচিত ইখলাসের সাথে এই ইবাদত পালন করা এবং হজরত ইব্রাহিম (আঃ) ও ইসমাঈল (আঃ) এর আত্মত্যাগের শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করা।

