কোরবানি দেওয়া ওয়াজিব না সুন্নত বিস্তারিত কোরআন এবং হাদিসের আলোকে
কোরবানি ওয়াজিব — কুরআনের দলিল
কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ
“অতএব, আপনার প্রতিপালকের জন্য নামায পড়ুন ও কোরবানি করুন।”
(সূরা কাওসার: ২)
এই আয়াতে “নাহর” (ذبح বা কোরবানি) করার আদেশ এসেছে, এবং اصول تفسীর অনুযায়ী কুরআনে কোনো আদেশ (أمر) থাকলে তা মূলত ওয়াজিব বোঝায়, যদি না অন্য কোনো প্রমাণ তা নাফল বা মুস্তাহাব হিসেবে ব্যাখ্যা করে। এখানে এমন কোনো প্রমাণ নেই যা নির্দেশ করে যে এটি শুধুমাত্র সুন্নত।
হাদীস দ্বারা ওয়াজিব হওয়ার প্রমাণ
হাদীসে এসেছে:
«مَنْ كَانَ لَهُ سَعَةٌ وَلَمْ يُضَحِّ، فَلَا يَقْرَبَنَّ مُصَلَّانَا»
“যার সামর্থ্য রয়েছে অথচ সে কোরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদের নামাযের ময়দানে না আসে।”
(সুনান ইবন মাজাহ, হাদীস: ৩১২৩; হাকেম: সহীহ বলেছেন)
এ হাদীসে কোরবানি না করার প্রতি তীব্র নিন্দা করা হয়েছে এবং নামাযের স্থান থেকে বিরত রাখার নির্দেশ এসেছে। ইসলামী বিধানে এমন নিষেধাজ্ঞা কেবল ফরজ বা ওয়াজিব ইবাদতের ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে। এর দ্বারা স্পষ্ট বুঝা যায় যে, সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য কোরবানি ওয়াজিব।
ইমামদের মতামত ও মাজহাবসমূহের অবস্থান
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন:
“কোরবানি ওয়াজিব, যদি ব্যক্তি মুকিম, بالغ, মুসলিম এবং নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়।”
(আল-হিদায়া, কিতাবুল উদহিয়া)
ইমাম মালিক (রহ.) থেকে দুই মত আছে। তাঁর প্রসিদ্ধ মত হলো:
“কোরবানি সুন্নত মুয়াক্কাদা। তবে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দিলে তা অপছন্দনীয় (مكروه) এবং গুনাহের নিকটবর্তী।”
(আল-মুদাওয়ানাহ الكبرى: ১/৫৪৭)
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.) বলেন:
“কোরবানি ওয়াজিব, এটি রাসূলুল্লাহ ﷺ কখনোও ত্যাগ করেননি।”
(আল-মুগনী: ১১/৯৬)
ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেন:
“কোরবানি সুন্নত। তবে যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ছাড়ে তাদের জন্য মাকরুহ।”
(আল-উম্ম ২/২৪৪)
উল্লেখ্য, অধিকাংশ হানাফি, হাম্বলি এবং কিছু মালিকি আলেম কোরবানিকে ওয়াজিব বলেন এবং তার পক্ষে দলিল প্রদান করেন।
সুন্নত বলার দাবির খণ্ডন
যারা বলেন কোরবানি সুন্নত, তারা নিম্নোক্ত হাদীস দ্বারা দলিল দেন:

«ثَلاثٌ هُنَّ عَلَيَّ فَرِيضَةٌ وَهُنَّ لَكُمْ تَطَوُّعٌ: الْوِتْرُ وَالنَّحْرُ وَرَكْعَتَا الْفَجْرِ»
(মুসলিম/আহমাদ; কিছু সূত্রে দুর্বল)
→ এই হাদীসটি দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত। হাদীস বিশারদ আলেমগণ যেমন দারাকুতনী, বায়হাকী প্রমুখ একে জঈফ বলেছেন।
→ এছাড়া “تطوع” শব্দ দ্বারা এখানে ‘অবশ্যই নফল’ বোঝানো হয়নি বরং ফারজের বিপরীতে এসেছে, অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ ﷺ এর উপর ফরজ ছিল, তোমাদের জন্য তা কঠোর ফরজ নয় — কিন্তু এটি ওয়াজিব হওয়ার বিপরীতে নয়।
উপসংহার ও চূড়ান্ত কথা
• কুরআনের সরাসরি আদেশ: “فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ”
• কঠোর হাদীস: “ফَلَا يَقْرَبَنَّ مُصَلَّانَا”
• ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আহমদ এবং অন্যান্য ফুকাহা একে ওয়াজিব বলেছেন।
• রাসূল ﷺ কখনো কোরবানি ত্যাগ করেননি, তাই এটি শুধুমাত্র নফল বা ঐচ্ছিক নয়।
অতএব, সামর্থ্যবান ব্যক্তির উপর কোরবানি ওয়াজিব। কেবল সুন্নত বলার কোন ভিত্তি নেই যখন শক্তিশালী কুরআন-সুন্নাহ এবং ফিকহি দলিল ওয়াজিবের পক্ষে।

